টি. এস. এলিয়ট একজন কবি, প্রাবন্ধিক এবং নাট্যকার

টি. এস. এলিয়ট বা টমাস স্টার্নস এলিয়ট (২৬ সেপ্টেম্বর ১৮৮৮ – ৪ জানুয়ারী ১৯৬৫) ছিলেন একাধারে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী কবি, প্রাবন্ধিক এবং নাট্যকার। ইংরেজি সাহিত্যের আধুনিকতাবাদী আন্দোলনে তিনি এক যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করেন। এলিয়ট তাঁর অসাধারণ লেখনীর মাধ্যমে কবিতার প্রচলিত ধারাকে ভেঙে ভাষা, প্রকাশভঙ্গি এবং ছন্দ কাঠামোতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছিলেন।

কেবল কাব্যচর্চায় নয়, সাহিত্য সমালোচক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল আকাশচুম্বী। তাঁর তীক্ষ্ণ ও মননশীল প্রবন্ধগুলো সমকালীন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছিল। প্রথাগত বিশ্বাসের পুনর্মূল্যায়ন এবং বৌদ্ধিক গভীরতার কারণে তিনি আজও বিশ্বসাহিত্যের এক অপরিহার্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে সমাদৃত।

বিখ্যাত কবি টি. এস. এলিয়ট আমেরিকার মিসৌরি অঙ্গরাজ্যের সেন্ট লুইসে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ছিলেন ইংল্যান্ডের ডিভনশায়ার অঞ্চলের অধিবাসী। ১৬৭০ সালের দিকে তাঁর আদিপুরুষেরা ইংল্যান্ড ছেড়ে আমেরিকায় পাড়ি জমান। এলিয়ট পরিবার ছিল একাধারে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী; বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁদের দীর্ঘদিনের পারিবারিক ঐতিহ্য ও বিশেষ খ্যাতি ছিল।

১৯০৬ সালে এলিয়ট হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে, ১৯১১ সালে প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং এক বছর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যলয়ের গ্রীকদর্শন সম্বন্ধে বিদাশিক্ষালাভ করেন। ১৯১৪ সাল থেকে টি. এস. এলিয়ট ইংলণ্ডে বসবাস শুরু করেন। হাইগেট স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করার পর ১৯১৬ সাল থেকে ব্যবসা করতে শুরু করেন। লয়েড ব্যাংকে আট বছর ছিলেন। এই সময়ে তিনি “দি ইগোইষ্ট” (১৯১৭-১৯) পত্রিকার সহ-সম্পাদক ছিলেন। ১৯২৩ সালে “দি ক্রাইটেরিয়ান” পত্রিকার সম্পাদক নিযুক্ত হন। 

১৯৩২-৩৩ সালে তিনি হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কাব্য বিভাগের চার্লস এলিয়ট নর্টন অধ্যাপকের পদ অলংকৃত করেছিলেন, ১৯৪৪ সালে ক্লাসিক্যাল এসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন, ১৯৪৮ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেছিলেন, ঐ বছরেই তিনি “অরডার অব মেরিট” উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন। এছাড়া ইউরোপ এবং আমেরিকার বারটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি সম্মানসূচক ডিগ্রী লাভ করেছিলেন। ১৯২৭ সালে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব লাভ করেছিলেন। টি. এস-এর কাব্য কবিতা তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “প্রুফ্রক এণ্ড আদার অবজারভেশন” (১৯১৭), “দি ওয়েস্টল্যান্ড” (১৯২২), “পোয়েমস” (১৯০৯-১৯২৫) “অ্যাস ওয়েডনেস ডে” (Ash Wednesday- 1930) “দি ফোর কোয়ার্টেটস” (১৯৪৪)।

টি. এস. এলিয়টের কাব্য বৈশিষ্ট্য ও ভাবনা

আশা-নিরাশার দোলাচল

টি. এস. এলিয়ট এমন একজন ভাববাদী বুদ্ধিজীবী, কবি ও সাহিত্যিক যাঁর কাব্যে যে মন্ত্রধ্বনি বার বার ধ্বনিত হয়েছে তা আধ্যাত্মিক ভাবনার আশা ও নৈরাশ্যের ভাবনা। ছোটবেলাতেই পিউরিটান ধর্মীয় বিশ্বাস তাঁর মনের মধ্যে গভীরভাবে যে দাগ কেটে দিয়েছিল তা তিনি কোনদিন ভুলতে পারেননি। পিউরিটান বিবেক ও ধ্যান-ধারণা তাঁর ভাবনার পাদপীঠ রচনা করেছিল। পরবর্তীকালে অ্যাংলো-ক্যাথলিক ধর্মের পথ গ্রহণ করেছেন, কিন্তু শৈশবের সেই অধ্যাত্ম-চেতনা বার বার তাঁর ভাবনার রাজ্যে হানা দিয়েছে এবং এলিয়ট আধ্যাত্মিক শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করে বাস্তব জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে সচেতনভাবে পরিহার করে গেছেন।

অবশ্য একটা কথা মনে রাখতে হবে যে তরুণ যৌবনের কবির মনে একটা অনিশ্চিত বাস্তব ভাবনা কবিকে তাড়া করে নিয়ে বেড়িয়েছে। কেন এই অনিশ্চয়তা? কারণ পিউরিটান বিবেক ও প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি সমাজের মানুষগুলির মধ্যে লক্ষ্য করেছেন সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির এক ভয়াবহ অবক্ষয়। এলিয়ট লক্ষ্য করেছেন সমাজের হতাশাগ্রস্ত, হালছাড়া, রুচিসম্পন্ন অর্থবান মানুষের দায়িত্বজ্ঞানহীন নীচতা, লক্ষ্য করেছেন একটা রাস্তার ছেলের চৌর্যবৃত্তির মধ্যে একটা জাতির নির্মম অবক্ষয়কে। অবক্ষয়কে তিনি দেখেছেন, তার বাইরে অন্য কিছু দেখেননি। এমনকি চোর ছেলেটার চোখেও দেখেননি, “I could see nothing behind that child’s’ eye.”

“দি ওয়েস্ট ল্যান্ড” কবিতায় সেই অবক্ষয়ের মরুভূমির উপর দাঁড়িয়ে একটু জলের জন্য হতাশায় আর্তনাদ করে উঠেছেন কবি—If there were only water amongst the rock! ওয়েস্ট ল্যান্ড কবিতায় শক্তিমান ওক বৃক্ষের মত একটা সভ্যতার অপমৃত্যুকে তিনি লক্ষ্য করেছেন যে সভ্যতা জাতীয় সংস্কৃতির মৃত্তিকা থেকে বিচ্যুত, যে সংস্কৃতি সেই ক্ষয়ে যাওয়া গাছের গুঁড়ি থেকে আর কোনদিন প্রস্ফুটিত হবে না। এলিয়ট অন্তঃসারশূন্য সভ্যতার একটা ভয়াবহ চিত্র অংকন করেছেন, একটা সংস্কৃতিবিহীন সভ্যতার নগ্ন কংকালের রূপ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু নৈরাশ্যই সব নয়, তিনি তাঁর কাব্যে ‘রেসারেকসন’ পুনর্জীবনলাভের কথাও বলেছেন। 

আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় তিনি একটা সভ্যতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। প্রচলিত সভ্যতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করার জন্য তাঁকে ঐ যুগের তরুণেরা জানিয়েছেন বিপুল অভিনন্দন। কিন্তু সে বিদ্রোহ ছিল মূলত নেতিবাচক, পেছন দিকে ফেরা। তাই এই নেতিবাচক বিদ্রোহই একদিন তাঁকে পরিণত করল কট্টর রক্ষণশীলরূপে। তিনি অ্যাংলো-ক্যাথলিক ধর্ম গ্রহণ করলেন এবং ১৯৩০ সালে “অ্যাশ ওয়েডনেস ডে” কাব্য প্রকাশ করে ঘোষণা করলেন যে খ্রিস্টবাদের পথ ধরেই আসবে মুক্তি, নামবে জলহীন শুষ্ক মরুপ্রান্তরের বুকে প্রবল বর্ষণ। ফলশ্রুতিতে তিনি নিন্দিত হলেন, ধিকৃত হলেন সেই তরুণদেরই কাছে।[১]

বিজ্ঞানচেতনা ও ধর্মবোধ: রাসেল বনাম এলিয়ট

বিজ্ঞানের প্রবল উন্নতির যুগে জন্ম নিয়ে এবং এর আবহাওয়ায় বিকশিত হয়ে বিজ্ঞানকে এলিয়ট অস্বীকার করেছেন এমন ধরনের অভিযোগ শোনা যায়। আবার অভিযোগটি যে নিছক অর্থহীন, এ কথাও জোর করে বলা যায় না। কিন্তু যে কথা অবশ্যই জোর করে বলা যায় তা হচ্ছে এই যে তিনি বিজ্ঞানকে প্রত্যক্ষ করেছেন সম্পূর্ণ ভিন্নতর দৃষ্টিকোণ থেকে। কথা হতে পারে ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গি বলতে আমরা কী বোঝাতে চাই। লক্ষণীয় হচ্ছে বার্ট্রান্ড রাসেলের সাথে এলিয়টের বিশ্বাসের খানিকটা সমান্তরাল অবস্থান। 

জ্ঞান-তাপস রাসেল বিজ্ঞানী হয়েও বিজ্ঞানের যথেচ্ছাচারের বিরোধিতা করেছেন। তিনি এ সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সতর্কও করে দিয়েছেন। অবশ্য উভয়ের মধ্যে ভাবনার পার্থক্যও রয়েছে। রাসেল আণবিক অস্ত্রসজ্জা তথা মহাকাশচারিতায় সভ্যতা বিধ্বংসী ক্রিয়াকলাপকেই বিশেষভাবে নিন্দে করেছেন। ব্যক্তিগত ভাবনায় নাস্তিকতার কাছাকাছি অবস্থানের কারণে তিনি আধ্যাত্মিকতার প্রতি অবহেলাভরে তাকিয়েছেন। 

রাসেলের বন্ধু এলিয়ট ভিন্ন মেরুর মানসিকতায় বিশ্বাসী। “ওয়েস্ট ল্যাণ্ড’ মূলত এলিয়টের ওই মানসিকতারই একটি সামগ্রিক প্রতিচ্ছবি। তিনি বিশ্বাস করেন, পাষাণে কিছুই গজায় না—স্নেহ বলি, প্রেম বলি কিংবা অন্যকিছুর কথা বলি, সবকিছুর মূলে জীবনের ‘হিয়ার আফটার’ বা শেক্সপেরীয়ান বিশ্বাসবোধের, যাতে কি-না ধর্মবোধকে কেন্দ্র করে উৎসারিত মানসভঙ্গির তাৎপর্যপূর্ণ ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া রয়েছে। 

এলিয়টের কবিতায় ভাববাদ

এলিয়ট প্রথম থেকেই অধ্যাত্মবাদী। রোমান্টিকতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলেও তিনি সনাতনপন্থী। ফলে এলিয়ট ঠিক প্রগতিবাদী ছিলেন না। তিনি “দি ক্রাইটেরিয়ান” পত্রিকার সম্পাদক থাকাকালীন, এমনকি ১৯২০ সাল থেকেই সাহিত্যে ক্লাসিক পদ্ধতির পক্ষে, রাজনীতিতে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছেন। জনগণ থেকে এলিয়ট বিচ্যুত। তাই নতুন কোন ভাবনা তিনি সাহিত্যের মধ্যে সৃষ্টি করতে পারেননি।

এলিয়ট সাহিত্যের আঙ্গিক রচনায় এনেছেন নতুনত্ব। সে নতুনত্ব হলো ভাষার দুর্বোধ্যতা এবং বাক্য রচনার দুর্বোধ্যতা। তার সপক্ষে এলিয়টের যুক্তি হল—

“Our civilization comprehends great variety and complexity, and this variety and complexity, playing upon a refined sensibility, must produce various and complex results. The poet must become more and more comprehensive, more allusive, more indirect, in order to force, to dislocate if necessary, language into his meaning.”

“আমাদের সভ্যতা বিরাট বৈচিত্র্য এবং জটিলতা বোঝে, এবং এই বৈচিত্র্য ও জটিলতা, একটি পরিশীলিত সংবেদনশীলতার উপর খেলা করে, বিভিন্ন ও জটিল ফলাফল তৈরি করবে। কবিকে আরও বেশি করে ব্যাপক, আরও ইঙ্গিতপূর্ণ, আরও পরোক্ষ হয়ে উঠতে হবে, যাতে জোর করে ভাষাকে, যদি প্রয়োজন হয়, তার অর্থে স্থানান্তরিত করতে হয়।”

ভাষাকে বিচ্ছিন্ন বা খন্ডিত করতেই হবে, দুর্বোধ্যতায় তাকে জটিল করে তুলতে হবে কারণ জীবন যেখানে জটিল এবং খন্ডিত সেখানে এছাড়া কোন উপায় নেই। যতই দুর্বোধ্য করা যাবে ততই বুদ্ধির দীপ্ত গরিমা প্রকাশ পাবে ততই ভাবনার শূন্যময়তাঁকে জটিল করে উপস্থাপন করা যাবে। আঙ্গিকের জটিল কলাকৌশলের অন্তরালে অন্তসারশূন্য ভাববাদী সাহিত্যিকের আত্মগোপন করার এ এক কৌশল ছাড়া আর কিছু নয়। 

আধুনিকতাবাদী এলিয়ট

টি. এস. এলিয়ট যে আধুনিকতাবাদী কাব্যরীতির অন্যতম অগ্রপথিক, তা বিশ্বসাহিত্যের পাঠকমাত্রই অবগত। তবে কেবল এই পরিচয়েই তাঁর সুবিশাল কবি-মানসকে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। সমকালীন অন্য কবিদের সাথে তাঁর কবিতার আঙ্গিকগত মিল থাকলেও, এলিয়ট এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও নতুন ধারার স্রষ্টা।

তাঁর কবিতার অনন্যতা নিহিত রয়েছে জীবন ও জগৎ সম্পর্কে তাঁর নিগূঢ় ও নির্মোহ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে। তিনি প্রথাগত আধুনিকতার মোড়কে যে গভীর চেতনা ও মনস্তাত্ত্বিক জটিলতাকে তুলে ধরেছেন, তা-ই তাঁকে তাঁর সমসাময়িকদের ভিড়ে এক অনন্য উচ্চতা দান করেছে। এলিয়টের কবিতা কেবল আধুনিকতার চর্চা নয়, বরং তা মানুষের অস্তিত্ব ও সময়ের এক কালজয়ী এবং নিজস্ব বয়ান, যা তাঁকে চিরকাল স্বতন্ত্র ও অপরিহার্য করে রাখবে।

জন স্টেইনবেক নোবেল পুরস্কার গ্রহণকালে বলেছিলেন, “আমি মনে করি, যে লেখক মানুষের নিজেকে উন্নত করার সক্ষমতায় গভীরভাবে বিশ্বাসী নয়, সাহিত্যের প্রতি তার অনুরাগ নেই।” এই যে মানুষের নিজেকে উন্নত করার সক্ষমতায় বিশ্বাসী হওয়া এবং নির্দিষ্ট প্রেক্ষিতে সৃষ্টিশীল প্রতিভাকে নিয়োজিত করা তা কোনোক্রমেই সহজ ব্যাপার নয়। 

এলিয়ট একাধারে কবি, নাট্যকার ও সমালোচক। লক্ষণীয় হচ্ছে এই তিনটে বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যিনি, তাঁর সৃষ্টি নৈপুণ্য অবশ্যই অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতের একটি নির্দিষ্ট সময় বিন্দুতে অবস্থান গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু সময়-বিন্দু কোথায় এবং কীভাবে নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করে তা স্থির করা জটিলতার চেয়েও জটিল কোনো এক ব্যাপার। এলিয়ট তাই এবং তাঁর প্রবহমান অন্বেষণ প্রিয়তার কারণে জীবনকে কাব্যে নাটকে সমালোচনায় প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছেন। পরিণতিতে দেখা গেল একই কথা, একই শব্দ ও একই বাক্য জীবনের ঘূর্ণায়মান চক্র বা টার্নিং অব দ্য হুইল-এর মতো বার বার ঘুরে ফিরে নির্দিষ্ট কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে এসেছে। একই কাব্যের ভিন্ন ভিন্ন চরণের পাশাপাশি কৌণিক প্রক্রিয়ায় নিজের উপরে নিজেরই ভাষ্যপ্রদানের মনোভঙ্গি বা রাসায়নিক সূত্র-বিন্যাস সক্রিয় রাখা মোটেই নাম-সর্বস্ব কোনো কবির কাজ নয়। এলিয়ট তাই অব্যাহত রেখেছেন। 

একই সঙ্গে একথা বলাও জরুরী যে এলিয়টের ধর্মবোধ বা আধ্যাত্মিক অনুসন্ধিৎসা মোটেই লোকাচার-সমর্থিত নয়। এলিয়ট মনে করেন, ধর্মীয় অনুশীলনের অনুপস্থিতি মানুষের জন্যে ক্ষতিকর এ কারণে যে এর ফলে মানুষের ভাবনা-চিন্তা-কল্পনা জাগতিক সীমারেখার নিগড়ে দারুণভাবে আবদ্ধ হয়ে যায়—অথচ মানুষের অস্তিত্ব কিছুতেই দৃশ্যমান জগতের বস্তুপুঞ্জের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয়। 

রমা রলাঁ আধুনিক সভ্যতাকে পাশাপাশি পরস্পরের বিপরীতমুখিন চলমান মোটর গাড়ির সাথে তুলনা করে বলেছেন যে এদের মধ্যে যে কোনো সময় সংঘাত ঘটতে পারে। এবং এর ফলে মহাবিপর্যয়ের সূচনা হওয়া অসম্ভব কোনো ব্যাপার নয়। তেমনি এলিয়ট রেলগাড়ির যাত্রীদের রুচি ও প্রজ্ঞা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন। অসংখ্য মানুষ একটি মাত্র চালকের বুদ্ধির ওপরে নির্ভর করে গাড়ির মধ্যে ঠায় বসে থাকে! মূলতঃ এই হচ্ছে আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতা যা মানুষের বেশ কিছু মহৎ দিক যে-কোনো মুহূর্তে নিঃশেষ করে দিতে পারে। 

আলোচনার সূত্রে মানসপটে ভেসে ওঠে এমিলি জোলার উপন্যাস বিস্ট ইনম্যানের সেই রেলগাড়ি চালকের ছবি—যেখানে দেখি রেলগাড়িটি চালকের মানসিক বৈকল্যের সুযোগ নিয়ে স্টেশনের পর স্টেশন দ্রুতবেগে পেরিয়ে যাচ্ছে, কেউ এটি থামাতে পারছে না—এক ভয়াবহ পরিণতির দিকে ধাবমান রেলগাড়িটি যেনো এর সাথে তাবৎ মানবসভ্যতাকে অন্ধকারের কোনো এক বিশ্লেষণহীন অজানা অচেনা আবর্তে নিয়ে যাচ্ছে। এলিয়ট মূল্যবোধের সংশ্লেষে আধুনিক সভ্যতার আত্মিক বিপর্যয় লক্ষ্য করে বেদনাহত, অশ্রুসজল।[২]

এলিয়ট যদিও কদাচিৎ কঠিন কিংবা অপরিচিত শব্দ ব্যবহার করেছেন তবু যেন তিনি অনুবাদের উর্ধ্বে কোথাও বিচরণ করছেন। বুদ্ধদের বসু ও বিষ্ণু দে অসাধারণ প্রতিভাবান কবি। কাজেই তাঁদের কিছু অনুবাদ বাংলা সাহিত্যে এলিয়টকে সুপরিচিত করেছে।

উপসংহার

বিশ্বসাহিত্যের আঙিনায় এমন কিছু বিরল প্রতিভাধর কবির বিচরণ রয়েছে, যাঁদের ক্ষেত্রে ‘কবিত্ব’ শব্দটি কেবল একটি পরিচয় নয়; বরং তা এক গভীর রহস্যময়তা আর বিস্ময়কর জগতের পার্থিব বহিঃপ্রকাশ। উইলিয়াম শেকসপিয়র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ইয়েটস, শেলী, জয়েস কিংবা এলিয়টের মতো স্রষ্টাগণ নিজ নিজ স্থান, কাল ও পরিবেশকে আত্মস্থ করেও হয়ে উঠেছেন কালোত্তীর্ণ।

তাঁরা সাধারণ কবিত্বের সীমারেখাকে অতিক্রম করে সেখানে জ্বেলে দিয়েছেন এক অবিনাশী ‘অন্তর প্রদীপ’। তাঁদের সৃষ্টি মহাকালের স্রোতে ভেসে যাওয়ার বদলে সেই স্রোতকেই রাঙিয়ে দিয়েছে অনন্তের অপরূপ লীলা-বৈচিত্র্যে। পার্থিব শব্দের আবরণে তাঁরা আসলে অপার্থিব আর অসীমের এক চিরন্তন জয়গান গেয়েছেন, যা সাহিত্যের সীমানাকে পৌঁছে দিয়েছে এক অনন্য উচ্চতায়।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. ড. শীতল ঘোষ, ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস, ফ্রেন্ডস বুক কর্নার, ঢাকা, পুনর্মুদ্রণ জানুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা ৩১৫-৩১৭
২. সিদ্দিকুর রহমান, স্মৃতি-সত্তার আলোকে টি. এস. এলিয়ট, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, জুন ১৯৮৪, পৃষ্ঠা ৫-৭।

Leave a Comment

error: Content is protected !!