বিশ শতকের ইংরেজি সাহিত্য বা বিংশ শতাব্দীর ইংরেজী সাহিত্য (ইংরেজি: Twentieth-century English literature) হচ্ছে ইংল্যান্ডের সাহিত্যের চেয়ে ইংরাজি ভাষার সাহিত্যের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ যার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস এবং পুরো আয়ারল্যান্ডের লেখকদের ইংরেজি সাহিত্য, পাশাপাশি প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশের ইংরেজি সাহিত্যও এই সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। এতে কিছুটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইংরেজি সাহিত্যও অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে, যদিও আমেরিকান সাহিত্য হিসেবে সেটি অধিক পরিমাণে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। আধুনিকতাবাদ বিংশ শতাব্দীর প্রথম অংশের একটি প্রধান সাহিত্য আন্দোলন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সাহিত্যের নির্দিষ্ট প্রবণতা বর্ণনা করতে উত্তর আধুনিকবাদী সাহিত্য শব্দটিও ব্যবহৃত হয়।[১]
আধুনিকতাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব জেমস জয়েস এবং পরবর্তীকালে স্যামুয়েল বেকেটসহ বিংশ শতাব্দীতে আইরিশ লেখকরা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন। কবি টি এস এলিয়ট ও এজরা পাউন্ড এবং উপন্যাসিক উইলিয়াম ফকনারের মতো আমেরিকানরাও ছিলেন অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ আধুনিকতাবাদী সাহিত্যিক। ব্রিটিশ আধুনিকতাবাদীদের মধ্যে জোসেফ কনরাড, ই এম ফরস্টার, ডরোথি রিচার্ডসন, ভার্জিনিয়া উলফ এবং ডি এইচ লরেন্স অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বেশ কয়েকজন নোবেল বিজয়ী সহ ব্রিটিশ কমনওয়েলথের বিভিন্ন দেশে প্রধান লেখকরা উপস্থিত হতে শুরু করেছিলেন।
সাহিত্য আধুনিকতাবাদ
বিশ শতকের গোড়ার দিকে সাহিত্যে আধুনিকতাবাদ ইংরেজী-ভাষী বিশ্বে বিকশিত হয়েছিল। এই সাহিত্য আন্দোলন বিকশিত হবার কারণ হচ্ছে ভিক্টোরিয় যুগের দৃঢ়তা, রক্ষণশীলতা এবং নৈর্বক্তিক সত্যের ধারণায় বিশ্বাসের প্রতি এক সাধারণ মোহমুক্তির বোধ।[২]
পূর্বের স্থির, নিঃসংশয় আত্মপ্রত্যয়ের স্থলে আবার সন্দেহবাদ ও জিজ্ঞাসামূলক মনোবৃত্তির প্রাধান্য স্থাপিত হলো। পুঁজিপতির সাথে শ্রমিকের স্বার্থসংঘাত, ধনবণ্টনের বৈষম্য, বিভিন্ন জাতির মধ্যে প্রতিযোগিতার তীব্রতা, জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্বন্ধে বিমূঢ়তা, অন্তরে বাহিরে শান্তি ও সন্তোষের অভাব—এই সমস্তই সমাজ-সংস্থিতির ভারসাম্যকে বিচলিত করে এক আমূল বিপর্যয়ের সম্ভাবনা উদ্ঘাটিত করেছিল। সাহিত্যিকের মন প্রশ্নসঙ্কুলতায় আচ্ছন্ন হয়ে তাদের সহজ, সরল দৃষ্টিভঙ্গী হারিয়ে গেছিল। পূর্বতন যুগের অবিসংবাদিত, স্বতঃস্বীকৃত সত্যসমূহও সংশয়াকুলতার বাষ্পে আবৃত্ত হয়ে অস্বচ্ছ ও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছিল। সুনির্দিষ্ট, অন্তর-সমর্থিত বিশ্বাসের যে প্রণালী দিয়ে কাব্য প্রচুর ধারায় প্রবাহিত হয় তা অবরুদ্ধ হয়ে গেল।
সংক্ষেপে, এই যুগে সন্দেহবাদ এত প্রবল হইয়া ওঠে যে, একজন সমালোচক ১৯০০-১৯২০’ এই কালবিভাগকে জিজ্ঞাসাচিহ্নের যুগ (Age of Interrogation) আখ্যায় অভিহিত করিয়াছেন। এই অনিশ্চাত্মক অবস্থার মধ্যে প্রথম মহাযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) বজ্রপাতের মত এসে সমাজ ও সাহিত্যের নৈতিক ও সৌন্দর্যবোঢের ভিত্তিভূমিকে চুর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল।
ভিক্টোরীয় যুগে ডারউইনের বিবর্তনবাদ যেমন মানুষের মনকে খ্রিস্টান ধর্মের সত্যতার প্রতি সন্দিগ্ধ ও সৃষ্টিরহস্যের অর্থ সম্বন্ধে জিজ্ঞাসু করে তুলে, বিংশ শতকের প্রথমেও তেমনি দুই চিন্তানায়কের লেখা মানুষের মনকে আলোড়িত ও মথিত করিয়া তোলে। তারা হলেন বস্তুবাদে কার্ল মার্কস ও ভাববাদে সিগমুণ্ড ফ্রয়েড। অর্থনীতির নিয়ম, সমাজসংস্থানের কারণ, রাষ্ট্রব্যবস্থার যৌক্তিকতা প্রভৃতি সম্বন্ধে যাবতীয় প্রচলিত ধ্যান ধারণাই মার্কস তাঁর পুঁজি (The Capital) নামক গ্রন্থে বিপর্যস্ত করে দেন। ওদিকে, ফ্রয়েডও তাঁর লেখায় এবং নির্জ্ঞান মনের তত্ত্ব উদ্ভাবনে নরনারীর পারস্পরিক সম্পর্ক, মানুষের কাজের প্রেরণা, সমাজসংস্থানের কারণ প্রভৃতি সম্পর্কে মানুষকে নূতন করিয়া ভাবিয়ে তোলেন। এই দুই চিন্তানায়কের প্রভাব বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধের অধিকাংশ ইউরোপীয় লেখকের লেখাতেই কখনও প্রত্যক্ষ, কখনও পরোক্ষভাবে পড়েছে।[৩]
আরো পড়ুন
- কাহিনী কাব্য বা বর্ণনামূলক বা আখ্যানমূলক কবিতা কী? সাহিত্যে কাহিনী কাব্যের বৈশিষ্ট্য ও বিবর্তন
- কবিতার বিশ্লেষণ: শিল্পরূপ ও নিগূঢ় অর্থ উন্মোচনের পথ
- নব্য ধ্রুপদী বা নিওক্লাসিকাল সাহিত্য ইউরোপীয় সাহিত্যে উদ্ভূত বিশেষ ধারার সাহিত্য
- নব্য ধ্রুপদীবাদ শিল্প ও সাহিত্য আন্দোলন যা প্রাচীন গ্রিক ও রোমান শিল্পের অনুসরণ করে
- ধ্রুপদীবাদ বা ক্লাসিসিজম কী? শিল্পকলার শাশ্বত ধ্রুপদী ঐতিহ্যের স্বরূপ
- উত্তর আধুনিকতাবাদ বা পোস্টমডার্নিজম কী? আধুনিকোত্তরবাদের বৈশিষ্ট্য ও মূল ধারণা
- আধুনিকতাবাদী সাহিত্য হচ্ছে নিরীক্ষাধর্মী সাহিত্যিক আন্দোলন
- ভবিষ্যবাদ বা ফিউচারিজম ছিল একটি শৈল্পিক ও সামাজিক আন্দোলন
- দাদাবাদ বা খেয়ালবাদ ছিল একটি আন্তর্জাতিক নৈরাজ্যবাদী শিল্প আন্দোলন
- আধুনিকতা হচ্ছে একটি ঐতিহাসিক সময়কাল ও নবজাগরণের পরে উদ্ভূত সংস্কৃতি
- হৃতসর্বস্ব প্রজন্ম ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালের সামাজিক প্রজন্মের সমাহার
- প্রহসন বা ফার্স হচ্ছে সমাজের খারাপ রীতি শোধনার্থে হাস্যরস প্রধান একাঙ্কিকা
- জাদু বাস্তববাদ হচ্ছে আধুনিক বিশ্বের কথাসাহিত্যের একটি শৈলী ও সাহিত্য ধারা
- সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদ তুলে ধরে সাম্যবাদ অভিমুখী পার্টির প্রতি শিল্পীর কর্তব্য
- সাহিত্যিক বাস্তববাদ সত্যদৃষ্টি দিয়ে বিষয়বস্তুকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে
- নীতিগল্প হচ্ছে রূপকথার ধরনে জীবজন্তুর গল্পের মাধ্যমে নীতিকথার প্রচার
- রূপকথা বা পরির গল্প লোককাহিনী ঘরানার উদাহরণ যা ছোটগল্পের রূপ নেয়
- লোককথা বা লোককাহিনী লোকবিদ্যার ধরন যা কথা, কিসসা বা গপ নিয়ে গঠিত
- প্রবচন হচ্ছে সৃজনশীল, মননশীল ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তির অভিজ্ঞতাজাত ব্যক্তিগত সৃষ্টি
- গীতিকা বা গাথা কী? লোকসাহিত্যের এই উপবর্গের বৈশিষ্ট্য, অনন্যতা ও বিশ্লেষণ
- প্রবাদ জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উপলব্ধি করা সত্যকে মূর্তভাবে প্রকাশ করে
- ভাদু মূলত কৃষি বা ফসল তোলার উৎসবকে কেন্দ্র করে আচার অনুষ্ঠানের গান
- ধাঁধা বা ধাঁধাঁ হচ্ছে একমাত্র ভাব বা বিষয়কে রূপকের দ্বারা প্রশ্নের আকারে প্রকাশ
- পুরাণ বা মিথ হচ্ছে লোক সাহিত্যের অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকরণ
- লোকসাহিত্য বা মৌখিক সাহিত্য হচ্ছে এমন ধরনের সাহিত্য যা কথ্য বা গীত হয়
- কমেডি হচ্ছে প্রধানত নাটকের একটি ধরন যেখানে বিষয়বস্তু হাস্যরসাত্মক
- ছড়া হচ্ছে বিশেষ ধরনের ছন্দের ক্ষুদ্রাকার কবিতা বা পদ্য
- চেতনা প্রবাহ হচ্ছে সাহিত্য সমালোচনায় একটি বর্ণনামূলক উপায় বা পদ্ধতি
- সাহিত্যে একক উক্তি বা মনোলোগ হচ্ছে একক চরিত্রের মানসিক চিন্তা প্রকাশের ভাষণ
- ক্যাথারসিস বা বিমোক্ষণ পুঞ্জিভূত আবেগ প্রকাশের মাধ্যমে স্বাভাবিকে আসা
- সংলাপ হচ্ছে সাহিত্যিক রচনায় দুটি চরিত্রের মধ্যকার কথোপকথন
- ট্রাজেডি হচ্ছে প্রধান চরিত্রের চরম বিপর্যয়ে পতিত হবার নাটক
- সাহিত্য হচ্ছে মানুষের চিন্তাভাবনা ও অনুভূতির লিখিত অথবা মুদ্রিত বিষয়
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ৩০ আগস্ট ২০২০, “বিশ শতকের ইংরেজি সাহিত্য হচ্ছে প্রধানত ইংরাজি ভাষায় রচিত সাহিত্য”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/literature/twentieth-century-english-literature/
২. M. H. Abrams,A Glossary of literary Terms (7th edition). (New York: Harcourt Brace), 1999), p. 167.
৩. কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস, ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানী, কলকাতা, তৃতীয় সংস্করণ, ডিসেম্বর ১৯৬৭, পৃষ্ঠা ২৪৫-২৪৬।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚