ইংরেজি সাহিত্য ইংরেজি ভাষায় সপ্তম শতাব্দী থেকে অদ্যাবধি লিখিত সাহিত্য

ইংরেজি সাহিত্য (ইংরেজি: English Literature) হচ্ছে সপ্তম শতাব্দী থেকে অদ্যাবধি ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দাদের দ্বারা ইংরেজী ভাষায় রচিত লিখিত সাহিত্য ও তৎসংক্রান্ত রচনাবলী। ইংরেজি ভাষা ১,৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিকশিত হয়েছে। পঞ্চম শতাব্দীতে অ্যাংলো-স্যাক্সন বসতি স্থাপনকারীদের হাত ধরে গ্রেট ব্রিটেনে আসা অ্যাংলো-ফ্রিসিয়ান উপভাষাগুলোর সমন্বিত রূপই হলো ‘পুরাতন ইংরেজি’। এই ভাষার সবচেয়ে বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম হলো মহাকাব্য ‘বেওউল্ফ’। যদিও এর পটভূমি স্ক্যান্ডিনেভিয়া, তবুও এটি ইংল্যান্ডের জাতীয় মহাকাব্যের মর্যাদা লাভ করেছে। ১০৬৬ সালে নরম্যানদের ইংল্যান্ড বিজয়ের পর ইংরেজি ভাষার গতিপথ বদলে যায়; নতুন অভিজাত শ্রেণির প্রভাবে ফরাসি ভাষা আদালত, সংসদ ও উচ্চবিত্ত সমাজের প্রধান ভাষা হয়ে ওঠে এবং অ্যাংলো-স্যাক্সন বা পুরাতন ইংরেজির লিখিত চর্চা কমে আসে। 

পরবর্তীকালে নরম্যান প্রভাবপুষ্ট ইংরেজির যে রূপটি বিকশিত হয়, তা ‘মধ্য ইংরেজি’ নামে পরিচিত। এই রূপটি ১৪৭০ সাল পর্যন্ত প্রচলিত ছিল, যতক্ষণ না লন্ডন-ভিত্তিক ‘চ্যান্সেরি স্ট্যান্ডার্ড’ (শেষ মধ্য ইংরেজি) ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় ইংল্যান্ডে ফরাসি ও ল্যাটিন ভাষার আধিপত্য থাকলেও জিওফ্রে চসার তাঁর ‘দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস’-এর মাধ্যমে স্থানীয় মধ্য ইংরেজির সাহিত্যিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অবশেষে ১৪৩৯ সালে জোহানেস গুটেনবার্গের ছাপাখানা আবিষ্কার, ১৬১১ সালের ‘কিং জেমস বাইবেল’ এবং ‘গ্রেট ভাওয়েল শিফট’ বা বৃহৎ স্বরবর্ণ পরিবর্তনের মতো ঘটনাগুলো ইংরেজি ভাষাকে একটি সুসংগত ও মানসম্মত রূপ দিতে সাহায্য করে।

বিখ্যাত কবি ও নাট্যকার উইলিয়াম শেকসপিয়রকে ইংরেজি ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক এবং বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসেবে গণ্য করা হয়। তাঁর কালজয়ী নাটকগুলো বিশ্বের প্রতিটি প্রধান ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং অন্য যেকোনো নাট্যকারের তুলনায় তাঁর নাটকই মঞ্চে সবচেয়ে বেশি প্রদর্শিত হয়। অন্যদিকে, উনবিংশ শতাব্দীতে স্যার ওয়াল্টার স্কটের ঐতিহাসিক রোমান্টিক উপন্যাসগুলো ইউরোপের এক প্রজন্মের চিত্রশিল্পী, সুরকার এবং লেখকদের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।

ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে আঠারো শতকের গোড়ার দিক পর্যন্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির সাথে সাথে ইংরেজি ভাষা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। এক পর্যায়ে এটি ইতিহাসের বৃহত্তম সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। ১৯১৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তৎকালীন বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৩ শতাংশ বা ৪১২ মিলিয়ন মানুষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ১৯০৭ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত গ্রেট ব্রিটেন, উত্তর আয়ারল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রাক্তন ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোর লেখকরা অন্য যেকোনো ভাষার তুলনায় ইংরেজিতে সাহিত্যচর্চার জন্য সবচেয়ে বেশিবার নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন।

ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের বাইরে ইংরেজিতে রচিত প্রধান সাহিত্যগুলিকে আমেরিকান সাহিত্য, অস্ট্রেলিয় সাহিত্য, কানাডিয় সাহিত্য এবং নিউজিল্যান্ডের সাহিত্যের অধীনে আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়। ইংরেজি সাহিত্যকে মাঝে মাঝে সংকীর্ণ হিসাবে অপবাদ দেয়া হয়েছে। এটি যুক্তিযুক্ত হতে পারে যে কোনও একক ইংরেজি উপন্যাস রুশ লেখক লিও তলস্তয়ের যুদ্ধ ও শান্তি বা ফরাসী লেখক গুস্তাভ ফ্লবার্টের মাদাম বোভেরির মতো সর্বজনীনতা অর্জন করতে পারেনি।[১]

এখানে আরেকটা জিনিস মনে রাখতে হবে, সদ্যগত বিশ শতকের সেরা ইংরেজি গদ্যকারদের বেশির ভাগই কিন্তু ইংল্যান্ডের মূল ভূখণ্ডের বাইরের! একালের সালমান রাশদী, অমিতাভ ঘোষ, অরুন্ধতী রায় কিংবা ভি এস নাইপাল, হেনরি জেমস, জোসেফ কনরাড—কেউই মূল ভূখণ্ড ইংল্যান্ডের নয়।[২]

সাধারণ পাঠকদের আগ্রহ ও প্রয়োজনের কথা বিশেষভাবে মনে রেখেই ইংরেজি সাহিত্য সম্বন্ধে এখানে কিছু লেখা প্রকাশ করা হয়েছে। এছাড়াও ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাস বিষয়ক কিছু লেখা প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলা ইংরেজি সাহিত্যের পাঠকদের কাছে এইসব লেখার মূল্য রয়েছে।  ইংরেজি সাহিত্যের ক্রমবিকাশের একটি সামগ্রিক ও কালানুক্রমিক রুপরেখা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সর্বস্তরের পাঠকের অনুসন্ধিৎসার কথা মনে রেখে। লেখাসমূহে সংশ্লিষ্ট যুগের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্যসমূহ, প্রধান ও পাঠ্যতালিকাভুক্ত কবি-লেখকদের যাবতীয় রচনা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলিতে বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক তুলনামূলক আলোচনা স্থান পেয়েছে। আগ্রহী পাঠকগণ যাতে আরো বিশদভাবে অনুশীলনে উৎসাহিত হন সেই বিষয়ে মনোযোগ দেয়া হয়েছে।

কোনো জাতি যখন রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার অধিকারী হয়, তখনই তাহাদের সাহিত্য, শিল্পকলা প্রভৃতির বিকাশ ও উন্নতি হয়। পেরিক্লিসের এথেন্স, অগাস্টাস সীজারের রোম, সমুদ্র গুপ্তের ভারত, প্রথম এলিজাবেথের ইংল্যাণ্ড—সর্বত্র এই একই কথা। বর্তমানে সাম্রাজ্য হারা ইংল্যান্ড দ্বিতীয় স্তরের রাজনৈতিক শক্তি, তাহার আর্থিক অবস্থাও শোচনীয়। অপরদিকে, ক্ষমতা ও স্বাচ্ছল্যের কেন্দ্রবিন্দুটি যুক্তরাষ্ট্রে সরে গেছে। সেখানেও সাহিত্য লেখা হয় ইংরেজি ভাষায়। আবার অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বহু ধারায় ইংরেজি সাহিত্য রচিত হচ্ছে। সেইজন্যই ইংল্যান্ড অদূর ভবিষতে তার সাহিত্য গরিমা পুনরুদ্ধার করতে পারবে না। কিন্তু তা সত্বেও নির্ধিধায় একথা বলা যেতে পারে যে, ইংল্যান্ড যে মহান সাহিত্যিক ঐতিহের অধিকারী, তাহার গৌরব কোনকালেই সহজে ম্লান হবে না।[৩]

সামন্তবাদী যুগের ইংরেজি সাহিত্য

প্রাচীন বা আদি ইংরেজি সাহিত্য: অ্যাংলো-স্যাক্সন ইংল্যান্ড

পৃথিবীর অন্যান্য অনেক ভাষার মতোই ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের উৎপত্তি ঘটেছে ইউরোপের ইতিহাসের সামন্তবাদী যুগে। এই যুগের সাহিত্য হচ্ছে প্রাচীন ইংরেজি সাহিত্য। প্রাচীন ইংরেজি সাহিত্য বা অ্যাংলো-স্যাক্সন সাহিত্য বলতে মূলত সেই সময়কালকে বোঝায়, যখন ইংল্যান্ডে রোমান শাসনের অবসান ঘটে এবং স্যাক্সনসহ অন্যান্য জার্মানিক উপজাতি (যেমন: জুটস ও অ্যাঙ্গেলস) বসতি স্থাপন করতে শুরু করে। ৪৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু করে ১০৬৬ সালে নরম্যান বিজয়ের ঠিক আগ পর্যন্ত অ্যাংলো-স্যাক্সন ইংল্যান্ডে প্রাচীন ইংরেজিতে রচিত সাহিত্যকর্মগুলোই এর অন্তর্ভুক্ত। এই সাহিত্যের বিশাল ভাণ্ডারে রয়েছে বীরত্বগাথামূলক মহাকাব্য, পবিত্র ধর্মীয় স্তোত্র, উপদেশনামা বা ধর্মোপদেশ, বাইবেলের অনুবাদ, আইনি নথি, কালানুক্রমিক ইতিহাস এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ধাঁধা। বর্তমানে এই সময়কালের প্রায় ৪০০টি মূল্যবান পাণ্ডুলিপি টিকে আছে।

মধ্য ইংরেজি সাহিত্য (১০৬৬–১৪৮৫)

১০৬৬ সালে ইংল্যান্ডে নরম্যান বিজয়ের পর অ্যাংলো-স্যাক্সন বা পুরাতন ইংরেজির লিখিত চর্চা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে আসে। নতুন শাসকগোষ্ঠীর প্রভাবে ফরাসি ভাষা হয়ে ওঠে আদালত, সংসদ এবং অভিজাত সমাজের প্রধান মাধ্যম। তবে সময়ের সাথে সাথে আক্রমণকারী নরম্যানদের ভাষা ও সংস্কৃতি স্থানীয় জনপদ ও ভাষার সাথে মিশে যেতে শুরু করে এবং তাদের উপভাষাটি ‘অ্যাংলো-নরম্যান’ রূপ ধারণ করে।

এই বিবর্তনের ধারায় দ্বাদশ শতাব্দী নাগাদ অ্যাংলো-স্যাক্সন ভাষা ধীরে ধীরে ‘মধ্য ইংরেজি’তে রূপান্তরিত হয়। যেহেতু তৎকালীন রাজনৈতিক ক্ষমতা ইংরেজির হাতে ছিল না, তাই ‘পশ্চিম স্যাক্সন’ উপভাষার আগের সেই একক আধিপত্য আর থাকেনি। ফলে মধ্য ইংরেজি যুগের সাহিত্য কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ডে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন আঞ্চলিক উপভাষায় রচিত হতে থাকে, যা সরাসরি সংশ্লিষ্ট লেখকের ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস এবং সাংস্কৃতিক পটভূমিকে প্রতিফলিত করত।

এই সময়কালে ধর্মীয় সাহিত্যের জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং প্রচুর পরিমাণে ‘হ্যাজিওগ্রাফি’ বা সাধু-সন্তদের জীবনী রচিত, রূপান্তরিত ও অনূদিত হয়—যার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো এডমারের ‘দ্য লাইফ অফ সেন্ট অড্রে’। আনুমানিক ১১৫০ থেকে ১১৮০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে রচিত ‘অরমুলুম’-এ প্রথমবারের মতো পুরাতন ইংরেজি ও অ্যাংলো-নরম্যান উপাদানের সংমিশ্রণ দেখা যায়, যা মূলত মধ্য ইংরেজি যুগের আনুষ্ঠানিক সূচনাকে চিহ্নিত করে। পরবর্তীতে, ব্রুট লেয়ামন (Layamon) কবি ওয়েসের নরম্যান-ফরাসি রচনাকে ভিত্তি করে রাজা আর্থার ও তাঁর গোলটেবিলের বীর যোদ্ধাদের (Knights of the Round Table) কিংবদন্তি ইংরেজিতে উপস্থাপন করেন। অ্যাংলো-স্যাক্সন ক্রনিকলের পর ইংরেজি ভাষায় লেখা এটিই ছিল প্রথম কোনো ঐতিহাসিক আখ্যান।

মধ্য ইংরেজি সাহিত্যযুগের বাইবেল অনুবাদ, বিশেষ করে ওয়াইক্লিফের বাইবেল, ইংরেজিকে একটি শক্তিশালী সাহিত্যিক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। জন ওয়াইক্লিফের সরাসরি নির্দেশনা বা অনুপ্রেরণায় একদল অনুবাদক ১৩৮২ থেকে ১৩৯৫ সালের মধ্যে ল্যাটিন থেকে মধ্য ইংরেজিতে বাইবেলের এই অনুবাদগুলো সম্পন্ন করেন। এই অনুবাদকর্মটি মূলত ‘লোলার্ড’ (Lollard) আন্দোলনের প্রধান চালিকাশক্তি ও অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়—যা ছিল রোমান ক্যাথলিক চার্চের প্রথাগত অনেক শিক্ষার বিরুদ্ধে একটি প্রাক-সংস্কারবাদী আন্দোলন।

১৩শ শতাব্দী থেকে ইংরেজি সাহিত্যে ‘রোমান্স’ বা রোমাঞ্চকর আখ্যানের একটি নতুন ধারা জনপ্রিয় হতে শুরু করে। এই ধারার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো ‘কিং হর্ন’ (King Horn) এবং ‘হ্যাভলক দ্য ডেন’ (Havelok the Dane)। এই রচনাগুলো মূলত ১১৭০ খ্রিস্টাব্দের দিকে রচিত ‘রোমান্স অফ হর্ন’-এর মতো অ্যাংলো-নরম্যান মূল কাজগুলোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। তবে ইংরেজিতে বড় মাপের লেখকদের প্রকৃত উত্থান ঘটে ১৪শ শতাব্দীতে। এ সময় উইলিয়াম ল্যাংল্যান্ড এবং জিওফ্রে চসারের পাশাপাশি আবির্ভূত হন ছদ্মনামধারী ‘পার্ল পোয়েট’ (Pearl Poet)। এই পার্ল পোয়েটেরই সবচেয়ে বিখ্যাত ও কালজয়ী সৃষ্টি হলো ‘স্যার গাওয়েন অ্যান্ড দ্য গ্রিন নাইট’ (Sir Gawain and the Green Knight)।

উইলিয়াম ল্যাংল্যান্ডের ‘পিয়ার্স প্লাউম্যান’ (আনুমানিক ১৩৬০–১৩৮৭ সালের মধ্যে রচিত), যার ল্যাটিন নাম ‘ভিসিও উইলেলমি ডি পেট্রো প্লোম্যান’ (Visio Willelmi de Petro Plowman), মধ্য ইংরেজি সাহিত্য যুগের একটি অনন্য রূপক আখ্যান কাব্য। এটি মূলত ছন্দবিহীন কিন্তু অনুপ্রাসনির্ভর (alliterative) পঙক্তিতে লেখা। এই কাব্যের মূল উপজীব্য হলো ‘উইলিয়াম’ নামক এক ব্যক্তির আধ্যাত্মিক স্বপ্নদর্শন, যেখানে পিয়ার্স প্লাউম্যান চরিত্রটির মাধ্যমে মধ্যযুগীয় সমাজের নৈতিকতা ও ধর্মীয় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

চতুর্দশ শতাব্দীর শেষভাগে রচিত ‘স্যার গাওয়াইন অ্যান্ড দ্য গ্রিন নাইট’ মধ্য ইংরেজি সাহিত্যের একটি অনবদ্য অনুপ্রাসনির্ভর (alliterative) রোম্যান্স। এটি রাজা আর্থারের কিংবদন্তি বা ‘আর্থারিয়ান’ গল্পের একটি জনপ্রিয় ধরন—যা ‘শিরচ্ছেদের খেলা’ (Beheading Game) নামে পরিচিত। ওয়েলশ, আইরিশ ও ইংরেজি ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে রচিত এই কাব্যটি বীরত্ব, সম্মান ও নৈতিকতার গুরুত্ব তুলে ধরে।

মজার বিষয় হলো, একই পাণ্ডুলিপিতে আরও তিনটি কবিতা সংরক্ষিত ছিল, যার মধ্যে ‘পার্ল’ (Pearl) নামক একটি জটিল শোকগাথা অন্তর্ভুক্ত। গবেষকরা মনে করেন, এই সবকটি কবিতাই একই ব্যক্তির লেখা, যাঁকে ‘পার্ল পোয়েট’ বলা হয়। এই কবিতাগুলোতে ব্যবহৃত মিডল্যান্ডস অঞ্চলের উপভাষা চসারের লন্ডন-ভিত্তিক ইংরেজি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। বিশেষ করে ‘স্যার গাওয়াইন’-এর দরবারী বর্ণনায় ফরাসি প্রভাব থাকলেও, এতে উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের প্রচলিত অনেক স্ক্যান্ডিনেভিয়ান বা নর্ডিক শব্দের আধিক্য দেখা যায়।

১৪৭০ সাল পর্যন্ত মধ্য ইংরেজির প্রচলন ছিল। এরপর লন্ডন-ভিত্তিক ইংরেজি উপভাষা ‘চ্যান্সেরি স্ট্যান্ডার্ড’ (Chancery Standard) ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ছাপাখানার উদ্ভাবন এই ভাষাকে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডে নিয়ে আসতে শুরু করে। জিওফ্রে চসার বর্তমানে তাঁর বিশ্বখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য ক্যান্টারবেরি টেলস’-এর জন্য সর্বাধিক পরিচিত। মধ্য ইংরেজিতে রচিত এই সংকলনে রয়েছে একদল তীর্থযাত্রীর গল্প, যারা সাউথওয়ার্ক থেকে ক্যান্টারবেরি ক্যাথেড্রালে সেন্ট থমাস বেকেটের মন্দিরে যাওয়ার পথে গল্প বলার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিল। সে সময় ইংল্যান্ডের রাজকীয় ও দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে ফরাসি ও ল্যাটিনের আধিপত্য থাকলেও, চসার তাঁর লেখনীর মাধ্যমে স্থানীয় মধ্য ইংরেজির সাহিত্যিক মর্যাদা ও বৈধতা প্রতিষ্ঠায় এক অনন্য ভূমিকা পালন করেন।

চতুর্দশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডের সাহিত্যিক পরিমণ্ডল ছিল বহুভাষিক, যেখানে ল্যাটিন, অ্যাংলো-নরম্যান (ফরাসি) এবং ইংরেজি—এই তিন ভাষাতেই সমান্তরালে সাহিত্য রচিত হতো। সেই সময়ের পাঠকদের এই বৈচিত্র্যময় ভাষার রুচি জন গাওয়ারের (John Gower) জীবন ও কর্মের মাধ্যমে চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। উইলিয়াম ল্যাংল্যান্ডের সমসাময়িক এবং জিওফ্রে চসারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গাওয়ার মূলত তাঁর তিনটি দীর্ঘ কবিতার জন্য অমর হয়ে আছেন:

  • মিররইর ডি ল’ওমে (Mirroir de l’Omme): এটি অ্যাংলো-নরম্যান ভাষায় রচিত।
  • ভক্স ক্ল্যামান্টিস (Vox Clamantis): এটি ল্যাটিন ভাষায় লেখা।
  • কনফেসিও আমান্টিস (Confessio Amantis): এটি মধ্য ইংরেজিতে রচিত। 

ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় লেখা হলেও এই তিনটি মহাকাব্যই নৈতিকতা এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক ভাবনার এক অভিন্ন সূত্রে গাঁথা।

চতুর্দশ শতাব্দীতে ইংল্যান্ডে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় সাহিত্য রচিত হয়, যার মধ্যে নরউইচের জুলিয়ান এবং রিচার্ড রোলের কাজগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। জুলিয়ানের ‘রিভেলেশনস অফ ডিভাইন লাভ’ (আনুমানিক ১৩৯৩) ইংরেজি ভাষায় কোনো নারীর লেখা প্রথম প্রকাশিত বই হিসেবে স্বীকৃত। পরবর্তী শতাব্দীতে অর্থাৎ ১৪৮৫ সালে উইলিয়াম ক্যাক্সটনের ছাপাখানায় মুদ্রিত হয় স্যার থমাস ম্যালোরির কালজয়ী গ্রন্থ ‘লে মর্টে ডি’আর্থার’। এটি মূলত ফরাসি ও ইংরেজি আর্থারিয়ান রোম্যান্সগুলোর একটি অনন্য সংকলন এবং ইংল্যান্ডে মুদ্রিত প্রাচীনতম গ্রন্থগুলোর অন্যতম। পরবর্তী সময়ে রাজা আর্থারের বীরত্বগাথা ও কিংবদন্তিগুলোর প্রতি জনমানুষের আগ্রহ পুনরুজ্জীবিত করতে এই গ্রন্থটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছিল।

সামন্তযুগীয় থিয়েটার

ইউরোপের স্থানীয় ভাষাগুলোতে মধ্যযুগীয় নাটকের উদ্ভব হয়েছিল মূলত ধর্মীয় উপাসনা বা ‘লিটার্জি’র নাটকীয় উপস্থাপনা থেকে। সে সময়ের ‘মিস্ট্রি প্লে’ বা রহস্য নাটকগুলো ক্যাথেড্রালের প্রাঙ্গণে অথবা উৎসবের দিনে ভ্রাম্যমাণ শিল্পীদের দ্বারা পরিবেশিত হতো। পরবর্তীতে এই মিরাকল (অলৌকিক) ও মিস্ট্রি নাটকগুলোই আরও বিকশিত হয়ে ‘মোরালিটি প্লে’ বা নীতি নাটকের রূপ নেয়, যা এলিজাবেথীয় যুগের মঞ্চনাটকের পথ প্রশস্ত করেছিল। মধ্যযুগীয় থিয়েটারের আরেকটি জনপ্রিয় রূপ ছিল ‘মামারস প্লে’ (Mummers’ play)—যা মরিস নৃত্যের সাথে সম্পর্কিত এক প্রকার আদি পথনাটক। সেন্ট জর্জ ও ড্রাগন অথবা রবিন হুডের মতো লোকগাঁথাগুলোই ছিল এসব নাটকের মূল উপজীব্য। অভিনেতারা অর্থ ও আতিথেয়তার বিনিময়ে শহর থেকে শহরে ঘুরে বেড়াতেন এবং দর্শকদের সামনে এসব পুরনো লোককাহিনী পুনরুজ্জীবিত করতেন।

মধ্যযুগীয় ইউরোপের নাট্যকলার ইতিহাসে ‘মিস্ট্রি’ (রহস্য) এবং ‘মিরাকল’ (অলৌকিক) নাটকগুলো ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে বিকশিত প্রথম দিককার নাট্যরূপ। মূলত দশম থেকে ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত বিবর্তিত এই নাটকগুলোর মূল ভিত্তি ছিল গির্জায় বাইবেলের বিভিন্ন কাহিনী ও রূপক উপস্থাপন, যার সাথে যুক্ত থাকতো সমবেত বা ‘অ্যান্টিফোনাল’ সংগীত। পঞ্চদশ শতাব্দীতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছালেও পেশাদার থিয়েটারের উত্থানের ফলে এগুলো একসময় অপ্রচলিত হয়ে পড়ে।

মধ্যযুগের শেষভাগ থেকে বাইবেলের কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে লেখা চারটি প্রায় পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি নাট্যসংগ্রহ বা ‘সাইকেল’ পাওয়া যায়, যার মধ্যে ৪৮টি পর্ববিশিষ্ট ‘ইয়র্ক সাইকেল’ (York Cycle) সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। ১৪শ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ১৫৬৯ সাল পর্যন্ত ইয়র্ক শহরে এই নাটকগুলো নিয়মিত অভিনীত হতো। মধ্য ইংরেজি নাটকের পাশাপাশি কর্নিশ ভাষায় ‘অর্ডিনালিয়া’ (Ordinalia) নামে তিনটি টিকে থাকা নাট্যসংগ্রহও এই যুগের এক অমূল্য নিদর্শন।

মধ্যযুগীয় ধর্মীয় রহস্য নাটক (Mystery Plays) থেকে উদ্ভূত ‘নীতি নাটক’ (Morality Play) হলো মধ্যযুগ ও প্রাথমিক টিউডর আমলের একটি জনপ্রিয় নাট্য ধারা, যা ইউরোপীয় থিয়েটারকে ক্রমেই ধর্মীয় গণ্ডি থেকে বের করে আরও সেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তির দিকে নিয়ে যায়। এই নাটকগুলো এক ধরনের রূপক আখ্যান, যেখানে মানবজীবনের বিভিন্ন নৈতিক গুণাবলী ও দোষ-ত্রুটিগুলোকে জীবন্ত চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়; যারা নায়ককে মন্দের পথ পরিহার করে সৎ জীবন বেছে নিতে প্ররোচিত করে।

১৫শ ও ১৬শ শতাব্দীতে সমগ্র ইউরোপে এই নাটকগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই ধারার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হলো ১৫শ শতাব্দীর শেষের দিকে রচিত ইংরেজি নাটক ‘দ্য সামনিং অফ এভরিম্যান’ (The Summoning of Everyman), যা সংক্ষেপে ‘এভরিম্যান’ নামে পরিচিত। বিভিন্ন রূপক চরিত্রের মাধ্যমে এই নাটকে মানুষের মৃত্যু এবং খ্রিস্টীয় মুক্তির বিষয়টি অত্যন্ত গভীরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

পুঁজিবাদী যুগের ইংরেজি সাহিত্য

আদি পুঁজিবাদী যুগের ইংরেজি সাহিত্য (১৪৫০–১৬৪৮)

আদি পুঁজিবাদী যুগের ইংরেজি সাহিত্য বলতে নবজাগরণ বা রেনেসাঁর প্রাকপর্ব ও প্রস্তুতিকাল অর্থাৎ ১৪৫০ থেকে ১৬৪৮ সময়কালের ইংরেজি সাহিত্য। এই সময়কালকে ইংরেজি সাহিত্যের আদি পুঁজিবাদী বা নবজাগরণের প্রস্তুতিকাল হিসেবে গণ্য করা হয়। এই সন্ধিক্ষণে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্ষয় এবং বাণিজ্যিক পুঁজিবাদের প্রাথমিক বিকাশ সাহিত্যের রূপরেখা বদলে দেয়।

১৪৭৬ সালে উইলিয়াম ক্যাক্সটন ইংল্যান্ডে ছাপাখানা প্রবর্তনের মাধ্যমে বই সাধারণ মানুষের নাগালে আসে, যা জ্ঞানচর্চাকে গির্জার নিয়ন্ত্রণমুক্ত করে এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির জন্ম দেয়। এর পরবর্তী সময়ে ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের ফলে ল্যাটিনের পরিবর্তে স্থানীয় ইংরেজি ভাষায় ধর্মীয় উপাসনা শুরু হয়। এই প্রেক্ষাপটে ১৫৪৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘বুক অফ কমন প্রেয়ার’ (Common Prayer Book), যা ইংরেজি সাহিত্যিক ভাষার গঠন ও শৈলীর ওপর এক দীর্ঘস্থায়ী ও গভীর প্রভাব ফেলে।

ইউরোপীয় রেনেসাঁর অংশ হিসেবে ‘ইংরেজি রেনেসাঁ’ ছিল একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ও শৈল্পিক আন্দোলন, যা ১৫শ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ১৭শ শতাব্দী পর্যন্ত ইংল্যান্ডে বিস্তৃত ছিল। যদিও ইতালিতে ১৪শ শতাব্দীর শেষভাগেই রেনেসাঁর সূচনা হয়েছিল, তবে উত্তর ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো ইংল্যান্ডেও এই নতুন চিন্তা ও শৈল্পিক ধারণাগুলো পৌঁছাতে প্রায় এক শতাব্দী সময় লেগে যায়। অনেক পণ্ডিত মনে করেন, রাজা অষ্টম হেনরির রাজত্বকালেই ইংরেজি রেনেসাঁর বীজ বপন করা হয়েছিল। তবে এই আন্দোলনের পূর্ণ বিকাশ ও সোনালী সময় হিসেবে ১৬শ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের ‘এলিজাবেথীয় যুগ’-কে ইংরেজি রেনেসাঁর চূড়ান্ত শিখর বলে বিবেচনা করা হয়।

আদি পুঁজিবাদী বা এলিজাবেথীয়-পূর্ব যুগে স্যার থমাস মোর তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইউটোপিয়া’ (Utopia) রচনা করেন, যা ১৫১৬ সালে ল্যাটিন ভাষায় প্রকাশিত হয়। এটি মূলত একটি কল্পকাহিনীর মোড়কে সাজানো সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক রচনা। এই গ্রন্থে তিনি একটি আদর্শ ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছেন, যা ছিল তৎকালীন ইংল্যান্ডের সামাজিক অস্থিরতা এবং উদীয়মান অর্থনৈতিক সংকটের এক তীক্ষ্ণ প্রতিফলন। মোরের এই কালজয়ী সৃষ্টি মধ্যযুগীয় চিন্তা থেকে আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনের দিকে উত্তরণের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এছাড়া, এই যুগে প্রাচীন ল্যাটিন ও গ্রিক সাহিত্যের অনুবাদ এবং ইতালীয় ‘সনেট’ ও ‘ব্ল্যাঙ্ক ভার্স’-এর অনুপ্রবেশ ঘটে, যা পরবর্তী এলিজাবেথীয় যুগের মহান সাহিত্যিক বিপ্লবের ভিত্তি তৈরি করে। মূলত ব্যক্তিবাদের উদয় এবং ইহজাগতিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের আকাঙ্ক্ষাই এই সময়ের সাহিত্যের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।

ইতালীয় নবজাগরণের গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায় স্যার থমাস ওয়াটের কবিতায়, যাঁকে ইংরেজি রেনেসাঁর আদি কবিদের অন্যতম হিসেবে গণ্য করা হয়। ইংরেজি কবিতার ছন্দে ও গঠনে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পেছনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ষোড়শ শতাব্দীর শুরুর দিকে তিনি এবং সারের আর্ল হেনরি হাওয়ার্ড যৌথভাবে ইতালি থেকে ইংরেজি সাহিত্যে ‘সনেট’ (চতুর্দশপদী কবিতা) প্রবর্তন করেন। তাঁদের এই উদ্ভাবন পরবর্তীকালে শেক্সপিয়ারীয় যুগের সনেট চর্চার মূল ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল।

রেনেসাঁ ও এলিজাবেথীয় জ্যাকোবীয় যুগের সাহিত্য

মধ্য পুঁজিবাদী যুগ বা ইংরেজি রেনেসাঁ বা নবজাগরণ যুগ বা এলিজাবেথীয় ও জ্যাকোবীয় যুগের ইংরেজি সাহিত্য শুরু হয় রিফর্মেশন বা ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন যুগের ইংরেজি সাহিত্যের ধারাবাহিকতা থেকে। সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে এই যুগ হলো ইংরেজি নবজাগরণের এক স্বর্ণশিখর। এই সময়কালটি কবিতা, সঙ্গীত, সাহিত্য এবং বিশেষ করে নাট্যকলায় এক অভূতপূর্ব সমৃদ্ধি প্রত্যক্ষ করেছিল। উইলিয়াম শেকসপিয়রের মতো কালজয়ী নাট্যকারদের হাত ধরে এই যুগেই ইংরেজি সাহিত্যে এক নতুন ও বৈপ্লবিক অধ্যায়ের সূচনা হয়।

ইংরেজি রেনেসাঁ যুগের কবিতা

এলিজাবেথীয় যুগের কাব্যসাহিত্যে এডমন্ড স্পেন্সার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র; তাঁর অমর সৃষ্টি মহাকাব্য ‘দ্য ফেইরি কুইন’ (১৫৯০-১৫৯৬) টিউডর রাজবংশ এবং রানী প্রথম এলিজাবেথের প্রশস্তি গাওয়ার পাশাপাশি এক চমৎকার কাল্পনিক রূপক হিসেবে স্বীকৃত। সমসাময়িক আরেকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন স্যার ফিলিপ সিডনি, যাঁর ‘অ্যাস্ট্রোফেল অ্যান্ড স্টেলা’, ‘দ্য ডিফেন্স অফ পোয়েট্রি’ এবং ‘দ্য কাউন্টেস অফ পেমব্রোকের আর্কেডিয়া’ ইংরেজি সাহিত্যে গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই সময়ে মুদ্রিত সাহিত্যের প্রসারের ফলে থমাস ক্যাম্পিয়নের মতো গীতিকবিতাগুলো সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এছাড়াও, জন ডান তাঁর স্বতন্ত্র লেখনীর মাধ্যমে এলিজাবেথীয় কবিতার ধারায় এক গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা যোগ করেছিলেন।

জর্জ চ্যাপম্যান ইংরেজি সাহিত্যে মূলত ১৬১৬ সালে হোমারের ‘ইলিয়াড’ এবং ‘ওডিসি’ মহাকাব্যের সার্থক পদ্য অনুবাদের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। এটিই ছিল ইংরেজি ভাষায় এই দুই মহাকাব্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ। চ্যাপম্যানের এই সৃষ্টি ইংরেজি সাহিত্যের ওপর এতই গভীর প্রভাব ফেলেছিল যে, প্রায় দুই শতাব্দী পর কবি জন কিটস তাঁর বিখ্যাত সনেট ‘অন ফার্স্ট লুকিং ইনটু চ্যাপম্যান’স হোমার’ (১৮১৬) রচনায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

উইলিয়াম শেকসপিয়র ইংরেজি সনেটকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান, যেখানে তিনি ইতালীয় কবি পেত্রার্কের প্রথাগত কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এনে নিজস্ব এক শৈলী প্রবর্তন করেন। ১৬০৯ সালে প্রকাশিত তাঁর ১৫৪টি সনেটের সংকলনটি ইংরেজি সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। এই সনেটগুলোতে তিনি সময়ের প্রবহমানতা, শাশ্বত প্রেম, নান্দনিক সৌন্দর্য এবং নশ্বরতার মতো গভীর ও চিরন্তন বিষয়গুলোকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

সপ্তদশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে শেক্সপিয়ার ও বেন জনসনের সমসাময়িক কবিদের মধ্যে ‘মেটাফিজিক্যাল’ বা অধিবিদ্যার কবিরা এক অনন্য ধারার জন্ম দেন। জন ডন, জর্জ হারবার্ট, হেনরি ভন, অ্যান্ড্রু মার্ভেল এবং রিচার্ড ক্র্যাশো ছিলেন এই ধারার প্রধান দিকপাল। তাঁদের কাব্যশৈলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল প্রখর বুদ্ধিমত্তা এবং ‘মেটাফিজিক্যাল কনসিট’ বা অদ্ভুত সব উপমার ব্যবহার; যেখানে তাঁরা অত্যন্ত জটিল ও অকল্পনীয় রূপকের মাধ্যমে গভীর জীবনদর্শন ফুটিয়ে তুলতেন।

সপ্তদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে অধিবিদ্যক বা মেটাফিজিক্যাল কবিতার ধারাটি আরও বিস্তৃত ও পরিপক্ক রূপ লাভ করে। ১৬২৫ সালের পরেও জন ডন এবং জর্জ হারবার্টের মতো অগ্রজ কবিরা তাঁদের সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন। পরবর্তীকালে, তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দ্বিতীয় প্রজন্মের একদল প্রভাবশালী কবি এই ধারায় যুক্ত হন। রিচার্ড ক্র্যাশো, অ্যান্ড্রু মার্ভেল, টমাস ট্র্যাহার্ন এবং হেনরি ভনের মতো এই নতুন প্রজন্মের কবিরা তাঁদের মেধা ও অনন্য উপমার মাধ্যমে মেটাফিজিক্যাল কবিতার ঐতিহ্যকে সপ্তদশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত সমুন্নত রেখেছিলেন।

রেনেসাঁ যুগের মূলধারার বাইরে ইংরেজি সাহিত্যে ‘ক্যাভালিয়ার কবি’ (Cavalier Poets) ছিলেন এক প্রভাবশালী প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী। মূলত ১৬৪২ থেকে ১৬৫১ সালের ইংরেজ গৃহযুদ্ধের সময় তাঁরা রাজা প্রথম চার্লসের একনিষ্ঠ সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। রাজা চার্লস ১৬২৫ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং ১৬৪৯ সালে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এই কবিদের মধ্যে রবার্ট হেরিক, রিচার্ড লাভলেস, টমাস কেরু এবং স্যার জন সাকলিং খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁদের কোনো প্রথাগত বা আনুষ্ঠানিক সংগঠন ছিল না, তবে প্রখ্যাত নাট্যকার বেন জনসনের সাহিত্যশৈলী তাঁদের সবাইকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। অধিকাংশ ক্যাভালিয়ার কবি রাজদরবারের সভাসদ হলেও রবার্ট হেরিক ব্যতিক্রম ছিলেন; তবে তাঁর লিখনশৈলী ও নান্দনিকতা তাঁকে এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করে। তাঁদের রচনায় প্রচুর পরিমাণে ধ্রুপদী রূপক ও অলঙ্কারের ব্যবহার দেখা যায়, যা মূলত রোমান লেখক হোরেস, সিসেরো এবং ওভিডের আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিল।

জন মিলটনকে “ইংরেজি নবজাগরণের সর্বশেষ মহান কবি” হিসেবে অভিহিত করা হয়। ১৬৬০ সালের পূর্বেই তিনি বেশ কিছু কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ ও রচনা প্রকাশ করেছিলেন, যা তাঁর অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ‘এল অ্যালেগ্রো’ (১৬৩১), ‘ইল পেনসেরোসো’ (১৬৩৪), গীতি-নাট্য বা মাস্ক ‘কোমাস’ (১৬৩৮) এবং তাঁর বিখ্যাত শোকগাঁথা ‘লিসিডাস’ (১৬৩৮)।

ইংরেজি রেনেসাঁ যুগের নাটক বা থিয়েটার

এলিজাবেথীয় নাট্যসাহিত্যের প্রাথমিক বিকাশে থমাস স্যাকভিল ও টমাস নর্টনের ‘গর্বোডাক’ (১৫৬১) এবং থমাস কাইডের ‘দ্য স্প্যানিশ ট্র্যাজেডি’ (১৫৯২) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে বিবেচিত। ইংরেজি সাহিত্যের প্রথম পদ্য নাটক হিসেবে ‘গর্বোডাক’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, কারণ এতেই প্রথম ‘ব্ল্যাঙ্ক ভার্স’ বা অমিত্রাক্ষর ছন্দের সার্থক প্রয়োগ ঘটে। নাটকটি সমকালীন নীতিমূলক নাটক এবং সেনেকান ট্র্যাজেডির সমন্বয়ে এক নতুন ধারার সূচনা করেছিল, যা পরবর্তী প্রজন্মের নাট্যকারদের জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, ১৫৮২ থেকে ১৫৯২ সালের মাঝামাঝি সময়ে রচিত থমাস কাইডের ‘দ্য স্প্যানিশ ট্র্যাজেডি’ সমসাময়িক থিয়েটারে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। এটি ইংরেজি নাট্যমঞ্চে ‘রিভেঞ্জ ট্র্যাজেডি’ বা প্রতিশোধমূলক নাটকের এক সম্পূর্ণ নতুন ও প্রভাবশালী ঘরানা প্রতিষ্ঠা করেছিল।

এলিজাবেথীয় যুগে কবি ও নাট্যকার হিসেবে উইলিয়াম শেকসপিয়ার এক অনন্য ও অতুলনীয় উচ্চতায় আসীন ছিলেন। তাঁর বহুমুখী প্রতিভা বিভিন্ন ধারার নাটকে প্রতিফলিত হয়েছে; যার মধ্যে রয়েছে ইতিহাসাশ্রয়ী নাটক (যেমন: ‘রিচার্ড দ্য থার্ড’ ও ‘হেনরি দ্য ফোর্থ’), কালজয়ী ট্র্যাজেডি (‘হ্যামলেট’, ‘ওথেলো’, ‘ম্যাকবেথ’), মনমুগ্ধকর কমেডি (‘আ মিডসামার নাইটস ড্রিম’, ‘অ্যাজ ইউ লাইক ইট’, ‘টুয়েলফথ নাইট’) এবং তাঁর শেষ জীবনের রোমান্স বা ট্র্যাজিকমেডি। শেক্সপিয়ারের এই সৃজনশীল যাত্রা পরবর্তী জ্যাকোবীয় যুগেও একইভাবে অব্যাহত ছিল।

সপ্তদশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে শেকসপিয়ার তাঁর বিখ্যাত কিছু ‘প্রবলেম প্লে’ বা সমস্যামূলক নাটক রচনার পাশাপাশি ‘ম্যাকবেথ’ ও ‘কিং লিয়ার’-এর মতো কালজয়ী সব ট্র্যাজেডি সৃষ্টি করেন। কর্মজীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি মূলত রোমান্স বা ট্র্যাজিকমেডির দিকে মনোনিবেশ করেন এবং ‘দ্য টেম্পেস্ট’-সহ আরও তিনটি উল্লেখযোগ্য নাটক সম্পন্ন করেন। এই নাটকগুলো তাঁর পূর্ববর্তী ট্র্যাজেডির তুলনায় কম বিষণ্ণ হলেও ১৫৯০-এর দশকের কমেডিগুলোর চেয়ে অনেক বেশি গম্ভীর ও জীবনধর্মী। জীবনের এই পরিণত পর্যায়ের নাটকগুলোতে ট্র্যাজিক ভুলভ্রান্তির ঊর্ধ্বে উঠে ক্ষমা ও পুনর্মিলনের এক প্রশান্ত সুর ধ্বনিত হয়েছে।

উইলিয়াম শেকসপিয়ারের প্রয়াণের পর, জ্যাকোবীয় যুগের সাহিত্যাঙ্গনে কবি ও নাট্যকার বেন জনসন একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। তাঁর নাট্যশৈলী মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যের ধারক এবং তাঁর চরিত্রগুলো সমকালীন চিকিৎসা শাস্ত্রের ‘থিয়োরি অব হিউমার্স’ বা চার রসের তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত। জনসন মূলত ‘কমেডি অব হিউমার্স’ ধারাটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন, যেখানে চরিত্রগুলো তাদের বিশেষ কোনো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বা খেয়ালের বশবর্তী হয়ে আচরণ করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কমেডিগুলোর মধ্যে ‘ভলপোনি’, ‘দ্য অ্যালকেমিস্ট’ এবং ‘বার্থোলোমিউ ফেয়ার’ অন্যতম। সমসাময়িক অন্যান্য নাট্যকারদের মধ্যে টমাস মিডলটনের ‘এ চ্যাস্ট মেইড ইন চিপসাইড’ নগর কমেডির (City Comedy) এক সার্থক উদাহরণ। এছাড়া ফ্রান্সিস বিউমন্ট এবং জন ফ্লেচার যৌথভাবে ‘ফিলাস্টার’, ‘আ কিং অ্যান্ড নো কিং’ এবং ‘দ্য স্করনফুল লেডি’-এর মতো জনপ্রিয় ট্র্যাজিকমেডি রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন।

জ্যাকোবীয় যুগে নাট্যসাহিত্যের অন্যতম আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় ধারা ছিল ‘রিভেঞ্জ ট্র্যাজেডি’ বা প্রতিশোধমূলক নাটক। এলিজাবেথীয় যুগে টমাস কিডের ‘দ্য স্প্যানিশ ট্র্যাজেডি’র মাধ্যমে যে ধারার পত্তন হয়েছিল, জ্যাকোবীয় যুগে তা আরও পরিপক্ক ও বিস্তৃত রূপ পায়। জর্জ চ্যাপম্যানের ‘বুসি ডি’অ্যাম্বোইস’ ও ‘দ্য রিভেঞ্জ অফ বুসি ডি’অ্যাম্বোইস’, সিরিল টুর্নুরের ‘দ্য অ্যাথিস্ট’স ট্র্যাজেডি’ এবং জন ফ্লেচারের ‘ভ্যালেন্টিনিয়ান’ এই ধারার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই সময়ের শ্রেষ্ঠ প্রতিশোধমূলক নাটকগুলোর মধ্যে জন ওয়েবস্টারের ‘দ্য হোয়াইট ডেভিল’ ও ‘দ্য ডাচেস অফ মালফি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এছাড়া টমাস মিডলটন ‘দ্য সেকেন্ড মেইডেন’স ট্র্যাজেডি’ এবং বিখ্যাত ‘দ্য রিভেঞ্জার্স ট্র্যাজেডি’ রচনা করেন—যা দীর্ঘকাল টুর্নুরের লেখা বলে মনে করা হলেও আধুনিক গবেষণায় মিডলটনের সৃষ্টি হিসেবে স্বীকৃত।

ইংরেজি রেনেসাঁ যুগের গদ্য

ইংরেজি রেনেসাঁ যুগের গদ্য সাহিত্যে ফ্রান্সিস বেকনের প্রবন্ধসমূহ এক অনন্য সংযোজন। তবে এই সময়ের পরবর্তী পর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গদ্য নিদর্শন হলো ‘কিং জেমস বাইবেল’। ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে এটি অন্যতম বৃহৎ ও প্রভাবশালী অনুবাদ প্রকল্প হিসেবে স্বীকৃত, যার কাজ ১৬০৪ সালে শুরু হয়ে ১৬১১ সালে সম্পন্ন হয়। এই অনুবাদটি উইলিয়াম টিন্ডেলের হাত ধরে শুরু হওয়া ইংরেজি বাইবেল অনুবাদের দীর্ঘ ঐতিহ্যের এক সার্থক সমাপ্তি ঘটায় এবং অচিরেই এটি ইংল্যান্ডের চার্চের জন্য একটি আদর্শ পাঠ্য বা স্ট্যান্ডার্ড বাইবেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

মধ্য পুঁজিবাদী যুগের ইংরেজি সাহিত্য (১৬৪৮–১৭৮৯)

মধ্য পুঁজিবাদী যুগের ইংরেজি সাহিত্যের সময়কাল ১৬৪২ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত ইংরেজি সাহিত্যের তিনটি যুগবিভাজন করা যায়। যুগ তিনটিকে যথাক্রমে বলা হয় নব্য ধ্রুপদী যুগ, রোমান্টিক যুগ এবং বাস্তববাদী সাহিত্যের যুগ।

নব্য ধ্রুপদী যুগ (১৬৪২–১৭৯৮):

এই যুগে লেখকরা প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্যের আদর্শ, যুক্তি এবং শৃঙ্খলার ওপর গুরুত্ব দিতেন। ১৬৪২ সালে ইংল্যান্ডে গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুগে জন ড্রাইডেন, আলেকজান্ডার পোপ এবং জোনাথন সুইফটের মতো সাহিত্যিকরা ব্যঙ্গাত্মক রচনা ও মহাকাব্যিক শৈলীকে জনপ্রিয় করেন। এই সময়ের শেষভাগে ডক্টর স্যামুয়েল জনসন ইংরেজি অভিধান রচনার মাধ্যমে সাহিত্যে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেন।

মূল নিবন্ধ: নব্য ধ্রুপদী সাহিত্য

নব্য ধ্রুপদী যুগ বিভাজন

নব্য ধ্রুপদী যুগকে তিন ভাগে বিভাজিত করা হয় যথা ইংরেজ বিপ্লব যুগের সাহিত্য, ইংরেজ সাংবিধানিক সংসদীয় যুগের সাহিত্য এবং সংবেদনশীলতার যুগের সাহিত্য। প্রথম বিভাজনকে বলা হয় ইংরেজ বিপ্লবের যুগ। ১৬৪২ সালে ইংরেজ গৃহযুদ্ধের সূচনা থেকে ১৬৮৮ সালের গৌরবময় বিপ্লব ও ১৬৮৯ সালের অধিকার ঘোষণা পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়কালকে একক শব্দে সাধারণত ‘ইংরেজ বিপ্লবের’ যুগ (English Revolution) বলা হয়। ইংরেজ গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অলিভার ক্রমওয়েলের ইংরেজ মহাবিদ্রোহের পিউরিটান শাসনামলে কঠোর সেন্সরশিপ এবং অতি-রক্ষণশীল নীতিবাদী মানদণ্ডের কারণে তৎকালীন সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে একটি বড় ধরনের ছেদ পড়ে। এই সময় সাহিত্য চর্চায় যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা দীর্ঘদিনের সাহিত্যিক ঐতিহ্যে একটি গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করে। যদিও নাটকে উপরের নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে অবস্থা বদল হতে কেবল কয়েক বছর লাগে।

ইংরেজ বিপ্লবী যুগের সাহিত্য

ইংরেজ গৃহযুদ্ধকালীন সময়ে সাহিত্যে ভাটা থাকে, তবে ১৬৬০ সালে রাজা দ্বিতীয় চার্লসের সিংহাসনে আরোহণের মাধ্যমে যখন রাজতন্ত্রের পুনর্বাসন বা পুনরাগমন (Restoration) ঘটে, তখন সেই দ্বন্দ্বময় দশা থেকে সাময়িক মুক্তি মেলে। এটি কেবল রাজনীতির পরিবর্তন ছিল না, বরং ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে এক নতুন ভোরের সূচনা ছিল, যা পরবর্তী যুগের সকল ধরণের সাহিত্য সৃষ্টির জন্য একটি আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।

ইংরেজ বিপ্লবী যুগের কবিতা

ইংরেজ বিপ্লবী যুগে, বিশেষভাবে ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্রের পুনর্বাসন বা রিস্টোরেশন যুগে বিজ্ঞান, সাংবাদিকতা, দর্শন এবং সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হয়। বিজ্ঞানের নবদিগন্ত উন্মোচিত হয় ১৬৬০ সালে ‘রয়্যাল সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে; আর ১৬৬১ সালে রবার্ট বয়েলের কালজয়ী গ্রন্থ ‘দ্য স্কেপটিকাল কিমিস্ট’ রসায়নশাস্ত্রে নতুন চিন্তার খোরাক দেয়। সাংবাদিকতার ইতিহাসে এই সময়টি বিশেষভাবে স্মরণীয় ১৬৬৫ সালে ‘দ্য লন্ডন গেজেট’ (তৎকালীন নাম ‘দ্য অক্সফোর্ড গেজেট’) প্রকাশের জন্য, যা আজ অবধি ইংরেজি ভাষার প্রাচীনতম এবং ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত সংবাদপত্র হিসেবে স্বীকৃত। 

দার্শনিক চিন্তাধারায় জন লকের ‘টু ট্রিটিসেস অফ গভর্নমেন্ট’ (১৬৮৯) রাজনৈতিক দর্শনে এক নতুন মাত্রা যোগ করে। পাশাপাশি, সাহিত্য সমালোচনার ক্ষেত্রে জন ড্রাইডেনের ‘এ্যাসে অফ ড্রামাটিক পোয়েসি’ (১৬৬৮) এবং জেরেমি কোলিয়ারের ক্ষুরধার সমালোচনা ‘শর্ট ভিউ অফ দ্য ইমরোরালিটি অ্যান্ড প্রোফেনেনেস অফ দ্য ইংলিশ স্টেজ’ (১৬৯৮) সমকালীন সাহিত্য ও নাট্যমঞ্চের বিবর্তন ও সংস্কারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জন মিল্টন তাঁর অমর মহাকাব্য ‘প্যারাডাইস লস্ট’ (১৬৬৭)-এর জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত এই মহাকাব্যে তিনি বাইবেলের বর্ণিত মানুষের পতনের কাহিনী তুলে ধরেছেন—যেখানে শয়তানের প্ররোচনায় আদম ও হবার প্রলোভিত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত ইডেন উদ্যান থেকে তাঁদের বহিষ্কারের মর্মস্পর্শী বিবরণ পাওয়া যায়।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৬৭১ সালে মিল্টন তাঁর পরবর্তী মহাকাব্য ‘প্যারাডাইস রিগেইনড’ রচনা করেন। পূর্ববর্তী কাজের মতো এখানেও তিনি গভীর ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়বস্তু ও একই ছন্দশৈলী বজায় রেখেছেন। তবে এই পর্বে তিনি মূলত লুকের সুসমাচারে বর্ণিত যিশুখ্রিস্টের ওপর শয়তানের প্রলোভন এবং সেই প্রলোভনকে জয় করার কাহিনী বর্ণনা করেছেন।

জন ড্রাইডেন ছিলেন রেস্টোরেশন যুগের একজন প্রভাবশালী ইংরেজ কবি, সাহিত্য সমালোচক, অনুবাদক ও নাট্যকার। তৎকালীন ইংল্যান্ডের সাহিত্যিক অঙ্গনে তাঁর আধিপত্য ও প্রভাব এতটাই প্রবল ছিল যে, সেই সময়কালটি সাহিত্য মহলে “এজ অফ ড্রাইডেন” (Age of Dryden) বা ‘ড্রাইডেন যুগ’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ইংরেজি কবিতায় ‘হিরোইক কাপলেট’ (Heroic Couplet) বা বীরত্বপূর্ণ দ্বিপদীকে আদর্শ রূপ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কৃতিত্ব তাঁরই।

ড্রাইডেনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাফল্য নিহিত রয়েছে তাঁর ব্যঙ্গাত্মক পদ্যে, যার সার্থক উদাহরণ হলো তাঁর উপহাস-বীরত্বপূর্ণ (Mock-heroic) সৃষ্টি ‘ম্যাকফ্লেকনো’ (১৬৮২)। পরবর্তী প্রজন্মের কবি আলেকজান্ডার পোপ ড্রাইডেনের রচনাশৈলী দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন এবং প্রায়ই তাঁর কৌশলগুলো অনুসরণ করতেন। এমনকি আঠারো শতকের অন্যান্য প্রথিতযশা লেখকরাও ড্রাইডেন ও পোপ—উভয়ের সাহিত্যিক আদর্শের দ্বারা সমানভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

ইংরেজ বিপ্লবী যুগের গদ্য

ইংরেজ বিপ্লবী যুগে বা পুনর্বাসন বা ‘রিস্টোরেশন’ যুগে ইংরেজি গদ্যে ধর্মীয় রচনার আধিপত্য থাকলেও, এই সময়েই কথাসাহিত্য (Fiction) এবং সাংবাদিকতার মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। তৎকালীন ধর্মীয় লেখাগুলো প্রায়শই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রভাবিত ছিল; আবার একইভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনাতেও ধর্মের সরাসরি ইঙ্গিত পাওয়া যেত। রিস্টোরেশন প্রশাসন উগ্র সাম্প্রদায়িক লেখাকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করলেও র্যাডিকালিজম বা আমূল সংস্কারবাদী চিন্তাধারা পুরোপুরি মুছে যায়নি।

এই পটপরিবর্তনের ফলে জন মিল্টনের মতো পিউরিটান লেখকদের জনজীবন থেকে সরে দাঁড়াতে অথবা নতুন ব্যবস্থার সাথে মানিয়ে নিতে বাধ্য করা হয়। বিশেষ করে যারা রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছিলেন কিংবা রাজা প্রথম চার্লসের বিচারে সরাসরি যুক্ত ছিলেন, তাদের কঠোরভাবে দমন করা হয়েছিল। ফলস্বরূপ, অনেক বিদ্রোহী লেখক গোপনে লিখতে বাধ্য হন এবং ইন্টাররেগনাম (Interregnum) বা প্রজাতন্ত্রের আমলে প্রভাব বিস্তারকারী অনেক লেখকের গুরুত্ব এই যুগে হ্রাস পায়। তবে এই ধর্মীয় ধারার লেখকদের মধ্যে জন বুনিয়ান ছিলেন ব্যতিক্রমী ও অনন্য। তাঁর বিশ্বখ্যাত কালজয়ী রচনা ‘দ্য পিলগ্রিম’স প্রোগ্রেস’ মূলত ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক মুক্তির এক অনন্য রূপক এবং খ্রিস্টীয় জীবন যাপনের এক অবিস্মরণীয় পথনির্দেশিকা।

রাজতন্ত্রের পুনর্বাসন পর্বে সংবাদ আদান-প্রদানের প্রধান মাধ্যম ছিল ‘ব্রডশিট’ প্রকাশনা। বিশাল আকারের একক কাগজে মুদ্রিত এই প্রকাশনাগুলোতে সমসাময়িক ঘটনার বিবরণ থাকত, যা প্রায়শই ছিল একপাক্ষিক বা পক্ষপাতদুষ্ট।

ইংরেজি উপন্যাসের উৎপত্তির সঠিক সময়কাল নির্ধারণ করা কঠিন হলেও, এই যুগেই দীর্ঘ গদ্যকাহিনী এবং কাল্পনিক জীবনীগুলো সাহিত্যের অন্যান্য শাখা থেকে নিজেদের আলাদা করতে শুরু করে। ফ্রান্স ও স্পেনের ‘রোমান্স’ ঘরানার গল্পের যে ঐতিহ্য ইংল্যান্ডে জনপ্রিয় ছিল, তার প্রভাবেই উপন্যাসের এই বিবর্তন ত্বরান্বিত হয়। এই যুগে উপন্যাসের বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের একজন হলেন আফ্রা বেন (Aphra Behn), যাঁর রচিত ‘ওরুনোকো’ (১৬৮৮) একটি মাইলফলক। তিনি কেবল প্রথম পেশাদার নারী ঔপন্যাসিকই ছিলেন না, বরং ইংল্যান্ডের ইতিহাসে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে প্রথম সারির পেশাদার লেখকদের মধ্যে অন্যতম।

ইংরেজ বিপ্লবী যুগের নাটক

ক্রমওয়েলের পিউরিটান শাসনামলে জনসম্মুখে নাটক প্রদর্শনের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, রাজতন্ত্রের পুনর্বাসনের সাথে সাথে তা তুলে নেওয়া হয়। ফলে নাটক অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এবং বিপুল সংখ্যায় পুনরুজ্জীবিত হতে শুরু করে। প্রাথমিক রিস্টোরেশন যুগের সবচেয়ে আলোচিত নাটকগুলো ছিল জন ড্রাইডেনউইলিয়াম ওয়াইচারলি এবং জর্জ এথেরেজের লেখা আবেগহীন বা ‘কঠিন’ কমেডি (Hard Comedy)। এই নাটকগুলো তৎকালীন রাজসভার (Court) পরিবেশকে ফুটিয়ে তুলত এবং যেখানে অভিজাত পুরুষতান্ত্রিক জীবনধারা, যৌন ষড়যন্ত্র ও বিজয়ের কাহিনী উদযাপন করা হতো।

১৬৮০-এর দশকে নাটকের গুণগত মান ও সংখ্যা উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পতন ঘটে। তবে ১৬৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এসে নাট্যসাহিত্যের, বিশেষ করে কমেডির এক সংক্ষিপ্ত কিন্তু উজ্জ্বল দ্বিতীয় প্রস্ফুটন ঘটে। এই সময়ের নাটকগুলো ছিল আগের চেয়ে কিছুটা ‘নরম’ (Soft) এবং নৈতিকতার দিক থেকে অনেক বেশি মধ্যবিত্তঘেঁষা। উইলিয়াম কংগ্রিভের ‘দ্য ওয়ে অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ (১৭০০) এবং জন ভ্যানব্রুর ‘দ্য রিল্যাপস’ (১৬৯৬) ও ‘দ্য প্রোভোকড ওয়াইফ’ (১৬৯৭)-এর মতো কমেডিগুলো বিশ বছর আগের সেই উগ্র অভিজাত ঘরানা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল এবং এগুলো মূলত বিশাল এক সাধারণ দর্শকগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নির্মিত হয়েছিল।

ইংরেজ সাংবিধানিক সংসদীয় যুগের সাহিত্য (১৬৮৯–১৭৪৫)

গৌরবময় বিপ্লবের পরে ব্রিটিশ সাংবিধানিক সংসদীয় যুগে শিল্প বিপ্লব, ব্যাংক ব্যবস্থার সূচনা হয়। এই সময়ে জর্জ বার্কলে, ডেভিড হিউম এবং অ্যাডাম স্মিথের মতো বরেণ্য ব্রিটিশ আলোকায়ন যুগের (British Enlightenment) দার্শনিকদের উত্থান ঘটে। তারা মূলত ফ্রান্সিস বেকন, টমাস হবস এবং জন লকের মতো সপ্তদশ শতাব্দীর অগ্রগামী দার্শনিকদের দেখানো পথ ও চিন্তাধারা অনুসরণ করেছিলেন।

ব্রিটিশ সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের সূচনালগ্ন এবং সংসদীয় যুগের প্রথমার্ধ ছিল ইংরেজি সাহিত্যের এক অনন্য সময়কাল। আঠারো শতকের শুরু থেকে ১৭৪০-এর দশক পর্যন্ত বিস্তৃত এই যুগের সমাপ্তি ঘটে ১৭৪৪ সালে আলেকজান্ডার পোপ এবং ১৭৪৫ সালে জোনাথন সুইফটের প্রয়াণের মাধ্যমে। এই যুগে উপন্যাসের দ্রুত বিকাশ ঘটে এবং ব্যঙ্গসাহিত্যের এক অভাবনীয় জোয়ার দেখা যায়। নাট্যকলায় রাজনৈতিক তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ বিবর্তিত হয়ে মেলোড্রামায় রূপ নেয় এবং কবিতায় শুরু হয় ব্যক্তিগত আত্ম-অন্বেষণের ধারা। দর্শনের ক্ষেত্রে এই সময়টি ছিল অভিজ্ঞতাবাদের (Empiricism) ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের যুগ। পাশাপাশি রাজনৈতিক অর্থনীতিতে এটি বাণিজ্যবাদের (Mercantilism) বিবর্তন, পুঁজিবাদের বিকাশ এবং বাণিজ্যের জয়জয়কারকেই চিহ্নিত করে।

সংসদীয় যুগের কবিতা

ব্রিটিশ সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও সংসদীয় যুগের এই সময়েই কবি জেমস থমসন তাঁর বিষণ্ণ ও প্রকৃতিপ্রেমী কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য সিজনস’ (১৭২৮-১৭৩০) এবং এডওয়ার্ড ইয়ং তাঁর বিখ্যাত ‘নাইট থটস’ (১৭৪২) রচনা করেন। তবে এই যুগের শ্রেষ্ঠ ও প্রভাবশালী কবি হিসেবে স্বীকৃত আলেকজান্ডার পোপ (১৬৮৮-১৭৪৪)। সে সময় যাজকীয় জীবনের সঠিক আদর্শ ও নৈতিকতা নিয়েও তাত্ত্বিক লড়াই বিদ্যমান ছিল। সমকালীন সাহিত্যে ‘সাজসজ্জার মতবাদ’ (Doctrine of Decorum), সঠিক অর্থের সঙ্গে যুৎসই শব্দের প্রয়োগ এবং বিষয়ের গুরুত্ব অনুযায়ী বাগ্মিতা অর্জনের বিষয়টি কবিদের কাছে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল।

একই সময়ে ব্যঙ্গাত্মক মহাকাব্য বা ‘মক-হিরোয়িক’ (Mock-heroic) ধারাটি সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছায়। আলেকজান্ডার পোপের ‘দ্য র‍্যাপ অফ দ্য লক‘ (১৭১২-১৭১৭) এবং ‘দ্য ডানসিয়াড’ (১৭২৮-১৭৪৩) আজও সর্বকালের সেরা ব্যঙ্গাত্মক কবিতা হিসেবে বিবেচিত হয়। এছাড়া তিনি হোমারের ‘ইলিয়াড’ (১৭১৫-১৭২০) এবং ‘ওডিসি’ (১৭২৫-১৭২৬) অনুবাদ করে বিপুল খ্যাতি অর্জন করেন। তবে ১৭৪৪ সালে মৃত্যুর পর থেকে আজ পর্যন্ত পোপের সাহিত্যকর্ম ও কৃতিত্ব নিয়ে সমালোচকদের মাঝে নিরন্তর পুনর্মূল্যায়ন ও বিতর্ক চলছে।

সংসদীয় যুগের নাটক

ব্রিটিশ সাংবিধানিক রাজতান্ত্রিক সংসদীয় যুগের শুরুর দিকে নাট্যমঞ্চে জন ভ্যানব্রু এবং উইলিয়াম কংগ্রেভের শেষদিকের নাটকগুলোর আধিপত্য ছিল, যা মূলত পরিবর্তিত রূপের ‘রেস্টোরেশন কমেডি’ (Restoration Comedy)। তবে ধীরে ধীরে মঞ্চের পরিবেশ বদলে যেতে শুরু করে; উচ্চাঙ্গের নাটকের বদলে নিম্নমানের প্রহসন এবং ঘরোয়া ট্র্যাজেডির প্রাধান্য বাড়তে থাকে। জর্জ লিলো এবং রিচার্ড স্টিল এই সময়ে এক নতুন ধরনের ‘নৈতিক ট্র্যাজেডি’ প্রবর্তন করেন, যেখানে রাজকীয় চরিত্রের বদলে মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের জীবন ও সংকট তুলে ধরা হয়। এটি নির্দেশ করে যে, নাটকের সাফল্যে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা আর আগের মতো অপরিহার্য ছিল না।

একই সময়ে কলি সিবার এবং জন রিচ বড় মাপের জাকজমকপূর্ণ মঞ্চায়নের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। এই যুগে ‘হারলেকুইন’ চরিত্র এবং ‘প্যান্টোমাইম’ থিয়েটারের সূচনা ঘটে। এসব ‘নিম্নবর্গের কমেডি’ অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং নাট্যমঞ্চের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়। অন্যদিকে, লন্ডনে ইতালীয় অপেরার জনপ্রিয়তা বাড়লে স্থানীয় সাহিত্যিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিরোধের সৃষ্টি হয়। ১৭২৮ সালে জন গে তাঁর বিখ্যাত ‘দ্য বেগার’স অপেরা’ নিয়ে সফলভাবে মঞ্চে ফিরে আসেন। তবে এই সৃজনশীল ধারায় ছেদ পড়ে ১৭৩৭ সালের ‘লাইসেন্সিং আইন’ (Licensing Act) পাসের মাধ্যমে, যার ফলে থিয়েটারগুলো পুনরায় কঠোর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে চলে যায় এবং অনেক নাটক মঞ্চায়ন চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।

সংসদীয় যুগের উপন্যাসসহ গদ্য

ব্রিটিশ সাংবিধানিক রাজতান্ত্রিক সংসদীয় যুগের গদ্য সাহিত্যে এই সময়টি ইংরেজি প্রবন্ধের বিকাশের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছে। জোসেফ অ্যাডিসন এবং রিচার্ড স্টিল তাঁদের বিখ্যাত সাময়িকী ‘দ্য স্পেক্টেটর’ (The Spectator)-এর মাধ্যমে ব্রিটিশ প্রবন্ধের একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামো ও আদর্শ প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এই যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ইংরেজি উপন্যাসের প্রথম সার্থক আবির্ভাব। এ সময়ে ড্যানিয়েল ডিফো সাংবাদিকতা এবং অপরাধীদের জীবন নিয়ে সংবাদপত্রে লেখালেখি ছেড়ে কাল্পনিক উপন্যাসের দিকে মনোনিবেশ করেন। এর ফলেই আমরা পাই ‘মল ফ্ল্যান্ডার্স’ (১৭২২) এবং ‘রোক্সানা’ (১৭২৪)-এর মতো অনবদ্য সৃষ্টি। এছাড়া তাঁর অমর সৃষ্টি ‘রবিনসন ক্রুসো‘ (১৭১৯) এই যুগকেই সমৃদ্ধ করেছে।

ব্রিটিশ সাংবিধানিক রাজতান্ত্রিক সংসদীয় যুগে অ্যাডিসন এবং স্টিল যদি এক ধরণের গদ্যে আধিপত্য বিস্তার করে থাকেন, তবে জোনাথন সুইফট তাঁর তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গাত্মক গদ্যের মাধ্যমে অন্য এক উচ্চতা স্পর্শ করেছিলেন। ‘গালিভার’স ট্রাভেলস’-এর এই অমর স্রষ্টা তাঁর ‘আ মডেস্ট প্রপোজাল’ এবং ‘ড্রেপিয়ার লেটারস’-এর মাধ্যমে ঔপনিবেশিক শোষণের হাত থেকে আয়ারল্যান্ডের জনগণকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হন। যদিও আইরিশ রোমান ক্যাথলিকদের প্রতি তাঁর বিশেষ কোনো অনুরাগ ছিল না, তবুও তাদের ওপর অমানবিক নির্যাতন তাঁকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল; যার ফলে তাঁর লেখাগুলো দাঙ্গা ও গ্রেপ্তারের মতো পরিস্থিতির জন্ম দেয়।

অন্যদিকে, ১৭৩৭ সালের লাইসেন্সিং আইনের কঠোর সেন্সরশিপের কারণে অনেক প্রতিভাবান নাট্যকার উপন্যাস রচনার দিকে ঝুঁকে পড়েন। হেনরি ফিল্ডিং তাঁর নাটকগুলো সেন্সরশিপের বেড়াজালে আটকে যাওয়ার পর গদ্য ব্যঙ্গ ও উপন্যাস লিখতে শুরু করেন। এরই মধ্যে স্যামুয়েল রিচার্ডসন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘পামেলা’ বা ‘ভার্চু রিওয়ার্ডেড’ (১৭৪০) প্রকাশ করেন। ফিল্ডিং এই উপন্যাসের ভাবালুতা ও অযৌক্তিকতাকে আক্রমণ করে ‘শামেলা’ (১৭৪১) এবং ‘জোসেফ অ্যান্ড্রুজ’ (১৭৪২)-এর মতো কালজয়ী উপন্যাস রচনা করেন।

সংবেদনশীলতার যুগের সাহিত্য (১৭৪৫–১৭৮৯)

নব্যধ্রুপদী যুগের শেষ পর্যায়টি সংবেদনশীলতার যুগ বা Age of Sensibility হিসেবে পরিচিত। যদিও মহান পণ্ডিত ও ইংরেজি অভিধানের প্রণেতা ডক্টর স্যামুয়েল জনসনের নামানুসারে এই যুগকে ‘এজ অফ জনসন’ বলেও অভিহিত করা হয়। এই উপ-বিভাগটি ছিল মূলত নব্য ধ্রুপদী যুগের কঠোর যুক্তিবাদ এবং আসন্ন রোমান্টিক যুগের ভাবাবেগের মধ্যবর্তী একটি সন্ধিক্ষণ। এই সময়ে নব্য ধ্রুপদী নিয়মগুলো কিছুটা শিথিল হতে শুরু করে এবং মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি বা ‘সেনসিবিলিটি’ সাহিত্যে জায়গা করে নিতে থাকে। এই যুগেই আধুনিক ইংরেজি উপন্যাসের প্রকৃত বিকাশ ঘটে এবং জীবনী ও প্রবন্ধ সাহিত্য অত্যন্ত জনপ্রিয়তা পায়। এটি মূলত রোমান্টিক যুগের (১৭৯৮) সূত্রপাতের জন্য একটি শক্তিশালী মঞ্চ তৈরি করে দিয়েছিল।

স্যামুয়েল জনসন, যিনি বিশ্বজুড়ে ‘ডক্টর জনসন’ নামেই সমধিক পরিচিত, ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের এক বহুমুখী প্রতিভা। কবি, প্রাবন্ধিক, নীতিবাদী, সাহিত্য সমালোচক, জীবনীকার এবং সম্পাদক হিসেবে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে যে অসামান্য অবদান রেখেছেন, তা চিরস্থায়ী। তাঁকে প্রায়ই “ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব” হিসেবে অভিহিত করা হয়।

দীর্ঘ নয় বছরের নিরলস পরিশ্রমের পর ১৭৫৫ সালে তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ ‘এ ডিকশনারি অফ দ্য ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ’ প্রকাশিত হয়। আধুনিক ইংরেজি ভাষার ওপর এই অভিধানের প্রভাব অপরিসীম; এটি কেবল একটি গ্রন্থ নয়, বরং ব্যক্তিগত পাণ্ডিত্যের এক অনন্য ও শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত।

আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ইংরেজি সাহিত্যে অলিভার গোল্ডস্মিথ, রিচার্ড ব্রিনসলি শেরিডান এবং লরেন্স স্টার্ন—এই তিনজন বিশিষ্ট আইরিশ লেখকের আবির্ভাব ঘটে। গোল্ডস্মিথ তাঁর কালজয়ী উপন্যাস ‘দ্য ভিকার অফ ওয়েকফিল্ড’ (১৭৬৬), বিখ্যাত যাজকীয় কবিতা ‘দ্য ডেজার্টেড ভিলেজ’ (১৭৭০) এবং ‘দ্য গুড-ন্যাচারড ম্যান’ (১৭৬৮) ও ‘শি স্টুপস টু কনকোয়ার’ (১৭৭৩)-এর মতো জনপ্রিয় নাটকের জন্য সমাদৃত। অন্যদিকে, শেরিডানের প্রথম নাটক ‘দ্য রিভালস’ (১৭৭৫) মঞ্চস্থ হওয়ার পরপরই ব্যাপক সাফল্য পায়। পরবর্তীতে ‘দ্য স্কুল ফর স্ক্যান্ডাল’-এর মতো নাটকের মাধ্যমে তিনি আঠারো শতকের শেষভাগে লন্ডনের প্রধান নাট্যকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। গোল্ডস্মিথ ও শেরিডান উভয়ই তৎকালীন যুগের ‘আবেগপ্রবণ কমেডি’র (Sentimental Comedy) পরিবর্তে ‘রেস্টোরেশন কমেডি’র আদলে নাটক লিখে নতুন ধারা তৈরি করেছিলেন।

একই সময়ে লরেন্স স্টার্ন ১৭৫৯ থেকে ১৭৬৭ সালের মধ্যে তাঁর নিরীক্ষাধর্মী ও বিখ্যাত উপন্যাস ‘ট্রিস্ট্রাম শ্যান্ডি’ প্রকাশ করেন। আবার ১৭৭৮ সালে ফ্রান্সেস বার্নি (ফ্যানি বার্নি) রচনা করেন ‘এভেলিনা’, যা ‘ম্যানারস অব নভেল’ বা শিষ্টাচারধর্মী উপন্যাসের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত। উল্লেখ্য যে, ফ্যানি বার্নির এই উপন্যাসগুলো বিশ্বখ্যাত ঔপন্যাসিক জেন অস্টেন অত্যন্ত আগ্রহের সাথে পাঠ করতেন এবং প্রশংসা করতেন।

রোমান্টিকতাবাদের পূর্বসূরীদের সাহিত্য

উনিশ শতকের শুরুর দিকে ইংরেজি সাহিত্যে যে রোমান্টিক আন্দোলনের সূচনা হয়, তার শিকড় প্রোথিত ছিল আঠারো শতকের কবিতা, গথিক উপন্যাস এবং সংবেদনশীলতাধর্মী (Sensibility) সাহিত্যধারার গভীরে। ১৭৪০-এর দশকের ‘কবরস্থানের কবিদের’ (Graveyard Poets) লেখায় মৃত্যু নিয়ে যে বিষণ্ণ ধ্যান ও গভীর চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল, তা রোমান্টিকতার পথ প্রশস্ত করে। পরবর্তীতে এই ধারার সাথে যুক্ত হয় ‘মহান’ (Sublime) ও অদ্ভুত সব অনুভূতির মেলবন্ধন এবং প্রাচীন ইংরেজি কাব্যরীতি ও লোককাহিনীর প্রতি গভীর অনুরাগ।

এই প্রাক-রোমান্টিক ধারার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে থমাস গ্রের বিখ্যাত ‘এলিজি রাইটেন ইন আ কান্ট্রি চার্চইয়ার্ড’ (১৭৫১) এবং এডওয়ার্ড ইয়ং-এর ‘নাইট থটস’ (১৭৪২-১৭৪৫)। এছাড়া জেমস থমসন এবং জেমস ম্যাকফারসন এই আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে বিবেচিত। জেমস ম্যাকফারসন ছিলেন প্রথম স্কটিশ কবি যিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন; তিনি দাবি করেছিলেন যে তিনি প্রাচীন চারণকবি ‘ওসিয়ান’-এর হারিয়ে যাওয়া মহাকাব্যগুলো খুঁজে পেয়েছেন এবং সেগুলো অনুবাদ করেছেন।

আবেগপ্রবণ উপন্যাস বা ‘সংবেদনশীলতার উপন্যাস’ (Novel of Sensibility) হলো ইংরেজি সাহিত্যের একটি বিশিষ্ট ধারা, যা আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বিকশিত হয়েছিল। এই ধারাটি মানুষের আবেগ, সূক্ষ্ম অনুভূতি এবং সংবেদনশীলতার বৌদ্ধিক ধারণাকে উদযাপন করে। মূলত আঠারো শতকের প্রথম ভাগের ‘আগস্টান যুগের’ কঠোর যুক্তিবাদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই কবিতা ও কথাসাহিত্যে এই সংবেদনশীলতার ফ্যাশন বা চল শুরু হয়।

ইংরেজি সাহিত্যে এই ধারার সবচেয়ে প্রভাবশালী ও জনপ্রিয় উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে স্যামুয়েল রিচার্ডসনের ‘পামেলা’ (১৭৪০), অলিভার গোল্ডস্মিথের ‘দ্য ভিকার অফ ওয়েকফিল্ড’ (১৭৬৬), লরেন্স স্টার্নের বৈপ্লবিক সৃষ্টি ‘ট্রিস্ট্রাম শ্যান্ডি’ (১৭৫৯-৬৭) এবং হেনরি ম্যাকেঞ্জির বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ম্যান অফ ফিলিং’ (১৭৭১)।

ব্রিটেনে রোমান্টিক আন্দোলনের বিকাশে আন্তর্জাতিক সাহিত্য ও দর্শনের প্রভাব ছিল অনস্বীকার্য। বিশেষ করে জার্মান সাহিত্যিক গ্যেটে, শিলার ও অগাস্ট উইলহেম শ্লেগেল এবং ফরাসি দার্শনিক ও লেখক জঁ-জাক রুশোর চিন্তাধারা এই আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। দর্শনের ক্ষেত্রে এডমন্ড বার্কের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আ ফিলোসফিক্যাল এনকোয়ারি ইনটু দ্য অরিজিন অফ আওয়ার আইডিয়াস অফ দ্য সাবলাইম অ্যান্ড বিউটিফুল’ (১৭৫৭) ছিল এক অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা। 

শিল্পকলার পাশাপাশি সে সময়কার আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটও বড় ভূমিকা পালন করেছিল। শিল্প বিপ্লব এবং ব্রিটিশ কৃষি বিপ্লবের ফলে ব্রিটেনের প্রাকৃতিক ভূদৃশ্যে যে ব্যাপক পরিবর্তন আসে, তা কবি ও সাহিত্যিকদের মনে প্রকৃতির প্রতি এক নতুন গভীর অনুরাগ ও রোমান্টিক ভাবাবেগ সৃষ্টিতে সহায়তা করে।

আঠারো শতকের শেষভাগে, হোরেস ওয়ালপোল তাঁর ১৭৬৪ সালের উপন্যাস ‘দ্য ক্যাসেল অফ ওট্রান্টো’-এর মাধ্যমে ইংরেজি সাহিত্যে গথিক উপন্যাসের (Gothic Fiction) এক নতুন ধারা তৈরি করেন। এই ধারায় তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে বীভৎস ভৌতিকতা এবং রোমান্টিকতার উপাদানগুলোকে একত্রিত করেছিলেন। 

পরবর্তীতে অ্যান র‍্যাডক্লিফ এই ঘরানায় এক বিশেষ মাত্রা যোগ করেন। তিনি গথিক খলনায়কের মধ্যে এক ধরণের মানসিক উদ্বেগ ও জটিলতা ফুটিয়ে তোলেন, যা পরবর্তীকালের বিখ্যাত ‘বায়রনিক হিরো’ (Byronic Hero) চরিত্রের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল। তাঁর রচিত ‘দ্য মিস্ট্রিজ অফ উডলফো’ (১৭৯৫) উপন্যাসটিকে আজও আদিম বা ধ্রুপদী গথিক উপন্যাসের একটি শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়।

অন্ত বা শেষ পুঁজিবাদী যুগের ইংরেজি সাহিত্য (১৭৮৯–১৯০১)

রোমান্টিকতাবাদী যুগ (১৭৮৯–১৮৩৭)

রোমান্টিকতাবাদ বা রোমান্টিসিজম (ইংরেজি: Romanticism) বা রোমান্টিক যুগ ছিল একটি শৈল্পিক, সাহিত্যিক, সাংগীতিক এবং মনীষাগত আন্দোলন যা অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে ইউরোপে উদ্ভূত হয়েছিল এবং বেশিরভাগ অঞ্চলগুলিতে ফরাসি বিপ্লবের সময় থেকে, অর্থাৎ আনুমানিক ১৭৯৮ থেকে ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত সময়ে শীর্ষে ছিল। রোমান্টিকতাবাদ আবেগ এবং ব্যক্তিত্ববাদের উপর জোর দেওয়ার সাথে সাথে সমস্ত অতীতচারিতা ও প্রকৃতির গৌরব দ্বারা চিহ্নিত হয়েছিল, যা ধ্রুপদী যুগের চেয়ে সামন্তবাদী বৈশিষ্ট্যকে বেশি পছন্দ করেছিল।

মূল নিবন্ধ: রোমান্টিকতাবাদ বা রোমান্টিক আন্দোলন

১৭৫০ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে রোমান্টিক যুগের সূচনা হয়েছিল এক বিশাল সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে। এই সময়ে গ্রামাঞ্চলের জনশূন্যতা এবং শিল্পশহরগুলোর দ্রুত বিকাশ জনজীবনকে বদলে দেয়। মূলত দুটি প্রধান কারণে মানুষের এই ব্যাপক স্থানান্তর ঘটেছিল: প্রথমত, কৃষি বিপ্লব ও জমি ঘেরাও পদ্ধতি—যা কৃষকদের ভূমিহীন করে শহরমুখী হতে বাধ্য করেছিল; এবং দ্বিতীয়ত, শিল্প বিপ্লব—যা তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছিল। 

রোমান্টিকতাকে মূলত শিল্প বিপ্লবের একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হয়। এটি ছিল একদিকে আলোকিত যুগের অভিজাত সামাজিক ও রাজনৈতিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, আর অন্যদিকে প্রকৃতির ওপর অতি-বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদের আধিপত্যের প্রতিবাদ। এছাড়া, ফরাসি বিপ্লবও সে সময়কার রোমান্টিক কবিদের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

রোমান্টিক যুগের কবিতায় নিসর্গ বা ভূদৃশ্য (landscape) এতটাই প্রাধান্য পেয়েছে যে, এই ধারার কবিদের—বিশেষ করে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থকে—প্রায়শই ‘প্রকৃতির কবি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তবে রোমান্টিকদের এই দীর্ঘ ‘প্রকৃতি-নির্ভর’ কবিতাগুলোর আড়ালে আরও গভীর ও বিস্তৃত উদ্বেগ লুকিয়ে ছিল। এগুলো নিছক প্রকৃতির বর্ণনা নয়, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোনো ‘মানসিক টানাপোড়েন বা ব্যক্তিগত সংকট’ নিয়ে এক প্রকার নিবিড় ধ্যান ও আত্মোপলব্ধির বহিঃপ্রকাশ।

উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং এস. টি. কোলরিজের ‘লিরিক্যাল ব্যালাডস’ প্রকাশের মাধ্যমে এই যুগের সূচনা হয়। নব্য-ধ্রুপদী যুগের কঠোর যুক্তিবাদকে সরিয়ে এখানে আবেগ, কল্পনা এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ প্রাধান্য পায়। জন কিটস, লর্ড বায়রন এবং পার্সি বিশি শেলির মতো কবিরা মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও মরমী অনুভূতিকে কবিতার মূল উপজীব্য করে তোলেন।

অষ্টাদশ শতকে ইংরেজি সাহিত্যে প্রচলিত সাহিত্যতত্ত্ব তথা রীতির বিরুদ্ধে দ্রোহ, নিসর্গ প্রেম, দরিদ্র ও নিপীড়িত মানবাত্মার প্রতি সহানুভূতি, অতিপ্রাকৃতের প্রতি আগ্রহ ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যগুলি এক বৃহত্তর সাহিত্য-আন্দোলনের দিকে অঙ্গুলি সংকেত করছিলো যা পরে চিহ্নিত হয়েছিল রোমান্টিকতাবাদ নামে।[৪]

বাস্তববাদী সাহিত্য বা ভিক্টোরীয় যুগ (১৮৩৭–১৯০১):

রানি ভিক্টোরিয়ার দীর্ঘ শাসনকালকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই যুগে শিল্পায়ন ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির প্রভাবে সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। এই সময়ে উপন্যাসের চরম জয়যাত্রা ঘটে; চার্লস ডিকেন্স, থমাস হার্ডি এবং জেন অস্টেন (উত্তর-রোমান্টিক ধারায়) সমাজবাস্তবতাকে তুলি ধরেন। এছাড়া আলফ্রেড টেনিসন এবং রবার্ট ব্রাউনিংয়ের কবিতায় সমকালীন দ্বন্দ্ব ও নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র:

১. এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা, The Editors of Encyclopaedia Britannica, ১৯৯৮, অনলাইন ভার্সন লিংক: https://www.britannica.com/art/English-literature/
২. সাবিদিন ইব্রাহিম, আদর্শ প্রকাশনী, প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, ঢাকা, ভূমিকা, পৃষ্ঠা ১২।
৩. কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, ওরিয়েন্ট বুক কোম্পানি, কলকাতা, তৃতীয় সংস্করণ, ডিসেম্বর ১৯৬৭, পৃষ্ঠা ২৯০।
৪. কুন্তল চট্টোপাধ্যায়, ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস, রত্নাবলী, কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ জানুয়ারি ১৯৫৯, পৃষ্ঠা ১৭

রচনাকাল: ১৭ জুন ২০২০, দক্ষিণখান, ঢাকা।

Leave a Comment

error: Content is protected !!