পার্সি বিশি শেলি হচ্ছেন ইউরোপের রোমান্টিক যুগের একজন বিখ্যাত কবি

পার্সি বিশি শেলি বা পার্সি বিশি শেলী (ইংরেজি: Percy Bysshe Shelley, ৪ আগস্ট, ১৭৯২ – ৮ জুলাই, ১৮২২) হচ্ছেন ইউরোপের ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক যুগের একজন বিখ্যাত কবি, এক দুর্দান্ত কথা কারিগর, একজন প্রতিদ্বন্দ্বীহীন গীতিকবি এবং সম্ভবত কবিতা লেখার জন্য সবচেয়ে উন্নত সংশয়বাদী বুদ্ধিদীপ্ত ব্যক্তিত্ব। তিনি দক্ষিণ ইংল্যান্ডের সাসেক্স-এর হরসহোম-এ এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত, বনেদি ও ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা টিমোথি শেলি চেয়েছিলেন পুত্রকে শহরের গণ্যমান্য, ভদ্রলোক, ভূসম্পত্তি সম্পন্ন একজন রাজনীতিবিদ গড়ে তুলবেন। কিন্তু শেলি পিতার ইচ্ছার ধারপাশে না গিয়ে তরুণ বয়স থেকেই কবিতা চর্চা করে ইংরেজি সাহিত্যের তথা বিশ্বসাহিত্যের একজন অন্যতম বিখ্যাত কবি হয়ে উঠেন।

বাল্যকাল থেকেই অতিপ্রাকৃত রহস্যের প্রতি আকর্ষণ এবং অস্থিরচিত্ততা ছিল শেলীর স্বভাবের বৈশিষ্ট্য। প্রথমে Syon House Academy ও পরে Eton-এ পাঠরত থাকাকালীন স্বভাবের এই উৎকেন্দ্রিকতার কারণে Mad Shally, এবং Eton Atheist শিরােপায় ভূষিত হয়েছিলেন, কিশাের শেলী। Eton-এই শেলীর সাহিত্য রচনার সূত্রপাত। ব্যক্তিগত উদ্যোগে ১৮১০-এ প্রকাশ করলেন ‘Zastrozzi’ নামে একটি ‘গথিক’ উপন্যাস। এরপর ঐ বছরই বােন এলিজাবেথের সঙ্গে যুগ্মভাবে প্রকাশ করলেন কবিতা সংকলন, ‘Original Poetry by Victor and Cazire’; অবশ্য আত্মপরিচয় গােপন রেখে। পরের বছরই প্রকাশিত হলাে আর একটি গথিক রীতির কাহিনী ‘St. Irvine, or The Rosicrucian’।[১]

ছাত্রাবস্থাতেই তাঁর প্রথম কাব্য ‘Queen Mab’ প্রকাশিত হয়। এরপর তিনি একের পর এক কবিতা এবং বেশ কয়েকটি কাব্যধর্মী নাটক রচনা করেন। মাত্র ৩০ বছর জীবিত থাকলেও তার এই কবিতা ও কাব্যধর্মী নাটকগুলি তাঁকে আজও অমর করে রেখেছে।

১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসী বিপ্লবের সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীণতার বাণী সমকালীন ইউরোপের যুবমানসে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। যে কোনো সামাজিক অন্যায়-অবিচারের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন সে সময়কার মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আশৈশব বিদ্রোহী মানসিকতার শেলিও তরুণ বয়স থেকেই ফরাসী বিপ্লবের এই সাম্যবাদের দ্বারা প্রভাবিত হন। তিনি আপন কাব্যকবিতার মধ্য দিয়ে সামাজিক অন্যায়-অবিচার, শ্রেণিবৈষম্য, পরাধীনতা প্রভৃতির বিরুদ্ধে সরব হন। হতাশাচ্ছন্ন যুগে দাঁড়িয়ে শেলি বারবার মানুষকে আশার বাণী শোনাতেন। যদিও তাঁর রচনাগুলিতে যুগের প্রভাবে আবেগের আতিশয্য লক্ষ্য করা যায়, তবুও এই রচনাগুলির জন্যই শেলি – ‘The poet of hopes in despair’-এর স্বীকৃতি পেয়েছেন।

আরো পড়ুন:  কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা সাহিত্যের কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও সঙ্গীতজ্ঞ

শেলির প্রথম কাব্য ‘কুইন ম্যাব’। এটি তিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে রচনা করেন। এ কাব্যে শেলি ঈশ্বরের অস্তিত্বে আস্থা জ্ঞাপন করলেও খ্রিস্টধর্মের সমালোচনা করেছিলেন। এ কারণে কাব্যটি সে সময় ইউরোপে যথেষ্ট বিতর্ক তৈরি করেছিল। শেলির পরের কাব্য ‘অ্যালাস্টার অর দ্য স্পিরিট অব সলিচুড’-এ তিনি এক অপাপবিদ্ধ কবি তরুণের কথা বলেছেন, যে নিঃসঙ্গ অথচ বিশ্বচিন্তায় নিমগ্ন। এ কাব্যে শেলির রোমান্টিক ভাবনার লীলায়িত আবেগই প্রকাশিত হয়েছে। ‘অ্যালাস্টার’ একটি গ্রীক শব্দ, এর অর্থ ‘হিংস্র দানব’। শেলি হয়ত হতাশাকেই এখানে হিংস্রদানবের সাথে তুলনা করেছেন।

শেলির আর একটি কাব্য হলো ‘দ্য রিভোল্ট অব ইসলাম’। এটি একটি অন্যতম বিতর্কিত কাব্য। তিনি ভাই বোনের অস্বাভাবিক-অসামাজিক প্রেম, মানবপ্রীতি ও স্বাধীনতা এই ত্রিস্তরযুক্ত কাহিনি গড়ে তুলেছেন এই কাব্যে। এই সময় শেলির আরও দু’টি কবিতা প্রকাশিত হয়— ‘রোসালিন অ্যান্ড হেলেন’ ও ‘জুলিয়ন অ্যান্ড ম্যাডোলো’। এই দু’টি কবিতার মধ্যে প্রথমটিতে শেলি রোসালিন ও হেলেন নামক দুই পতিহীনা নারীর বেদনা বিধুর কাহিনি পরিবেশন করেছেন। আর দ্বিতীয়টি হলো রূপক কাব্য। একাব্যে জুলিয়ন হলেন শেলি নিজে আর ম্যাডোলো হলেন ইউরোপের রোমান্টিক যুগের অপর কবি বায়রন।

শেলি প্রেমের স্তুতিমূলক ‘এপিপসাইকিডিয়ন’ নামে একটি বিখ্যাত কবিতা রচনা করেন। এই কবিতাটি এমিলিয়া ভিভিয়ানি নামক জনৈকা ইতালির মহিলার উদ্দেশ্যে লেখা। এই এমিলিয়া কিছুদিনের জন্য শেলির হৃদয়েশ্বরী হয়ে উঠেছিলেন। এপিপসাকিডিয়ন’ কথাটির অর্থ ‘প্রাণের মিলন’। কাব্যটিতে শেলির রোমান্টিক ভাবনার নানা পরিচয় পাওয়া যায়। এই সময় শেলি তাঁর বন্ধুপত্নী জেন উইলিয়ামকে নিয়ে ‘জেন: দ্য রিকালেকসন’ নামক একটি কবিতা লেখেন। এ সময়ে লেখা শেলির আর দু’টি কবিতা হলো ‘দ্য ইন্ডিয়ন সেরোনাড’ এবং ‘ওয়ান উড ইস টু ওফেন প্রোফাউন্ড’।

শেলির কবিতাগুলির মধ্যে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা হলো ‘এডোনাইস। বন্ধু কীটস-এর অকাল মৃত্যুতে শেলি এই কাব্যটি রচনা করেন। গ্রীক মিথোলজি (এডোনিস)-কেই শেলি লিখেছেন এডোনাইস। মিথোলজিতে এডোনিস ছিলেন ভেনাসের প্রিয় পাত্র। শেলি ভেনাসের স্থান দিয়েছেন ইউরোনিয়াকে, ইনি কাব্যলক্ষ্মী। পাস্টোরাল এলিজির নিয়ম অনুযায়ী শেলি কীটসকে এডোনাইস হিসাবে কল্পনা করেছেন। এডোনাইস ছিলেন মেষপালক ও অপূর্ব বংশীবাদক। তিনি ইউরোনিয়ার সাধক এবং অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। কিন্তু নিষ্ঠুর সমালোচকদের আক্রমণে তার অকালমৃত্যু হয়। শেলি কীটস-এর মৃত্যুকে এর সাথে তুলনা করেছেন। শেলির শেষ রচনা ‘দ্য ট্রি অব লাইফ’ কবিতাটি শেষ করার আগেই তিনি মারা যান।

আরো পড়ুন:  লন্ডন, ১৮০২ বা মিল্টনের প্রতি কবিতার মূল বক্তব্য বা সার-সংক্ষেপ

এই কাব্য কবিতাগুলি ছাড়াও শেলি কয়েকটি কাব্যধর্মী নাটক ও অসংখ্য গীতিকবিতা রচনা করেছিলেন। শেলির নাটকগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা হলো ‘প্রমেথিউস আনবাউন্ড’। এই গীতিধর্মী কাব্যটির উপাদান শেলি প্রাচীন গ্রীক নাট্যকার এস্কাইলাসের ‘প্রমেথিউস আনবাউন্ড’ থেকে গ্রহণ করেছেন।

এত কিছু লেখার পরও শেলির প্রতিভার সবচেয়ে বেশি বিকাশ ঘটেছে তাঁর গীতিকবিতাগুলিতে। গীতিকবিতার মাধ্যমেই শেলি যেন নিজেকে ঠিকমত প্রকাশ করতে পেরেছিলেন। শেলি অসংখ্য গীতিকবিতা রচনা করলেও তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ‘স্টাঞ্জার্স রিটেন ইন ডেজেকসন’, ‘নিয়ার নেপলস্’, ‘টু নাইট’, ‘রেয়ারলি রেয়ারলি’, ‘কামেস্ট দ্যাউ’, ‘লাইনস্ রিটেন অ্যামং ইউগোনিয়ান হিল’, ‘টু এ স্কাইলার্ক’, ‘ওড টু দ্য ওয়েস্ট উইন্ড’, ‘ও ওয়ার্ড ও লাইফ! ও টাইম!’, ‘দ্য ক্লাউড’, ‘দ্য সেনসেটিভ প্ল্যানেট’ ইত্যাদি। এই গীতিকবিতাগুলিতে শেলি যেমন হতাশার কথা বলেছেন, তেমনি হতাশা কাটিয়ে আশার বাণী শুনিয়েছেন। হয়ত এই কারণেই তাঁকে বলা হয়— ‘The poets of hopes in despairs’।

শেলি মাত্র ত্রিশ বছর বেঁচে ছিলেন এবং খুব বেশিদিন কাব্যচর্চা করেননি। কিন্তু ইউরোপের রোমান্টিক যুগের এই ইংরেজ কবি তাঁর কাব্য কবিতায় নানা বৈশিষ্ট্যের জন্য বিশ্বসাহিত্যে আজও শ্রদ্ধার আসন পান। তাঁর কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল— 

প্রথমত:

শেলি নিজে নাস্তিক মনোভাবাপন্ন ছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর কবিতাতে নাস্তিকতার কথা বারবার এসেছে। শেলির এই নাস্তিকতা ছিল তার মধ্যেকার সহজাত রোমান্টিক প্রেরণার ফল। 

দ্বিতীয়ত:

তিনি প্রথমে প্লেটোর দর্শন দ্বারা এবং পরবর্তীকালে এডুনিয়নের মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হন। তবে জীবন সম্পর্কে তার নিজস্ব দর্শনও ছিল। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর কবিতায় এই তিনের প্রভাব পড়েছে। 

তৃতীয়ত:

রোমান্টিক যুগের অন্যসব কবিদের মত শেলিও মানবপ্রেমিক ছিলেন। মানুষের সুন্দর ভাবনা সম্পর্কে শেলি যথেষ্ট আশাবাদী ছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় আশা কিভাবে বাস্তব রূপ পাবে শেলি তা জানাতে পারেন নি৷ 

চতুর্থত:

তিনি রোমান্টিক যুগের কবি হলেও সে সময়কার কবিদের চেয়ে পৃথক ছিলেন। শেলির রোমান্টিকতা ছিল একান্ত আদর্শায়িত রোমান্টিকতা। 

আরো পড়ুন:  গিরিশচন্দ্র ঘোষ ছিলেন নাট্যকার, কবি, অভিনেতা সাধারণ রঙ্গমঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা

পঞ্চমত:

রোমান্টিক যুগের কবিরা একান্তভাবে প্রকৃতিপ্রেমিক ও সৌন্দর্যবাদী ছিলেন। শেলিও রোমান্টিক যুগের কবি তাই তাঁর রচানায় বারবার প্রকৃতিপ্রেম ও সৌন্দর্যতৃষ্ণার কথা এসেছে।

ষষ্ঠত: তিনি অনেকটাই ভাবপ্রধাণ ব্যক্তি ছিলেন। তাই তার বেশিরভাগ কবিতাই ভাবাবেগ তাড়িত রচনা। তিনি অনেক সময় তার অনুভূতিগুলির সুষম সমীকরণ ঘটাতে পারেননি। এইজন্য শেলির সমালোচনা করে বলা হয় তাঁর কবিতায় মস্তিস্কের চাইতে হৃদয়ের প্রাধান্যই বেশি আছে।।

সমালোচনা যাই হোক না কেন, শেলি যে একজন প্রতিভাধর কবি ছিলেন তা সকলেই স্বীকার করে নিয়েছেন। তাঁর সমকালীন ইউরোপের অনেক কবিই তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে বিশ্বসাহিত্যের অনেক কবিকেই তিনি প্রভাবিত করেছেন। শেলির প্রভাব আমাদের বাংলা সাহিত্যেও পড়েছে। বিহারীলাল চক্রবর্তীর নেতৃত্বে বাংলায় যখন গীতিকবিতার জোয়ার আসে তখন বিহারীলালসহ অনেক গীতিকবিই শেলির দ্বারা প্রভাবিত হন। পরবর্তীকালে আধুনিক কবিতার যাত্রা শুরু হলেও শেলি গুরুত্ব হারাননি৷ আধুনিক যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জীবনানন্দ দাশও কবিতার ক্ষেত্রেও (ক্যাম্পে) শেলির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় শেলি কত বড় মাপের কবি ছিলেন।

তথ্যসূত্র

১. কুন্তল চট্টোপাধ্যায়, ইংরাজী সাহিত্যের ইতিহাস, রত্নাবলী, কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ জানুয়ারি ১৯৫৯, পৃষ্ঠা ১৩৫-১৩৬।

Leave a Comment

error: Content is protected !!