জর্জ অরওয়েল (ইংরেজি: George Orwell, ২৫ জুন ১৯০৩ – ২১ জানুয়ারি ১৯৫০) ছিলেন একজন ইংরেজ ঔপন্যাসিক, কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক এবং সমালোচক যার প্রকৃত নাম ছিল এরিক আর্থার ব্লেয়ার। তাঁর রচনাবলীকে প্রাঞ্জল গদ্য, সামাজিক সমালোচনাপূর্ণ, সর্বস্বতাবাদের বিরোধিতা এবং সমাজ-গণতন্ত্রের স্পষ্টবাদী সমর্থন দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ হচ্ছে উদারতাবাদ তাঁকে মনে করা হয় পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী ফার্মের একগুঁয়ে এক এনিমেল।[১]
জর্জ অরওয়েল তাঁর রাজনীতি, সাহিত্য, ভাষা এবং সংস্কৃতি সম্পর্কিত তার প্রবন্ধগুলির মতোই তাঁর বিভিন্ন কথাসাহিত্য সমালোচকদের দ্বারা প্রশংসিত। অরওয়েল তাঁর রূপক উপন্যাস অ্যানিমেল ফার্ম (১৯৪৫) এবং ডিস্টোপিয়ান উপন্যাস নাইনটিন এইটি-ফোর (১৯৪৯) এর জন্য সর্বাধিক পরিচিত। তার অকথাসাহিত্যমূলক রচনাগুলির মধ্যে রয়েছে দ্য রোড টু উইগান পিয়ার (১৯৩৭) যেটাতে শিল্প-উত্তর ইংল্যান্ডে শ্রমিক-শ্রেণীর জীবনের অভিজ্ঞতাগুলোকে নথিভুক্ত করে এবং স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের (১৯৩৬-১৯৩৯) রিপাবলিকান গোষ্ঠীর হয়ে সৈনিক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতার বিবরণ হচ্ছে হোমেজ টু ক্যাটালোনিয়া (১৯৩৮)।
সাহিত্যিক রচনাবলী ছাড়াও জর্জ অরওয়েলেরে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে স্পেনের গৃহযুদ্ধে রিপাবলিকানদের পক্ষে অংশগ্রহণ করা। অরওয়েল ১৯৩৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর স্পেনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন। কয়েকদিন পরে বার্সেলোনায়, অরওয়েল ইন্ডিপেন্ডেন্ট লেবার পার্টি (আইএলপি) অফিসের জন ম্যাকনেয়ারের সাথে দেখা করেন যিনি তাকে উদ্ধৃত করেছিলেন: “আমি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এসেছি”। অরওয়েল কাতালোনিয়ায় একটি জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পা রেখেছিলেন।
রিপাবলিকান সরকার বহু সাংঘর্ষিক লক্ষ্যের সাথে কয়েকটি দল দ্বারা সমর্থিত ছিল। রিপাবলিকানদেরকে সমর্থন করত মার্কসবাদী একীকরণের ওয়ার্কার্স পার্টি (POUM), আনার্কো-সিন্ডিকালিস্ট কনফেডারেশন নাসিওনাল দেল ট্রাবাজো (CNT) এবং কাতালোনিয়ার একীকৃত সমাজতন্ত্রী পার্টি (স্প্যানিশ কমিউনিস্ট পার্টির একটি পক্ষ যেটা সোভিয়েত অস্ত্র ও সাহায্য দ্বারা সমর্থিত)। আইএলপি POUM- এর সাথে যুক্ত ছিল তাই অরওয়েল POUM- এ যোগ দিইয়েছিলেন।
কর্তৃত্ব সম্পর্কে জর্জ অরওয়েল
ফ্রিডরিখ এঙ্গেলসের একটি প্রবন্ধের নাম ‘কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে’। সেই প্রবন্ধে এঙ্গেলস দেখাচ্ছেন আধুনিক কালের বা শিল্পবিপ্লব পরবর্তীকালের বড় কারখানায় কীভাবে কর্তৃত্বের প্রয়োজন পড়ে। তিনি উদাহরণ হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই রেলের জটিল কর্মপ্রক্রিয়াকে উল্লেখ করেছেন।[২] একজন ট্রেন ড্রাইভার স্বাধীনভাবে দশ মিনিটও কি একটি ট্রেন চালাতে পারবেন?
একজন সাধারণ জ্ঞান ধারণ করেন এরকম শ্রমিক খুব সহজেই কর্তৃত্বের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করবেন। পুঁজিবাদী জটিল সমাজব্যবস্থায় পুঁজিপতি এবং সাম্রাজ্যবাদী নরপিশাচেরা নিপীড়নমূলক আধিপত্য করেন গোটা দুনিয়ার শ্রমিক ও কৃষকের উপর। পুঁজিপতিদের সেই আধিপত্যকে ধ্বংস করার মহান লড়াইয়ে নেমে এঙ্গেলসের কর্তৃত্বের ধারণাকে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদের ধারণায় বিকশিত করেন লেনিন। এই গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদ মতবাদটি গোটা দুনিয়ার কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর গৃহীত একটি সাধারণ নীতি।
আর অন্যদিকে গোটা দুনিয়ায় শোষণ লুট চালিয়ে বিলাসে মত্ত ইউরোপীয় নির্বোধ এবং পাকা বদমাশ লেখকেরা কর্তৃত্ব এবং কর্তৃত্ববাদী শাসন সম্পর্কে নঞর্থক বুলি ঝেড়েছে বিভিন্ন লেখা ও আবর্জনায়। সেরকম একটি লেখার নাম হচ্ছে ‘এনিমেল ফার্ম’। সেই লেখা লিখে গাড়ল ইউরো-মার্কিনদের বাহবা পেয়েছে সেই পুঁজিবাদী ফার্মের সৃষ্ট মেধাবী এনিমেল জর্জ অরওয়েল (১৯০৩-১৯৪৯)।
ইউরোপীয় বদমায়েশ পুঁজিপতি ও তাদের দালাল দাসেরা মার্কসবাদের বিরোধিতা করেছে একচোখা দৈত্যের মতো। ইউরোপীয় এই বদমাশি দৃষ্টিভঙ্গিটি ইউরোপেই যাত্রা থামায়নি। সেটি বাংলাদেশের ঢাকাতেও পাকাপোক্ত আসন গেড়েছে। কেননা পরজীবী নির্বোধ লেখকের অভাব ঢাকার মতো এখন গোটা দুনিয়াতেই নেই। ফলে এখানকার উদারনীতিক ভাঁড়েরা মতপ্রকাশের উইট ও মজা নিতে গিয়ে সবাইকে তাদের মতোই নির্বোধ ঠাউরান। যেমন গবেষক আলতাফ পারভেজ গত ৩ মে সেই অরওয়েল নামক আবর্জনাটি সম্পর্কে একটি স্ট্যাটাস দিলেন যাতে তিনি লিখেছিলেন “চলতি মুহূর্তে সাহিত্য নিয়ে এত গুরুতর রাজনৈতিক আলাপ আর” আলতাফ পারভেজের নজরে নাকি পড়ে নাই। আর অধ্যাপক আলী রিয়াজের মত এতদূর পর্যন্ত এগিয়েছে যে তিনি সন্দেহ করে বসেছেন “বাংলা-পাঠকরা … অরওয়েলের লেখা বুঝতে”[৩] পারবেন না!
এই হচ্ছে এখনকার ঢাকার উদারনীতিক গবেষক লেখকদের চিন্তার দৌড়। তারা ভুলে গেছেন, শ্রমিক শ্রেণির কাছে মোটু-পাতলু যে কোনো অজ্ঞতারই কানাকড়ি মূল্য নেই। মার্কস একবার তাঁর বন্ধু ভিলহেল্ম ভাইতলিংকে বলেছিলেন, ‘অজ্ঞতা কখনো কাউকে সাহায্য করে না’।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিলো মানবেতিহাসের সবচেয়ে অগ্রগামি সমাজতন্ত্র অভিমুখি রাষ্ট্র। সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথমবার ভ্রমণ করার পর মার্কিন সংগীতজ্ঞ পল রোবসনের (১৮৯৮ – ১৯৭৬) মনে হয়েছিল সেটি তাঁর নিজের ঘর, যেখানে সব মানুষ গোটা দুনিয়ার চেয়ে অগ্রগামী। তিনি লিখেছিলেন,
“মস্কোয় যা দেখেছি তা দেখার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। প্রতিটি মুখেই যেন তৃপ্তি আর আনন্দ। জানতাম এখানে অনাহার নেই। জীবন এখানে মুক্ত, নিরাপত্তায় পূর্ণ, প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরপুর, আর সর্বত্র দেখছি স্বাধীনতার অবাধ প্রকাশ। এ দেখার জন্য আমি তৈরি ছিলাম না। … আনন্দ, সুখ আর বন্ধুত্ব আমি অনুভব করেছি, ‘জাতি’ প্রশ্নে কোনো অসুবিধার মুখোমুখি আমাকে হতে হয়নি।
এরকম মুক্তসমাজের যারা বিরোধিতা করে তাদের কঠোর হাতে দমন করা দরকার। আমার আশা সোভিয়েত সরকার সেই কাজই করবে। … সোভিয়েত ইউনিয়ন আমার নিজের ঘর। নতুন সমাজ ব্যবস্থায় যে সোভিয়েত জনগণ বাস করছেন তাদের প্রতি আমি আত্মীয়তা অনুভব করছি। এই ধরনের অনুভূতি আমার কোথাও হয়নি। এখানে কোনো আতংক নেই। সমস্ত জাতির জনগণই এখানে সুখী। তারা তাদের সরকারকে সমর্থন করবে।”[৪]
এরকম মহান একটি দেশ সম্বন্ধে সাম্রাজ্যবাদী ও পুঁজিবাদীরা মিথ্যাচার ছাড়া কোনো কথাই বলতে পারেনি। যেমন পেঙ্গুইন সংস্করণের ভূমিকায় জর্জ অরওয়েল নিজেই স্বীকার করেছেন, “অ্যানিমেল ফার্ম … প্রথমত রুশ বিপ্লবের ওপর একটি ব্যঙ্গাত্মক রচনা”[৫]। এইভাবেই অরওয়েল, পাস্তারনাক কিংবা সোলঝিনেৎসিনরা হয়ে যায় পুঁজিবাদী ফার্মের সেইসব শয়তান পশু যারা ব্যক্তিগত মালিকানার কাছে মগজটিকে বন্ধক দিয়ে একচোখা দৈত্যের মতো ঘোঁত ঘোঁত করে চাটতে থাকে পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদীদের নোংরা পশ্চাৎদেশ।
আরো পড়ুন
- সমারসেট মম ছিলেন ইংরেজ নাট্যকার, ঔপন্যাসিক এবং ছোট গল্প লেখক
- জর্জ অরওয়েল হচ্ছেন পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী ফার্মের একগুঁয়ে এক এনিমেল
- জন স্টুয়ার্ট মিল উনিশ শতকের ইংল্যান্ডের দার্শনিক, যুক্তিবিদ এবং অর্থনীতিবিদ
- জেরেমি বেনথাম ছিলেন ইংরেজ দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ, সংস্কারক ও আইনবিদ
- উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ রোমান্টিক কাব্য আন্দোলনের ইংরেজি সাহিত্যের কবি
- পার্সি বিশি শেলি হচ্ছেন ইউরোপের রোমান্টিক যুগের একজন বিখ্যাত কবি
- জন কিটস ছিলেন ইউরোপের রোমান্টিক যুগের সর্বকনিষ্ঠ অন্যতম কবি
- ডি এইচ লরেন্স ইংরেজ কবি, উপন্যাসিক, নাট্যকার, সমালোচক ও প্রাবন্ধিক
- স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ ছিলেন ইংরেজ কবি, সাহিত্য সমালোচক এবং দার্শনিক
- লর্ড জর্জ গর্ডন বায়রন ছিলেন ইংল্যান্ড তথা ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি
- উইলিয়াম শেকসপিয়র ছিলেন একজন ইংরেজি নাট্যকার, কবি এবং অভিনেতা
- জন মিলটন ছিলেন বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাকবি, বুদ্ধিজীবী ও লেখক
- কর্তৃত্ববাদ হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যবস্থা যার বৈশিষ্ট্য হলো রাজনৈতিক বহুত্ববাদ প্রত্যাখ্যান
- কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে
- এশীয় উৎপাদন পদ্ধতি হচ্ছে কার্ল মার্কস কর্তৃক তৈরিকৃত একটি তত্ত্ব
- বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি প্রসঙ্গে
- প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র বলতে এশীয় সমাজগুলির রাজনৈতিক বা নৈতিকভাবে স্বৈরশাসনকে বোঝায়
- স্বৈরতন্ত্র এমন সরকার যেখানে একটি একক সত্তা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার সাথে শাসন করে
- আরব অঞ্চলের ধারাবাহিক স্থবিরতা প্রসঙ্গে একটি মূল্যায়ন
- ভোট হচ্ছে মৌখিক বা ব্যালটের মাধ্যমে কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া
- স্বৈরতন্ত্র জনগণের মধ্যে অনৈক্য করেই টিকে থাকে
- মৌলিক গণতন্ত্র হচ্ছে স্বৈরতন্ত্রী শাসনব্যবস্থা পাকা করবার পদ্ধতি
- জর্জ অরওয়েল হচ্ছেন পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী ফার্মের একগুঁয়ে এক এনিমেল
- চার্লস লুই দ্য মন্টেস্কু স্বৈরতন্ত্র ও রাজতন্ত্রবিরোধী একজন পুঁজিবাদী দার্শনিক
শুটিং এন এলিফ্যান্ট সম্পর্কে আলোচনা দেখুন ইউটিউবে
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ১৮ মে ২০১৮,”ফার্মের এনিমেল, জর্জ অরওয়েল”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল:https://www.roddure.com/biography/animal-of-capitalist-farm-george-orwell/
২. দেখুন, ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, “কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে”, মার্কস-এঙ্গেলস রচনা সংকলন, প্রথম খণ্ড, দ্বিতীয় অংশ, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৭১, পৃষ্ঠা ৩০৯-৩১২।
৩. আলতাফ পারভেজ, ৩ মে, ২০১৮, ফেসবুক স্ট্যাটাস, ইউআরএল https://web.facebook.com/altaf.parvez/posts/10216180404173865
৪. পল রোবসন, “সোভিয়েত ইউনিয়ন আমার নিজের ঘর” জানুয়ারি ১৯৩৫, তারেক হাসান সম্পাদিত শতবর্ষে রুশ বিপ্লব, দ্যু প্রকাশন, ঢাকা, অক্টোবর ২০১৭, পৃষ্ঠা ১৮২।
৫. পিটার ডেভিসন, পেঙ্গুইন সংস্করণের ভূমিকা, এনিমেল ফার্ম, আমারবই ডট কম, ইউআরএল: http://www.amarboi.com/2015/11/animal-farm-george-orwell-bangla-onubad.html.
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।