ময়মনসিংহের কথা হলেই মনে পড়ে ‘ময়মনসিংহ গীতিকা’র কথা। মহুয়া-মলুয়ার দেশ ময়মনসিংহে সাহিত্যচর্চা চলেছে বহু শতাব্দী ধরে। ময়মনসিংহের মানুষের সৃষ্টিশীলতা সর্বজনবিদিত। বৃহত্তর এ জেলার মানুষেরা মুখে মুখে ছড়া ও গান বা গীতিকা লিখেছে শুনিয়েছে, সংরক্ষণ করেছে স্মৃতিতে, লিখিতরূপে, পুস্তকে, সুদূর প্রাচীনকাল থেকে।
ময়মনসিংহ শহরে গড়ে উঠেছে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে। এ নদীকে কেন্দ্র করেই এ জনপদের সকল কর্মকাণ্ডের ইতিহাস। যদিও আধুনিক ইংরেজি শিক্ষার ইতিহাস ইংরেজ উপনিবেশের পরে। ময়মনসিংহে ইংরেজি শিক্ষার প্রচলন শুরু হয় ১৮৪৬ সালে। এরপরই বিভিন্ন এলাকা থেকে পত্রপত্রিকার প্রকাশ শুরু হয়।
এ প্রবন্ধে প্রথমদিকের কয়েকটি পত্রিকার কথা উল্লেখ করা হবে প্রাসঙ্গিক বলেই এবং এতে বুঝতে সুবিধা হবে কখন থেকে এ অঞ্চলের মানুষ ছাপানো সাহিত্যপত্রিকার সাথে সম্পৃক্ত হয়। প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সামাজিক বিষয়ে আলোচনায় নিজেদের সমস্যা ও সমাধানকে চিহ্নিত করতে আরম্ভ করে। এ প্রবন্ধে ময়মনসিংহের সাহিত্যপত্র ও ছোট কাগজের আলোচনায় বৃহত্তর ময়মনসিংহের আলোচনা এসেছে। যদিও-এ প্রবন্ধটিতে অন্য জেলাগুলোর খোঁজ খুব সামান্যই নেয়া সম্ভব হয়েছে।
১৮৬৫ সালের প্রথম দিকে তৎকালীন ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর মহকুমার শেরপুরের (বর্তমানে জেলা) জমিদার শ্রী হরচন্দ্র চৌধুরী মহাশয়ের উদ্যোগে ও সম্পাদনায় ‘বিদ্যান্নতি সাধিনী’ নামে একটি সাহিত্যচক্র গঠিত হয় এবং উক্ত সাহিত্যচক্রের মুখপত্ররূপে মাসিক বিদ্যান্নতি সাধিনী পত্রিকা প্রকাশিত হয়। প্রথম প্রকাশকাল আশ্বিন ১২৭২। উল্লেখ্য, এটি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলায় প্রকাশিত প্রথম সাহিত্য পত্রিকা বা সংবাদপত্র। ঢাকা থেকে মুদ্রিত বিদ্যান্নতি সাধিনী পত্রিকাটির আয়ুষ্কাল ছিল প্রায় বছর খানেক।
মৌলভী নঈমুদ্দিন-এর সম্পাদনায় আখবারে এসলামিয়া ‘নামে একটি মাসিক পত্রিকা ১৮৮৪ সালের জানুয়ারিতে টাঙ্গাইলের করটিয়ার মাহমুদীয়া প্রেস থেকে মীর আতাহার আলীর মুদ্রণে প্রকাশিত হয়। এটিই সম্ভবত তৎকালীন বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার মুসলমান সম্পাদিত প্রথম পত্রিকা। করটিয়া নিবাসী তৎকালীন প্রখ্যাত আলেম মৌলভী গোলাম সরওয়ার এর প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন।
১৮৮৫ সালে সুসং দুর্গাপুর থেকে শ্রী রুক্ষিনী কান্ত ঠাকুর-এর সম্পাদনায় কৌমুদী নামে একটি সাহিত্যপত্রিকা প্রকাশিত হয়। জানা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা এ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই তথ্য পাই ময়মনসিংহের সাহিত্য ও সংস্কৃতি গ্রন্থের ‘ময়মনসিংহের পত্র-পত্রিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে।
১৮৯৩ সালের জুন মাসের টাঙ্গাইলে জনাব খন্দকার নাজির উদ্দিন আহমদ, যিনি ফরিদপুর জেলার লোক ছিলেন, প্রকাশ করেন ইসলাম রবি নামে একটি পত্রিকা। জানা যায়, জুলুমবাজ জমিদারদের বিরুদ্ধে সাহসী সম্পাদকীয় লেখার জন্য তাঁকে টাঙ্গাইল ছাড়তে হয়েছিল। পত্রিকাটি সক্রিয় ছিল ১৯১৩ সালে পর্যন্ত।
শ্রী কেদারনাথ মজুমদার ও তাঁর বন্ধু-বান্ধবদের দ্বারা পরিচালিত মাসিক আরতি ১৩০৭. বঙ্গাব্দের পহেলা আষাঢ় ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত হয়। ১৩০৮ বঙ্গাব্দ থেকে এটির সম্পাদক ছিলেন শ্রী উমেষ চন্দ্র বিদ্যারত্ন। এ পত্রিকাটি সে সময় সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
শ্রী কেদারনাথ মজুমদারের সম্পাদনায় ১৩১৯ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে প্রাকাশিত হয় মাসিক সৌরভ। তিনি ছিলেন বাংলা সাময়িকপত্রের ইতিহাস-এর রচয়িতা। সৌরভ সম্পাদনা ছিল তাঁর আরেক উজ্জ্বল উপস্থিতি। ১৯৭৮ সালে ময়মনসিংহ জেলা পরিষদ থেকে প্রকাশিত ময়মনসিংহের সাহিত্য ও সংস্কৃতি গ্রন্থের ‘ময়মনসিংহের পত্রপত্রিকা’ শীর্ষক প্রবন্ধে এ পত্রিকার গুরুত্ব সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়- ‘ময়মনসিংহের গৌরব এ পত্রিকাটির একটু বিস্তারিত পরিচয় দেয়া অবশ্য প্রয়োজন। কারণ এ পত্রিকার মাধ্যমেই ‘মৈমনসিং গীতিকা’ ও ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ সংগ্রহের সুযোগ ও আগ্রহ সৃষ্টি হয়। শ্রী চন্দ্রকুমার দে এ পত্রিকার এক সংখ্যায় ‘মৈমনসিং গীতিকা’র পালাগুলোর একটি সামান্য অংশ প্রকাশ করলে ড. দীনেশ চন্দ্র সেন মহাশয়ের দৃষ্টি এদিকে আকৃষ্ট হয় এবং ড. সেন শ্রী চন্দ্রকুমার দে মহাশয়কে ‘মৈমনসিং গীতিকা’র পালাগুলো সংগ্রহে নিযুক্ত করেন। সৌরভ এ ভূমিকা পালন না করলে ময়মনসিংহের লোকজ ঐতিহ্যের ‘এ অমূল্য সম্পদ হয়তো লোকচক্ষুর আড়ালে চিরদিনের জন্য রয়ে যেত। তাছাড়া ময়মনসিংহের কবি গান, বাউল গান, ঘাটু গান প্রভৃতি সম্পর্কে এবং এ জেলার পুরাকীর্তি আচার ব্যবহার, রীতিনীতি প্রভৃতি নিয়ে অজস্র আলোচনা প্রকাশিত হতে লাগলো এ পত্রিকায়। শুধু ময়মনসিংহের কথাই নয়, বিচিত্র বিষয়সম্ভারে সমৃদ্ধ হয়ে প্রতিমাসে নিয়মিত সৌরভ প্রকাশিত হয়েছিল। মফস্বল শহর থেকে এরকম সুসম্পাদিত একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল, ভাবতে আমরা বিস্ময়াভিভূত হয়ে পড়ি।’ শ্রী কেদারনাথ মজুমদার বাংলা ১৩৩৩ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসে (১৯২৬ সালে) লোকান্তরিত হলে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।
১৯৩৯ সালে সাপ্তাহিক ভাস্কর নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয় শ্রী বিরাজমোহন ঘোষের সম্পাদনায়। এ পত্রিকাটির মালিক ছিলেন ময়মনসিংহের মুক্তগাছার জমিদার শ্রী শশীকান্ত আচার্য চৌধুরী।
১৩৬৫ বঙ্গাব্দের পৌষ মাসে দিল আরা মিনু ও সুফিয়া হকের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় শ্যামলী। পত্রিকাটি সম্ভবত তৎকালীন প্রদেশের নারীদের সম্পাদিত প্রথম সাহিত্য পত্রিকা। ১৩৬৭ বঙ্গাব্দের কার্তিকে প্রকাশিত হয়। আগামী এবং এটির সম্পাদক ছিলেন একে মকবুল আহমদ ও আবুল হাসান। এ বছরই প্রকাশিত হয় দ্বিমাসিক শিল্প ও সংস্কৃতি। ডা. অবনী নন্দীর সম্পাদনায় মোমেনশাহী সাহিত্য মজলিসের স্থাপনের অল্পদিন পরেই সংঘঠনের মুখপত্র হিসেবে এটি প্রকাশিত হয়।
১৩৬৮ বঙ্গাব্দে রুবী প্রেস, ময়মনসিংহ থেকে বিশিষ্ট অধ্যাপক মাহবুবুল আলমের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল সাহিত্যপত্র ফসল। এ পত্রিকাটিও সাহিত্য মজলিশের মুখপত্র ছিল এবং সম্পাদক তখন ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন।
১৯৫৮ সালেই ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের মুখপত্র অরণি প্রকাশিত হয়। সম্পাদক ছিলেন ডা. অবনী নন্দী ও খ্যাতনামা সংবাদিক রাহাত খান। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে সম্পাদনা করেছেন অধ্যাপক বাশীর উদ্দীন, অধ্যাপক গোলাম, সামদানী কোরায়শী, সাংবাদিক মোশাররফ হোসেন, সাইফুল ইসলাম, ছড়াকার আতাউল করিম, শ্রী বাদল আচার্য, জনাব এম. এ. মোতালেব, অধ্যাপক মীর মোঃ রেজাউল করিম, সাজাহান সিরাজী, সাংবাদিক মীর গোলাম মোস্তফাসহ অনেকে। অরণিতে প্রবন্ধ, গল্প, কবিতা, পুস্তক সমালোচনাসহ সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়ে লেখা প্রকাশিত হয়। একটি সংখ্যার সূচিপত্রে নাম পাওয়া যায় প্রাবন্ধিক হিসেবে ড. আলী নওয়াজ, প্রণব চৌধুরী, যতীন সরকার, প্রদীপ কুমার বিশ্বাস, আনোয়ারুল হাকিম খান, আব্দুর রাজ্জাক, নূরুল আনোয়ার, আমিরুল ইলাম, অলোকময় সাহা, সৈয়দ আহসান আলী; কবি হিসেবে নির্মলেন্দু গুণ, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, নুরুল ইসলাম মানিক, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, মামুন মাহফুজ, আশুতোষ পাল, মুশাররাফ করিম, সেরিম মাহমুদ, যুগল দাস, শাজাহান সিরাজী, শেখ জলিল, মনোতোষ ঘোষ, আশিক আকবর, আবদুল হাসিম, মাসুদ বিবাগী, মীর মোঃ রেজাউর করিম, আলম মাহবুব, গাউসুর রহমান, গল্পকার হিসেবে আলমগীর রেজা চৌধুরী, হেলেনা খান ও সালিম হাসান; পুস্তক সমালোচক হিসেবে আহমদ সাইফ। ময়মনসিংহের প্রায় সকলেই অরণিতে লিখেছেন, ময়মনসিংহের বাইরের প্রখ্যাত লেখকরাও লিখতেন। উল্লেখ্য, পত্রিকাটি এখনো চালু আছে।
১৯৬১ সালের ১ নভেম্বর (১৫ কার্তিক ১৩৬৮) নেত্রকোণা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল পাক্ষিক উত্তর আকাশ। কাগজটি নেত্রকোণা মহকুমা থানা কাউন্সিলের মুখপত্র ছিল এবং ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন সাহিত্যিক খালেকদাদ চৌধুরী।
১৩৬৯ বঙ্গাব্দে ‘প্রয়াস সাহিত্যচক্রে’র মুখপত্ররূপে প্রকাশিত হয়েছিল মাসিক প্রয়াস এবং এটির সম্পাদক ছিলেন আজীজুল হাসান।
১৩৭১ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত হয় পাতা সূর্যমুখী। সম্পাদক জনাব ফরহাদ। এটি ‘অবসর সাহিত্যগোষ্ঠী’র পত্রিকা ছিল। উল্লেখ্য অবসরগোষ্ঠীর মুখপত্র বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নামে প্রকাশিত হয়েছে। অন্যত্র উল্লেখ আছে পাতার সম্পাদক রেজাউল করিম কামাল।
আহমদ তৌফিক চৌধুরী’র সম্পাদনায় ১৩৭৫ বঙ্গাব্দের ফাল্গুনে প্রকাশিত হয়েছিল দ্বিমাসিক ঋতুপত্র। ১৩৭৬ বঙ্গাব্দের শ্রাবণে (জুলাই, ১৯৬৯) এ টি এম জাকারিয়া চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় মহুয়া। এটি জেলা পরিষদের মুখপত্র ছিল। দীর্ঘদিন বন্ধের পর সপ্তম দশকের শেষে আবার প্রকাশ হয়েছিল পত্রিকাটি। সম্পাদক পদাধিকারবলে জেলা পরিষদের সচিব। নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন মুশাররাফ করিম।
১৩৭৬ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে প্রকাশিত হয়েছিল চরৈবেতী। এর সম্পাদক ছিলেন শ্রী খগেশ তালুকদার ও নূরুল হক। ১৩৭৭ বঙ্গাব্দের আষাঢ়ে প্রকাশিত হয়েছিল তাহেরুদ্দীন মল্লিকের সম্পাদনায় সাহিত্যপত্র মোমেনশাহী।
১৯৭০ সালে এডওয়ার্ড ইনস্টিটিউশন স্কুল থেকে প্রকাশিত হয় সাহিত্য সংকলন। বার্ষিকী ৭০ এবং এটি সম্পাদনা করেন খদ্যোত কুমার রায় ও পূর্ণেন্দু শেখর সরকার।
১৯৭৩ সালে মু. হাবিবুর রহমান শেখ-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল মাসিক চন্দ্রাকাশ। এতে কবিতা, গল্প প্রকাশিত হতো। চন্দ্রাকাশ গোষ্ঠী ছিল ঐ সময়ের আলোচিত গোষ্ঠী। এ বছরই প্রকাশিত হয়েছিল ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র উচ্চারণ। আর পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন মুশাররাফ করিম। ১৯৭০ সালে অক্টোবরে কবি মুশাররাফ করিমের সম্পাদনায় বেরিয়েছিল আরেকটি উল্লেযোগ্য সাহিত্যপত্র তিলোত্তমা। পত্রিকাটির শেষ সংখ্যা বেরিয়েছিল ১৯৭৬ সালে। এটি আধুনিক কবিতাচর্চার পথিকৃৎ হিসেবে ভূমিকা রেখেছিল এবং পত্রিকাটির লেখকদের তিলোত্তমাগোষ্ঠী হিসেবে সম্বোধন করা হতো। এতে লিখতেন মুশাররাফ করিম, শামসুল ফয়েজ, নুরুল ইসলাম মানিক, আহমেদ ফখরুদ্দীন, সোয়েব সিদ্দিকী, তসলিমা নাসরিন প্রমুখ। এছাড়া ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝিতে শফিকুল ইসলাম সেলিমের সম্পাদনায় সরণী সাহিত্যচক্র, শ্যামগঞ্জ থেকে প্রকাশিত হয়েছিল মাসিক যুগধ্বনি।
ময়মনসিংহে প্রথম ছড়া আন্দোলন শুরু হয় ১৯৭৩-৭৪ সালে ‘চাঁদের হাট’ ও ‘শাপলা শালুকদে’র আসর-এর বিশেষ ভূমিকায়। কবি আবু হাসান শাহরিয়ারের সম্পাদনা এবং ছড়াকার আতাউল করিমের প্রকাশনায় ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম একক ছড়াপত্র, এলোমেলো ছড়া।
১৯৭৬ সালে ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত হয় ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র কালানল। সম্পাদক আজহারুল ইসলাম হীরা। তারা একটি গল্প সংখ্যা বের করেছিলেন। ১৯৭৬ সালের আরও একটি সাহিত্যপত্র শুভ্রশিখার নাম পাওয়া যায়। এবং এটির সম্পাদক ছিলেন মোয়াজ্জেম হোসেন আজাদ। তিন স্নাতক ডিগ্রি হোস্টেল, আনন্দমোহন কলেজ থেকে প্রকাশিত এ সাহিত্যপত্রটির ১০/১১টি সংখ্যা ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা বের করতো। এতে লিখতেন মোয়াজ্জেম হোসেন আজাদ, নাজুমুল করিম সিদ্দিকী, মাসুদ বিবাগী, সরকার হাসান মাহবুব, মামুন মাহফুজ, সাজাহান সিরাজীসহ আরো অনেকে। সম্ভবত এ সময়েই ছড়াকার আতাউল করিমের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ছড়াবিষয়ক কাগজ দ্বি-মাসিক পাপড়ি। এনাম প্রেস থেকে মুদ্রিত ও শাপলা শালুকের আসর ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত পাপড়িতেই তসলিমা নাসরিন ও নাসরিন জাহানের প্রথম ছড়া প্রকাশিত হয়।
১৯৭৭ সালে মঞ্জুরুর আহসান বুলবুলের সম্পাদনায় ময়মনসিংহ ছড়া সংসদের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হয় অন্তর মন্তর। মোট ২টি সংখ্যা বেরিয়েছিল। পত্রিকাটি নূর প্রেস, জিলা স্কুল থেকে মুদ্রিত হয়ে ২২ বাউণ্ডারি রোড, ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত হতো ছড়াকার অধ্যাপক প্রণব চৌধুরী গোলাম সামদানী কোরায়সী সম্পাদিত অরণীতে ‘ময়মনসিংহ ছড়া আন্দোলন’ শীর্ষক রচনায় লেখেন-‘ময়মনসিংহ ছড়ায় এতোদূর এগিয়ে গেছে যে ছড়া পাঠের আসর হয়ে স্বতন্ত্র হয়ে ছড়া প্রকাশিত হয়, কবিতার মতো ছড়ার পৃথক অধিবেশনে। ময়মনসিংহ সাহিত্য সম্মেলন ১৯৮০ সালে ছড়ার অধিবেশনে প্রধান অতিথি ছিলেন কবি ছড়াকার আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আবু সালেহ, সমুদ্র গুপ্ত সহ দেশের প্রতিষ্ঠিত ছড়াকারবৃন্দ এতে অংশ নিয়েছেন।’
১৯৭৮ সালে ময়মনসিংহ শহরের ২নং সারদা ঘোষ রোড, নওমহল থেকে সালিম হাসানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাহিত্যপত্র সম্মোহনী। পত্রিকাটি উল্লেখযোগ্য ৯টি সংখ্যা প্রকাশ করেছিল তার মধ্যে হাসান আজিজুল হক, আল মাহমুদ সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয় সালিম হাসানের সম্পাদনায় টান, আতাউর রহমান মুকুলের সম্পাদনায় মুক্তাঙ্গ সাহিত্যগোষ্ঠীর প্রকাশনা অবয়ব, ইসমাইল ইব্রাহীম প্লেন্টির সম্পাদনায় অরুণোদয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রকাশনা সূর্যপ্রত্যাশা, এস এম শাহজাহান কামাল সম্পাদিত বিজয় বারতা ইত্যাদি।
জুলাই, ১৯৭৯ সালে শ্রী বিমল দে’র সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ময়মনসিংহ সাহিত্য পরিষদের মুখপত্র দীপাবলী। এছাড়া সত্তর দশকের শেষদিকে গফরগাঁও থেকে মুঃ আব্দুস সাত্তারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে অগ্নিশিখা। এ বছরই প্রকাশিত হয় পার্থ সারথি নিত্য’র সম্পাদনায় হালুয়াঘান লেখক ফোরামের প্রকাশনা উনাশির আকাল। এছাড়া সে বছর বৃহত্তর ময়মনসিংহের কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশনা নিম্নরূপ:
আতউর রহমান কহিনূরের শাশ্বত অধিকার, আহমদ সিদ্দিকীর একুশের সংকলন স্বরূপ, শ্যামলেন্দু পালের প্রত্যাশা, মুহম্মদ আবদুল বারীর দেউটি (এটি মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা সাধারণ গ্রন্থাগার থেকে প্রকাশিত), কিশোরগঞ্জ থেকে শফিকুল মবিনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল ছাড়পত্র; কিশোরগঞ্জের অন্য একটি সাময়িকী পোস্টারের সম্পাদক ছিলেন আবু বকর সিদ্দিক হিরো। ময়মনসিংহের লুৎফর রহমান শিকদারের উত্তাপ, এম এ মাহমুদের উৎসারণ, মুমিনুন্নেসা মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে প্রকাশিত পলাশ এবং ছাত্র ইউনিয়নের চারণিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বাকৃবি শাখার চারণিক ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
এ বছরে নাট্যকার ফরিদ আহমদ দুলালের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সখি। জানা যায় এটি জেলার নাটক বিষয়ক প্রথম কাগজ। এ সালেই প্রকাশিত হয়েছিল সাহিত্যপত্র উপল, প্রথম সংখ্যা নভেম্বর ১৯৮০। উপল-এর ৪/৫টি সংখ্যা বের হয়েছিল, সম্পাদক ছিলেন ফরিদ আহমদ দুলাল ও কুমকুম সরকার। উপল-এ লিখতেন ফরিদ আহমদ দুলাল, ইয়াজদানী কোরায়শী, মনোতোষ ঘোষ, যুগল দাস, মুশাররাফ করিম, শামসুল ফয়েজ, নুরুল ইসলাম মানিক, আহমেদ ফখরুদ্দীন, তসলিমা নাসরিন প্রমুখ। ১৯৮০ সালে প্রকাশিত হয়েছিল সাহিত্যপত্র উপমা এবং এটির শেষ সংখ্যাটি ছিল আহসান হাবীব সংখ্যা। সম্পাদক ছিলেন মামুন মাহফুজ ও আতউল করিম। এ বছরই ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য আরো কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকা হলো আব্দুল হাই মাশরেকীর সন্ধানী (ঈশ্বরগঞ্জ), টিপু খন্দকারের লাটিম, এম সাইদুল হক খানের প্রভাতী এবং দূরাপত্র আতাউর রহমান কোহিনূর এর ছড়াছড়ি (নেত্রকোনা) এস.কে অপু ও তসলিমা নাসরিনের ঝনঝন, সরকার জসিমের তেপান্তর, ঔপন্যাসিক নাসরীন জাহান ও পারভিন সুলতানার হাওয়াই মিটাই, জয়ন্ত কুমার তালুকদার শিপুর আলোর প্রতিমা ইত্যাদি।
১৯৮১ সালে ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রিকাগুলো হলো লুৎফর রহমান সিকদার সম্পাদিত পীড়ন; প্রকাশকাল ১৬ ডিসেম্বর। এছাড়া জাহাঙ্গীর আশরাফের আলেখ্য, গোলাম মোস্তফা বাবলুর প্রবাহ, নিজাম আহমেদের নিনাদ ইত্যাদি।
১৯৮১ সালে নেত্রকোণা থেকে প্রকাশিত হয়েছে সৃজনী। এটির সম্পাদক ছিলেন খালেকদাদ চৌধুরী। এ বছরই চন্দ্রিকা প্রকাশগোষ্ঠী কিশোরগঞ্জ থেকে প্রকাশিত হয় গোলাপে ফাগুনের উজান এবং সম্পাদক ছিলেন কুমকুম সরকার। এ জেলার আরেকটি মাসিক পত্রিকা ভাটির দেশ (জ্যৈষ্ঠ, ১৩৮৮)। সম্পাদক এরশাদ উদ্দীন মল্লিক এবং এটি ‘ভাটির দেশ সাহিত্য চক্রে’র মুখপত্র। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে এ জেলার আরো কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকা হলো নূর আব্দুল লতিফের পাক্ষিক নরসুন্দা, বসির আহমেদের গ্রামবাংলা (১৯৮৫), জিল্লুর রহমানের ভাটির দর্পণ,, আশুতোষ ভৌমিকের বিন্যাস ও নরসখা, রেজা রহমানের রক্তের স্বরলিপি (১৯৭৩), রেজাউল হাবীব রেজার নবতরঙ্গ, প্রতিধ্বনি ও নীলকণ্ঠ, মহিবুর রহিম সৌরভের ঘোরযাত্রা, জাহাঙ্গীর আলম জাহানের বজ্রকণ্ঠ, উত্তাপ, অতিক্রম ও থাপ্পর, বিজনকান্তি বণিকের দৃষ্টি ও বৈশাখী, তরুণ লেখকগোষ্ঠীর মুখপত্র সংবত (১৯৬৮), জিয়াউদ্দিন আহমদের কোরক (১৯৬৯)-এটি সাহিত্য মজলিশের প্রকাশনা, বাসিরুল আমিন মোখলেছের চন্দ্রাবতী, শাহ মোঃ মোশাহিদুল ইসলামের কিশোর কথা ও জিয়াউদ্দিন আহমদ সম্পাদিত সৃষ্টি (পরবর্তীতে সম্পাদক মুঃ আব্দুল লতিফ) ইত্যাদি। এসব পত্রিকার নাম শফিকুল ইসলাম দুলাল সম্পাদিত নব অঙ্কুর এ পাওয়া গেছে।
১৯৮২ সালে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকাগুলো হলো সাকি আনোয়ার সম্পাদিত ধানসিড়ি (ফাল্গুন ১৩৮৮), বিকাশ রায় সম্পাদিত পরিধি প্রকাশকাল জানুয়ারি, জুলাইতে, জি. এম আলতাফের জাগরণ-এটি সবুজ ফুল সাহিত্য সংসদের পত্রিকা ছিল। এ সময়ের আরো দুটি সাহিত্যপত্রিকা হলো দীপক বিশ্বাস দীপুর অ এবং শহীদ আল মামুনের একদিন।
১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয়েছিল কবিতাপত্র উত্তর এবং এর সম্পাদক ছিলেন ইয়াজদানী কোরায়শী। ময়মনসিংহের আলোচিত বারজন কবির গুচ্ছকবিতা নিয়ে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা ছিল এটি। কবিদের কবিতা মূল্যায়ন করে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধও এতে প্রকাশিত হয়েছিল। লিখেছিলেন তৎকালীন বামপন্থি ও পরে ডানপন্থি এক লেখক। আলোচিত কবিরা হলেন শামসুল ফয়েজ, নুরুল ইসলাম মানিক, আশরাফ মীর, ফরিদ আহমদ দুলাল, নাজমুল করিম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজী, সেলিম আতাউর, মামুন মাহফুজ, যুগল দাস, মনোতোষ ঘোষ, সরকার হাসান মাহবুব ও ইয়াজদানী কোরায়শী। এ বছরের মুন্সী জহির আহমেদ সম্পাদিত আরেকটি সাহিত্য পত্রিকা তরণি। ১৯৮৩ সালে আহমেদ আজিজের সম্পাদনায় জামালপুর থেকে প্রকাশিত হয় মাসিক শব্দ নৈঃশব্দ।
১৯৮৫ সালে গল্পকার ইফফাত আরার সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় চিন্তা এবং পরে নাম করা হয় দ্বিতীয় চিন্তা। এটি একটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রিকা এবং একে কেন্দ্র করে ৯০ দশকের কবিদের বিকাশ ঘটে। ইফফাত ম্যানসন, সেনবাড়ি রোড ময়মনসিংহ থেকে এখনো এটি অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়। এতে কবিতা প্রকাশিত হয় আশরাফ রোকন, আশিক আকবর, মুজিব মেহেদী, হাদিউল ইসলাম, মাসুম মোকাররম, মশিউর রহমান খান, শামীম পারভেজ, শতাব্দী কাদের, মামুন মাহবুব, মামুন মোয়াজ্জেম ও স্বাধীন চৌধুরী প্রমুখের। দ্বিতীয় চিন্তা প্রবন্ধকারগণ হলেন যতীন সরকার, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, ফয়জুন লতীফ চৌধুরী, ফরিদ আহমদ দুলাল, শাহরিয়ার রিপন, শেখ আব্দুল জলিল, জুলফিকার হায়দার, ইফফাত আরা, আহমদ সাইফ, আবদুল কাদির খান, আজাহার সরকার, শামসুল ফয়েজ, প্রদীপ কুমার বিশ্বাস, স্বপন ধর, আশিক সালাম, সুমিতা সাহা প্রমুখ। দ্বিতীয় চিন্তায় অনেকের কবিতা প্রকাশিত হয়। যেমন-সন্তোষ মুখোপাধ্যায়, শামসুল ফয়েজ, আশরাফ রোকন, রইস মনরম, হোসেন আজাদ, শরৎ সেলিম, নাজমা মমতাজ, জসিম আবদুল্লাহ, যুগল দাস, কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার, আওলাদ হোসেন, আকতারুজ্জমান চিরূ, আসাদ উল্লাহ, শাবিহ মাহমুদ প্রমুখ। দ্বিতীয় চিন্তায় অনেক পুরনো লেখাও পুনর্মুদ্রিত হয়।
এছাড়া ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত আরো কয়েকটি পত্রিকা হলো সোহরাব পাশা সম্পাদিত সাহিত্য মেলা; এটি শহীদ বেলাল পাঠাগার, গফরগাঁওয়ের কচিকাঁচার মেলার প্রকাশনা এবং জয়ন্ত কুমার তালুকদার শিবুর শিল্পীত মুখ ও আশিক আকবর সম্পাদিত দেবদারু। ১৯৮৬ সালের একটি পত্রিকা হলো রতন সরকার রানা ও স.ম. শাব্বির আহমদ লিটন সম্পাদিত মাসিক চেতনা।
১৯৮৭ সালে প্রকাশিত একটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রিকা ত্রৈমাসিক স্বরচিত। এটি ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের মুখপত্র। কাগজটির সম্পাদক পদাধিকারবলে সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। এর প্রথম সংখ্যাটি সম্পাদনা করেন আতাউল করিম, পরবর্তী দশ/বারোটি সংখ্যা সম্পাদনা করেন ফরিদ আহমদ দুলাল এবং জানুয়ারি ২০০২ সংখ্যাটি সম্পাদনা করেন ইয়াজদানী কোরায়শী। পত্রিকাটি এখনো সক্রিয়। এ সংগঠনের বীক্ষণ নামে একটি ভাঁজপত্র আছে যার পদাধিকারবলে সম্পাদক বীক্ষণ আহ্বায়ক। ১৯৮৭ সালের আরো তিনটি কাগজ হলো সাঁকো, সুন্দর ও মাসিক জাগরণ এবং সম্পাদক হলেন যথাক্রমে শামসুল ফয়েজ, অমল রজক ও রতন সরকার রানা।
১৯৮৮ সালে বেরিয়েছে জলদ। বিভিন্ন সময়ে জলদ সম্পাদনা করেন আলম মাহবুব ও ছড়াকার স্বপন ধর। এতে প্রবন্ধ, গল্প ও কবিতা ছাড়া ছড়া প্রকাশিত হয়। এতে বিভিন্ন সময়ে লিখেছেন যতীন সরকার, অরুণাভ সরকার, অসীম সাহা, আতাউল করিম, আনজীর লিটন, আবিদ আনোয়ার, আল মুজাহিদী, গাউসুর রহমান, সমরেশ দেবনাথ, ইকবাল আজিজ, শান্তা মারিয়া, টোকন ঠাকুর, নির্মলেন্দু গুণ, নাসরিন জাহান, শামসুল ফয়েজ, স্বপন ধর, শফিক ইমতিয়াজ, প্রণব চৌধুরী, দিলরুবা তাসনিন, এস. কে অপু সহ আরো অনেকে। সম্ভবত ১৯৮৮ সালেই বেরিয়েছিল আমজাদ দোলন সম্পাদিত কবিতাপত্র। ফুলবাড়িয়া থেকে আশির দশকের শেষে মুজিব মেহেদীর সম্পাদনায় বেরিয়েছিল সাহিত্য সংকলন সিঁড়ি।
১৯৮৯ সালে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা ব্রহ্মপুত্র। সম্পাদক অমিতাভ পাল।
১৯৯০ সালে আশিক চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশ পায় অবিসংবাদ এবং এটির সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ছিলেন শামসুল ফয়েজ। এ সম্পাদকের অন্য একটি সাহিত্য ম্যাগাজিন মধ্যরাত এ বছরই প্রকাশিত হয়।
১৯৯১ সালে কথাশিল্পী সালিম হাসানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় গবেষণামূলক উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রিকা প্রিয় প্রসঙ্গ। কাগজটি এখনো অনিয়মিত বের হয়। এ বছরের আরো কয়েকটি সাহিত্য সংকলন হলো পলাশ চৌধুরী সম্পাদিত আগামী, রবীন্দ্রনাথ পাল সম্পাদিত প্রভাতি বার্তা মোস্তাক বিবাগীর নিধৃত।
১৯৯৩ সালে আলী ইউসুফের সম্পাদনায় নৈঃশব্দ। ১৯৯৪ সালে সরকার আজিজ সম্পাদনা করেন অনুশীলন সাহিত্য পত্রিকা এবং মোস্তফা তারেক সম্পাদনা করেন বাউল। ১৯৯৫ সালে মোহাম্মদ আবদুল লতিফের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় মেঘ। এ বছরই কিশোরগঞ্জের মাইজহাটি কালীয়াচাপড়া থেকে প্রকাশিত হয় সাহিত্যপত্র নব অঙ্কুর এর সম্পাদক মোঃ শফিকুল ইসলাম দুলাল। ১৯৯৬ সালে শতাব্দী কাদের সম্পাদিত বিবিধ ও নীহার বকুলের সম্পাদনায় নীহারিকা প্রকাশিত হয়। ১৯৯৭ সালে মনো জসীমের সম্পাদনায় বাতিঘর ও রবীন পারভেজের সম্পাদনায় রা এবং আব্দুল মোতালেব লালের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সূর্যসিঁড়ি। সূর্যসিঁড়ির বিভিন্ন সংখ্যা লিখেছেন ফরিদ আহমেদ দুলাল, মাহববু হাসান, মাহমুদ আল মামুন, আবদুর রশিদ, ডা. প্রদীপকর, এস.কে. অপু, জীবনাদ শ্যামল, মঈনুদ্দীন কাজল, শাবিহ মাহমুদ, স্বাধীন চৌধুরী, চন্দন সাহা রায়, ফয়জুর রহমান খোকন, শেখ ফরিদ নয়ন, স্বপন ধর, জাফর আহমেদ চৌধুরী, মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ।
১৯৯৮ সালে প্রকাশিত হয় স্বাধীন চৌধুরী সম্পাদিত সাঁতার ইত্যাদি। বিশ শতকের শেষ দুই দশকে (১৯৮০-৯৯) প্রকাশিত কাগজগুলোর একটি তালিকা পাওয়া যায় শাহজাহান সিদ্দিকী সম্পাদিত দুপুর সাহিত্যপত্রে। ঐ সময়ের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যপত্রিকাগুলো হলো নাজমুল করিম সিদ্দিকী ও মোয়াজ্জেম হোসেন আজাদ সম্পাদিত জলসিঁড়ি, শুধাংশু সরকারের উত্তরীয়, মাহবুব শাহীনের নোঙ্গর, তসলিমা নাসরীনের সেজুতি, শাহজাহান সিদ্দিকীর কয়েকজন, দীপক বিশ্বাস দীপুর প্রত্যাশা, মাসুদ বিবাগীর কংকাল প্রসূত, মাসুদ আলম আকন্দের কবিতা, মোস্তাফিজুর রহমান খানের সন্ধ্যাতারা, শহীদ আল মামুনের দেমাগ, সেলিম আতাউর, সরকার হাসান এবং ইয়াজদানী কোরায়শীর রোদন, আতাউর রহমান মুকুলের অবয়ব, সালিম হাসানের অলিক, শাহজাহান সিদ্দিকীর দুপুর, আতাউল করিম ও সারিম হাসানের আলেখ্য, নিজাম আহমেদের নিনাদ, মীর মোঃ রেজাউল করিমের প্রয়াস, আমিনুর রহমান সুলতানের পূর্ণিমা, সৌরভ জাহাঙ্গীরের প্রদ্যোত, আশিক সালামের উত্তরণ, বিন্না বাইদীর প্রাঞ্জল, তালাত মাহমুদের সাহিত্য দর্পণ, জয় প্রকাশের আগডুম বাগডুম, সুহৃদ জাহাঙ্গীরের আড্ডা, আশিক আকবরের কালো কাগজ, অনিন্দ্য জসীমের একা, তপন বর্মণের অর্জন, মোস্তাক বিবাগী, জুয়েল কবির ও স্বাধীন চৌধুরীর কিন্তু এবং নেত্রকোনা থেকে প্রকাশিত মেহেদী হাসান মুসার ধলাই, মাহবুব কবিরের অক্ষর, রাজীব অর্জুনির মস্তক আর শেরপুর থেকে প্রকাশিত সরোজ মোস্তফার অনুধ্যান আরিফ হাসানের সাহিত্য লোক ও শেখ সুরুজ্জামানের কালীদহ ইত্যাদি।
২০০০ সালে ময়মনসিংহ থেকে বের হয় সাহিত্যের কাগজ ময়মনসিংহ জং। মোট ৪টি সংখ্যা বের হয় এ পত্রিকাটির এবং সম্পাদক হচ্ছেন সরকার আজিজ। এ কাগজটিতে গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ ইত্যাদি প্রকাশিত হয়। চতুর্থ সংখ্যা তে প্রবন্ধ লিখেছেন এহসান হাবীব, কামাল মুহাম্মদ, জাকির তালুকদার, কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, এমরান কবির, তালাশ তালুকদার, প্রান্তিক অরণ্য; দীর্ঘ কবিতা ও কবিতা লিখেছেন আশিক আকবর, মুজিব মেহদী, মোস্তাক আহমদ দীন, শরীফ শাহরিয়ার, সরকার আজিজ, মুজিব ইমন, আলফ্রেড খোকন এবং গল্প লিখেছেন শাহানা আকতার মহুয়া, কামরান পারভেজ, সোমা ঘোষ ও হীরামন সাঁই। এ বছরই নেত্রকোনা থেকে প্রকাশিত হয় মাহমুদ সীমান্ত সম্পাদিত হাওড়। এছাড়াও এ বছার প্রকাশিত অন্য সাহিত্যপত্রগুলো হলো অতনু তিয়াস ও বিল্লাল মেহদীর অথবা সুমারঙ, সফেদ ফরাজীর কালশুদ্ধি মাসুক নন্দনের (পরের নাম কামাল মুহম্মদ) জ্বালামুখ, এহসান হাবীবের নতুন সময় ও গৌতম কৈরীর ঘুড্ডি।
২০০১ সালে ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত হয় দুর্মর। এটি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, বাকৃবি শাখা বের করে। সম্পাদক গালিব হোসেন নাহিদ। এ বছরে জামালপুর অঞ্চল থেকে প্রকাশিত হয় ধ্রুব জ্যোতি ঘোষ মুকুলের সম্পাদনায় ছন্দে ঝিনাই, কাফি পারভেজের রাঙা পলাশ, বিপ্লব সরকারের উৎসমুখ ও আজাদুর রহমান আজাদের দিশারী প্রভৃতি।
২০০২ সালের এপ্রিলে আরেকটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্যপত্র মেইনরোড, মুক্তাগাছা হতে কাজী নাসির মামুনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। মেইনরোডের বিভিন্ন সংখ্যায় লিখেছেন আশিক আকবর, আয়শা ঝর্ণা, বিজয় আহমেদ, রাতুল আহমেদ, অনিন্দ্য আকাশ, গৌতম কৈরী, রতন মাহবুব, রাজিয়া সুলতানা, বিল্লাল মেহদী, তুহিন দাস, কাজী নাসির মামুন, সাইফ ইবনে রফিক, চন্দন সাহা রায়, সিদ্ধার্থ টিপু, হেনরী স্বপন প্রমুখ।
২০০৩ সালে ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত শাবিহ মাহমুদ সম্পাদিত সাহিত্যপত্রিকা চর্যাপদ। চর্যাপদের প্রথম সংখ্যায় প্রবন্ধ লিখেছিলেন কামাল মুহম্মদ, কবিতা লিখেছিলেন অরূপ কিষাণ, এহসান হাবীব, কামাল মুহম্মদ, মোস্তফা তারেক, শাবিহ মাহমুদ, সিদ্ধার্থ টিপু, অনিন্দ্য জসীম, দেবাশীষ তেওয়ারী, নুরুজ্জামান খান, বিপ্লব সরকার, শামীম পারভেজ, মাসুম মোকাররম, শরীফা সুলতানা, শহিদুল ইসলাম এবং গল্প লিখেছিলেন মোস্তফা তারেক, শাহীদা হোসেন রীনা।
২০০৪ সালে অরূপ কিষাণের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় শিল্প-সাহিত্যের কাগজ ব্রতকথা। প্রথম সংখ্যায় গল্প লেখেন সোমা ঘোষ, প্রবন্ধ লেখেন-জাকির তালুকদার, শতাব্দী কাদের, আলফ্রেড খোকন, কবিতা লেখেন-মানস সান্যাল, পরাগ রিছিল, মশিউর রহমান খান, হোসেন আজাদ, অরূপ কিষাণ, ফকির হাসান, সাদ্দু হাসান, আশরাফ রোকন, শাবিহ মাহমুদসহ আরো অনেকে। এছাড়া এ বছর বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ময়মনসিংহ জেলা সংসদ আবদুল মোত্তালেব লাল-এর সম্পাদনায় বের করে বর্তিকা নামক একটি সাহিত্যপত্র।
২০০৫ সালে গফরগাঁও ও ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত হয় শফিকুল কাদির-এর সম্পাদনায় উত্তরকাল। এটি ছিল রবীন্দ্র নজরুল সংখ্যা। এতে ৪টি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় এবং প্রবন্ধগুলো লেখেন সারোয়ার জাহান, মর্জিয়া বেগম ও ইউনুস আলী। ২০০৬ সালে পাঁচিল নামে একটি ছোট কাগজ বের হয়, যার নামলিপিতে ছিলেন সরকার আজিজ।
ডিজিটাল রূপান্তর ও সামাজিক প্রচারমাধ্যমের প্রভাব
বর্তমানে তরুণ সম্পাদকরা কেবল ছাপানো কাগজের ওপর নির্ভর না করে ফেসবুক গ্রুপ বা পেজের মাধ্যমে একটি ‘অনলাইন কমিউনিটি’ তৈরি করছেন। এর ফলে লেখা নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রকাশনা পরবর্তী আলোচনা—সবই দ্রুততর হচ্ছে। অনেক ম্যাগাজিন এখন পিডিএফ (PDF) আকারে ই-বুক হিসেবেও প্রকাশ পাচ্ছে, যা দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশের পাঠকদের কাছেও পৌঁছে যাচ্ছে।
কাগজের উচ্চমূল্য এবং প্রেসের খরচের কারণে এখন অনেকে ব্যক্তিগত অর্থায়নের বদলে ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ বা যৌথ উদ্যোগে ম্যাগাজিন বের করছেন। এছাড়া ময়মনসিংহের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আড্ডা বা পাঠচক্রগুলো লিটল ম্যাগাজিন কর্মীদের মধ্যে একতা ধরে রাখতে সাহায্য করছে।
কৃতজ্ঞতা
নানাবিধ সীমাবদ্ধতার কারণে এ লেখায় অনেক কাগজের নামই অনুল্লেখ রয়ে গেল এজন্য আন্তরিকভাবেই দুঃখ প্রকশ করছি। এই প্রবন্ধটি রচনায় শাবিহ মাহমুদ সম্পাদিত চর্যাপদ-পত্রিকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন সময় তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন শামসুল ফয়েজ, শরীফ আহমেদ, শাবিহ মাহমুদ, শেখর রায়, এ.কে.এম. নাহিদ, এ.এস.এম. শরীফুল ইসলাম-এঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা রইল।
🏛️ ময়মনসিংহের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বরেণ্য ব্যক্তিত্ব
ব্রহ্মপুত্র তীরের এই জনপদের গৌরবময় ইতিহাস, রাজনৈতিক বিবর্তন এবং বরেণ্য ব্যক্তিদের জীবনগাথা নিয়ে আমাদের বিশেষ ২১টি আয়োজনের বিস্তারিত পড়তে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন।
👉 এখানে পড়ুন — ময়মনসিংহের মনন ও সংগ্রাম: রাজনীতি, সংস্কৃতি ও বরেণ্য ব্যক্তিত্ব 📖✨
বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রবন্ধটি মিজান রহমান সম্পাদিত গ্রন্থ বাংলাদেশে লিটল ম্যাগাজিন চর্চা অতীত ও বর্তমান, কথাপ্রকাশ, ঢাকা; প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ঢাকা, পৃষ্ঠা ১১৪-১২৪ প্রকাশিত এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশের সময় কিছুটা সংস্কার করা হয়েছে।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚