ময়মনসিংহের প্রগতিশীল ও বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে যে কজন নারী রাজপথের লড়াকু সৈনিক হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছেন, কমরেড জমিলা খাতুন (আনু. ১৯৪০-এর দশক – ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৪) তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য। তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না, বরং ছিলেন ময়মনসিংহের চর কালীবাড়ি বস্তি আন্দোলন এবং বিপ্লবী শ্রমিক আন্দোলনের এক অবিসংবাদিত নেত্রী। ২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি তাঁর মৃত্যু ময়মনসিংহের বামপন্থী রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি করে।
চর কালীবাড়ি বস্তি আন্দোলন মূলত বাংলাদেশের ময়মনসিংহ শহরে এলাকার মাস্তান ও জেলা পরিষদের পরজীবী কর্মকর্তাদের অত্যাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে ভূমিহীন কৃষক ও শ্রমজীবীদের দীর্ঘ তিন দশকের সংগ্রামের অংশ, যা শ্রমজীবীরা আন্দোলনের মাধ্যমে রুখে দিয়েছিল। এই অঞ্চলটি বিশ শতকের স্বাধীনতার পরে চরে বসতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে চালিত হয়েছিল। চর কালীবাড়ি বস্তি আন্দোলনের অন্যান্য দুজন নেতা হচ্ছে কমরেড এম এ মতিন এবং কমরেড বিকাশ ভৌমিক।
সংগ্রামী জীবন ও নেতৃত্বের বৈশিষ্ট্য
জমিলা খাতুনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তি। সমাজের সবচেয়ে নিচুতলার মানুষ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে তিনি অবলীলায় আন্দোলনের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে পারতেন। তাঁর এই সংগ্রামে ব্যক্তিগত অভাব-অনটন বা অর্থনৈতিক প্রতিকূলতা কখনোই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। বরং ভেতরের আদর্শিক রাজনৈতিক শক্তি এবং গণমানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে হৃদয়ে ধারণ করে তিনি সকল বাধাকে জয় করেছেন। তিনি ছিলেন মেহনতি মানুষের ইচ্ছাশক্তির এক জীবন্ত প্রতীক।
নারীদের সংগঠিতকরণ ও শ্রেণিচেতনা
জমিলা খাতুন মনে করতেন, সর্বহারার মুক্তি কেবল পুরুষদের লড়াই দিয়ে সম্ভব নয়; এতে প্রয়োজন নারী ও পুরুষের সম্মিলিত ও সমান অংশগ্রহণ। তিনি নারীনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং বিশেষ করে দারিদ্র্যপীড়িত নারীদের মাঝে আন্দোলনের বীজ বুনে দিয়েছিলেন। তাঁর সাহচর্য পেয়ে ময়মনসিংহের বহু অবহেলিত নারী রাজনৈতিক সচেতন হয়ে ওঠেন। তিনি তাঁদের শিখিয়েছিলেন, মুক্তির লড়াইটি কেবল নারীর একার নয়, এটি একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক ও শ্রেণিগত মুক্তির পথ। আজও তিনি ময়মনসিংহের প্রগতিশীল শক্তির কাছে এক চিরন্তন প্রেরণার উৎস।[১]
আরো পড়ুন
- নেত্রকোনার রাজনৈতিক ইতিহাস: স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী প্রগতিশীল ও শ্রমিক আন্দোলন
- মণি সিংহ: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস ও রাজনৈতিক জীবন
- বাংলাদেশে সাম্যবাদ হচ্ছে বিভিন্ন সংগঠনে কার্যকর বিভিন্ন পন্থার রাজনীতি
- সিপিবির জাতীয়তাবাদ অভিমুখি বিচ্যুতি প্রসঙ্গে
- সিপিবির মোদীতোষণ এবং ক্ষুদে-বুর্জোয়া নির্বোধদের সিপিবিতোষণ
- বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো বনেদী বামপন্থী দল
- খোকা রায় ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য বিপ্লবী
- সিপিবি মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষের ইতিহাস
- সিপিবি সিলেট জেলার ইতিহাস শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মেহনতি মানুষের সংগ্রামের পথ
- আনোয়ার হোসেন: নেত্রকোনার এক আদর্শবাদী ও সাম্যবাদী রাজনীতিকের জীবনগাথা
- কমরেড আবদুল বারী: মোহনগঞ্জের এক প্রদীপ্ত সাম্যবাদী চেতনার জীবনগাথা
- বাংলাদেশে মার্কসবাদ চর্চা
- আলতাব আলী ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতিক ও শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের নেতা
- কমরেড জ্যোতিষ বসু: ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে সশস্ত্র সংগ্রামের এক কিংবদন্তি শ্রেণিযোদ্ধা
- অ্যাডভোকেট রোকেয়া বেগম: নারীমুক্তি ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের এক আপসহীন কাণ্ডারি
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ২৪ অক্টোবর ২০১৪; “কমরেড এম. এ. মতিন ও জমিলা খাতুন স্মরণে ময়মনসিংহে আলোচনা সভা” শিরোনামে খবরটি প্রথম প্রকাশিত হয় প্রাণকাকলি ব্লগে, পরে একই খবর ৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে একই শিরোনামে রোদ্দুরে.কমে প্রকাশিত হয়; ইউআরএল: https://www.roddure.com/news/mamatin-and-jamila-khatun/
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚