সিপিবি সিলেট জেলার ইতিহাস শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মেহনতি মানুষের সংগ্রামের পথ

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবি, সিলেট জেলার ইতিহাস শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের দীর্ঘ এক সংগ্রামের পথ। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবির সিলেট জেলা শাখা অত্র অঞ্চলের প্রগতিশীল রাজনীতি ও গণমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে আসছে।

সূচনা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

অবিভক্ত ভারতে ১৯২৫ সালে কমিউনিস্ট পার্টির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলেও সিলেটের পলিমাটিতে এর বৈপ্লবিক চেতনা দেশভাগের বহু আগেই শিকড় গেড়েছিল। মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আপসহীন সংগ্রাম এবং চা-শ্রমিক ও প্রান্তিক কৃষকদের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই এখানে সাম্যবাদের শক্ত ভিত রচিত হয়। শোষিত মেহনতি মানুষের সেই দীর্ঘ লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ এই ভূখণ্ডে স্বতন্ত্রভাবে আত্মপ্রকাশ করে কমিউনিস্ট পার্টি। বিশেষ করে চা-বাগান অধ্যুষিত এই অঞ্চলে শ্রমিক শ্রেণির লড়াকু ভূমিকা পার্টিকে কেবল সাংগঠনিক ভিত্তিই দেয়নি, বরং একে পরিণত করেছে এ অঞ্চলের অধিকারবঞ্চিত মানুষের মুক্তির প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ারে।[১]

মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী সময়

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সিলেট জেলা সিপিবির নেতা-কর্মীরা সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে মিলে গঠিত বিশেষ গেরিলা বাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সিলেটে সাহসিকতার সাথে লড়াই করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে আওয়ামী লীগের সাথে ‘গণ ঐক্য জোট’ গঠনে সিপিবির সিলেট শাখা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ১৯৭৭ সালে সামরিক শাসনামলে পার্টি নিষিদ্ধ হলেও সিলেটে গোপনে এর সাংগঠনিক কার্যক্রম অব্যাহত ছিল এবং ১৯৭৮ সালে পুনরায় প্রকাশ্যে আসে।

গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থা

নব্বইয়ের দশকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সিলেট জেলা সিপিবি রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বর্তমানেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুর্নীতি এবং সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষায় দলটি সিলেটে নিয়মিত কর্মসূচি পালন করে আসছে। ২০২৩ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে কমরেড সৈয়দ ফরহাদ হোসেনকে সভাপতি এবং খায়রুল হাছানকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা কমিটি পুনর্গঠিত হয়। বর্তমানে দলটি সিলেটে মেহনতি মানুষের মুক্তির লক্ষ্য নিয়ে ‘বাম গণতান্ত্রিক জোট’-এর মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

সিলেট জেলা সিপিবি শাখার সাম্প্রতিক ঘটনাবলী

২০২৫ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত সিলেট জেলা সম্মেলনে সৈয়দ ফরহাদ হোসেনকে সভাপতি এবং খায়রুল হাছানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি নতুন জেলা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই সম্মেলনটি সিলেট নগরীর সারদা হলে অনুষ্ঠিত হয় এবং এর উদ্বোধন করেন সিপিবির কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য কমরেড অনিরুদ্ধ দাশ অঞ্জন। দলের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতা এডভোকেট আনোয়ার হোসেন সুমন এবং বেদানন্দ ভট্টাচার্যও এই শাখার গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে বিভিন্ন সময় নেতৃত্ব দিয়েছেন।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আন্দোলন

সিলেট জেলা সিপিবি স্থানীয়ভাবে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে সোচ্চার থাকে। বিশেষ করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধ, শ্রমিক অধিকার রক্ষা এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনে তাদের উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানেও সিপিবি সিলেট জেলা শাখা সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে। এছাড়া, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসনে এডভোকেট আনোয়ার হোসেন সুমন এবং সিলেট-৩ আসনে সৈয়দ ফরহাদ হোসেনকে দলের পক্ষ থেকে ‘কাস্তে’ মার্কার প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জ

সিলেটের চা-শ্রমিকদের অধিকার আদায় এবং মেহনতি মানুষের সংগ্রামে এই শাখার ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ তবে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে এই শাখার নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন সময় হামলা ও বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, অতীতে সিলেটে সিপিবি ও বাসদ-এর যৌথ সমাবেশে হামলার ঘটনা ঘটেছিল, যাতে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা আহত হয়েছিলেন। প্রতিকূল পরিবেশ সত্ত্বেও সিলেট জেলা শাখা সমাজতান্ত্রিক আদর্শ এবং গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সিপিবি: ইতিহাস ও বাস্তবতা, ০৬ মার্চ ২০২২, ঢাকামেইল.কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://dhakamail.com/opinion/4645

Leave a Comment

error: Content is protected !!