ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে মণি সিংহ (ইংরেজি: Moni Singh; ২৮ জুন ১৯০১, – ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯০) এক আলোচিত নাম। মার্কসবাদ-লেলিনবাদের অনুসারী হলেও তিনি মূলত ছিলেন একজন সংশোধনবাদী ও সুবিধাবাদী বামপন্থী নেতা। মেহনতি মানুষের অধিকারের কথা বললেও বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষমতার নানা সমীকরণে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা সবসময়ই এক বিশেষ বিতর্কের দাবি রাখে। তৎকালীন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের যুগে ময়মনসিংহের কৃষক ও টংক আন্দোলনের নেতা হিসেবে তার অবদান গুরুত্বপূর্ণ। শেষ জীবনে তিনি অন্তত দুই দশক বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক ও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
জন্ম, শৈশব ও রাজনীতির হাতেখড়ি
উপমহাদেশের বামপন্থী রাজনীতিবিদ মণি সিংহ ১৯০১ সালের ২৮ জুন নেত্রকোণার সুসং দুর্গাপুরের এক প্রভাবশালী জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা কালীকুমার সিংহ ছিলেন পূর্বধলার সিংহ উপাধিধারী জমিদার সন্তান, বিয়ে করেছিলেন সুসঙ্গ জমিদার বংশে। মণি সিংহের মায়ের নাম সরলা দেবী।
জমিদারীর আয়ে সংসার চলতো না বলে পিতা কলিকাতায় কোনো এক কোম্পানীতে মধ্যমানের এক চাকরী করতেন। সেখানে মণি সিংহের জন্ম। চার ভাই এক বোনের মধ্যে বোন নির্মলা সিংহ বামপন্থি আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। শৈশবে পিতৃহারা হওয়ার পর মামার বাড়িতেই তিনি বেড়ে ওঠেন।
মণি সিংহ কলকাতায় লেখাপড়া করা অবস্থায় ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে ন্যাশনাল পরীক্ষা দিয়েছিলেন। বাল্যকাল থেকেই তাঁর দেশ ও সমাজসেবার প্রতি জাগ্রতবোধ ছিল। কলকাতায় পড়াশোনা চলাকালীন তিনি তৎকালীন বিপ্লবী সংগঠন অনুশীলন দলের সঙ্গে যুক্ত হন ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দে এবং বৈপ্লবিক কর্মতৎপরতার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারী হয়। তখন পার্টির কাজের স্বার্থে তাঁকে দীঘ দীন আত্মগোপন করে থাকতে হয়। ফলে ভাগ্যে উচ্চশিক্ষা জোটেনি।
বয়স ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সঙ্গে বিপ্লবী রাজনীতির প্রতি মোহভঙ্গের পর তিনি ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে মার্কসবাদে দীক্ষিত হন এবং ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। সে সময় তিনি সুসঙ্গ দুর্গাপুর অঞ্চলের শোষিত হাজং ও কৃষকদের সঙ্গে মিশেন। তাদেরকে শিক্ষিত ও সচেতন করে তোলার উদ্দেশ্যে কতিপয় সহকর্মীর সহযোগিতায় তিনি সেখানে একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। এ সকল কৃষক জনগণের সঙ্গে মেলামেশার জন্য সুসঙ্গের জমিদারগণ তাঁকে ভাল চোখে দেখতেন না। অতঃপর তিনি কলিকাতা চলে যান ও কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মুজফফর আহমদের প্রকাশ্য সংগঠন ওয়ার্কার্স এন্ড পিজেন্টস পাটির সার্বক্ষণিক কর্মীরূপে ব্রত হন এবং উক্ত সংগঠনে ৯ বছর কাজ করেন।
শ্রমিক আন্দোলন ও ঐতিহাসিক টঙ্ক বিদ্রোহ
রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে ১৯২৮ সালে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে কেশরাম কটন মিলে কাজ করার সময় সুতা কল শ্রমিকদের ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি সফলতার পরিচয় দেন। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠিত হওয়ার পরবর্তী ৯ মে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং দীর্ঘ সাত বছর জেলে থাকেন। বিভিন্ন জেলখানায় আটক থাকার পর তাঁকে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে সুসঙ্গের নিজ বাড়ীতে নজরবন্দি করে রাখা হয়। তখন প্রতিদিন তাঁকে থানায় হাজিরা দিতে হতো। অন্তরীন অবস্থায় সুসঙ্গের নিকটবর্তী গ্রামসমূহের শোষিত মুসলমান ও হাজং কৃষকদের সঙ্গে তাঁর সংযোগ আরও গভীর হয়।
জনগণের সংগে সংযোগ বাড়লে তিনি টংক প্রথা সম্পর্কে সচেতন হন। কৃষকরা টংকের অত্যাচারে জর্জরিত। জমিতে ফসল হোক বা না হোক জমি চাষের জন্য খাজনা হিসাবে জমির মালিককে একর প্রতি ছয় থেকে পনর মণ ধান দিতে হতো। জমিতে প্রজার কোনো স্বত্ত্ব ছিল না। এ প্রথার নাম টংক প্রথা। সুসঙ্গে নজরবন্দি থাকার সময় নিজ গ্রামের জনৈক জমিদারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ করেন। সে আক্রোশে জমিদার মণি সিংহ নজরবন্দী থাকাবস্থায় রাজনীতি করেন বলে, অভিযোগ দায়ের করেন। মামলার বিচারে তাঁর দেড় বছর জেল হয়। সাজার মেয়াদ শেষে নদীয়া জেলার করিমপুর থানার এক গণ্ডগ্রামে পুনরায় তাঁকে নজরবন্দি রাখা হয়।
১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি মুক্তি পান। মুক্তির পর কলিকাতায় আসেন। তখন পার্টি আত্মগোপনে থাকায় বন্ধু কমিউনিস্টদের কারও সঙ্গে দেখা করতে পারেননি। অতঃপর মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য সুসঙ্গ যান। মণি সিংহের বাড়ি আসার খবর পেয়ে শোষিত মুসলমান কৃষকরা প্রথমে তরে সঙ্গে দেখা করে। তারা টংক প্রথার অসহনীয় পীড়ন থেকে বাঁচানোর জন্য তাঁর নিকট আবেদন করে। তখন তিনি কলিকাতার শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বাড়ীতে এসেছেন শুধু মাকে দেখতে এবং আবার নিজ কর্মক্ষেত্রে চলে যাবেন বলে জানিয়ে তাদেরকে বিদায় করেন। কৃষকরা তবু নাছোড়বান্দা হয়ে প্রতিদিন দেখা করে ও নিজেদের দাবী অব্যাহত রাখে।
অবশেষে কৃষকদের দুর্দশা ও ক্রমাগত কাতর অনুনয়ে তিনি অত্যন্ত ভাবনায় পড়েন। কারণ জমিদার, জোতদার এমন কি তাঁর নিজ জমিতেও টংক চাষী বিদ্যমান ছিল। এ অবস্থায় অনেক ভেবে চিন্তে শেষ পর্যন্ত তিন টংক আন্দোলনের নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন এবং বিভিন্ন স্থানে সভা সমিতি করে টংক প্রথা উচ্ছেদের জন্য তুমল অন্দোলন শুরু করেন। প্রথমে একাই কাজের সূত্রপাত ঘটান। পরে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন ভূপেন ভট্টাচার্য, প্রমথ গুপ্ত, জলধর পাল, আলতাব আলী, নগেন সরকার এবং অন্যান্য নেতৃস্থানীয় কমিউনিস্ট কর্মীগণ। তাঁদের সমবেত প্রয়াস ও সংগ্রামের ফলে উত্তর ময়মনসিংহের গারো পাহাড় অঞ্চল সে সময় এক সাম্যবাদী রাজনীতির সংগ্রামী ভুবনে পরিণত হয়।
আন্দোলনের কর্মীদের মাঝে হাজংরা ছিলেন প্রবল ও পাহাড়ের পাদদেশের এক বিশাল জনগোষ্ঠী। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগে ও পরে দুই ভাগে টংক আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিলো। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে জমিদার ও সরকারী বাহিনীর বহুবার সংঘর্ষ হয়। উভয় পক্ষে বহু লোক হতাহত হয়। তার এক সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে।
মণি সিংহ সর্বপ্রথম ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করেন। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলা কমিউনিস্ট পাটির সদস্য হন। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে কিশোরগঞ্জে ও ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে দুর্গাপুরে অনুষ্ঠিত জেলা কৃষক সম্মেলন এ বং ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে নালিতাবাড়ীতে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন।
১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে করিমগঞ্জ থানায় মহামারী হয়। সেখানে তিনি চিকিৎসক দল প্রেরণ করেন। পঞ্চাশের মনন্তরের (১৩৫০ বঙ্গাব্দ =১৯৪৩ খ্রি.) সময় ময়মনসিংহ শহরে লঙ্গরখানার উদ্যোক্তাদের মধ্যে তিনি অন্যতম। দুর্ভিক্ষে চাউলের মূল্য কম রাখার জন্য শেরপুর থেকে চাউল ক্রয় করে ময়মনসিংহের বাজারে ছাড়ার ব্যবস্থা করেন।
১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসের ৪ ও ৫ তারিখে নেত্রকোনার নাগরার মাঠে অনুষ্ঠিত সারা ভারত কৃষক সম্মেলনের দায়িত্বে ছিলেন। এরূপ বিরাট ও সুশৃঙ্খল ঐতিহাসিক জন সমাবেশ এতদঞ্চলে পূর্বাপর দেখা যায়নি। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য পদের জন্য নির্বাচনে তিনি অংশগ্রহণ করে ব্যর্থ হন।[১]
দেশভাগ ও টঙ্ক আন্দোলনের বিজয়
১৯৪৬ সনে তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহের হাজং গারো ও মুসলমান কৃষকদের সংগঠিত করে পুনরায় ‘টঙ্ক প্রথা’র বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। দ্বিতীয় দফায় টংক আন্দোলন জোরদার করেন। দুর্গাপুর, লেঙ্গুরা, বহেরাতলী, দশলি প্রভৃতি গ্রামসহ পূর্বে পশ্চিমে দীর্ঘ ৬০/৭০ মাইল বিস্তীর্ণ পাহাড় অঞ্চল এক সশস্ত্র বিপ্লবের ক্ষেত্রে পরিণত হয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হলে মণি সিংহ পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিস্ট আন্দোলনের হাল ধরেন।
১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারীতে ১৯ জন আন্দোলনকারী শহীদ হন। তা ছাড়াও পরে অনেককে পাকিস্তান সরকার হত্যা করে। আন্দোলনটি সশস্ত্র রূপ নিলে পাকিস্তান সরকার নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের পর টংক আন্দোলন স্তিমিত হয়ে আসে এবং ১৯৫১ সালে ঐতিহাসিক টংক ও জমিদারী প্রথা উঠে যায়।
রাজনৈতিক নিপীড়ন ও দীর্ঘ আত্মগোপন
টঙ্ক আন্দোলনে বিজয়ের পরপরই তৎকালীন বর্বর নুরুল আমিন সরকার সরকার মণি সিংহের ওপর হুলিয়া জারি করে এবং তাঁর সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক করে। গ্রেফতার এড়াতে দীর্ঘ ২০ বছর তিনি অত্যন্ত প্রতিকূলতার মধ্যে আত্মগোপনে থেকে পার্টির কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ১৯৫১, ১৯৫৬ এবং ১৯৬৮ সালের সম্মেলনে পরপর তিনবার কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। উল্লেখ্য, ১৯৫৪ সাল থেকে দলটি পাকিস্তান সরকার কর্তৃক বেআইনি ঘোষিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে গোপন নেতৃত্ব বজায় রাখেন।
নরপশু আইয়ুব খাঁর শাসনামলে তিনি দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন এবং ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে গ্রেপ্তার হন। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে ফেব্রুয়ারী মাসে মুক্তি পেয়ে জুলাই মাসে পুনরায় গ্রেপ্তার হন। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহী জেলে বন্দী ছিলেন এবং ২৫ মার্চের পর কমরেড দেবেন শিকদারের নেতৃত্বে অন্যান্য বন্দিরা জেল ভেঙ্গে তাঁকে বের করে। পরে তিনি ভারতে গমন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সক্রিয় অবদান রাখেন। দেশ বিভাগের পর ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পাটির সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন। তাঁর লেখা একটি মাত্র বই হচ্ছে জীবন সংগ্রাম যা ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত হয়।
আদর্শিক অবস্থান ও কারাজীবন
ষাটের দশকে বিশ্ব রাজনীতিতে চীন ও রাশিয়ার আদর্শগত দ্বন্দ্বে কমিউনিস্ট দলগুলো যখন বিভক্ত হয়ে পড়ে, তখন মণি সিংহ রাশিয়ার (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) নীতি অনুসরণ করেন। দীর্ঘ আত্মগোপন জীবনের অবসান ঘটিয়ে ১৯৬৭ সালের ৬ নভেম্বর তিনি গ্রেফতার হন। তবে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের প্রবল চাপে ২২ ফেব্রুয়ারি সরকার তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। মুক্তিলাভের অল্প সময়ের মধ্যেই, একই বছর জুলাই মাসে তিনি আবারও গ্রেফতার বরণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ ও উপদেষ্টা পরিষদে ভূমিকা
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পরপরই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনার মধ্য দিয়ে ৭ এপ্রিল সাধারণ কয়েদিদের সহায়তায় তিনি রাজশাহী কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে আসেন। কারাগার থেকে বেরিয়েই তিনি মুজিবনগরে গমন করেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী দায়িত্ব পালন করেন।
স্বাধীনতার পরবর্তী রাজনীতি ও বাকশাল
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় কংগ্রেসে মণি সিংহ সভাপতি নির্বাচিত হন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান এবং আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (মোজাফফর) ও সিপিবির সমন্বয়ে গঠিত ‘ত্রিদলীয় ঐক্য জোট’-এর অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ‘বাকশাল’ গঠন করলে মণি সিংহের নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি সেই রাজনৈতিক কাঠামোর সাথে একীভূত হয়।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও দল পুনর্গঠন
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের স্বৈরতন্ত্র উৎখাতের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে যায়। ১৯৭৬ সালে রাজনীতি দলবিধি ঘোষিত হলে তিনি পুনরায় কমিউনিস্ট পার্টিকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেন। পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের খাল কাটা ও নদী খননের মতো উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতেও তিনি সমর্থন ব্যক্ত করেছিলেন। ১৯৭৮ সালে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি উঠে গেলে কমিউনিস্ট পার্টি বৈধ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং তিনি পুনরায় দলের পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
নির্বাচনী প্রচারণা ও স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে ভূমিকা
১৯৭৮ সালের ৩ জুনের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গণতান্ত্রিক ঐক্য জোটের মনোনীত প্রার্থী জেনারেল (অব.) এমএজি ওসমানী এবং ১৯৮১ সালের ১৪ নভেম্বরের নির্বাচনে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী অধ্যাপক মুজাফফর আহমদের পক্ষে তিনি জোরালো প্রচারাভিযানে অংশ নেন। পরবর্তীতে সামরিক স্বৈরাচার হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পদত্যাগ এবং নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ, সিপিবি ও জাসদসহ ১৫ দলীয় জোট গঠনে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন।
ব্যক্তিগত জীবনদর্শন, আত্মজীবনী ও মহাপ্রয়াণ
১৯৮০ সালে পার্টির তৃতীয় কংগ্রেসে তিনি দ্বিতীয়বার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সাল থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। মার্কসবাদ-লেলিনবাদকে বিকৃতকারী এই নেতা সারাজীবন একজন সুবিধাবাদী-সংশোধনবাদী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের এই সুবিধাবাদী পুরুষ কমরেড মণি সিংহ মেহনতি মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও রাজনৈতিক অধিকারের জন্য বিভিন্ন সংগ্রাম পরিচালনা করলেও মূলত বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে রচিত হয়েছে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ “জীবন সংগ্রাম” (১ম খণ্ড ১৯৮৩, ২য় খণ্ড ১৯৯২)। ১৯৯০ সালের ৩১ ডিসেম্বর নেত্রকোণার এই সন্তান ঢাকায় পরলোকগমন করেন।[২]
আরো পড়ুন
- নেত্রকোনার রাজনৈতিক ইতিহাস: স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী প্রগতিশীল ও শ্রমিক আন্দোলন
- মণি সিংহ: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস ও রাজনৈতিক জীবন
- বাংলাদেশে সাম্যবাদ হচ্ছে বিভিন্ন সংগঠনে কার্যকর বিভিন্ন পন্থার রাজনীতি
- সিপিবির জাতীয়তাবাদ অভিমুখি বিচ্যুতি প্রসঙ্গে
- সিপিবির মোদীতোষণ এবং ক্ষুদে-বুর্জোয়া নির্বোধদের সিপিবিতোষণ
- বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো বনেদী বামপন্থী দল
- খোকা রায় ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য বিপ্লবী
- সিপিবি মৌলভীবাজার জেলার ইতিহাস শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতি মানুষের ইতিহাস
- সিপিবি সিলেট জেলার ইতিহাস শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মেহনতি মানুষের সংগ্রামের পথ
- আনোয়ার হোসেন: নেত্রকোনার এক আদর্শবাদী ও সাম্যবাদী রাজনীতিকের জীবনগাথা
- কমরেড আবদুল বারী: মোহনগঞ্জের এক প্রদীপ্ত সাম্যবাদী চেতনার জীবনগাথা
- বাংলাদেশে মার্কসবাদ চর্চা
- আলতাব আলী ছিলেন প্রগতিশীল রাজনীতিক ও শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের নেতা
- কমরেড জ্যোতিষ বসু: ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে সশস্ত্র সংগ্রামের এক কিংবদন্তি শ্রেণিযোদ্ধা
- অ্যাডভোকেট রোকেয়া বেগম: নারীমুক্তি ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের এক আপসহীন কাণ্ডারি
তথ্যসূত্র
১. দরজি আবদুল ওয়াহাব, ময়মনসিংহের চরিতাভিধান, ময়মনসিংহ জেলা দ্বিশতবার্ষিকী উদ্যাপন কর্তৃপক্ষ, ময়মনসিংহ, বাংলাদেশ, এপ্রিল ১৯৮৯, পৃষ্ঠা ৩৬৭-৩৭০।
২. অনুপ সাদি, দোলন প্রভা, নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ, টাঙ্গন, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, জুন ২০২৪, পৃষ্ঠা ১৯৯-২০১।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚