নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চার ২০২৬ সালের নির্বাচনের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ

নির্বাচন: একটি প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ
নয়াগণতান্ত্রিক গণমোর্চা
তারিখ : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

১. জুলাই,’২৪ অভ্যুত্থান এবং হাসিনা সরকারের পতনের পর জনগণের মাঝে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা-আকাঙ্ক্ষার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু তার কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। তার কারণ হলো– জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের চাপে বিদ্যমান গণ-বিরোধী রাষ্ট্রব্যবস্থায় যে সংকট সৃষ্টি হয় তাতে শঙ্কিত হয়ে শাসকশ্রেণির হাসিনা-বিরোধী অংশগুলো ক্ষমতার বদল ঘটায়। তারা হাসিনা ও বিপুল পরিমাণ আওয়ামী ফ্যাসিস্টদেরকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে সহায়তা করে। ছাত্র-নেতৃত্বদের গুরুতর রাজনৈতিক দুর্বলতা, বিচ্যুতি ও সুবিধাবাদের কারণে গণঅভ্যুত্থানকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রক্ষমতাকে তাদের হাতে রাখতে সক্ষম হয়। তবে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তার কিছু সংস্কারের পদক্ষেপ তারা নেয়। এজন্য তারা নেতৃত্ব হিসেবে বেছে নেয় পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ, বিশেষত মার্কিনের একান্ত বিশ্বস্ত ও অনুগত ড.ইউনুসের উপর। তার নেতৃত্বে সামরিক-বেসামরিক আমলা, এনজিও কর্মকর্তা, সুশীল সমাজ, বড় বুর্জোয়া ও ছাত্র নেতৃত্বের একাংশসহ শাসকশ্রেণির কথিত “তৃতীয় শক্তি”র অন্তর্বর্তী সরকার এ কাজগুলোর দায়িত্ব গ্রহণ করে। যাকে সমস্ত বুর্জোয়া পার্টিসহ ধর্মবাদী, বাম নামধারী সংস্কারবাদী পার্টি ও অন্যান্য ছোটো খাটো পার্টিগুলো সমর্থন করে।

ইউনূস সরকার সংস্কার ও ফ্যাসিস্টদের বিচারের ধুয়া তুলে বুর্জোয়া নির্বাচনকে অনিশ্চিত করে তোলে। যাকে মদদ দেয় জামাতসহ কিছু ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট পার্টি ও “তৃতীয় শক্তি”র মদদ-প্রাপ্ত কিংস পার্টি এনসিপি। এর বিপরীতে আওয়ামী পরবর্তীকালে সর্ববৃহৎ বুর্জোয়া পার্টি বিএনপি দ্রুত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসীন হবার মানসে নির্বাচনের দাবি জোরদার করে। সাম্রাজ্যবাদীদের বিভিন্ন অংশের সমর্থনও তারা পায়। কোন্দল ও আপস-সমঝোতা, এবং জুলাই ঘোষণা, ঐকমত্য কমিশন, সনদ তৈরি এবং তথাকথিত সংস্কার ও বিচারের বহু নাটকের পর অবশেষে ১২ ফ্রেব্রুয়ারির নির্বাচনটি সম্পন্ন হয়েছে।

২. অন্তর্বর্তী সরকার ৯ লক্ষাধিক সশস্ত্র ফোর্স (সেনাবাহিনী, নৌ-বহিনী, কোস্টগার্ড, বিজিবি, র‍্যাব, পুলিশ, আনসার) নিয়োজিত করে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের এ তথাকথিত ‘সৌন্দর্য’, ‘সুষ্ঠু’ ও ‘নিরপেক্ষ’ নির্বাচনকে পাহারা দিয়েছে। তথাপি বেশ কিছু সহিংসতা হয়েছে নির্বাচনের আগে, সময়ে ও পরে। নিহত, আহত, মারামারি, বাড়িঘর পুড়ানো, লুটপাট– এসবই হয়েছে। যা এখনো চলমান।

বুর্জোয়া বিশ্লেষকরা এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি যে, একে ইউনুসের দাবি মতো ইতিহাসের সেরা ও ঐতিহাসিক নির্বাচন বলবে কিনা। কারণ, ইতিমধ্যেই ইউনূসের প্রধান মিত্র জামাত-এনসিপি জোট অন্তত ৩০টি আসনে কারচুপির অভিযোগ করেছে। ইলেকশন ইনজিনিয়ারিং-এর অভিযোগ সকল পক্ষ থেকেই হচ্ছে। এমনকি, পরাজয়ের আলামত পেয়ে জামাত নেতা শফিকুর রহমান ও নাহিদ ইসলামকে ইলেকশান ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে পাশ করানোর অভিযোগও উঠেছে।

বিভিন্ন জায়গায় লক্ষ লক্ষ টাকা জব্দ হয়েছে বিএনপি-জামাত-এনসিপি’র পক্ষে ভোট কেনার অভিযোগে। এ দুর্নীতিতে অবশ্য “সৎ-লোকের শাসনে”র দাবিদার জামাত এগিয়েছিল। ভোটের আগে আইডি নম্বর ও বিকাশ নম্বর নিয়ে সাধারণ জনগণ, বিশেষত গ্রামীণ নারীদের ভোটকেনার অভিযোগও তাদের বিরুদ্ধে ছিল।

অন্যদিকে আরপিও-তে নিষেধ থাকলেও প্রায় ১৪ জন বিএনপি-পন্থি ঋণখেলাফি প্রার্থিকে ভোট করতে দেয়া হয়েছে।

ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকলেও জামাতের বিরুদ্ধে প্রমাণিত অভিযোগ দাখিল হয়েছে জান্নাতে যাওয়ার টিকিট বিক্রি বা এ জাতীয় কর্মকান্ডের। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে আওয়ামী ভোট কেনার এক উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা হয়েছে সকল প্রধান দলগুলোর মাঝে।

৩. গণভোট প্রশ্নে জনগণের সাথে জঘণ্য প্রতারণা করা হয়েছে। জুলাই সনদে হ্যাঁ ভোট জয়যুক্ত হয়েছে বলা হয়েছে। এমনকি সংসদ-সদস্য নির্বাচনে প্রদত্ত ভোট থেকেও গণভোটে বেশি ভোট পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

কিন্তু গণভোটে ৪টি প্রশ্নের ১টি উত্তর দেয়ার উদ্ভট আবিষ্কারটির জন্য মার্কিনি নাগরিক আলী রিয়াজকে এখনো কোনো পদক দেয়া হয়নি। বাস্তবে ৪টি প্রশ্নে ভেতরে ছিল সংবিধান সংশোধনীর প্রায় ৪৮টি বিষয়। যার বহু বিষয়ে প্রধান বুর্জোয়া পার্টি বিএনপিসহ অনেকের দ্বিমতও ছিল।

সংসদবাদী বাম সংগঠনগুলো তাদের কিছু রাজনৈতিক নীতিগত ভিন্নমতের কারণে সনদে সই করেনি। নিবন্ধিত ৫৭টি পার্টির মাত্র ২৫টিকে এই তথাকথিত “ঐকমত্যের” আলোচনায় ডাকা হয়েছিল। নির্বাচনে অংশ নেয়া ৫০টি পার্টির অর্ধেকের বেশি এতে ছিল না। সর্বোপরি সাধারণ জনগণের কোনো প্রতিনিধিত্ব এতে ছিল না। এমনকি ঐকমত্যের বিষয়গুলো শুধু নয়, যেসব বিষয়ে দ্বিমত ছিল বিভিন্ন পার্টির, সেগুলোকে পর্যন্ত প্রতারণার সাথে সনদে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল।

এই জটিল বিষয়টি শুধুমাত্র সংবিধান-বিশেষজ্ঞ ব্যতীত ব্যাপক শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কাছেও পরিষ্কার ছিল না। সাধারণ জনগণ কীভাবে এতে ভোট দেবেন? দিয়েছেন কি? সেটা শুধু তারাই জানেন, যারা নির্বাচনটি পরিচালনা করেছেন। এই গড্ডালিকায় সামিল হওয়া কোনো বুর্জোয়া পার্টি এ সম্পর্কে টু-শব্দটি পর্যন্ত করছে না।

৪. নির্বাচনের এ ফলাফল অনুরণিত ছিল। যদিও অন্যতম প্রধান বুর্জোয়া পার্টি আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবং তার মিত্র জাতীয় পার্টির কার্যত নিষিদ্ধ থাকায় অন্তত ২০% ভোট কম পড়েছে। এতে জামাত-বিএনপি উভয়েই উপকৃত হয়েছে।

জামাত হেরেছে তার কারণ হলো – ’৭১-এর গণহত্যায় তাদের সহযোগীর ভূমিকা, ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট রাজনীতি, বিশেষত তার থেকে উদ্ভূত তাদের নারীবিদ্বেষী পুরুষতন্ত্র। পাশাপাশি তারা প্রতারণামূলক ভাবে নিজেদেরকে কোরানের আইনের বিপরীতে পশ্চিমা বুর্জোয়া গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী হিসেবে দেখায়, যে কারণ দেখিয়ে অপর ধর্মবাদী পীর-পার্টিটি তাদের থেকে সরে যায়।

তথাপি বিএনপির মধ্যকার বিদ্রোহী প্রার্থীর সুযোগ জামাত পেয়েছে। যে কারণে বহু আসনে তারা পাশ করেছে বা ফেল করলেও বিএনপি’র সাথে ভোটের ব্যবধান কমিয়ে আনতে পেরেছে।

তাই, ধর্মবাদ খুব বড়ো সমর্থন পেয়েছে তা ভাবার কারণ নেই।

৫. এনসিপি কোনো ‘নতুন বন্দোবস্ত’র রাজনীতি আনতে পারেনি। কিংস পার্টির পুরোনো রাজনীতির বড়ে হিসেবে ভূমিকা, কিন্তু তাতে সফল হতে ব্যর্থ হওয়া। আর শেষ পর্যন্ত জামাতের মতো একটি ধর্মবাদী ফ্যাসিস্ট পার্টির সাথে জোটবদ্ধ হওয়া। এটা তাদের মধ্যপন্থি উদার বুর্জোয়া রাজনীতির বোলচালকে প্রতারণা হিসেবে প্রকাশ করেছে। তাদেরকে বিভক্তও করে দিয়েছে।

৬. নির্বাচনী দলগুলো তাদের ইশতেহারে বহু প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তারা যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছে তাতে জনগণের শত্রু সকল সাম্রাজ্যবাদ-ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, দালাল আমলা-মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ এবং সামন্তবাদ বিরোধী মৌলিক কোনো কর্মসূচি নেই। শ্রমিক-কৃষক-নারী-আদিবাসীদের স্বার্থের ও মৌলিক কোনো কর্মসূচি নেই। ফলে রাষ্ট্র ও সমাজের কোনো মৌলিক পরিবর্তন হবে না। শ্রমিক-কৃষক-নারী-আধিবাসী জনগণের উপর চালিত শোষণ-নিপীড়নও বন্ধ হবে না। সংবিধান বা রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কিছু কিছু সংস্কার হলেও তাতে সাধারণ জনগণের কোনো আগ্রহ নেই।

বিজয়ী পার্টি বিএনপি কর্তৃক জনগণকে দেয়া সংস্কারমূলক ও বুর্জোয়া জন-কল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতিগুলো কতটা বাস্তবায়ন হবে তা দেখার বিষয়। তবে এসবে জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না। দুর্নীতি-চাঁদাবাজী চলবে। তাদের গণবিরোধী সন্ত্রাসও ক্রমান্বয়ে বেড়ে উঠবে। কারণ, এগুলো বিদ্যমান ব্যবস্থারই উপজাত। মৌলিক সমস্যা থেকে যা সৃষ্ট।

৭. জুলাই সনদ প্রশ্নে শাসকশ্রেণির মাঝে গুরুতর গোঁজামিল রয়েছে। তার ব্যাখ্যা ও বাস্তবায়ন নিয়ে শাসকশ্রেণির মাঝে অচিরেই দ্বন্দ্ব-কলহ আবার চাঙ্গা হবে। ১৭ ফেব্রুয়ারি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ নিয়েই যার যাত্রা শুরু হয়েছে। জুলাই সনদ, বুর্জোয়া নির্বাচন শাসকশ্রেণির সংকট সমাধান করবে না, বরং নতুনতর সংকটে তারা আবর্তিত হবে।

৮. নির্বাচনী ইশতেহারে দলগুলো যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তাতে বিদেশি প্রভুদের সাথে তাদের দাসত্বমূলক সম্পর্ক অবসানেরও কোনো কর্মসূচি ছিল না। যা তাদের শ্রেণি-চরিত্রের থেকে অনিবার্য। সাবভৌমত্ব রক্ষা, আধিপত্যবাদ বিরোধিতার যেসব বিমূর্ত বুলি তারা ঝেড়ে চলেছে সেগুলোর কোনো মূল্য নেই। মার্কিনের তাবেদারি শক্তিশালী হয়েছে, যা অব্যাহত থাকবে। সম্প্রতি মার্কিনের সাথে অন্তর্বর্তী সরকারের অসম বাণিজ্য চুক্তিও সই হয়েছে, যাকে নতুনরা বাতিল করতে পারবে না। নির্বাচনি দলগুলো টু-টা শব্দ করেনি। হাসিনা-আওয়ামী লীগের প্রভু ভারতের সাথে জামাত ও বিএনপি উভয়েরই যোগাযোগ ছিল। ক্ষমতাসীন বুর্জোয়া যেকোনো পার্টি সেটা অব্যাহত রাখতে বাধ্য। এখন বিএনপি সরকারের সাথে সখ্যতা বাড়াতেও চাচ্ছে মোদি সরকার। কারণ বিশ্বস্ত গোলাম হাসিনাকে তারা আর বেশি খেলতে চাইবে না, অন্তত বর্তমান মুহূর্তে। মার্কিন-চীন-রাশিয়াসহ সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর সাথে বহু অসম চুক্তি বিগত সরকারগুলো বা অন্তর্বর্তী সরকার প্রকাশ ও বাতিল করেনি। নতুন সরকারও তা করতে সক্ষম নয়। এই শাসকশ্রেণি তা করতে সক্ষমও নয়। বর্তমান বিরোধী দল জামাত-জোট এসব নিয়ে কিছু মাঠ গরম করবে মাত্র। যদিও মৌলিক কোনো বিরুদ্ধতা তারাও করতে সক্ষম নয়।

৯. বামপন্থি নামে পরিচিত সংস্কারবাদী সংসদবাদী বুর্জোয়া-লেজুড় দলগুলো সম্পর্কে আলোচনা বুর্জোয়া মিডিয়া ও রাষ্ট্রযন্ত্র প্রায় হারাম করে রেখেছে। বাস্তবে তাদের সংস্কারবাদী ধারাতেও শ্রমিক-কৃষকের মাঝে তাদের কোনো পদচারণা নেই বললে চলে। যদিও তারা সনদ স্বাক্ষর করেনি, কিন্তু সেটা কোনো বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী অবস্থান থেকে নয়। বরং ’৭২-সংবিধান চেতনা থেকে। এদের কোনো ভবিষ্যৎ দেখা যাচ্ছে না। আর বিএনপি’র সাথে জোটবাধা তথাকথিত ‘বাম’দের ভবিষ্যৎ আরো শোচনীয়।

১০. বুর্জোয়া নির্বাচনে শাসকশ্রেণির মুখ বদল হয়েছে মাত্র, ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি, হবে না। নির্বাচনে জনগণের মুক্তি কখনো হয়নি, এবারও হবে না। তাই জনগণকে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকার-সংবিধান ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী সংগ্রামে সামিল হয়ে এগিয়ে যেতে হবে।

আরো পড়ুন

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লিফলেটটি ফেসবুকে প্রচার হতে দেখা যায় এবং ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করে ফুলকিবাজ.কমে ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ তারিখে প্রকাশ করা হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!