বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো বনেদী বামপন্থী দল

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবি (ইংরেজি: Communist Party of Bangladesh, সংক্ষেপে: CPB) হচ্ছে পূর্ব বাংলার সাম্যবাদী আন্দোলনের সবচেয়ে পুরনো আধুনিক সংশোধনবাদী বনেদী রাজনৈতিক দল। এটি ১৯৬৮ সালে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলা শাখা থেকে উদ্ভূত হয়েছিল।

১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ-ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (সংক্ষেপে: সিপিআই) সাংগঠনিক, লাইনগত ও মতাদর্শগত সংশোধনবাদী উত্তরাধিকার নিয়েই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর গঠিত হয় পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি। এটি মূলত দেশভাগের পর অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিরই একটি পাকিস্তানি সংস্করণ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই প্রেক্ষাপটে বিচার করলে, বর্তমান বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি হলো ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯২৫ সালে পুনর্গঠিত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার উত্তরসূরি।

পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ও নানা অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি সমগ্র পাকিস্তানে তার কার্যক্রম বিস্তৃত রাখতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে সৃষ্টি হয় পূর্ব পাকিস্তান ভিত্তিক “পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি” (ইপি সিপি)। শুরু থেকেই এই দলটির প্রধান নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিলেন মণি সিং ও খোকা রায়ের মতো ব্যক্তিত্বরা, যাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে ‘সংশোধনবাদী’ ধারার রাজনীতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও স্নায়ুযদ্ধ সমাপ্তি ও নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে মণি সিংয়ের মতো প্রবীণ বিপ্লবীদের উত্তরসূরি হিসেবে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতারা ক্রমান্বয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসতে থাকেন। নেতৃত্বের এই ধারাবাহিকতায় আবির্ভূত হন মনজুরুল আহসান খান, যিনি দীর্ঘ সময় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তীতে ডাকসুর সাবেক ভিপি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর মোহাম্মদ শাহ আলম সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন, যার হাত ধরে সিপিবি বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সচেষ্ট হয়। অতি সম্প্রতি ২০২৫ সালের ত্রয়োদশ কংগ্রেসের মাধ্যমে দলের নেতৃত্বে আরও বড় পরিবর্তন এসেছে এবং কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন সভাপতি এবং আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।

সিপিবির উত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

রুশ-চীন মহাবিতর্কের পরিণতি

রাজনৈতিক মেরুকরণে মণি সিং ও খোকা রায়ের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি’ (ইপি সিপি) এক চরম বিতর্কিত ও সুবিধাবাদী অবস্থানে অবতীর্ণ হয়। ১৯৬০-এর দশকে যখন ক্রুশ্চেভ চক্রের উত্থানের মধ্য দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার পার্টি খোদ সংশোধনবাদ ও পুঁজিবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তখন আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে এক বিশাল ফাটল তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে চেয়ারম্যান মাও সেতুং-এর নেতৃত্বে সূচিত ‘রুশ-চীন মহাবিতর্ক’ আধুনিক সংশোধনবাদের মুখোশ উন্মোচন করে দিলেও মণি সিং-খোকা রায় চক্র সচেতনভাবে ক্রুশ্চেভের সেই আধুনিক সংশোধনবাদী ধারাকেই বেছে নেয়।

দলটির এই অবস্থান তাদের কেবল ক্রুশ্চেভীয় সংশোধনবাদের তল্পিবাহক হিসেবেই চিহ্নিত করেনি, বরং তাদের রূপান্তর ঘটায় চরম চীনবিরোধী, মাওবিরোধী এবং বৈপ্লবিক সংগ্রামবিরোধী এক সংগঠনে। মার্কসবাদ-লেনিনবাদের মূল চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়ে তারা বাংলাদেশে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থরক্ষাকারী প্রতিনিধি ও এজেন্টে পরিণত হয়। ফলশ্রুতিতে, এই সংশোধনবাদী-সুবিধাবাদী চক্রটি এদেশের জনগণের প্রকৃত মুক্তি ও বৈপ্লবিক রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষাকে ধূলিসাৎ করে সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থের পাহারাদারে পরিণত হয়েছিল।

১৯৬৬-৬৭ সালের প্রেক্ষাপটে মণি সিংখোকা রায়ের নেতৃত্বাধীন সোভিয়েতপন্থী বা ক্রুশ্চেভীয় সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে দলের ভেতর এক তীব্র অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দানা বেঁধে ওঠে। দলের সাধারণ ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের এই অসন্তোষের চূড়ান্ত রূপ হিসেবে আবদুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা, সুখেন্দু দস্তিদার, আবদুল মতিন এবং আলাউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী)’ বা ইপিসিপি (এমএল)। এই ভাঙনটি ছিল মূলত আন্তর্জাতিক মহাবিতর্কের ঢেউয়ে এদেশের মাটিতে রুশপন্থী ও চীনপন্থী ধারার আনুষ্ঠানিক বিভক্তি।[১]

১৯৭১ সালের গণযুদ্ধে ভূমিকা

সংশোধনবাদ বিরোধী এই লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় ১৯৭০ সালে মণি সিংয়ের নেতৃত্বাধীন মূল ধারা থেকে বেরিয়ে আসে আরেকটি বিদ্রোহী অংশ। নাসিম আলী ও শুভ রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই উপদলটি সশস্ত্র বিপ্লবের লাইন গ্রহণ করে এবং ‘হাতিয়ার গ্রুপ’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের মহান গণযুদ্ধ চলাকালীন এই ‘হাতিয়ার গ্রুপ’ ভারতে অবস্থান নেয় এবং সেখানে কাজী জাফর আহমদ, রাশেদ খান মেনন ও হায়দার আকবর খান রনোর নেতৃত্বাধীন ধারার সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মুক্তি সংগ্রামে লিপ্ত হয়।

তৎকালীন পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর তীব্র জাতীয় নিপীড়নকে মণি সিং-খোকা রায়ের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠীটি কার্যত অস্বীকার করে আসছিল। জনগণের স্বাধিকার ও মুক্তি কামনার সংগ্রামকে তারা মূলত সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র হিসেবেই বিবেচনা করত। তবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তারা বুর্জোয়া সংস্কারবাদী ঢঙে কেবল ‘প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের’ দাবিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। ১৯৬৬ সাল থেকেই তারা একটি অখণ্ড পাকিস্তানের কাঠামোতে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাজতন্ত্র কায়েমের অবাস্তব ও ক্রুশ্চেভীয় সংশোধনবাদী লাইন প্রচার শুরু করে। যার ফলশ্রুতিতে এই নেতৃত্ব বাংলার সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।

কিন্তু ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে এরা দ্রুত নিজেদের ভোল পাল্টাতে বাধ্য হয়। নিজেদের পূর্বতন অবস্থানের কোনো প্রকার নীতিগত ও আদর্শিক আত্মসমালোচনা ছাড়াই এরা রাতারাতি স্বাধীনতার প্রবক্তা সাজে। মূলত তৎকালীন সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এবং ভারতের শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক নির্দেশনায় তারা আওয়ামী লীগের অন্যতম সহযোগী হিসেবে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তারা দলগতভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং মুক্তিবাহিনীতে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেয়, যা ছিল মূলত তাদের রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতারই নামান্তর।

সিপিবির আদর্শিক বিচ্যুতি ও বাকশাল রাজনীতি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) একটি আলোচিত নাম। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দলটি তাদের নাম পরিবর্তন করে বর্তমান নাম ধারণ করে। তবে স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান, আদর্শিক ভিত্তি এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সাথে তাদের সম্পর্ক নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্ক রয়েছে।

প্রকাশ্য রাজনীতি ও আদর্শিক রূপান্তর

স্বাধীনতার পর সরকারি আনুকূল্য পাওয়ায় সিপিবি দীর্ঘদিনের গোপন রাজনীতি ছেড়ে প্রকাশ্যে আসার সুযোগ পায়। তবে সমালোচকদের মতে, এই প্রকাশ্যে আসার প্রক্রিয়ায় দলটি তার বিপ্লবী সত্তা হারিয়ে ফেলে। তারা মূলত নির্বাচনী রাজনীতি, প্রকাশ্য গণসংগঠনবাদ এবং সংস্কারবাদী ধারার অনুসারী হয়ে পড়ে। মার্কসবাদ-লেলিনবাদের মৌলিক বিপ্লবী লাইন থেকে বিচ্যুত হয়ে দলটি ক্রমান্বয়ে বুর্জোয়া সংসদীয় ব্যবস্থার লেজুড়বৃত্তিতে লিপ্ত হয় বলে অভিযোগ করা হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি সমর্থন

তৎকালীন শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে সিপিবির ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তৎকালীন সরকারের বিভিন্ন নীতি, যা অনেক মহলে শোষণমূলক ও ফ্যাসিবাদী হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, সিপিবি সেসবের কট্টর সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশেষ করে:

  • ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও রুশ প্রভাব: তৎকালীন ভূ-রাজনীতিতে সোভিয়েত রাশিয়ার ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ’ এবং ভারতের প্রভাব বিস্তারের নীতিকে সিপিবি নগ্নভাবে সমর্থন দেয় বলে মনে করা হয়।
  • লুটপাট ও দমন-নিপীড়ন: আওয়ামী লীগ সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক লুটপাট এবং রক্ষীবাহিনীর বর্বরতাকে দলটি রাজনৈতিক বৈধতা প্রদান করেছিল।

বাকশালে বিলোপ ও নগ্ন বিলোপবাদ

সিপিবির রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন তারা নিজেদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে শেখ মুজিবের গঠিত একক দল ‘বাকশাল’ (বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ)-এ যোগ দেয়। নিজেদের পার্টি এবং সকল অঙ্গ-সংগঠন বিলুপ্ত করে একটি একদলীয় স্বৈরশাসনে অংশ নেওয়াকে অনেকে মার্কসবাদ-বিরোধী ‘বিলোপবাদ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ক্ষমতার ভাগাভাগি বা বখরার বিনিময়ে তারা মূলত শাসকদলের দালালি ও আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করতে শুরু করে।
দমন-পীড়নে ভূমিকা
সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়টি ছিল দেশপ্রেমিক ও বিপ্লবী কর্মীদের ওপর দমন-নিপীড়নের সমর্থন। রক্ষীবাহিনী কর্তৃক হাজার হাজার বিপ্লবী নেতাকর্মী এবং সাধারণ জনগণকে হত্যার ঘটনাগুলোতে সিপিবি কেবল নীরব দর্শক ছিল না, বরং অনেক ক্ষেত্রে তারা এই দমনমূলক কর্মকাণ্ডকে প্রকাশ্যে সমর্থন ও সক্রিয় সহযোগিতা প্রদান করেছিল। এর ফলে দলটি মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে শাসকগোষ্ঠীর সহযোগী শক্তিতে পরিণত হয়।

আওয়ামী ফ্যাসিবাদের ‘বি টিম’ ও জনবিচ্ছিন্নতা

তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিটি জনবিরোধী কর্মকাণ্ড, ফ্যাসিবাদী শাসন এবং লুণ্ঠন প্রক্রিয়ায় নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়ার ফলে সিপিবি সাধারণ মানুষের কাছে আওয়ামী লীগের ‘বি টিম’ বা সহযোগী শক্তি হিসেবে পরিচিতি পায়। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে দলটি শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের পরিবর্তে শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষাকেই প্রাধান্য দিয়েছিল। এর ফলে তারা সাধারণ জনগণের আস্থা হারিয়ে পুরোপুরি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মূলত দেশীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে রুশ-ভারত অক্ষশক্তির দালালি করতে গিয়ে দলটি একটি প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রতিবিপ্লবী শক্তি হিসেবে জনগণের নিকট চিহ্নিত হয়।

সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের অনুসারী

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সিপিবির ভূমিকা ছিল সর্বদা সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বার্থের অনুগামী। সমালোচকদের মতে, সারা বিশ্বে সোভিয়েত ‘সামাজিক সাম্রাজ্যবাদে’র প্রতিটি ষড়যন্ত্র, আগ্রাসন এবং অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপকে সিপিবি কেবল সমর্থনই করেনি, বরং বাংলাদেশে তার পক্ষে জনমত গঠনের অপচেষ্টাও চালিয়েছে। বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রতিটি পদক্ষেপকে তারা আদর্শিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছে।

বৈশ্বিক আধিপত্য ও তথাকথিত ‘শান্তি আন্দোলন’

স্নায়ু যুদ্ধকালীন সময়ে দুনিয়া ভাগাভাগি নিয়ে রুশ-মার্কিন যে তীব্র প্রতিযোগিতা ও ‘কামড়াকামড়ি’ চলছিল, সেখানে সিপিবি অন্ধভাবে সোভিয়েত অবস্থানকে সমর্থন জোগাত। সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক পরিচালিত অস্ত্র প্রতিযোগিতা, পারমাণবিক যুদ্ধের প্রস্তুতি এবং সামরিক শক্তির হুমকি প্রদর্শনকে— দলটি নির্লজ্জভাবে সমর্থন করত। অত্যন্ত চতুরতার সাথে তারা এই যুদ্ধবাজ নীতিগুলোকে ‘শান্তি আন্দোলন’ হিসেবে প্রচার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালিয়েছে। তাদের এই দ্বিমুখী আচরণ প্রমাণ করে যে, তারা কোনো স্বাধীন বিপ্লবী আদর্শ নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট বিদেশি শক্তির তল্পিবাহক হিসেবেই কাজ করত।

মার্কিন বিরোধিতার আড়ালে সোভিয়েত স্বার্থ রক্ষা

সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হয়, তখন সিপিবি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা শুরু করে। তবে এই বিরোধিতা কোনো প্রকৃত স্বাধীন বিপ্লবী চেতনা থেকে ছিল না; বরং এটি ছিল সোভিয়েত সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষার একটি কৌশল মাত্র। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভ ও বিক্ষোভকে তারা নিজেদের সংকীর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের পক্ষে ব্যবহারের অপচেষ্টা চালায়। এভাবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার লেবাস পরে তারা মূলত এক সাম্রাজ্যবাদের বদলে অন্য সাম্রাজ্যবাদের দালালি করত।

জিয়ার আমল ও সিপিবির ভূমিকা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৭৫ সাল একটি ভয়াবহ মোড় পরিবর্তনের বছর। ১৫ আগস্ট মার্কিনপন্থী সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুজিব সরকারকে উৎখাত করার পর দেশের রাজনৈতিক পটভূমি সম্পূর্ণ বদলে যায়। পরবর্তী নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যখন জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসীন হন, তখন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)-র ভূমিকা অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের নিকট বিস্ময় ও সমালোচনার জন্ম দেয়।

জিয়া সরকারের সাথে প্রাথমিক সখ্য ও খালকাটা কর্মসূচি

জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর যখন দেশে একটি দক্ষিণপন্থী ও সামরিক শাসন জেঁকে বসছিল, তখন সিপিবি আশ্চর্যজনকভাবে সেই সরকারের কিছু উদ্যোগের প্রতি নমনীয় ভাব প্রদর্শন করে। বিশেষ করে জিয়ার বহুল আলোচিত ‘খালকাটা কর্মসূচি’-কে সিপিবি প্রকাশ্য সমর্থন প্রদান করে। যেখানে বামপন্থী দলগুলোর কাজ ছিল সামরিক শাসনের বিরোধিতা করা এবং মেহনতি মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, সেখানে একটি প্রতিক্রিয়াশীল সামরিক সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সহযোগী হওয়াকে রাজনৈতিক মহলে ‘নগ্ন আপস’ হিসেবে দেখা হয়।

প্রতিক্রিয়াশীলদের সাথে নগ্ন আপসের দৃষ্টান্ত

জিয়া সরকারের এই কর্মসূচি মূলত ছিল তাঁর রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার একটি কৌশল। সিপিবির মতো একটি দল, যারা সাম্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার কথা বলে, তারা কীভাবে একটি সামরিক জান্তার কর্মসূচিতে শামিল হলো—তা নিয়ে বাম রাজনৈতিক বলয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এটি ছিল সিপিবির সুবিধাবাদী রাজনীতির একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সাথে এই ধরনের হাত মেলানো কেবল তাদের আদর্শিক দুর্বলতাকেই প্রকাশ করেনি, বরং এর ফলে বামপন্থীদের স্বতন্ত্র বিপ্লবী ইমেজও দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

মনি সিং-ফরহাদ চক্র ও আফগান আগ্রাসন

সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশে তাদের প্রভাব বিস্তারের জন্য মনি সিং-ফরহাদ চক্রকে প্রধান বা বিশ্বস্ত দালাল হিসেবে ব্যবহার করত। এই চক্রের সবচেয়ে কলঙ্কিত ভূমিকা দেখা যায় যখন তারা আফগানিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের নগ্ন সামরিক আগ্রাসনকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানায়। সিপিবির নেতারা সে সময় বাংলাদেশেও “আফগান স্টাইলে বিপ্লব” (অর্থাৎ বিদেশি শক্তির সহায়তায় ক্ষমতা দখল) ঘটানোর হুমকি প্রদান করেন। তাদের এই বক্তব্য ও অবস্থান প্রমাণ করে যে, তারা দেশের সার্বভৌমত্বের চেয়ে বিদেশি প্রভুদের সন্তুষ্টিকেই বড় করে দেখেছিল।

গণরোষ ও রাজনৈতিক অন্তর্ধাম

১৯৭৯ সালে সিপিবির এই রুশ-ঘেঁষা দালালি চরম সীমানা অতিক্রম করলে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ডিসেম্বর মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট সরকারকে রক্ষায় এবং নিয়ন্ত্রণ নিতে এক নগ্ন সামরিক আগ্রাসন শুরু করে। আফগান আগ্রাসনের সমর্থনে মিছিল ও সমাবেশ করতে গিয়ে দলটির কর্মীরা সাধারণ জনতার প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে এবং ‘রাশিয়ার দালাল’ হিসেবে গণপিটুনির শিকার হয়। এই নজিরবিহীন অপদস্থ হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে, দলটি জনগণের আকাঙ্ক্ষা থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। এই ঘটনার পর তারা এতটাই জনবিচ্ছিন্ন ও ভীত হয়ে পড়ে যে, পরবর্তী দীর্ঘ সময় তাদের প্রকাশ্য জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও সুবিধাবাদী রাজনীতি

আশির দশকে বাংলাদেশে এরশাদের সামরিক শাসনবিরোধী গণআন্দোলন ছিল এদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের এক অনন্য অধ্যায়। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত ১৫ দলীয় জোট এই আন্দোলনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। এই জোটে অন্তর্ভুক্ত থেকে সিপিবি এবং তার সহযোগী গণসংগঠনগুলো, বিশেষ করে শ্রমিক সংগঠনগুলো আন্দোলনের ময়দানে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি পূর্বের তুলনায় অনেকটাই শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছিল। রাজপথের লড়াই-সংগ্রাম তাদের জনবিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।

তবে এই বাহ্যিক সক্রিয়তার আড়ালে দলগুলোর অভ্যন্তরে কাজ করেছে এক গভীর সুবিধাবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। তথাকথিত সংশোধনবাদী শ্রেণিস্বার্থ দ্বারা পরিচালিত হওয়ার ফলে এই রাজনৈতিক শক্তিগুলো কখনোই চায়নি যে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন একটি আপসহীন ও বৈপ্লবিক গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিক। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল গণআন্দোলনের স্বতঃস্ফূর্ত জোয়ারকে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতার পথ প্রশস্ত করা, ভোটের পাঁকে জড়ানো, ব্যবস্থাগত পরিবর্তন আনা নয়।

এরশাদ আমল ও ১৯৮৬ সালের নির্বাচন

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যখন দেশব্যাপী তীব্র গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তখন সিপিবির অবস্থান ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ১৯৮৬ সালে এরশাদের অধীনে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন ছিল মূলত একটি অবৈধ শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার প্রক্রিয়া। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দলের একাংশ ৮ দল কর্তৃক এরশাদের ১৯৮৬-এর সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে গণআন্দোলনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষেত্রে মনি সিং-ফরহাদ চক্রের সিপিবি-ই প্রধান নীতি-নির্ধারক বিশ্বাসঘাতকের ভূমিকা পালন করেছে। অধিকাংশ গণতান্ত্রিক ও বামপন্থী দল সেই নির্বাচন বর্জন করলেও, সিপিবি সেই তথাকথিত ‘ভুয়া’ নির্বাচনে অংশ নেয়। সমালোচকদের মতে, এই অংশগ্রহণের মাধ্যমে দলটি প্রকারান্তরে সামরিক-স্বৈরতন্ত্রকে দীর্ঘস্থায়ী করার সুযোগ করে দিয়েছিল এবং এরশাদ সরকারের রাজনৈতিক বৈধতার সংকট দূর করতে সহায়তা করেছিল।

আন্দোলনকে রাজপথ থেকে সরিয়ে বারবার নির্বাচন ও আপসের কানাগলি পথে চালিত করার মাধ্যমে তারা স্বৈরাচারী এরশাদকে টিকে থাকার রসদ জুগিয়েছে।
ফ্যাসিস্ট এরশাদ সরকারের পক্ষ থেকে আসা প্রতিটি আপস প্রস্তাব বা রাজনৈতিক টোপকে তারা সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে চেয়েছে।

একমেরু বিশ্বায়ন ও মুৎসুদ্দি ক্ষমতার রাজনীতিতে সিপিবির দোদুল্যমানতা

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন-পরবর্তী ১৯৯১ সালের বিশ্ববাস্তবতা ছিল একক মেরুকরণের যুগ। বিশ্বায়নের এই নতুন ধাপে বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা পালাক্রমে কুক্ষিগত করে রাখে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। সমালোচকদের মতে, এই প্রধান দুই দল মূলত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও বিশ্বায়নবাদী শক্তির অনুগত থেকে দেশীয় রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।

লীগ-বিএনপির দ্বিদলীয় রাজনীতির বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের যে ভূমিকা রাখার কথা ছিল, সেখানে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) এক রহস্যময় ও সুবিধাবাদী অবস্থানে অবতীর্ণ হয়। ক্ষমতার বলয়ে থাকা লীগ-বিএনপির বিপরীতে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভাবের শ্লোগান দিলেও তারা ৮ দল, ১১ দল ইত্যাদি সংখ্যাভিত্তিক মতাদর্শবিহীন জোট গঠনে মনোযোগী হয়।

আওয়ামী লীগের দিকে হেলে থাকা সম্পর্ক ও লেজুড়বৃত্তি

দীর্ঘদিন রুশপন্থী রাজনীতির ধারক হিসেবে পরিচিত সিপিবি নব্বইয়ের দশকের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার সংকটে পড়ে।পরবর্তী দশকগুলোতেও সিপিবির রাজনীতিতে একটি নির্দিষ্ট ঘরানার প্রতি আনুগত্য লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক মেরুকরণে সিপিবির অবস্থানকে অনেক বিশ্লেষক ‘লেজুড়বৃত্তি’ হিসেবে অভিহিত করেন। জোটবদ্ধ রাজনীতি বা নির্বাচনী সমঝোতার নামে দলটি প্রায়শই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক এজেন্ডার পরিপূরক হিসেবে কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে করে বামপন্থীদের নিজস্ব ও স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ধারাটি দুর্বল হয়ে পড়েছে।

২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচন

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০১৮ সালের নির্বাচন অত্যন্ত বিতর্কিত হিসেবে পরিচিত। ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোটের’ নির্বাচন নিয়ে যখন দেশি-বিদেশি সব মহলে তীব্র সমালোচনা চলছিল, তখন সিপিবির ভূমিকা নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন ওঠে। অভিযোগ রয়েছে যে, আওয়ামী লীগের এই প্রশ্নবিদ্ধ ক্ষমতা গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত থেকে বা নির্বাচনে অংশ নিয়ে সিপিবি তাদের সুবিধাবাদী রাজনীতিরই প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এই অবস্থান দলটির আদর্শিক ভিত্তিকে সাধারণ মানুষের কাছে যেমন হালকা করেছে, তেমনি বাম রাজনীতির প্রকৃত লক্ষ্যকেও ব্যাহত করেছে।

সিপিবি প্রভাবাধীন সংগঠনসমূহ

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) দীর্ঘ সময় ধরে এদেশের প্রগতিশীল আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। এই রাজনৈতিক আদর্শ ও কার্যক্রমকে তৃণমূল পর্যায়ে বিস্তৃত করতে সিপিবি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ গণসংগঠন ও প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তাদের প্রভাব বজায় রাখে। মূলত ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, নারী এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে এই সংগঠনগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। দেশের প্রায় সর্বত্রই এদের কারো না কারো শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত আছে।

  • তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র ও প্রগতিশীল চিন্তার প্রসারে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এবং বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ছাত্র ইউনিয়ন এদেশের সকল ছাত্র আন্দোলনে ঐতিহাসিকভাবে একটি শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত।
  • শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি) এবং গ্রামাঞ্চলের ভূমিহীন ও কৃষি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি সিপিবির প্রধান সাংগঠনিক হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে।
  • বাঙালি সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশে উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী দেশের বৃহত্তম সাংস্কৃতিক সংগঠন। পাশাপাশি নারী অধিকার আন্দোলনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থানে বাংলাদেশ শান্তি পরিষদ সিপিবির আদর্শিক বলয়ে অত্যন্ত প্রভাবশালী।
  • সংসদীয় ও রাজনৈতিক মিত্রতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ঐতিহাসিকভাবে এই ধারার রাজনীতির সাথে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট।

সিপিবির প্রচারণা

প্রকাশনা ব্যবস্থা

সিপিবির প্রধান দলীয় মুখপত্র হিসেবে সাপ্তাহিক একতা দীর্ঘকাল ধরে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি ও আদর্শ প্রচার করে আসছে। এর পাশাপাশি, তাত্ত্বিক আলোচনার জন্য তাদের রয়েছে বিশেষায়িত পত্রিকা ‘মুক্তির দিগন্ত’। সংবাদপত্রের জগতে দৈনিক সংবাদ-এর ওপর এই ধারার রাজনীতির গভীর প্রভাব ঐতিহাসিকভাবেই স্বীকৃত। এছাড়া বিভিন্ন নিয়মিত ও অনিয়মিত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক সাময়িকী এবং সংকলনের ওপর দলটির কম-বেশি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে, যা তাদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য বা ‘হেজেমনি’ বজায় রাখতে সহায়তা করে।

প্রকাশনা সংস্থা ও ব্যবসায়িক প্রভাব

সিপিবির এই প্রচারযন্ত্রের পেছনে শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করে বেশ কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান। ঢাকার বিজয়নগরে অবস্থিত ‘জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী’ মূলত এদের নিজস্ব আদর্শিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে। এছাড়া দেশের পুস্তক ব্যবসার অন্যতম বড় নাম মুক্তধারা, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স, ‘হাক্কানি’, ‘দ্যু’ এবং ‘বিপ্লবীদের কথা’-র মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সিপিবির ব্যাপক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। এই প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল স্থানীয় প্রকাশনাই নয়, বরং সোভিয়েত আমল থেকেই রুশ সাহিত্য ও রাজনৈতিক বইপত্রের ব্যবসার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শিক বলয় তৈরি করেছে।

পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবী মহলে প্রভাব

তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমানে রাশিয়া) সহায়তায় সিপিবি দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও পেশাজীবী মহলে গভীর শিকড় গেড়েছে। প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের একটি বড় অংশ এই ধারার রাজনীতির দ্বারা প্রভাবিত, যাদের অনেককে সমালোচকরা মতাদর্শিক অনুগত বা ‘দালাল বুদ্ধিজীবী’ হিসেবেও অভিহিত করেন। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও বেসামরিক আমলাদের মাঝেও এই গোষ্ঠীর সুসংগঠিত অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। তবে কৌশলগত কারণে বা ঐতিহাসিক বিবর্তনে সামরিক আমলাতন্ত্রের মাঝে এই রুশপন্থী বা সিপিবির প্রভাব বর্তমান সময়ে অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে।

সিপিবির রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য

তারা মাঝে মাঝে রাজপথে আন্দোলনমুখী ভাব দেখানোর চেষ্টা করে বটে, কিন্তু সেই আন্দোলনের কোনো সুনির্দিষ্ট বৈপ্লবিক লক্ষ্য থাকে না। জনমনে অসন্তোষ তৈরি হলে বা গণআন্দোলনের কোনো প্রেক্ষাপট তৈরি হলে সিপিবি সেখানে অংশগ্রহণ করে মূলত সেই আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রিত রাখার জন্য। তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভকে বৈপ্লবিক রূপান্তর বা সশস্ত্র উত্থানের দিকে যেতে না দিয়ে কৌশলে নির্বাচনের কানাগলি পথে ঠেলে দেওয়া।

তাত্ত্বিকভাবে তারা নিজেদের মেহনতি মানুষের প্রতিনিধি দাবি করলেও বাস্তব ক্ষেত্রে তারা সংস্কারবাদী ও সংশোধনবাদী ধারার বাইরে বের হতে পারেনি। যখনই শোষিত শ্রেণির পক্ষ থেকে কোনো আপসহীন গণসংগ্রাম বা সশস্ত্র প্রতিরোধের সম্ভাবনা উঁকি দিয়েছে, তখনই সিপিবি তার সাংগঠনিক শক্তি দিয়ে সেই অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। বিপ্লবী পরিবর্তনের পরিবর্তে সংসদীয় গণতন্ত্রের মোড়কে বিদ্যমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখাই যেন তাদের অঘোষিত প্রধান কাজে পরিণত হয়।

সাম্রাজ্যবাদ ও আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদের এই যুগে সিপিবির এই আত্মসমর্পণবাদী রাজনীতি মূলত শাসকগোষ্ঠীর হাতকেই শক্তিশালী করেছে। ফলে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষ বারবার রাজপথে রক্ত দিলেও শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রক্ষমতা সেই মার্কিনঘনিষ্ঠ বুর্জোয়া দলগুলোর হাতেই বন্দি থেকেছে। বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথ রুদ্ধ করে আন্দোলনকে আপসকামী ও নির্বাচনী কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার এই নীতি বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসে এক নেতিবাচক অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আন্দোলনের প্রতিটি বাঁকে এরা ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের জাল বিস্তার করেছে। যখনই গণআন্দোলন দেশব্যাপী একটি জঙ্গি ও আপসহীন রূপ নিতে শুরু করেছে, তখনই এই প্রতিক্রিয়াশীল চক্র তা স্তিমিত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে।

বিশেষ করে আন্দোলনের তুঙ্গে থাকা অবস্থায় যখন সরকারের ওপর চূড়ান্ত আঘাত হানার সময় এসেছে, তখনই তারা আত্মসমর্পণবাদী নীতি গ্রহণ করে আন্দোলনের পিঠে ছুরি মেরেছে। তাদের এই দোদুল্যমানতা ও আপসকামী রাজনীতির কারণে সামরিক স্বৈরাচারের পতন যেমন দীর্ঘায়িত হয়েছে, তেমনি রাজপথের সাধারণ ত্যাগী কর্মীদের আকাঙ্ক্ষা বারবার ধূলিসাৎ হয়েছে। ফলে এই আন্দোলন কেবল ব্যক্তিবদলের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তনের পথ রুদ্ধ হয়ে পড়ে।

সিপিবির রাজনৈতিক কৌশলগত গতিপ্রকৃতি

সিপিবির কৌশলগত অবস্থান বিশ্লেষণ করলে একটি সুনির্দিষ্ট ধারা লক্ষ্য করা যায়। তাদের বর্তমান রাজনীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো “মুক্তিযুদ্ধের চেতনা” উদ্ধারের ধুয়া তোলা। এই চেতনার আড়ালে তারা মূলত ১৯৭১-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের ওপর রুশ ও ভারতীয় আধিপত্য এবং শোষণ-নিপীড়নকে আড়াল করতে চায়। জাতীয় মুক্তির প্রকৃত আকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে তারা ওই শক্তির স্বার্থ রক্ষা ও তাদের কর্মকাণ্ডকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণের চেষ্টা চালিয়েছে। বর্তমানে যখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অনুগত শাসকরা নগ্নভাবে জনস্বার্থ বিরোধী অবস্থান নিচ্ছে, তখন সিপিবি জনগণের ন্যায়সঙ্গত বিক্ষোভকে পুঁজি করে নিজেদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

সিপিবির সাংগঠনিক ভিত্তি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এদেশের বিপ্লবী কর্মীদের মাঝে দলটির প্রভাব ঐতিহাসিকভাবেই অত্যন্ত নগণ্য। তাদের মূল শক্তির উৎস শহরকেন্দ্রিক ক্ষুদেবুর্জোয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণি। মূলত সংস্কৃতিমনা, রাবীন্দ্রিক ঘরানার বুদ্ধিজীবী এবং তথাকথিত মানবতাবাদী প্রগতিশীল সংস্কারবাদী লোকজনের মাঝেই তাদের প্রধান বিচরণক্ষেত্র। এটি এমন এক গোষ্ঠী যারা ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের চেয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রেখে কিছু সংস্কারেই বেশি আগ্রহী।

শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রেও সিপিবির ভূমিকা বিপ্লবী ধারার বিপরীতে বুর্জোয়া ট্রেড ইউনিয়ন লাইনের অনুসারী। এই সংস্কারবাদী ধারার কারণে শ্রমিক সংগঠনগুলোর ভেতরে এক ধরনের ‘শ্রমিক অভিজাত’ শ্রেণির জন্ম হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিক পাণ্ডা বা মাস্তান শ্রেণির ওপর ভিত্তি করে তাদের সংগঠন গড়ে উঠছে, যা প্রকৃত সর্বহারা শ্রেণির সংগ্রামের পরিপন্থী।

গ্রামাঞ্চলেও দলটির ভূমিকা প্রশ্নাতীত নয়। অনেক এলাকায় দেখা যায়, যখন কোনো সশস্ত্র বিপ্লবী পার্টি শোষক ও অত্যাচারীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে, তখন সেই বিপ্লবী শক্তিকে মোকাবিলার অস্ত্র হিসেবে স্থানীয় গণবিরোধী শোষক ও শোষক গোষ্ঠী সিপিবিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। বিপ্লবী রাজনীতির বিরোধিতা করার এই সূত্রে শোষক শ্রেণির সাথে সিপিবির এক অদ্ভুত সখ্যতা তৈরি হয়েছে। যদিও এই চিত্রটি এখনও দেশব্যাপী খুব ব্যাপক নয়, তবে তাদের রাজনীতির এই গতিমুখ স্পষ্টতই বিপ্লবী পরিবর্তনের প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

সংস্কারবাদ ও বৈদেশিক নির্ভরতা: সিপিবির সাংগঠনিক শক্তির উৎস ও সীমাবদ্ধতা

বাংলাদেশের বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসে কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবির অবস্থান এক বৈপরীত্যে ঘেরা। কৌশলগতভাবে তারা বুর্জোয়া ট্রেড ইউনিয়ন ধারার অনুকরণে শ্রমিক ও ক্ষেতমজুরদের মাঝে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের ক্ষেতমজুর এবং শহরের শিল্পাঞ্চলগুলোতে তাদের গণসংগঠনগুলো দৃশ্যত বেশ এগিয়ে রয়েছে। কিন্তু এই আপাত বিস্তৃতি সত্ত্বেও রাজনৈতিকভাবে দলটির অবস্থান এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। তাদের এই সুবিধাবাদী ও সংস্কারবাদী রাজনৈতিক লাইন এবং আপসকামী অবস্থান প্রকৃত বিপ্লবী বামপন্থী ঘরানাগুলোর কাছে প্রবলভাবে ঘৃণিত ও সমালোচিত।

সিপিবির এই সাংগঠনিক উত্থানের পেছনে কেবল আদর্শিক লড়াই নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের বড় ভূমিকা ছিল। নব্বইয়ের দশকের পূর্ব পর্যন্ত রাশিয়ার (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) বিপুল অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা এবং আন্তর্জাতিক সুযোগ-সুবিধার ওপর ভর করে সিপিবি দেশের রাজনীতিতে একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পেরেছিল। মূলত সোভিয়েত স্বার্থ রক্ষা এবং তাদের রাজনৈতিক মডেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছিল। যদিও সোভিয়েত পতনের পর সেই বৈশ্বিক সমর্থনের উৎস সংকুচিত হয়েছে, তবুও সেই আমলের গড়ে তোলা বিশাল অর্থবিত্ত, সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধার অবশিষ্টাংশ এখনও দলটিকে টিকিয়ে রাখতে এবং একটি নির্দিষ্ট শক্তির বলয় ধরে রাখতে সহায়তা করছে।

তবে এই তথাকথিত শক্তি মূলত উপরিকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। বৈপ্লবিক আদর্শের অভাব এবং শাসকগোষ্ঠীর সাথে গোপন সমঝোতার রাজনীতির কারণে তারা জনমানুষের মৌলিক মুক্তির প্রশ্নে কোনো আমূল পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হয়েছে। সংস্কারবাদী সংগঠনের বিকাশ ঘটালেও জনগণের সত্যিকারের বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষাকে প্রতিনিধিত্ব করার রাজনৈতিক সক্ষমতা তারা হারিয়েছে। ফলে বর্তমানের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও তারা সেই পুরাতন সংশোধনবাদী জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে রাজনৈতিক বন্ধ্যাত্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

উপসংহার

এক কথায় বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবি হচ্ছে সুবিধাবাদী-সংশোধনবাদীদের এমন এক সংগঠন যারা সামন্তবাদ পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদ আর সম্প্রসারণবাদের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে নিজেদের পরজীবীতা আর মেরুদণ্ডহীনতাকে বাগাড়ম্বর দিয়ে আড়াল করে বুর্জোয়া, ক্ষুদে-বুর্জোয়াদের সব ধরনের পশ্চাৎপদতাগুলোতে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখে বিশ্বায়নবাদ ও নয়া-উপনিবেশবাদের উচ্ছিষ্ট ভোগ করে।

নানা ধরনের ভাববাদ ও অন্ধতায় ডুবে থাকা সিপিবি নিজেদের উপরে আস্থাহীন, জনগণের শক্তিতে অবিশ্বাসী, কর্মীদের সম্মুখে বুলিবাগিশ, ঊর্ধ্বতনদের কাছে ভূতলশায়ী, উভয়পক্ষের কাছেই স্বার্থপর এবং সে স্বার্থপরতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, রক্ষণশীলদের কাছে বিপ্লবী এবং বিপ্লবীদের কাছে রক্ষণশীল, নিজেদের সাইনবোর্ডধারী আদর্শের কাছে বিশ্বাসঘাতক, রাষ্ট্রশক্তির কাছে অনুগত, শ্রমিক-কৃষকের কাছে ভণ্ড-প্রতারক, সকল বিষয়েই মামুলি আবার মামুলিপনার ক্ষেত্রে অনন্য, মগজে নিশ্চল এবং সকল কর্মে প্রথাগত, বিশ্বঝঞ্ঝায় আতংকিত, ন্যায়যুদ্ধে পলায়নপর, বিশ্বইতিহাসে ভূমিকাহীন, এক কথায় চক্ষু কর্ণ দন্তহীন এক জন্মদণ্ডিত বৃদ্ধ।[২]

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. মনজুরুল হক, পূর্ব বাংলার সাত দশকের কমিউনিস্ট রাজনীতি, ঐতিহ্য, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১৮, পৃষ্ঠা ১১৭।
২. অনুপ সাদি, ৩১ মে ২০১৯, “সুবিধাবাদী সিপিবির কসাইতোষণ এবং ক্ষুদে-বুর্জোয়া নির্বোধদের সিপিবিতোষণ”, রোদ্দুরে.কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/politics/cpb-on-buthcher/

Leave a Comment

error: Content is protected !!