অনুপ সাদির ‘সমাজতন্ত্র’ বই রিভিউ: তরুণ প্রজন্মের আদর্শিক গাইড

সমাজতন্ত্র বইটি প্রখ্যাত লেখক ও চিন্তাবিদ অনুপ সাদি-র একটি অনন্য সৃষ্টি, যার নান্দনিক প্রচ্ছদটি অঙ্কন করেছেন প্রথিতযশা শিল্পী ধ্রুব এষ। ২০১৫ সালের অমর একুশে বইমেলায় (ফেব্রুয়ারি, ২০১৫) ঢাকার ঐতিহ্যবাহী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ভাষাপ্রকাশ থেকে অত্যন্ত গুরুত্ববহ এই গ্রন্থটি প্রথম আলোর মুখ দেখে। মাত্র ১৩৬ পৃষ্ঠার এই সংক্ষিপ্ত অথচ তথ্যবহুল বইটিতে সমাজতন্ত্রের মূল ভাবধারা ও তাত্ত্বিক বিষয়গুলো অত্যন্ত সহজ ভাষায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ২০০ টাকা।

সমাজতন্ত্র কেবল সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান কিংবা দর্শনের শুষ্ক অ্যাকাডেমিক আলোচনার বিষয় নয়; বরং এর তাত্ত্বিক আলোচনা ও বাস্তব প্রয়োগ আমাদের অনেকেরই প্রাত্যহিক জীবনযাত্রার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলা ভাষায় এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে সহজপাঠ্য এবং মানসম্মত বইয়ের চরম সংকট রয়েছে। মূলত বাংলাভাষী পাঠকদের মাঝে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা, এর ঐতিহাসিক পটভূমি এবং মৌলিক ধারণা অত্যন্ত সহজ ও প্রাঞ্জল ভাষায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই লেখক এই বইটি রচনা করেছেন।

আলোচ্য গ্রন্থে সমাজতন্ত্রের জটিল তাত্ত্বিক বিষয়গুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণের পাশাপাশি এর বাস্তব ও প্রায়োগিক দিকগুলো অত্যন্ত নিপুণভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এই প্রগতিশীল মতাদর্শের মূল ধারণা, উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের ধারার সাথে এর সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে বইটিতে বেশ কয়েকটি সংক্ষিপ্ত অথচ সারগর্ভ নিবন্ধ সংকলিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, বিশ্বজুড়ে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং এর পেছনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসও এখানে স্বল্প পরিসরে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ফলশ্রুতিতে, সমাজতন্ত্র বিষয়ে মৌলিক ও স্বচ্ছ জ্ঞানার্জনের জন্য যেকোনো পাঠক এই গ্রন্থটিকে অনায়াসে একটি নির্ভরযোগ্য গাইড হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, সাম্যবাদী ও মানবিক সমাজ বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখা তরুণ প্রজন্মের জন্য এই বইটি একটি আদর্শ পথপ্রদর্শক এবং নিত্যদিনের বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়ে উঠবে।

কয়েক হাজার বছর ধরে শোষিত, বঞ্চিত ও মেহনতি মানুষের ধারাবাহিক শ্রেণিসংগ্রামের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটবে বর্তমান সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে, যা মানবজাতিকে নিয়ে যাবে এক বৈষম্যহীন সাম্যবাদী সমাজে। সাম্যবাদী দার্শনিক ও তাত্ত্বিকদের মতে, সেই পরম কাঙ্ক্ষিত সমতার সমাজের প্রথম এবং প্রধান স্তরই হলো সমাজতন্ত্র। স্বাভাবিকভাবেই, এই গ্রন্থের সিংহভাগ আলোচনা ও তত্ত্বসমূহ মার্কসবাদী, লেনিনবাদী এবং মাওবাদী কালজয়ী লেখক, দার্শনিক ও সমাজ-বিশ্লেষকদের বিশ্বস্ত উৎস থেকে সংকলিত হয়েছে। এই বইটি পাঠ করার পর সাধারণ পাঠক এবং প্রগতিশীল সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের চিন্তাভাবনা ও আদর্শিক চেতনা যদি সামান্যতম শাণিত বা বিকশিত হয়, তবেই লেখকের দীর্ঘদিনের শ্রম ও প্রচেষ্টা সার্থক বলে বিবেচিত হবে।

যদিও সমাজতন্ত্রের সাথে সম্পর্কিত আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক বিষয় এই গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করার তীব্র প্রয়োজন ছিল, তবুও নানা সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব কারণে এই সংস্করণে তা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তবে এই তথ্যসমৃদ্ধ পুস্তকটি রচনার প্রতিটি ধাপে রেজাউল করিম, বিজন সম্মানিত এবং দোলন প্রভার সাথে গঠনমূলক আলোচনা লেখককে দারুণভাবে সমৃদ্ধ ও উপকৃত করেছে। আগামী দিনে বইটির আরও পরিমার্জিত ও বর্ধিত সংস্করণের জন্য যেকোনো পাঠক, গবেষক বা শুভাকাঙ্ক্ষীর মূল্যবান পরামর্শ ও গঠনমূলক সমালোচনা অত্যন্ত আনন্দের সাথে সাদরে গ্রহণ করা হবে।

আরো পড়ুন

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ৬ মে ২০১৭ তারিখে রোদ্দুরে.কমে মতামত আকারে প্রকাশ করা হয়। বর্তমানে লেখাটি কিছুটা সংস্কার করে ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশ করা হলো।

Leave a Comment