কিছু মানুষের বিদ্যার দৌড় দেখে সত্যি অবাক লাগে। সত্যি এরাও শিক্ষিত? এরাও স্কুল কলেজে পাশ করেছে?
এরা হয়তো বয়সে বা চেহারায় বা আকারে অনেকটা বড়, কিন্তু মানসিকতায় অতি নীচ ও ক্ষুদ্র। বেশ কিছু ব্যক্তি বিশেষের অহংবোধ এতটাই বেশি তারা আবার নিজেদের সংকীর্ণ মানসিকতায় গোটা জগৎটাকে মাপতে চায়। এরা ভীষণভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজস্ব জরাজীর্ণ চিন্তাভাবনা আরো পাঁচটা মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে।
আমার গাঁয়ের রঙ শ্যামলা। অথচ ফর্সা বা সাদা চামড়ার কিছু নিচু মন মানসিকতার লোকের কাছে আমার গায়ের রং কালো। তাদের চোখে বা তাদের ধারণা আমি বিশ্রী চেহারা নিয়ে জন্মেছি।
বড়োরা বলতো, “ইস্! গায়ের রংটা মায়ের মত না হয়ে একটু যদি বাবার মতো হতো।” আবার অনেকের আমার নাক নিয়েও সমস্যা। কারণ, আমার নাকটা কিছুটা আদিবাসীদের মতো। আমার চোখগুলো যদি বড় না হয়ে ছোট হতো তাহলে অনেকেই আদিবাসীই ধরে নিত।
আমার কিছু সুন্দরী বোনরা তো আমায় সরাসরি বলতো, আমার চেহারার জন্য আমার ভাল বিয়ে হবে না। যদিও এখনো আমার বিয়ে হয় নি। তখন আমার ভীষণ হাসি পেতো। অথচ যারা এসব বলতো তারা কেউ হয়তো বেঁটে, কেউ রোগা, কেউ আবার ভীষণরকম সুন্দরী, আবার কেউ আমারই মতো বা আমার থেকেও কুৎসিত। তবে আপসোস! সুন্দরীদের মধ্যে যারা এইসব বলতো তারা চেহারা ও সংসার সব মিলিয়ে খুব বাজে অবস্থাতেই আছে।
মানুষের সৌন্দর্য রং এ নয়, ধরা পড়ে তার কর্মে সাহসিকতায়, কথোপকথন ও স্বভাবে। যে মানুষ জীবিত লাশ হয়ে বেঁচে আছে, যার ভিতরটা জঞ্জালে পরিপূর্ণ সে কিভাবে সুন্দর হতে পারে?
এরকম মানুষ না নিজের সংসারটাকে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখে না নিজের বাচ্চাটাকে সুন্দর মানসিকতার বানাতে পারে।
সত্যি! এরাও মানুষ হয়ে জন্মেছে… এরাও পরিবার। আমার বরাবরই গন্ডারের চামড়া এসব সত্যি এখন আর গাঁয়ে লাগে না। তবে হ্যাঁ আমি খুব ভালোভাবে বুঝি মেলানিন কেন বডিতে থাকে। তাই হয়তো এসব নিয়ে মাথা ঘামাই না বা আয়নার সামনে ভান ধরে ভাবতে বসিনি।
এরপর আসি আসল কথায়, মেয়েদের একটু বয়স হলেই শুনতে হয়, “আর কেন? এবার তো বিয়ে করতে হবে। প্রস্তুতি শুরু করো।” ইত্যাদি ইত্যাদি। একটু বেশি মোটা হলে বলবে, “বেশি মোটা হলে চেহারা খারাপ হবে, কেউ পছন্দ করবে না বিয়েও হবে না।” — তার মানে কি নিজেকে কারোর বাই চয়েসে পরিণত করতেই হয়?
শরীর ভর্তি আমার রোগের জঞ্জালে ভরা আর আমি কি করছি? আমি বাহিরটা হাজারবার লেপছি মুছছি আর টিনএজের হারিয়ে যাওয়া গ্ল্যামার খুঁজছি আর ভাবছি আহা কত না ভালো আছি।
আমার কাছে জীবন মানে আত্মপরিচয়ের সাথে সাথে আরো কয়েকটা জীবন তৈরি করা।
তবে হ্যাঁ প্রথাগতভাবে না বা ডিগ্রির বোঝা চাপিয়ে নয়, আমরা শিক্ষা বলতে মানবিক বোধের শিক্ষাকেই বুঝি, টাকা পয়সার ওজনে যাঁরা মানুষকে মাপে তাদের পথ আর আমাদের পথ আলাদা। আমরা সমান অধিকার চেয়ে থাকি কিন্তু মানসিকতায় কখনো নিজেদেরকে পুরুষ জাতির সমকক্ষ ভাবতে পারি না। সামাজিকতার গন্ডিতে আবদ্ধ না থেকে আমরা চাইলেই ভাবতে পারি অন্যভাবে। আর কিছু হোক বা না হোক আমার ঘরের ছেলে বা মেয়েটা ছোট থেকে শক্ত মানসিকতা নিয়ে তৈরি হবে। বিকৃত চিন্তাভাবনা এবং অসুস্থ মানসিকতা নিয়ে বেড়ে উঠবে না। আর তা না হলে এরকমই চলবে। আর নিষিদ্ধতার আগল যত আলগা হবে ততই শৈশব আর যৌবনের মাঝে কৈশোরটা আবছা হতে থাকবে। তাই আমি মনে করি, সৌন্দর্যের সংজ্ঞাটা নতুন করে লেখার সময় এসেছে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটা মাপার আগে, আমাদের একবার নিজের ভেতরটাকে মাপা দরকার। কারণ আয়না কখনোই চরিত্র দেখায় না, সাহস দেখায় না, সততা দেখায় না।আমাদের সমাজে এখনো একটা অদ্ভুত প্রতিযোগিতা চলে—কে কতটা নিখুঁত দেখাতে পারছে, কে কতটা অন্যের চোখে গ্রহণযোগ্য হতে পারছে। অথচ এই গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠিগুলো তৈরি করেছে কারা? সেই একই সংকীর্ণ চিন্তার মানুষগুলো, যারা নিজেরাই নিজের ভেতরের অন্ধকারটা দেখতে চায় না।
একটা মানুষ যদি অন্যকে ছোট করে নিজের উচ্চতা প্রমাণ করতে চায়, তাহলে সে যতই ফর্সা হোক, যতই সুন্দর হোক—সে আসলে ভেতর থেকে ভীষণ রকম কুৎসিত। আর একটা মানুষ যদি নিজের মতো করেই বাঁচতে পারে, নিজের দুর্বলতাকে স্বীকার করে নিয়েও শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে—সেই মানুষটাই সত্যিকারের সুন্দর।
আমরা ভুলে যাই, এই পৃথিবীতে কেউই নিখুঁত হয়ে জন্মায় না। কারো গায়ের রং আলাদা, কারো চেহারা আলাদা, কারো পথচলা আলাদা। কিন্তু এই ভিন্নতাগুলোই তো আমাদের আলাদা করে তোলে, আমাদের নিজস্ব করে তোলে।
আর মেয়েদের ক্ষেত্রে তো এই বিচারটা আরও নির্মম। ছোটবেলা থেকেই যেন একটা অদৃশ্য তালিকা হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়—কেমন দেখতে হতে হবে, কেমন আচরণ করতে হবে, কখন বিয়ে করতে হবে, কাকে খুশি রাখতে হবে। কিন্তু কেউ কি কখনো বলে—নিজেকে খুশি রাখতে শিখো?
আমি মনে করি, একটা মেয়ে তখনই সত্যিকারের সুন্দর হয়ে ওঠে, যখন সে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে, নিজের জীবনের দায় নিজে নিতে পারে, আর অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
আমাদের দরকার এমন একটা প্রজন্ম, যারা কাউকে তার গায়ের রং দিয়ে বিচার করবে না, শরীরের গঠন দিয়ে অপমান করবে না, বরং মানুষের ভেতরের আলোটা দেখতে শিখবে। কারণ একটা সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে সুস্থ মানসিকতার মানুষ দিয়ে—বাইরের চাকচিক্য দিয়ে নয়।
আমরা যদি আমাদের পরের প্রজন্মকে শেখাতে পারি—মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে, সম্মান করতে, নিজের মতো করে বাঁচতে—তাহলেই হয়তো একদিন “সৌন্দর্য” শব্দটার মানে বদলে যাবে।
সেদিন হয়তো কেউ আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করবে না—“আমি কি সুন্দর?” বরং গর্ব করে বলতে পারবে—“আমি মানুষ, আর সেটাই আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়।”
আরো পড়ুন
- সৌন্দর্যের আসল সংজ্ঞা কি?
- তেলেনাপোতা আবিষ্কার
- যে শৈশব আর ফিরে আসে না
- চণ্ডালের চণ্ডিপাঠ
- ঋত্বিক ঘটক-এর চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে বাংলার আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট
- নিঃস্বার্থ আনন্দপথের অভিযাত্রী: অর্চনা দত্ত
- স্মৃতি জুড়ে সীমান্তের বেদনা, স্বরূপে মোড়ানো নিজস্ব ঐতিহ্য
- বটবৃক্ষের ছায়া: আমার জীবনে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আমার নানী
- আমার দাদী শাহেরা খাতুনের গ্রামীণ জীবন যাপনের এক ঝাঁক স্মৃতি
- কল্পনা ও শৌখিন কল্পনা সম্পর্কে স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের বিশ্লেষণ

লেখক অনাবিলা অনা ২০০১ সালের ১৬ জুলাই বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার বারহাট্টা থানার বড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার মাতা গীতাঞ্জলি সরকার এবং পিতা রঞ্জন কান্তি সরকার। শৈশব থেকেই সৃজনশীলতার প্রতি গভীর আগ্রহ তাকে সাহিত্য ও শিল্পচর্চার পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন ১৩ নং বড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে বারহাট্টা সিকেপি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে এসএসসি এবং নেত্রকোনা সরকারি কলেজে ২০১৯ সালে এইচএসসি এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ২০২৫ সালে স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করে বর্তমানে একই বিষয়ে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত। যুক্ত আছেন বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে। পঞ্চম শ্রেণি থেকেই তার লেখালেখি শুরু; কবিতার পাশাপাশি বই পর্যালোচনা ও ভাবনাধর্মী লেখা এখন তার প্রধান কার্যক্রম। ছবি আঁকা ও ‘Ana’Tivity’ ইউটিউব চ্যানেলে দ্বিমাত্রিক অ্যানিমেশন নির্মাণ তার সৃজনজগতের অংশ।