ড. অর্চনা দত্ত: নিঃস্বার্থ আনন্দপথের অভিযাত্রী এক উজ্জ্বল কর্মনায়িকা

অর্চনা দত্ত এই জগতের আনন্দপথে বিপুল প্রাণচাঞ্চল্য আর গভীর অনুরাগ নিয়ে দীর্ঘকাল ঋজু পায়ে হেঁটে চলেছেন। তাঁর এই নিরন্তর পথচলা কেবল নিজের ব্যক্তিগত তুষ্টির জন্য ছিল না; বরং শৈশব থেকেই তিনি চারপাশের সমাজ ও সাধারণ মানুষের দায়ভার নিজের কাঁধে তুলে নিতে শিখেছিলেন। এই বিশাল দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রতিকূলতার মুখেও তিনি কখনও শঙ্কাগ্রস্ত হননি বা লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি মনেপ্রাণে একটি শান্তিময় ও বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ করতে চান, যেখানে তাঁর বিন্দুমাত্র ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ নেই। মূলত নিজে সার্থকভাবে বেঁচে থাকা এবং অন্যের বেঁচে থাকার পথ সুগম করার মাঝেই তিনি জীবনের পরম সার্থকতা খুঁজে পেয়েছেন।

আমাদের কর্মস্থলে যে কজন অধ্যাপক আপন ব্যক্তিত্ব ও মহিমায় কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন, ড. অর্চনা দত্ত ছিলেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান। তাঁর সাহসিকতা নিয়ে নানা গল্প আমাদের কানে আসত—কীভাবে তিনি কুখ্যাত কোনো সন্ত্রাসীকে চোখের ইশারায় তটস্থ করে তুলেছিলেন, কিংবা কোনো দুষ্ট লোককে এমন তিরস্কার করেছিলেন যে সে আর কক্ষনো ত্রিসীমানায় ঘেঁষার সাহস করেনি। এমনকি তাঁর অদম্য প্রাণশক্তির গল্প হিসেবে প্রচলিত ছিল যে, প্রচণ্ড ভিড়ের চাপে ট্রেনে উঠতে না পেরে তিনি অবলীলায় জানালার পথেই ভেতরে ঢুকে পড়েছিলেন। এমন অসংখ্য বীরত্বগাথা আর চমকপ্রদ কাহিনী তাঁর সম্পর্কে ক্যাম্পাসের বাতাসে ঘুরে বেড়াত।

স্বভাবে তিনি ছিলেন নির্ভীক, সদালাপী অথচ মাপা কথা বলা এক মানুষ; তবে আদর্শের প্রশ্নে প্রয়োজনে তাঁকে আমরা দেখেছি অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন রূপে। বিশেষ করে অশান্ত ও সন্ত্রাসের জনপদে যাঁরা কর্মজীবন অতিবাহিত করেছেন, তাঁদের জন্য অর্চনা দত্তর মতো একজন অভিভাবক ও দৃঢ়চেতা গুরুজন অত্যন্ত অপরিহার্য ছিলেন।

তিনি দেশ-বিদেশের মানচিত্রে প্রচুর পরিভ্রমণ করেছেন। তাঁর এই ভ্রমণের নেপথ্যে যেমন সমাজ ও মানুষের জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখার এক তীব্র তাগিদ ছিল, তেমনি ছিল নিজের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর এক অবিচল সংকল্প। এমনকি গুরুভার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনকালেও নিজের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করা এবং লব্ধ জ্ঞান অন্যের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা তাঁর মধ্যে আমরা লক্ষ্য করেছি। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত কাজের জন্য কর্মক্ষেত্রকে প্রসারিত করা প্রয়োজন; তাই এই মহান শিক্ষককে আমরা কখনও কোনো সংকীর্ণ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকতে দেখিনি। জ্ঞানপিপাসু ও পুস্তকপ্রেমী এই মানুষটি তারুণ্যের শুরুতেই সমাজের সর্বোচ্চ উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন, যা তাঁর কর্মজীবন ও চিন্তার জগতকে করেছিল আরও সুদূরপ্রসারী ও বৈচিত্র্যময়।

কর্মক্ষেত্রে আমরা তাঁকে একজন প্রবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এবং উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী নারী হিসেবে দেখেছি। তাঁর সম্পর্কে যখনই কোনো ঘরোয়া আলোচনা উঠত, দেখা যেত প্রত্যেকেই পরম শ্রদ্ধায় তাঁর ইতিবাচক গুণাবলির প্রশংসা করছেন। তাঁর ব্যক্তিত্বের দীপ্তি আমাদের প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করত, যেখানে মিশে থাকত গভীর এক শ্রদ্ধাবোধ। আলোচনায় তিনি ছিলেন স্বতঃস্ফূর্ত, কথাবার্তায় মার্জিত আর চিন্তায় আগাগোড়া আধুনিক। কর্মে নিষ্ঠা, প্রতিজ্ঞায় দৃঢ়তা, লক্ষ্যে একাগ্রতা আর কঠোর পরিশ্রমে তাঁর যে অটুট আস্থা ছিল, তা সত্যই বিরল।

এমনকি কঠিন পরিস্থিতিতেও এই গতিশীল মননের মানুষটিকে আমরা কখনও অস্থিরতায় ভুগতে দেখিনি। বর্তমান যুগে যখন চারদিকে ক্ষুদ্র স্বার্থের সংঘাত আর অস্থিরতার জয়জয়কার, তখন অর্চনা দত্তর মতো স্থির ও প্রাজ্ঞ একজন মানুষ আমাদের দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে কাজে লেগে থেকে সফল হওয়ার অনন্য প্রেরণা জুগিয়েছেন।

আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, তাঁর এই সুবিশাল ও কর্মচঞ্চল জীবনের গতি কেবল কর্মস্থল থেকে অবসর গ্রহণের মাধ্যমে থমকে যাবে না। জগতের প্রতিটি আনন্দ-উৎসবে যিনি প্রতিদিনের নিরলস কর্মমুখরতায় শামিল হন, তাঁর অভিধানে আসলে ‘অবসর’ বলে কোনো শব্দ নেই। আমাদের এই সময়ের একজন পথপ্রদর্শক ও গুরুজন হিসেবে আমরা সর্বদা তাঁকে শ্রদ্ধাভরে অনুসরণ করি। তাঁর সুদীর্ঘ জীবন, অসামান্য কর্মযজ্ঞ এবং অম্লান স্মৃতি নিয়ে হয়তো আরও অনেকেই লিখবেন—যাঁরা আমার চেয়েও তাঁকে আরও গভীরভাবে জানার সুযোগ পেয়েছেন। তবে আমি এটুকু জানি যে, আমাদের সময়ের কর্মপ্রেরণায় তিনি ছিলেন এক উজ্জ্বল ও অকুতোভয় নায়িকা। তাঁর আদর্শের অমল আলো আমাদের মাঝে আরও সুদীর্ঘকাল ধরে ছড়িয়ে থাকুক এবং আমাদের পথ দেখাক।

আরো পড়ুন

আরও এমন নিভৃতচারী ও সাধারণ মানুষের জীবনগাথা পড়তে ভিজিট করুন আমাদের বিশেষ সংকলন: হৃদমাঝারে প্রাণভোমরা

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ২৩ জুলাই ২০২২ তারিখে রচিত এবং প্রফেসর ড. অর্চনা দত্ত সম্মাননা স্মারক গ্রন্থে প্রকাশিত। লেখাটি ৮ মে ২০২৬ তারিখে কিছুটা সংস্কার করা হয়েছে।

Leave a Comment