প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড, যা জনপ্রিয় ব্র্যান্ড নাম ‘সিটিসেল’ হিসেবে পরিচিত ছিল, বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম ও প্রাচীনতম মোবাইল অপারেটর। শুধু বাংলাদেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্কের অগ্রদূত হিসেবে শ্রীলঙ্কার ‘ইতিসালাত’ কিংবা পাকিস্তানের ‘পাকটেল’-এর সমসাময়িক সময়েই সিটিসেল তাদের কার্যক্রম শুরু করে। এটি দেশের একমাত্র মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিল যা তৎকালীন উন্নত সিডিএমএ (CDMA) এবং ইভিডিও (EV-DO) প্রযুক্তি ব্যবহার করত। তবে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হিমশিম খাওয়ায়, আগস্ট ২০১৬ নাগাদ এর গ্রাহক সংখ্যা ১ লাখ ৪২ হাজারে নেমে আসে।
আমার ব্যক্তিগত জীবনের এক বড় অংশ জুড়ে মিশে আছে সিটিসেল। ২০০৩ সালের ডিসেম্বরের সেই দিনটির কথা আজও মনে পড়ে, যখন ধূসর রঙের ছোট অ্যান্টেনাওয়ালা একটি সেট কিনে আমি সিটিসেলের গ্রাহক হয়েছিলাম। সেটি ছিল একটি পোস্টপেইড সংযোগ। তৎকালীন সময়ে যখন ‘গ্রামীণফোন’-এর মতো অপারেটরগুলোতে প্রতি মিনিটে কথা বলতে সাত টাকা লাগত, সেখানে সিটিসেলে আমি কথা বলতাম মাত্র সাড়ে তিন টাকায়। সস্তা কলরেটের কারণে তখন দেদারসে কথা হতো। আমার সাড়ে ছয় হাজার টাকা বেতনের প্রায় ৫০০-৭০০ টাকাই খরচ হতো ফোনে। এমনকি আমার কলিগরাও মাঝেমধ্যে আমার ফোন দিয়েই কথা সারতেন; তাদের সহজ যুক্তি ছিল—’তোর ফোনে তো রেট কম!’
মূলত বড় ভাইয়ের হাত ধরেই সিটিসেলের সাথে আমার পরিচয়। তাঁর প্রথম মোবাইলটি ছিল সিটিসেলের, যাতে কোনো রিম (RUIM) কার্ড ছিল না—অর্থাৎ ফোন ও নম্বর ছিল অবিচ্ছেদ্য। সে সময় সেই সেটটির দাম ছিল প্রায় ১০ হাজার টাকা। সময়ের সাথে সাথে সিটিসেলের কলরেট অভাবনীয়ভাবে কমতে শুরু করে। এক পর্যায়ে সিটিসেল থেকে সিটিসেলে কথা বলার খরচ মাত্র ২৯ পয়সা মিনিটে নেমে আসে। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে যাদের সাথে আমার নিয়মিত দীর্ঘ আলাপ হতো, তাদের প্রত্যেককে আমি ৯৯০ টাকার সাশ্রয়ী সেটগুলো উপহার দিতে শুরু করি। এভাবেই ধীরে ধীরে আমাদের পুরো পরিবারটি একটি ‘সিটিসেল পরিবারে’ পরিণত হয়।
তারুণ্যের সেই উত্তাল দিনগুলোতে সিটিসেল ছিল আমার পরম বন্ধু। বন্ধুত্ব, প্রেম আর একরাশ মুগ্ধতা—সবকিছুর সাক্ষী হয়ে ছিল এই অপারেটরটি। এই সিটিসেলে দীর্ঘ আলাপের মাধ্যমেই আমি খুঁজে পেয়েছিলাম আমার জীবনের সেই প্রিয় মানুষটিকে, যাকে আজ পরমাত্মীয় হিসেবে পাশে পাই। তাই সিটিসেলের বিদায় বেলাটি আমার কাছে কেবল একটি টেলিকম কোম্পানির বন্ধ হওয়া ছিল না, বরং তা ছিল আনন্দ-বেদনা আর হাজারো স্মৃতির এক অধ্যায়ের সমাপ্তি।
বরেণ্য কবি নির্মলেন্দু গুণ যেমন মোবাইলের মেসেজ বক্সে তার ‘মুঠোফোনের কাব্য’ রচনা করেছিলেন, আমার দিনগুলোও কাটত ঠিক সেভাবে। সেই সময় সিটিসেলের মেসেজ বক্সে আমি লিখেছিলাম প্রায় ৩০০টি প্রেমবার্তা। তখনকার সৃজনশীলতা ছিল তুঙ্গে; মাত্র দশ-বিশ মিনিটের ব্যবধানে চার-পাঁচ লাইনের একেকটি আস্ত কবিতা লিখে ফেলতাম। প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা থাকলেও সেই ছোট ছোট বার্তায় যে আবেগ মিশে ছিল, তা আজ এক অমূল্য স্মৃতি।
সিটিসেলের সেই দীর্ঘ যাত্রার যবনিকা ঘটে সেদিন, যখন বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে আঙুলের ছাপ নিয়ে সিম নিবন্ধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। সেই সময় বিভিন্ন কারণে আমরা পরিবারের প্রায় সবাই সিটিসেলের জন্য আর আঙুলের ছাপ দিইনি। ফলে ঐতিহ্যের সেই সংযোগটি বিচ্ছিন্ন হওয়া ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, আমাদের সবার অনীহা সত্ত্বেও পরিবারের একজন সদস্য তখনও সেই পুরোনো মায়ার টানে তাঁর সিটিসেল সংযোগটি টিকিয়ে রাখতে আঙুলের ছাপ দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করেছিলেন।
সবাই সিটিসেল ছেড়ে দিলেও, আমি শেষ পর্যন্ত এই মায়া ত্যাগ করতে পারিনি। গ্রামীণ ফোন আমি জীবনে একবছরও ব্যবহার করতে পারিনি। তৎকালীন সময়ের অন্য জনপ্রিয় অপারেটরগুলোর তুলনায় সিটিসেলের প্রতি আমার নির্ভরতা ছিল অবিচল। বিকল্প হিসেবে হয়তো অন্য সংযোগ ব্যবহার করতাম, কিন্তু ২০১৫ সালেও আমার পকেটে সগৌরবে শোভা পেত একটি সিটিসেল সেট। বিশেষ করে সিটিসেল অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে যে উন্নত ইন্টারনেট সেবা দিত, তার কার্যকারিতা আজও ভোলার মতো নয়। অনেকের কাছে এটি কেবল একটি টেলিকম কোম্পানি হলেও, আমার কাছে এটি ছিল এক যুগের বিশ্বস্ত সঙ্গী।
আরো পড়ুন
- স্মৃতিময় সিটিসেল: আমার তারুণ্য, প্রেম এবং একটি হারানো অধ্যায়ের স্মৃতিচারণ
- সৌন্দর্যের আসল সংজ্ঞা কি?
- তেলেনাপোতা আবিষ্কার
- যে শৈশব আর ফিরে আসে না
- চণ্ডালের চণ্ডিপাঠ
- ঋত্বিক ঘটক-এর চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে বাংলার আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট
- নিঃস্বার্থ আনন্দপথের অভিযাত্রী: অর্চনা দত্ত
- স্মৃতি জুড়ে সীমান্তের বেদনা, স্বরূপে মোড়ানো নিজস্ব ঐতিহ্য
- বটবৃক্ষের ছায়া: আমার জীবনে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ আমার নানী
- আমার দাদী শাহেরা খাতুনের গ্রামীণ জীবন যাপনের এক ঝাঁক স্মৃতি
- কল্পনা ও শৌখিন কল্পনা সম্পর্কে স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের বিশ্লেষণ
বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ২৬ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখে রচিত এবং প্রাণকাকলি ব্লগে প্রকাশিত। ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশের সময় কিছুটা উন্নত করা হয়েছে।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚