ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের মাটি ও মানুষের হৃদস্পন্দন হয়ে নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছিল শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা ‘অর্ঘ্য’। গফরগাঁও থিয়েটারের এই মহতী উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য এক গৌরবের বিষয়। ২০০৮-০৯ সালের প্রায় এক বছরে পত্রিকাটির সফল দশটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। এই সংখ্যাগুলোর প্রতিটি পাতায় চোখ বুলালে যে কোনো সাহিত্য অনুরাগী বা সংস্কৃতিমনা মানুষের মন এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও মুগ্ধতায় ভরে উঠবে।
একটি মফস্বল বা থানা শহর থেকে শিল্প-সাহিত্যের মশাল জ্বালিয়ে রাখা কতটা চ্যালেঞ্জিং, তা আমাদের সবারই জানা। সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, গফরগাঁওয়ের মতো একটি জনপদ থেকে একটি সাহিত্য পত্রিকা এক বছরে দশ-দশবার তার আগমনী বার্তা ঘোষণা করেছে—এটি ভাবলে সত্যিই অবাক হতে হয় এবং গর্বে বুক ভরে ওঠে। ‘অর্ঘ্য’ তার প্রতিটি সংখ্যার মাধ্যমেই পাঠকদের জন্য নিয়ে এসেছিল সতেজ ও প্রাণবন্ত সব কবিতা, মননশীল ও রুচিশীল প্রবন্ধ এবং জীবনঘনিষ্ঠ নতুন সব ছোটগল্প। শুধু সৃজনশীল সাহিত্যই নয়, পত্রিকাটির পাতায় নিয়মিত স্থান পেয়েছে অত্র এলাকার শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের সমসাময়িক খবরাখবর ও ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন, যা স্থানীয় সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিলে পরিণত হয়েছে।
‘অর্ঘ্য’ পত্রিকার এই নিরন্তর পথচলার নেপথ্যে যিনি আলোকবর্তিকা হয়ে কাজ করেছেন, তিনি হলেন বরেণ্য ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক শফিকুল কাদির। পত্রিকাটির পাতায় সম্পাদক হিসেবে তার নাম মুদ্রিত থাকলেও, বাস্তবে তিনি কেবল একজন সম্পাদক নন; বরং তিনি অর্ঘ্যের মূল প্রাণশক্তি। পত্রিকা প্রকাশের সব কাজ তিনি দুই হাতে একাই সামলেছেন। পত্রিকা প্রকাশের পর শুরু হয় আরেক কঠিন সংগ্রাম—তা হলো পাঠকের কাছে পত্রিকাটি পৌঁছে দেওয়া। মাত্র দশ টাকা মূল্যে এই অমূল্য রত্নটি দ্বারে দ্বারে গিয়ে বিক্রি করতে হয়। যদিও একজন বিদগ্ধ মানুষের জন্য এই কাজটি বেশ নিরানন্দ ও বিরক্তিকর হওয়ার কথা, কিন্তু পত্রিকার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং সামান্য কিছু আর্থিক সংস্থানের তাগিদে তিনি অত্যন্ত ধৈর্য ও নিষ্ঠার সাথে এই দায়িত্বটিও পালন করেছেন।
১৯৯৭ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় এই প্রবন্ধের লেখক এক রূঢ় ও হতাশাজনক সত্য প্রত্যক্ষ করেছেন। দেখা গেছে যে, আমাদের সমাজের শিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নীতিবর্জিত ও কুরুচিপূর্ণ কাজে অকাতরে অর্থ ব্যয় করতে দ্বিধাবোধ করে না। মাদকাসক্তি, লোক দেখানো অপচয়, দম্ভ প্রকাশ, কিংবা সাম্প্রদায়িক উস্কানি ও দুর্নীতির মতো গর্হিত কাজে তারা অজস্র টাকা ব্যয় করলেও, মাত্র দশ টাকা মূল্যের একটি পত্রিকা বা বই কিনতে চরম অনীহা প্রকাশ করে। এই মানসিকতা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত সমাজের আচরণগত মান, নৈতিক কর্তব্যবোধ এবং জানার আকাঙ্ক্ষা কতটা নিম্নগামী।
যতদিন না এই বিশাল জনগোষ্ঠী সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সুস্থ ধারার মননশীল বই-পুস্তক পাঠের মাধ্যমে নিজেদের চিন্তাশক্তিকে শাণিত ও উন্নত করবে, ততদিন এদেশের প্রকৃত ইতিবাচক পরিবর্তন কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে। এমন এক বৈরী ও প্রতিকূল সামাজিক পরিবেশে দাঁড়িয়েও একজন সম্পাদক যখন পত্রিকাটিকে দীর্ঘায়ু করার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যান এবং আজও নবীন-প্রবীণ লেখকদের কাছে লেখার আহ্বান জানান, তখন সেই জেদ ও নিষ্ঠা আমাদের দারুণভাবে আশান্বিত করে। এটি কেবল একটি উদ্যোগ নয়, বরং অন্ধকারের বিরুদ্ধে এক আলোর লড়াই।
২০০৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত ‘অর্ঘ্য’-এর বিশেষ সংখ্যাটি ছিল বিষয়বৈচিত্র্যে অনন্য। এই সংখ্যাটিতে গফরগাঁওয়ের সমৃদ্ধ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিবর্তন ও ঐতিহ্য নিয়ে অত্যন্ত চমৎকার ও গবেষণাধর্মী একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন মনিরুস সালেহীন। তার সেই লেখনীতে স্থানীয় শেকড়ের কথা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল। এছাড়াও সংখ্যাটির অন্যতম আকর্ষণ ছিল সোহেল মাজাহারের একটি হৃদয়স্পর্শী স্মৃতিচারণমূলক লেখা, যেখানে তিনি ‘একাভয়’-এর স্মৃতিগুলো পরম মমতায় পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথার পাশাপাশি এই সংখ্যাটিতে স্থান পেয়েছিল বেশ কিছু প্রাণবন্ত কবিতা, যা সাহিত্যপ্রেমীদের কাব্যতৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম হয়েছিল। সব মিলিয়ে ২০০৭ সালের সেই সংখ্যাটি ছিল গফরগাঁওয়ের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
২০০৮ সালের ১৫ জানুয়ারি ‘অর্ঘ্য’-এর যে সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়, তা ছিল বিশেষভাবে আবেগতাড়িত এবং গুরুত্বপূর্ণ। এই সংখ্যাটি উৎসর্গ করা হয়েছিল প্রখ্যাত নাট্যকার সেলিম আলদীনকে। তার প্রয়াণে শোক প্রকাশের পাশাপাশি গফরগাঁও থিয়েটারের সাথে তার যে নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক ছিল, তা এই সংখ্যাটি থেকে স্পষ্টভাবে জানা যায়। বিশেষ করে গফরগাঁও থিয়েটারের বিভিন্ন মঞ্চায়নে তার সশরীরে উপস্থিত থাকার স্মৃতিগুলো ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই সংখ্যাটিতে গফরগাঁওয়ের সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার অন্যতম পথিকৃৎ শেখ আব্দুস সাত্তারের জীবন ও কর্মের ওপর একটি দীর্ঘ ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ আলোচনা উপস্থাপন করেন গফরগাঁও সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের তৎকালীন প্রভাষক একেএম ফেরদৌস। এছাড়া কবিতা লিখেন দেওয়ান লালন আহমেদ, শরিফুল ইসলাম, রাশিদ আহমেদ, জেবা ফারাহ নুসরাত মুনমুন, মাহমুদ সালেহীন খান, সাইফুল হুদা নাজাত। গল্পের ডালিতে ছিল মুহাম্মদ ফারুক ও সিদ্দিক হোসেনের মননশীল ছোটগল্প।
এরপর, ২০০৮ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত হয় অর্ঘ্যের আরও একটি বিশেষ সংকলন। এই সংখ্যাটি ছিল প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথার এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। এতে প্রথিতযশা সাংবাদিক আবেদ খানসহ বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক সুলতান আহমেদ ও আতাউর রহমান মিন্টু ও তরিকুল ইসলাম মন্টুর লেখনীতে ফুটে উঠেছিল ভাষা ও সংস্কৃতির নানা দিক। মকবুল হোসেন খান মকবুল হোসেন খান, অধ্যাপক শফিকুল কাদির এবং মো. শফিকুল ইসলাম আতার স্মৃতিচারণমূলক লেখাগুলো পাঠককে নিয়ে গিয়েছিল শেকড়ের সন্ধানে। এছাড়া সারোয়ার জাহান, অনুপ সাদি, নাজমূল করিম মানিক, মোহাম্মদ ফারুক, নিপা জাহান, সোহেল মাজাহার, সাইফুল হুদা নাজাত, হাসান জামিল, সৈয়দ হুমায়ুন ও সুলভের মতো কবিদের শব্দশৈলী এই সংখ্যাটিকে গফরগাঁওয়ের প্রকাশনা ইতিহাসে একটি অবিস্মরণীয় মাইলফলক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
২০০৮ সালের ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ‘অর্ঘ্য’ একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে। এই সংখ্যাটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল বিশিষ্ট গবেষক ও প্রাবন্ধিক মোস্তফা নূরউল ইসলামের প্রবন্ধ ‘ছাব্বিশেতে জয়ধ্বনি’, যেখানে তিনি স্বাধীনতার চেতনাকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। স্থানীয় ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের ত্যাগের মহিমা তুলে ধরতে অধ্যাপক নূর আবেদীন লিখেছিলেন গফরগাঁওয়ের সূর্যসন্তান শহীদ বেলালকে নিয়ে, যা পাঠকদের সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতিতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এছাড়া সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়ে সুলতান আহমেদের মননশীল প্রবন্ধ সংখ্যাটিকে দিয়েছিল আলাদা এক মাত্রা। প্রবীণদের পাশাপাশি বেশ কিছু প্রতিভাবান তরুণ কবির দ্রোহ ও দেশপ্রেমের কবিতায় সাজানো এই সংখ্যাটি স্বাধীনতার গৌরবে ভাস্বর হয়ে উঠেছিল।
২০০৮ সালের এপ্রিল মাসে বাংলা নববর্ষ ১৪১৫ উপলক্ষে ‘অর্ঘ্য’ একটি বিশেষ বর্ষবরণ সংখ্যা প্রকাশ করে। এই সংখ্যাটির একটি অনন্য সংযোজন ছিল প্রখ্যাত কবি, গীতিকার ও প্রাবন্ধিক হাসান ফকরীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ ‘বাংলাদেশের সামাজিক বিবর্তনের ধারা’। উল্লেখ্য যে, এই গবেষণাধর্মী প্রবন্ধটি ২০০৮ সালের ২১ মার্চ গফরগাঁও সরকারি কলেজে আয়োজিত একটি উচ্চতর সেমিনারে পঠিত হয়েছিল। সেই সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক, মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এবং অনুপ সাদিসহ অনেক প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানটিকে প্রাণবন্ত করেছিলেন।
নববর্ষের এই সংখ্যাটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল নুরুদ্দিন খান হাসিব, সুলতান আহমেদ এবং প্রবীণ সাহিত্যিক আব্দুস সাত্তারের চিন্তাশীল প্রবন্ধসমূহ। এই সংখ্যার মাধ্যমেই পাঠক মহলে পরিচিতি পায় কবি ও প্রাবন্ধিক অনুপ সাদির প্রথম ছোটগল্প ‘একদিন মৃত্যুর মিছিলে’, যা তার কথাসাহিত্যে পদচারণার এক স্মরণীয় মুহূর্ত। এছাড়া একঝাঁক তরুণ কবির সতেজ ও প্রাণবন্ত কবিতার সমাহার সংখ্যাটিকে সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে আরও আবেদনময় করে তুলেছিল।
২০০৮ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয় ‘অর্ঘ্য’-এর পরবর্তী সংখ্যাটি, যা ছিল প্রবন্ধ সাহিত্যের এক অনন্য সংকলন। এই সংখ্যাটিতে পাঁচজন অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত প্রাবন্ধিকের পাঁচটি উচ্চমানসম্পন্ন ও চিন্তাশীল প্রবন্ধ স্থান পেয়েছিল। প্রাবন্ধিক ফাইজুস সালেহীন তার ‘অন্তরমম বিকশিত করো অন্তরতর হে’ প্রবন্ধে এক গভীর জীবনদর্শনের অবতারণা করেন। বিশ্বকবির সাহিত্যকর্মের ওপর আলোকপাত করে অনুপ সাদি রচনা করেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছিন্নপত্র’ গ্রন্থের ওপর একটি গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ—’ছিন্নপত্রের রূপসী বাংলা’। এছাড়া মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামের সুচিন্তিত প্রবন্ধ ‘বুদ্ধদেব বসুর নজরুল বিচার’ সংখ্যাটিকে আরও মননশীল ও সমৃদ্ধ করে তুলেছিল। প্রতিটি প্রবন্ধই ছিল বিষয়বস্তুর গভীরতায় অনন্য এবং পাঠকদের জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক খোরাক জোগাতে সক্ষম।
জুলাই ২০০৮ সংখ্যাটি ছিল ‘অর্ঘ্য’র ইতিহাসের অন্যতম সমৃদ্ধ একটি সংকলন। জুনের বিরতি কাটিয়ে জুলাইয়ে যখন পত্রিকাটি পুনরায় প্রকাশিত হয়, তখন এতে যুক্ত হয়েছিল নতুন নতুন চমক। এই সংখ্যার প্রধান আকর্ষণ ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা অধ্যাপক ও বিশিষ্ট চিন্তাবিদ আবুল কাশেম ফজলুল হকের অত্যন্ত গবেষণাধর্মী ও চমৎকার একটি প্রবন্ধ—’নজরুল, নবযুগ ও শেরে বাংলা’। এটিই ছিল এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটির প্রথম প্রকাশ, যা পত্রিকাটির মর্যাদাকে এক অন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
প্রবন্ধের তালিকায় আরও যুক্ত হয়েছিল জ্যোতিষ চন্দ্র দাস এবং মোহাম্মদ ফারুকের সুচিন্তিত দুটি প্রবন্ধ। অন্যদিকে কথাসাহিত্যের অংশে কবি ও প্রাবন্ধিক অনুপ সাদির গল্প—’আগুন ও ঘুম‘ প্রকাশিত হয়। উল্লেখ্য যে, এই গল্পগুলোর সাহিত্যিক গুরুত্ব ও চিত্রনাট্যধর্মী আবেদনের কারণে বর্তমানে এগুলোকে চলচ্চিত্রে রূপ দেওয়ার একটি মহতী কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়াও নার্গীস সুলতানা সোমার জীবনঘনিষ্ঠ গল্প ‘হলুদ বরণ’ এবং রনজিৎ মল্লিকের কাব্যিক ছোঁয়ায় ‘কোন এক নবীনাকে’ কবিতাটি এই সংখ্যাটিকে পূর্ণতা দিয়েছিল।
১৪ আগস্ট ২০০৮ সালে ‘অর্ঘ্য’ এক অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করে। কেবল লেখালেখিতে সীমাবদ্ধ না থেকে, সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে পত্রিকাটি এসএসসি ও সমমানের মেধাবী পরীক্ষার্থীদের জন্য একটি জাঁকজমকপূর্ণ সংবর্ধনা ও সম্মাননা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই মহতী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানটিকে আলোকিত করেছিলেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর তৎকালীন চেয়ারম্যান ও বরেণ্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ।
এই বিশেষ আয়োজনকে স্মরণীয় করে রাখতে অর্ঘ্যের সংশ্লিষ্ট সংখ্যাটিতে প্রকাশিত হয় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতি শিক্ষার্থীদের ছবিসহ বিস্তারিত পরিচিতি, যা স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য ছিল এক বিশাল অনুপ্রেরণা। এছাড়া শিক্ষার্থীদের দিকনির্দেশনা দিতে শিক্ষা বিষয়ক দুটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও দিকনির্দেশনামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধ দুটি রচনা করেছিলেন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক ফাইজুস সালেহীন এবং অনুপ সাদি। সৃজনশীল চর্চার পাশাপাশি শিক্ষা ও মেধার মূল্যায়নে অর্ঘ্যের এই বলিষ্ঠ পদক্ষেপ সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছিল।
অক্টোবর ২০০৮ সালে প্রকাশিত ‘অর্ঘ্য’-এর সংখ্যাটি ছিল বিষয়বৈচিত্র্যে এক কথায় অতুলনীয়। এই সংখ্যাটির অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ছিল প্রখ্যাত সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক শাহীন রেজা নুরের গভীর জীবনদর্শন সমৃদ্ধ প্রবন্ধ ‘প্রভু আমাদের মানুষ দাও’। ভ্রমণের রোমাঞ্চ আর লোকজ ঐতিহ্যের মিশেলে সাভার অঞ্চলের একটি অনবদ্য ভ্রমণকাহিনী ‘ঠাকুরমার ঝুলির খোঁজে’ লিখেছিলেন সৈয়দ শওকত আলি, যা পাঠকদের এক ভিন্ন আমেজ দিয়েছিল।
এই সংখ্যাটির একটি ঐতিহাসিক দিক ছিল প্রথিতযশা কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের একটি অপ্রকাশিত ও একান্ত সাক্ষাৎকার। তরুণ কবি ও প্রাবন্ধিক অনুপ সাদির নেওয়া এই সাক্ষাৎকারটি সেলিনা হোসেনের সাহিত্যিক ভাবনার অনেক অজানা দিক উন্মোচিত করেছে। এছাড়াও, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীর একটি হৃদয়স্পর্শী স্মৃতিচারণমূলক লেখা এই সংখ্যাটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়। যেখানে তিনি নাট্যজন সেলিম আলদীন, আবদুল্লাহ আল মামুন, জিয়া হায়দার এবং কিংবদন্তি গীতিকার মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানকে নিয়ে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও তাদের কর্মময় জীবনের ওপর আলোকপাত করেছেন। গুণী ব্যক্তিদের এমন সমাগম সংখ্যাটিকে একটি সংগ্রহযোগ্য দলিলে পরিণত করেছিল। অর্ঘ্যের সর্বশেষ সংখ্যাটি ছিল বিজয় দিবস সংখ্যা।
অর্ঘ্য’-এর সেই ঐতিহাসিক দশটি সংখ্যার পাতায় পাতায় মিশে আছে একঝাঁক লেখক, সাহিত্যিক ও নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিকদের অক্লান্ত সংগ্রামের পদছাপ। পত্রিকাটির প্রতিটি সংখ্যা কেবল কালো হরফে ছাপা কিছু শব্দ নয়, বরং এতে উৎকীর্ণ হয়ে আছে অগণিত মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, হৃদয়ের গভীর অনুপ্রেরণা আর বিন্দু বিন্দু ঘামের ছবি। এই প্রকাশনাটি পরম মমতায় তুলে ধরেছে আমাদের জনপদের মেহনতি মানুষের জীবনগাথা, তাদের শ্রম, মেধা ও আত্মত্যাগের অজানা সব কাহিনী। শুধু তাই নয়, স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের নাম—সবই অত্যন্ত যত্নে ধারণ করেছে ‘অর্ঘ্য’; যা মূলত একটি নির্দিষ্ট সময়কালকে ইতিহাসের ফ্রেমে বন্দী করার এক সফল প্রচেষ্টা। মহাকালের স্রোতে সময় বয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু সেই সময়ের অমলিন চিহ্নগুলো টিকে থাকে সাহিত্যের এমনসব অমূল্য স্মারকে। ‘অর্ঘ্য’ আমাদের এই স্বল্প সময়ের এক অনন্য ও চমৎকার স্মারক হয়ে বেঁচে থাকুক; আমরা এই সাহসী যাত্রার দীর্ঘায়ু ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করি।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটির রচনাকাল ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৯, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ। লেখাটি ছোটকাগজ অর্ঘ্যের বর্ষপূর্তি ও শহীদ দিবস সংখ্যা ফেব্রুয়ারি ২০০৯-এ প্রকাশিত হয়েছিল। লেখাটি ১ মে ২০২৬ তারিখে কিছুটা সংস্কার করে ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশ করা হলো।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚