বাংলা সাহিত্যের সহজিয়া ধারার একজন অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল মরমী কবি ও বহুুমাত্রিক লেখক এনামূল হক পলাশ। সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি একাধারে প্রাবন্ধিক, শিশু সাহিত্যিক, প্রগতিশীল সংগঠক এবং বামপন্থী বিপ্লবী রাজনৈতিক ধারার একজন সক্রিয় কর্মী।
কবি এনামূল হক পলাশের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:
- জন্ম ও পৈত্রিক নিবাস: কবি ১৯৭৭ সালের ২৬ জুন নেত্রকোণা জেলার বারহাট্টা উপজেলার বাদেচিরাম গ্রামে তাঁর মাতুলালয়ে (মায়ের বাড়ি) জন্মগ্রহণ করেন। তবে তাঁর পৈত্রিক নিবাস একই উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বামনগাঁও গ্রামে।
- পারিবারিক পরিচয়: তাঁর পিতা মরহুম এমদাদুল হক এবং মাতা নুরুন্নাহার হক।
- সম্পাদনা ও সংগঠন: তিনি মেধা ও মননের বিকাশে নিয়মিত সম্পাদনা করছেন সাহিত্য পত্রিকা ‘অন্তরাশ্রম’। একইসঙ্গে তিনি পরিচালনা করছেন সমনামের একটি ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক সংগঠন।
- জীবনের বড় স্বপ্ন: বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি কাজ করছেন। তাঁর মূল স্বপ্ন, ‘অন্তরাশ্রম’ একদিন একটি আন্তর্জাতিক আনন্দশিক্ষালয় ও শান্তির নীড় হিসেবে বিশ্বমঞ্চে আত্মপ্রকাশ করবে।
শিক্ষাজীবন ও কৃতিত্ব:
কবি এনামূল হক পলাশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন কেটেছে নিজ উপজেলার নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে তিনি প্রতিটি স্তরেই বৃত্তি লাভ করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- প্রাথমিক শিক্ষা: তিনি নেত্রকোণার বারহাট্টার গোপালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হন। এর এক বছর পর বারহাট্টা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এই স্কুল থেকেই ১৯৮৮ সালে কৃতিত্বের সাথে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেয়ে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।
- মাধ্যমিক শিক্ষা: এরপর তিনি বারহাট্টা সি.কে.পি. পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক স্তরে পড়াশোনা শুরু করেন। অষ্টম শ্রেণিতে তিনি সাধারণ বৃত্তি লাভ করেন।
- বিশেষ বৃত্তি ও এসএসসি: পরের বছরই তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘ড. ইন্নাছ আলী বৃত্তি’ লাভ করেন। অবশেষে ১৯৯৪ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার সফল সমাপ্তি ঘটান।
উচ্চ মাধ্যমিক ও সাহিত্যচর্চার সূচনা
শিক্ষা জীবনের পাশাপাশি এই সময়েই কবি এনামূল হক পলাশের সাহিত্যচর্চা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে শুরু করে। ১৯৯৫ সালে ‘উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি’ থেকে প্রকাশিত ‘মাটির সুবাস’ নামক একটি পত্রিকায় তাঁর একটি কবিতা প্রকাশিত হয়। এছাড়া তৎকালীন জনপ্রিয় সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিন’ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যাগুলোতে তাঁর লেখা নিয়মিত ছাপা হতো।
তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমানে কেবি কলেজ) থেকে উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন এবং ১৯৯৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রথম বিভাগে এইচএসসি (HSC) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
উচ্চশিক্ষা ও স্নাতক (সম্মান) জীবন
এইচএসসি পাসের পর ১৯৯৭ সালে তিনি ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সরকারি তিতুমীর কলেজে উদ্ভিদবিজ্ঞান (Botany) বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হন। তবে ১৯৯৮ সালে পারিবারিক কারণে তিনি নিজ জেলা নেত্রকোণায় ফিরে আসেন এবং নেত্রকোণা সরকারি কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজ থেকেই ২০০২ সালে তিনি উদ্ভিদবিজ্ঞানে দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরবর্তীতে তিনি কিশোরগঞ্জের বিখ্যাত গুরুদয়াল সরকারি কলেজে স্নাতকোত্তর স্তরে ভর্তি হন এবং ২০০৪ সালে উদ্ভিদবিদ্যায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে মাস্টার্স পরীক্ষায় সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হন।
রাজনৈতিক জীবন ও সাংবাদিকতা
১৯৯৮ সালে এনামূল হক পলাশের জীবনে একটি বড় পরিবর্তন আসে। এই বছর তিনি একটি প্রগতিশীল বাম সংগঠনের সাথে যুক্ত হন এবং সক্রিয়ভাবে প্রগতিশীল বিপ্লবী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি গণমাধ্যমের সাথেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৫ বছর তিনি বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
কর্মজীবন ও চাকুরিতে যোগদান
২০০৩ সালে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে বিদায় নেন এবং কর্মজীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করেন। এই বছর তিনি সরকারি ভূমি কর্মকর্তা (Land Officer) হিসেবে চাকুরিতে যোগদান করেন এবং বর্তমানে এই পেশাতেই নিয়োজিত আছেন।
পারিবারিক জীবন
২০০৫ সালে পারিবারিক সম্মতিতে কবি এনামূল হক পলাশ নেত্রকোনা শহরের বাসিন্দা মাহবুবা এনাম সোমা-র সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রী পেশাগত জীবনে একজন নিবেদিতপ্রাণ প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক। আদর্শিক মেলবন্ধনের কারণে সোমা তাঁর স্বামীর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ভাবনার অন্যতম সহযোগী এবং বর্তমানে তাঁদের প্রিয় সাহিত্য পত্রিকা ‘অন্তরাশ্রম’-এর যোগ্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ
কবির প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ও গবেষণামূলক বইগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
- ২০০৯: প্রথম কাব্যগ্রন্থ “অস্তিত্বের জন্য যুদ্ধ চাই”।
- ২০১৫: দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ “জীবন এক মায়াবী ভ্রমণ”।
- ২০১৬: তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ “অন্ধ সময়ের ডানা”।
- ২০১৭: চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ “অন্তরাশ্রম” এবং পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ “মেঘের সন্ন্যাস”।
- ২০১৮: ষষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ “পাপের শহরে”।
- ২০১৯: সপ্তম কাব্যগ্রন্থ “জল ও হিজল”।
- ২০২০: প্রথম শিশুতোষ বই “বইয়ের পাতায় ফুলঝুরি” এবং পেশাগত অভিজ্ঞতা থেকে লেখা গবেষণাধর্মী বই “ভূমি ব্যবস্থাপনার সরল পাঠ”।
সাম্প্রতিক গ্রন্থসমূহ ও অনুবাদ সাহিত্য
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁর বেশ কিছু মৌলিক কাব্যগ্রন্থ, শিশুতোষ বই এবং বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে:
- ২০২১: অষ্টম কাব্যগ্রন্থ “তামাশা বাতাসে পৃথিবী”, শিশুতোষ বই “কলমি লতার ফুল” এবং প্রাচীন আরবি সাহিত্যের অনুবাদ গ্রন্থ “ধর্মবিশ্বাস আখ্যানের মত সুন্দর”।
- ২০২২: নবম কাব্যগ্রন্থ “অখণ্ড জীবনের পাঠ”, দশম কাব্যগ্রন্থ “লাবণ্য দাশ এন্ড কোং”, শিশুতোষ বই “মগড়া নদীর বাঁকে” ও “পাখপাখালির ছড়া” (বাবুই প্রকাশনী) এবং আরবের বিখ্যাত কবি ইমরুল কায়েসের কবিতার অনুবাদ “মু-আল্লাক্বা”। একই বছর তাঁর নির্বাচিত কবিতার ইংরেজি অনুবাদ গ্রন্থ “CROSSING FORTY NIGHTS” প্রকাশিত হয়।
- ২০২৪: একাদশ কাব্যগ্রন্থ “সুফি কবিতা”, শিশুতোষ বই “পাখপাখালির কবিতা” এবং ফিলিস্তিনের জাতীয় কবি মাহমুদ দারবিশের কবিতার অনুবাদ “লিখে রাখো আমি একজন আরব”। এছাড়া একই বছর প্রকাশিত হয় তাঁর আরেকটি অনুবাদ গ্রন্থ “আরব ভূখণ্ডের কবিতা”।
গীতিকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ
২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি গীতিকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তাঁর লেখা “গণতন্ত্রের গান” এবং “রাত্রির গান” শ্রোতামহলে বেশ সাড়া ফেলে। এই দুটি গানের পাশাপাশি তাঁর লেখা “বাউলজন্মের গান” নামক আরেকটি গান দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবদান
- ভূমি জাদুঘর প্রতিষ্ঠা (২০২১): নেত্রকোণায় একটি ‘ভূমি জাদুঘর’ (ভূমি ও কৃষি উপকরণ প্রদর্শনশালা) প্রতিষ্ঠার মূল ধারণাপত্র (Concept Paper) তৈরি করেন এনামূল হক পলাশ। পরবর্তীতে তাঁর এই অনন্য ধারণার ওপর ভিত্তি করে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নেত্রকোণার মেছুয়া বাজার সংলগ্ন পুরাতন সদর কাচারিকে ‘ভূমি জাদুঘর’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
- বাউল রশিদ উদ্দিনের ভাস্কর্য (২০২৩): নিজ অর্থায়নে তিনি বিখ্যাত ভাস্কর অখিল পালকে দিয়ে বাংলার মালজোড়া গানের স্রষ্টা বাউল কবি রশিদ উদ্দিনের একটি ভাস্কর্য নির্মাণ করান। তবে উপযুক্ত স্থানের অভাবে ভাস্কর্যটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
🏆 কবি এনামূল হক পলাশের প্রাপ্ত পুরস্কার ও সম্মাননা:
বাংলা সাহিত্যে নিরলস ও অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ কবি এনামূল হক পলাশ বিভিন্ন সময়ে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বেশ কিছু মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন:
- অমর একুশে স্মৃতি পদক (২০১৬): শিক্ষা ও সাহিত্যের প্রসারে কাজ করায় বাংলাদেশ শিক্ষা পর্যবেক্ষক সোসাইটি কর্তৃক তিনি এই সম্মাননা লাভ করেন।
- লেখা প্রকাশ সাহিত্য সম্মাননা (২০১৬): সৃজনশীল সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি হিসেবে ‘লেখা প্রকাশ’ প্রকাশনী তাঁকে এই সম্মাননা প্রদান করে।
- চর্চা শুভেচ্ছা সম্মাননা (২০১৭): নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী ‘চর্চা সাহিত্য আড্ডা’-র গৌরবময় শততম আসরে তাঁকে এই বিশেষ শুভেচ্ছা সম্মাননা দেওয়া হয়।
- মেঠোসুর গুণিজন সম্মাননা (২০২৪): লোকসংস্কৃতি ও সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০২৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি তিনি এই পদক অর্জন করেন।
- কংস থিয়েটার সম্মাননা (২০২৪): একই বছর সমাজ ও সংস্কৃতি অঙ্গনে বিশেষ ভূমিকার জন্য ৪ মার্চ তিনি এই সম্মাননায় ভূষিত হন।
সাম্প্রতিক গ্রন্থসমূহ, অনুবাদ ও প্রবন্ধ (২০২৫ – ২০২৬)
গত দুই বছরে কবি ও প্রাবন্ধিক এনামূল হক পলাশের বেশ কিছু মননশীল প্রবন্ধের বই এবং বিশ্বসাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে:
- ২০২৫ (অনুবাদ সাহিত্য): এই বছর তাঁর তিনটি বিখ্যাত অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়; বিশ্বখ্যাত তুর্কি কবির সৃষ্টির অনুবাদ “নির্বাচিত কবিতা: নাজিম হিকমত”, প্রান্তিক জীবনগাথা নিয়ে “আদিবাসী নারীদের কবিতা” এবং ফিলিস্তিনি কবির কালজয়ী ডায়েরির রূপান্তর “নদী মরে যায় পিপাসায় (মাহমুদ দারবিশের ডায়েরি)”।
- ২০২৫ (প্রবন্ধ গ্রন্থ): সমসাময়িক রাজনীতি ও সমাজভাবনা নিয়ে প্রকাশিত হয় তাঁর বৈপ্লবিক প্রবন্ধের বই “জনগণের ঐক্য ও সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা”।
- ২০২৬ (অনুবাদ সাহিত্য): বিশ্বখ্যাত কথাসাহিত্যিক পাওলো কোয়েলহোর জনপ্রিয় রচনার অনুবাদ গ্রন্থ “স্টোরিজ ফর প্যারেন্টস, চিল্ড্রেন অ্যান্ড গ্র্যান্ডচিল্ড্রেন”-এর প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়।
- ২০২৬ (প্রবন্ধ গ্রন্থ): এই বছর চিন্তাশীল পাঠকদের মাঝে আলোড়ন তোলে তাঁর দুটি চমৎকার প্রবন্ধের বই—“সাংস্কৃতিক কেবলার সন্ধানে” এবং “বাংলাদেশের জনগণের রাজনীতি”।
- সর্বশেষ প্রকাশনা: কবির সদ্য প্রকাশিত ও বহুল আলোচিত গবেষণাধর্মী বইটির নাম “সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকে ইসলামের আলো”।
বিশ্ব কবিতার আবাসস্থল ‘কবিতাকুঞ্জ’
২০১৬ সালে প্রখ্যাত কবি নির্মলেন্দু গুণ নেত্রকোণার মালনী এলাকায় বিশ্ব কবিতার আবাসস্থল বা ‘হোম অব ওয়ার্ল্ড পয়েট্রি’ খ্যাত “কবিতাকুঞ্জ” প্রতিষ্ঠা করেন। কবি এনামূল হক পলাশ এর সূচনালগ্ন থেকেই অবকাঠামো গঠনের কাজে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। তাঁর এই নিষ্ঠার কারণে কবি নির্মলেন্দু গুণ কর্তৃক তিনি এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হন এবং বর্তমানেও এই দায়িত্ব পালন করছেন।
‘অন্তরাশ্রম’ প্রতিষ্ঠা ও মানবিক কার্যক্রম
২০১৭ সালে নেত্রকোণা শহরের মালনী এলাকায় কবি, লেখক ও সংস্কৃতি কর্মীদের মেলবন্ধন হিসেবে তিনি গড়ে তোলেন “অন্তরাশ্রম” নামক একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি নিজেই এর প্রতিষ্ঠাতা ও আচার্য। শুরুর দিকে এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম মূলত বিভিন্ন সাহিত্য আড্ডা, অসহায় মানুষকে আর্থিক সহায়তা এবং শীতার্তদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণের মতো সামাজিক ও মানবিক কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
‘স্কুল অব মোরাল সায়েন্স’ ও আদর্শিক দর্শন
মানুষের মধ্যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে কবি এনামূল হক পলাশ ‘স্কুল অব মোরাল সায়েন্স’ নামের একটি ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠানের রূপরেখা কল্পনা করেন, যা পরবর্তীতে নেত্রকোণায় ‘অন্তরাশ্রম’ নামেই পরিচিতি লাভ করে।
- বিশ্ববীক্ষা ও আদর্শ: অন্তরাশ্রম এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা আন্তর্জাতিকতাবাদকে ধারণ করে এবং সাম্রাজ্যবাদ ও সামন্তবাদ বিরোধী প্রগতিশীল অবস্থানকে সবসময় শ্রদ্ধার চোখে দেখে।
সাহিত্য পত্রিকা ‘অন্তরাশ্রম’ প্রকাশের ইতিহাস
এই সমাজভাবনা ও সাহিত্যিক আদর্শকে ছড়িয়ে দিতে প্রতিষ্ঠানটি থেকে ‘অন্তরাশ্রম’ নামে একটি সাহিত্যের ছোট কাগজ বা লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ পর্যন্ত প্রকাশিত এর গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যাগুলো হলো:
- প্রথম সংখ্যা: আগস্ট ২০১৮ (ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ)
- দ্বিতীয় সংখ্যা: অক্টোবর ২০১৯ (আশ্বিন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ)
- তৃতীয় সংখ্যা: ফেব্রুয়ারি ২০২০ (ফাল্গুন ১৪২৬ বঙ্গাব্দ)
- চতুর্থ সংখ্যা: ৩০ নভেম্বর ২০২২ (১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ বঙ্গাব্দ)
অন্তরাশ্রমের জীবনদর্শন ও মূল স্লোগান
প্রতিটি আদর্শিক প্রতিষ্ঠানের একটি সুনির্দিষ্ট মূলমন্ত্র থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় ‘অন্তরাশ্রম’-এর মূল স্লোগান বা মূলমন্ত্র হলো:
“অনন্ত জীবনের গান গাই”
এটি নিশ্চিতভাবেই একটি গভীর ভাববাদী (Idealistic) স্লোগান। তবে এই প্রতিষ্ঠানের দার্শনিক ভিত্তি কেবল ভাববাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্তরাশ্রমের আচার্য, কবি ও সাহিত্য পত্রিকাটির সম্পাদক এনামূল হক পলাশ মনে করেন, অন্তরাশ্রম ভাববাদে দীক্ষিত একটি প্রতিষ্ঠান হলেও বস্তুবাদকে (Materialism) কোনোভাবেই অস্বীকার করে না। তাঁর মতে, বস্তুবাদকে পুরোপুরি বাদ দিলে অন্তরাশ্রমের নিজস্ব অস্তিত্ব রক্ষা করাই অসম্ভব। অর্থাৎ, ভাববাদ ও বস্তুবাদের এক অপূর্ব ও বাস্তবসম্মত মেলবন্ধনের ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে ‘অন্তরাশ্রম’।
ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন ও ঐতিহাসিক দূরদর্শিতা
কবি এনামূল হক পলাশ ২০০৯ সাল থেকেই ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও নিজের লেখনীর মাধ্যমে সরব ভূমিকা পালন করে আসছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবিরাম লিখে গেছেন এবং একের পর এক বই রচনা করেছেন। এমনকি ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়কের দাবিতে হওয়া ‘শিশু বিদ্রোহ’ বা ছাত্র আন্দোলন্কেও তিনি দৃঢ় সমর্থন জুগিয়েছিলেন।
তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার এক অনন্য প্রমাণ মেলে ২০১৩ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একটি ফেসবুক পোস্টে। সেদিন তিনি লিখেছিলেন:
“ঘর যে তৈরি করেছেন তার মধ্যে এক্সিট পয়েন্ট রেখেছেন তো?”
তৎকালীন সময়ে পোস্টটিতে মাত্র ৭টি লাইক এবং ৩টি কমেন্ট পড়লেও, ঘটনাচক্রে ২০২৪ সালে এসে এই ‘এক্সিট পয়েন্ট’ বা পতনের বিষয়টি স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর জন্য চরম বেদনাদায়ক ও বাস্তব সত্য হিসেবে প্রমাণিত হয়।
স্বৈরাচারী আমলের রোষানল ও চাকুরির সংকট
ফ্যাসিবাদী শাসন আমলে তিনি স্বাধিকার ও মুক্তির চেতনা থেকে “গণতন্ত্রের গান” এবং “রাত্রির গান” নামে দুটি প্রতিবাদী গান রচনা করেন, যা ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায়। এই গান এবং গণমাধ্যমে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অপরাধে ২০২৪ সালের মার্চ মাসের শেষ দিকে তৎকালীন ভূমি মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ ও ভূমি সচিব খলিলুর রহমান তাঁকে চাকুরিচ্যুত করার সরাসরি নির্দেশ দেন।
এরই প্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মোছামাৎ মমতাজ বেগম বিভাগীয় কমিশনারকে চিঠি দেন এবং টেলিফোনে দ্রুত চাকুরিচ্যুতির আদেশ কার্যকর করতে বলেন। তবে তৎকালীন নেত্রকোণার জেলা প্রশাসক শাহেদ পারভেজ কবিকে সরাসরি চাকুরিচ্যুত না করে, কৌশলগতভাবে তাৎক্ষণিক দুর্গম হাওরাঞ্চলে বদলি করে দেন এবং একটি বিভাগীয় মামলা দায়েরের মাধ্যমে তাঁর সরকারি চাকুরিটি রক্ষা করেন। পরবর্তীতে ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের পর তিনি এই মামলা থেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হন।
২০২৪-এর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ভূমিকা
চাকুরির ওপর এমন চরম আঘাত ও মানসিক চাপের সময়েও কবি দমে যাননি। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন তিনি প্রকাশ্য ও গোপনে আন্দোলনকারীদের প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ সমর্থন বজায় রাখেন। একই সাথে তিনি বৈষম্যবিরোধী কবি ও লেখকদের সাথে নিবিড় যোগাযোগ রক্ষা করেন এবং নিজ শহর নেত্রকোণায় আন্দোলনরত সাধারণ ছাত্রদের সংগঠিত করতে মানসিক ও আর্থিক সহায়তা জুগিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
উপসংহার
কবি, সাহিত্যিক ও প্রগতিশীল সংগঠক এনামূল হক পলাশ কেবল শব্দের কারিগর নন, বরং তিনি সমাজ পরিবর্তনের একজন সম্মুখসারির লড়াকু সৈনিক। চাকুরির সংকট থেকে শুরু করে স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর নানামুখী দমন-পীড়নের মাঝেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী ও আদর্শ কখনো ম্লান হয়নি। সাহিত্য সৃষ্টি, সমাজ সংস্কার এবং প্রগতিশীল দর্শনের মেলবন্ধনে গড়া তাঁর ‘অন্তরাশ্রম’ আগামী প্রজন্মের কাছে অসাম্প্রদায়িক আলোর এক অনন্য বাতিঘর হয়ে থাকবে।
আরো পড়ুন
- কবি থেকে বিপ্লবী: কে এই এনামূল হক পলাশ, যিনি স্বৈরাচারের রোষানল পেরিয়েও দমে যাননি?
- মোহাম্মদ সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী: লোকসাহিত্য গবেষণা ও সংগ্রহের অগ্রপথিক
- চন্দ্রকুমার দে: মৈমনসিংহ গীতিকার নেপথ্য কারিগর ও লোকসাহিত্যের অমর সংগ্রাহক
- মণি সিংহ: বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস ও রাজনৈতিক জীবন
- কাহ্নপা বা কাহ্নপাদ হাজার বছর আগের বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্য ও চর্যাপদকর্তা
- অনিল চন্দ্র তালুকদার: নেত্রকোনার এক নিভৃতচারী সংগীত সাধক
- বীর মুক্তিযোদ্ধা অরবিন্দ সাংমা দিও: নেত্রকোনার এক অকুতোভয় গেরিলার সমরগাথা
- অনিন্দ্য জসীম: নেত্রকোনার এক নিভৃতচারী কবি ও দক্ষ সম্পাদক
- অনার্য শান্ত: নেত্রকোনার এক আধুনিক কবি ও সমাজ সংস্কারক
- অনাথ নকরেক: এক লড়াকু আদিবাসী বীর এবং হারিয়ে যাওয়া সার্টিফিকেটের গল্প
- সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অঞ্জনা রায়: সমাজ পরিবর্তন ও শিল্পের এক অনন্য নাম
- অনিমা সিংহ: টংক আন্দোলন ও কৃষক সংগ্রামের এক অবিস্মরণীয় নাম
- ভাষাসৈনিক অছিম উদ্দিন আহম্মদ: নেত্রকোণার এক নির্লোভ জননেতার জীবনগাথা
- স্বামী অখিলানন্দ: প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের দর্শনের সেতুবন্ধনকারী এক অমর সাধক
- ভাস্কর অখিল পাল: যার ছোঁয়ায় জীবন্ত হয়েছে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বাঙালির ইতিহাস
- শহীদ অখিল চন্দ্র সেন: নেত্রকোনার এক প্রদীপ্ত আইনজীবীর আত্মত্যাগের ইতিহাস
- অক্ষয় কুমার সরকার: এক কালজয়ী কবিয়াল ও আয়ুর্বেদ পণ্ডিতের জীবনগাথা
- দোলন প্রভার যৌথ খামার: সাহিত্য, সাম্যবাদ ও সৃজনশীলতার সমন্বয়
- বাদল মজুমদার: বীর মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও নেত্রকোণার এক গর্বিত সন্তান
- আনোয়ার হোসেন: নেত্রকোনার এক আদর্শবাদী ও সাম্যবাদী রাজনীতিকের জীবনগাথা
- দোলন প্রভা: নতুন সমাজ বিনির্মাণে এক প্রগতিশীল ও মানবিক সত্তার প্রতিকৃতি
- কমরেড আবদুল বারী: মোহনগঞ্জের এক প্রদীপ্ত সাম্যবাদী চেতনার জীবনগাথা
- ‘সত্যপীরের পাঁচালি’-র আদি রূপকার: মধ্যযুগের বিস্ময় কবি কঙ্ক
- বিপ্লবী চেতনার অগ্নিপুরুষ: কর্নেল আবু তাহের বীর উত্তম
ঋত্বিক ঘটকের একটি তথ্যচিত্র দেখুন
তথ্যসূত্র ও টিকা
১. নিবন্ধটি প্রথম ২৯ নভেম্বর ২০২২ তারিখে ফুলকিবাজ.কমে প্রকাশ করা হয়। পরে টাঙ্গন ঢাকা থেকে জুন ২০২৪ সময়ে প্রকাশিত অনুপ সাদি, দোলন প্রভা রচিত নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ গ্রন্থের ২১ নং পৃষ্ঠা ২১ প্রকাশিত হয়। লেখাটি সর্বশেষ ৫ জুন ২০২৬ তারিখে পুনরায় সংস্কার ও আপডেট করা হয়েছে।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚