বাজে না বাঁশি গো ফুলের বাসরে: শচীন দেববর্মণের সেই অমর বিরহী গানের অন্তরালে

“বাজে না বাঁশি গো ফুলের বাসরে জাগে না হাসি গো” — বাংলা আধুনিক গানের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ও কালজয়ী সৃষ্টি। কিংবদন্তি সুরকার ও গায়ক শচীন দেববর্মণের জাদুকরী কণ্ঠ এবং অনন্য সুরের মূর্ছনায় গানটি বাঙালির শ্রোতহৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছে। কালজয়ী গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের ক্ষুরধার লেখনীতে এই গানে প্রেম, বিরহ ও বিষাদের এক অপূর্ব এবং অতুলনীয় সংমিশ্রণ ঘটেছে। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে সৃষ্টি হওয়া এই মেলোডিপ্রধান গানটি আজও তার আবেদন হারায়নি, বরং নতুন প্রজন্মের সঙ্গীতপ্রেমীদের কাছেও এক পরম আবেগের নাম।

গানের মূল ভাবার্থ বিশ্লেষণ করলে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা এবং নিঃসঙ্গতার চিত্র ফুটে ওঠে। এখানে ‘ফুলের বাসর’ বলতে মিলনের বাহ্যিক সমস্ত জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন সম্পূর্ণ থাকাকে বোঝানো হলেও, প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতি কিংবা মনের অমিল সেই সব আনন্দকে এক মুহূর্তে ম্লান করে দেয়। গানের প্রতিটি ছত্রে মূর্ত হয়ে উঠেছে একাকী হৃদয়ের হাহাকার ও অপূর্ণতার আকুল আর্তনাদ। বাহ্যিক উৎসবের আলো যে ভেতরের অন্ধকারকে দূর করতে পারে না—এই চিরন্তন সত্যটিই গানটিকে চিরসবুজ বিরহের সংগীতে পরিণত করেছে।

গানের বিশ্লেষণ

১. সুর ও সৌন্দর্যের অনুপস্থিতি: গানের শুরুতেই ‘বাজে না বাঁশি’ এবং ‘জাগে না হাসি’ শব্দমালার মাধ্যমে এক অদ্ভুত শূন্যতা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বাঁশি ও হাসি সাধারণত আনন্দ ও মিলনের প্রতীক। কিন্তু ‘ফুলের বাসরে’ অর্থাৎ মিলনের সমস্ত আয়োজন থাকা সত্ত্বেও যখন সুর ও হাসি হারিয়ে যায়, তখন বোঝা যায় হৃদয়ের গভীর কোনো ক্ষত। পরিবেশ অনুকূল হলেও প্রিয়জনের অনুপস্থিতি উৎসবের আবহকে এক নিমেষেই বিষাদে রূপান্তর করেছে।

২. প্রকৃতির বিমুখতা ও নিঃসঙ্গতা: চাঁদের ‘মধু জ্যোছনা’র অনুপস্থিতি এবং ‘মৃগলোচনা’ বা হরিণনয়না প্রিয়ার দূরত্ব—বিরহী হৃদয়ের কাছে প্রকৃতিকেও নিস্তেজ করে তুলেছে। এখানে জ্যোছনা না থাকা মানেই যেন আশার আলো নিভে যাওয়া। তাই কবির ‘নীরব নয়নধারে’ নিভৃতে চোখের জল ফেলা অত্যন্ত সংযত অথচ গভীর এক শোকের পরিচয় দেয়।

৩. মিলনের আকাঙ্ক্ষা ও নিয়তির পরিহাস: ‘মায়াভরা মধু নিশীথে’ প্রিয়ার হৃদয়ে ঠাঁই পাওয়ার যে ব্যাকুলতা, তা এক চিরন্তন মানবিক আকুতি। তবে গানের শেষে ‘মালাখানি ফুল ঝরানো’ পঙক্তিটি অপূর্ণ প্রেমের প্রতীক হিসেবে ধরা দিয়েছে। ‘জীবনে সবই যেন ভুলে ভরানো’—এই চরণের মাধ্যমে শিল্পী এক ধরণের নিয়তিবাদ বা ভাগ্যের প্রতি অভিমান প্রকাশ করেছেন, যেখানে প্রাপ্তির চেয়ে হারানোর হাহাকারই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

৪. পরবাসী প্রিয় ও অন্তহীন বেদনা: গানের সবশেষে “সে প্রিয় হলো কেন পরবাসী গো”—এই একটি প্রশ্নই পুরো গানের মূল সুর। এখানে ‘পরবাসী’ বলতে শুধু ভৌগোলিক দূরত্ব নয়, বরং মনের দূরত্ব বা ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে যাওয়াকে বোঝানো হয়েছে। যাকে কাছে পাওয়ার তীব্র বাসনা ছিল, তার এই দূরত্বই বিরহকে এক চূড়ান্ত রূপ দান করেছে।

শচীন দেববর্মণের কণ্ঠে গানটি শুনুন ইউটিউব থেকে

গানের কথা

বাজে না বাঁশি গো
ফুলের বাসরে জাগে না হাসি গো।।

আকাশে নাই চাঁদে মধু জ্যোছনা,
দূরেই রহিল সেই মৃগলোচনা,
তাই নীরব নয়নধারে আমি ভাসি গো।।

আজি এই মায়াভরা মধু নিশীথে
বঁধূর মনে মন চায় মিশিতে।
মালাখানি হল যে গো ফুল ঝরানো,
জীবনে সবই যেন ভুলে ভরানো—
সে প্রিয় হল কেন পরবাসী গো।।

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, “বাজে না বাঁশি গো ফুলের বাসরে” কেবল একটি গান নয়, বরং এক চিরন্তন বিরহের কাব্য। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের অসাধারণ শব্দশৈলী আর শচীন দেববর্মণের দরদী কণ্ঠের জাদুতে গানটি কয়েক দশক ধরে বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে আছে। মিলনের আনন্দ যেখানে বিষাদে রূপ নেয়, সেই অমোঘ সত্যই গানটির প্রতিটি ছত্রে ফুটে উঠেছে। বিরহী হৃদয়ের এমন নিখুঁত প্রকাশ বাংলা সংগীতের ইতিহাসে এই গানটিকে চিরকাল অনন্য করে রাখবে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. লেখাটি ২ জুলাই ২০১৯ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে শিশির চক্রবর্তী সংকলিত পত্রভারতী কলকাতা প্রকাশিত দ্বিতীয় মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৮পাঁচদশকের আধুনিক বাংলা গানের গীতবিতান এ শুধু গানের দিন গ্রন্থের ৩১৫ পৃষ্ঠা থেকে।

Leave a Comment