সহেলা গীত ও সয়লা উৎসব: রাঢ় বাংলা ও লোকসংগীতের এক অনন্য অধ্যায়

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সমৃদ্ধ লোকসংগীত ও লোকনৃত্যের ঐতিহ্যে ‘সহেলা গীত’ (Sahela Geet) বা ‘মেয়েলী গীত’ একটি অনন্য স্থান দখল করে আছে। এটি মূলত নারীদের কেন্দ্রিক একটি লোকজ ধারা, যা বিভিন্ন পারিবারিক উৎসব, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা ধর্মীয় আচার-ব্রতের সময় মেয়েরা দলবদ্ধভাবে পরিবেশন করেন।[১]

প্রখ্যাত পণ্ডিত ড. মুহম্মদ এনামুল হক এই সংগীত ধারাটিকে ‘সহেলা গীত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, যেহেতু মেয়েরাই এই গানের রচয়িতা, গায়িকা এবং শ্রোতা, তাই সখীদের এই সম্মিলিত সুরের মূর্ছনাকে ‘সহেলা’ বা সখীদের গান বলা যুক্তিযুক্ত। এই ধারার একটি অত্যন্ত পরিচিত গান হলো প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় ও সুমিত্রা সেনের কণ্ঠে জনপ্রিয় হওয়া— ‘কেনো আইলাম কেনো আইলাম কেনো আইলাম গো, আগে না জাইনা আমি কেনো আইলাম গো’।

অনেক গবেষক ও লেখক ‘মেয়েলী গীত’ এবং ‘সহেলা গীত’কে একই ধারার অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করেন। মূলত নারীজীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা, সুখ-দুঃখের অনুভূতি এবং বিভিন্ন সামাজিক বা পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে যেসব লৌকিক গান রচিত হয়, সেগুলোই মেয়েলী গান হিসেবে পরিচিত। এই গানের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলোর রচয়িতা এবং পরিবেশনকারী উভয়ই নারী। মূলত গ্রামীণ জনপদে নারীদের যাপিত জীবনের প্রতিচ্ছবিই ফুটে ওঠে এই লোকসংগীতের সুরে।

সহেলা গীতের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি সম্পূর্ণ কৃত্রিমতামুক্ত এবং বহির্জগতের প্রভাবহীন এক নিটল লোকজ ধারা। কোনো সচেতন পরিকল্পনা বা কারুকার্য দিয়ে নয়, বরং নারী হৃদয়ের গভীর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই এই গানের উদ্ভব ঘটেছে। গ্রামীণ নারীদের দৈনন্দিন জীবন ও উৎসবের আনন্দ-বেদনা এই গানের মূল প্রেরণা। বিশেষ করে বিবাহ উৎসব, ধান ভানা, চিড়া কুটা কিংবা মুসলিম পরিবারে ছেলেদের খাৎনার মতো বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে মেয়েরা সমবেতভাবে এই গান পরিবেশন করেন।

রাঢ় বাংলার সয়লা উৎসব ও বন্ধুত্বের বন্ধন

সহেলা শব্দটির উৎপত্তি সখী বা সহি থেকে। এই অর্থে বন্ধুত্বের গান অর্থে সহেলা গীতি। মূলত নারীদের গাওয়া বন্ধুত্বের গানই হচ্ছে সহেলা গীত। উল্লেখ্য যে, যারা একত্রে এই গীত গেয়ে থাকেন, গ্রামীণ ভাষায় তাদের ‘এয়ো’ নামে অভিহিত করা হয়। এ প্রসঙ্গে সয়লা উৎসবের কথা বলা যায়। রাঢ় বাংলার লোকসংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন হলো বন্ধুত্বের উৎসব ‘সয়লা’। দক্ষিণ দামোদরের বিস্তীর্ণ জনপদে বয়স, জাতি, ধর্ম, বর্ণ কিংবা অর্থনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে মানুষ এই উৎসবে মেতে ওঠে। এই উৎসবের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি সমলিঙ্গের ভিত্তিতে পালিত হয়। সাধারণত আষাঢ় মাসের পঞ্চমীর মনসাপূজার সময় এই উৎসবের দিনক্ষণ নির্ধারিত হয়। গ্রামদেবী বা গ্রাম দেবতার পুরোহিতের সাথে গ্রামের গণ্যমান্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের আলোচনার মাধ্যমে সয়লা উৎসবের দিনটি স্থির করা হয়।

ভাষাতাত্ত্বিক দিক থেকে ধারণা করা হয়, ‘সয়লা’ শব্দটি মূলত ‘সহেলা’ শব্দ থেকে উদ্ভূত, যার আভিধানিক অর্থ হলো বন্ধুত্ব। সাধারণ অর্থে সহেলা বা সয়লা বলতে আমরা সখা, সই, সাঙাত বা পরম বন্ধুকে বুঝি। এই উৎসবের মূল দর্শনের গভীরে রয়েছে মানবিক বন্ধনকে বন্ধুত্বের অটুট সূত্রে সুদৃঢ় করা। মূলত হৃদয়ের টান ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যকে আজীবন টিকিয়ে রাখাই এই উৎসবের প্রধান লক্ষ্য।[২]

নারী জীবনে সহেলা গীতের প্রভাব

সহেলা গীতের শব্দমালা ও সুর অত্যন্ত সহজ-সরল এবং এটি সর্বদা দলগতভাবে পরিবেশিত হয়। বাংলার অন্যান্য লোকসংগীতের মতো এই ধারার সৃষ্টি ও প্রচারও হয়েছে মৌখিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে। নারী জীবনের গভীর অনুভূতি—আশা-আকাঙ্ক্ষা, আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না ও হৃদয়ের একান্ত বাসনাই এই গানের প্রধান উপজীব্য। এসব গানে উঠে আসে গ্রামীণ সংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি, দাম্পত্য জীবনের গল্প এবং সংসার যাত্রার বাস্তব চিত্র। পিতৃগৃহ ত্যাগের বিরহ, শাশুড়ি-ননদিনীর আচরণ, স্বামীর সোহাগ কিংবা দেবরের প্রতি স্নেহের মতো পারিবারিক নানা প্রসঙ্গ এখানে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়। এছাড়া হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে উভয় সমাজেই গর্ভাধান, সাধভক্ষণ, বিবাহ, নাইয়র এবং জামাই বরণের মতো উৎসবগুলোতে অসংখ্য মেয়েলী গান প্রচলিত রয়েছে। প্রকৃত অর্থেই সহেলা গীত এক গতিশীল, অসাম্প্রদায়িক ও শাশ্বত লোকজ সম্পদ।[৩]

একটি গীত শুনুন ইউটিউব থেকে

একটি সহেলা গীত

কন্যারা মা বন্ধন করে পশ্চিম দুয়ার ঘরে
খেরকি দুয়ারে ফালাইছি পানি জাল্যা বেটার গায়ে
মাছ খাওয়ার আশাতে।
কন্যার জেঠি রন্ধন করে উত্তর দুয়ার ঘরেতে
খেরকি দুয়ারে ফালাইছি পানি বেয়ারা (বেহায়া) বেটার গায়েতে
সোয়ারী উঠার আশাতে।
কন্যার পিসী রন্ধন করে পূর্ব দুয়ার ঘরেতে
খেরকি দুয়ারে ফালাইছি পানি ঢুলি বেটার গায়েতে
নাচিবার আশাতে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. অনুপ সাদি, ৩ জুলাই ২০২০, “সহেলা গীত বাংলার লোকসংগীত ও লোকনৃত্যের ধারায় একটি স্বতন্ত্র শাখা” রোদ্দুরে.কম, ইউআরএল: https://www.roddure.com/art/music/sahela-geet/
২. শেখ মইনুল হক, “সহেলা বা সয়লা উৎসব: সমন্বিত বর্ণের উৎসব”, ডিসেম্বর ২০১৫, International Journal of Research and Analytical Reviews (IJRAR); Volume 2, Issue 4; www.ijrar.org, পৃষ্ঠা ২৪৪-২৫১।
৩. আবুল হাসান চৌধুরী, বাংলাদেশের লোকসঙ্গীতে প্রেমচেতনা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা।

Leave a Comment