পুরাণ বা মিথ হচ্ছে লোক সাহিত্যের অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকরণ

পুরাণ বা পৌরাণিক কাহিনি বা মিথ (ইংরেজি: Myth) হচ্ছে লোকসাহিত্যের অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকরণ। লোকসাহিত্যের এই উপাদানটিকে প্রাচীনতম বলা যেতে পারে। প্রাচীন পূর্বপুরুষদের নানান অভিজ্ঞতার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ছিল না সে যুগে। সেই অব্যাখ্যাত অভিজ্ঞতাগুলির বর্ণনামূলক যে মৌখিক কাহিনিগুলি গড়ে উঠেছে সেগুলিই হলো আদিম মিথ। প্রাক কৃষিবিজ্ঞান যুগের মানসিকতায় রচিত এই কাহিনিগুলির ভিত্তিভূমি অলৌকিকের ওপর বিশ্বাস এবং একক নয় গোষ্ঠীগত প্রয়াসে এগুলি গড়ে উঠত। এই কাহিনীগুলির সঙ্গে প্রাচীনকালের ধর্মবিশ্বাসের সংযোগও ছিল গভীরভাবে।

‘লোকপুরাণ’ বা ‘মিথ’ থেকেই সময়ের বিবর্তনে তৈরি হয়েছে ‘টেল’ (বা ‘কথা’) যাতে মিথ-সম্পৃক্ত ধর্ম ও অলৌকিকতার ভাগ কমে এসে মুখ্য হয়ে উঠেছে প্রচলিত লোকজীবনের পরিচিত ছবিগুলি। তাই ‘মিথের মূল ভিত্তি ধর্ম ও দেবতা হলেও, তার বিবর্তিত রূপ ‘টেল’-এ মানুষ ও তার সামাজিক সংস্কারই প্রধান। তবে মানুষের সহজাত অলৌকিকতায় প্রতীতি তার মধ্যেও বিম্বিত হয়ে থেকেছে।[১]

পুরাণ শব্দটির ব্যুৎপত্তি

প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যে ‘mythos’ বলতে যে কোনো গল্প বা কাহিনী বোঝাত, সেটা সত্য হোক বা মিথ্যা হোক। বর্তমানে মিথ শব্দটি অন্য অর্থ অর্জন করেছে। একটি মিথ হচ্ছে রূপকথা বা মাইথোলজির (mythology) একটি গল্প। মাইথোলজি বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে পুরুষানুক্রমে প্রাপ্ত গল্পাবলীর একটি ধারাক্রম ও পদ্ধতি, একটা সিস্টেম যা কোনো একটি সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠী একসময় বিশ্বাস করত, যার সাহায্যে তারা বিশ্ব এবং বিশ্বে সংঘটিত কর্মকাণ্ডের একটা অর্থ আবিষ্কার করে নিত এবং যা তাদের নানা আচার-অনুষ্ঠান ও জীবনযাপনের রীতিপ্রকৃতির পেছনে যুক্তির সমর্থন যোগাত। অধিকাংশ মিথের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সুস্পষ্ট নিয়মকানুন। অবশ্য আচার-অনুষ্ঠান থেকে মিথের জন্ম হয়েছে, নাকি মিথ জন্ম দিয়েছে আচার-অনুষ্ঠানের, সে-সম্পর্কে সব নৃবিজ্ঞানী একমত নন। 

আরো পড়ুন:  শাহেরা খাতুনের গাওয়া তিনটি মেয়েলী গীত বা সহেলা গীত

কাহিনীতে যদি অতিমানবিক প্রাণীর পরিবর্তে মানুষ কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে, তখন তাকে পুরাণ বা মিথ না বলে ‘লেজেন্ড’ বা উপকথা বলা হয়। কাহিনীর মধ্যে যদি অতিমানবিক প্রাণীদের কীর্তিকলাপ থাকে কিন্তু তা যদি কোনো সিস্টেম্যাটিক মাইথোলজির অংশ না হয় তখন তাকে ‘ফোকটেল’ অথবা লোককাহিনী বলা হয়।

যে কোনো ধর্ম যার প্রতি আমরা এখন আর আস্থা স্থাপন করি না তাকে মাইথোলজি বলা যেতে পারে। পাশ্চাত্যের কবিরা অবশ্য বিশ্বাসের প্রশ্নটি অন্তর্হিত হয়ে যাবার পরেও জুপিটার, ভেনাস, প্রমিথিউস, অ্যাডাম ও ঈভ, জোনাহ প্রমুখের মিথসমূহকে তাদের সৃষ্টিকর্মে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছেন, এখনও করে চলেছেন। জেমস জয়েস তাঁর ‘ইউলিসিস’ এবং ‘ফিনেগানস ওয়েক’ উপন্যাসে, টি. এস. এলিয়ট তার ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ কাব্যগ্রন্থে, ইউজীন ও নীল তাঁর ‘মোর্নিং বিকামস ইলেকট্রা’ নাটকে এবং আরও অনেক আধুনিক লেখক তাঁদের সাহিত্যকর্মে সমকালীন বিষয়বস্তুকে বিন্যস্ত করেছেন প্রাচীন মিথের প্যাটার্নে।

বর্তমানে সাহিত্য সমালোচনা ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে মিথতত্ত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মিথ ক্রিটিকদের মধ্যে যারা বিশেষ অবদান রেখেছেন তাঁদের মধ্যে রয়েছেন রবার্ট গ্রেভস, ফ্রান্সিস ফার্গুসন, রিচার্ড চেস, লেসলি ফিডলার, এবং সাম্প্রতিক কালে সর্বাপেক্ষা প্রভাববিস্তারী নর্থরপ ফ্রাই।[২]

তথ্যসূত্র

১. চন্দ্রমল্লী সেনগুপ্ত, সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত, বুদ্ধিজীবীর নোটবই, নবযুগ প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠা, ৫৮০-৫৮১।
২. কবীর চৌধুরী, সাহিত্যকোষ, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, অষ্টম মুদ্রণ ফেব্রুয়ারি ২০১২, পৃষ্ঠা ৯৬-৯৭।

Leave a Comment

error: Content is protected !!