গীতিকা বা গাথা (ইংরেজি: Ballad) হচ্ছে লোকসাহিত্যের সর্বশেষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপবর্গ। গীতিকবিতার আদি রূপ হিসেবে গীতিকাকে বিচার করা হয়। ইতালীয় শব্দ Ballare থেকে ইংরেজি Ballad শব্দের উৎপত্তি। Ballare শব্দের অর্থ নৃত্য করা। অর্থাৎ কবিতার সংগে নৃত্য ও নাটকীয়তার মিশ্রণে গাথার সৃষ্টি। গাথা কবিতায় প্রেম, ধর্ম, বীরত্ব, রাজনীতি, সামাজিক প্রসঙ্গ, হাস্যরসের ঘটনা প্রাধান্য পায়। এছাড়াও লোকজীবন ও গ্রাম্যজীবনের প্রসঙ্গও এর বিষয়বস্তু। এতে ব্যক্তি কিংবা সামষ্টিক জীবনের করুণ কাহিনীর প্রাধান্য থাকে।[১]
প্রাচীনকালে ‘গাথা-নারাশংসী’ নামক এক ধরনের বীরগাথা-বিজয়গাথা আমাদের দেশে প্রচলিত ছিল। মূলত চারণকবিরা এই কাহিনিগুলি সুরে বেঁধে দেশ থেকে দেশান্তরে গেয়ে বেড়াতেন। পরবর্তীকালে সেগুলিই ‘গীতিকা’ হিসেবে পরিচিত হয়েছে। অর্থাৎ লোকমুখে প্রচলিত কাহিনি-রেণু কি লোককথার নানান ঘটনাগুচ্ছ ধীরে ধীরে যেভাবে সমষ্টিবদ্ধ রূপ লাভ করত—সেই কাহিনিগুলিতে ভ্রাম্যমাণ ওই গায়কেরা গানের সুর সংযোজিত করে তাকে পরিণত করতেন বীরগাথা তথা গাথা-নারাশংসী’-তে—এই ছিল মধ্যযুগের গীতিকার প্রাক রূপ। রামায়ণ, মহাভারতও এইভাবেই একদা গড়ে উঠেছিল। গীতিকার পরিপূর্ণ রূপের বিকাশ ঘটেছে মধ্যযুগেই—নাথ গীতিকার উদ্ভবের যথার্থ সময় জানা না গেলেও সপ্তদশ শতাব্দীর আগেই ঐ ধর্মীয় কাহিনিগুলি প্রচলিত ছিল যে, তা বলাই যায়। ধর্ম ভাবনা-বর্জিত পূর্ববঙ্গ গীতিকাগুলিও আনুমানিক তিনশো বছরের পুরোনো। তবে পশ্চিমবঙ্গের গীতিকাগুলির বয়স কম ।
গীতিকার মূল দুটি উপাদান হলো কাহিনি এবং সংগীতময়তা। একটি নির্দিষ্ট গল্পকে অবলম্বন করে গীতিকার সৃষ্টি এবং এরপর গল্পটি গানের সুর সহযোগে পরিবেশিত হয়। তবে এই সুরের ধরাবাঁধা কোনো রীতি নেই। সুর মূলত শাদামাটা হয়—কারণ সুরের কারিকুরির পরিবর্তে কথার ভাবকে ব্যক্ত করাটাই তার মূল লক্ষ্য। এছাড়াও সব ধরনের গীতিকাতেই বাকরীতির একটি বিশেষ ভঙ্গি হিসেবে শব্দগুচ্ছ বা পংক্তির পুনরাবৃত্তি থাকে, যাকে ধুয়া বা Refrain বলা হয়। গীতিকার মধ্যেই বহুলভাবে প্রতিফলিত হয় ব্যক্তিকেন্দ্রিক আবেগ।
পূর্ববঙ্গের গীতিকাগুলির কাহিনী সাধারণত বিষাদাত্তক প্রেম নির্ভর হয় আর এক্ষেত্রে ভাটিয়ালি সুরের গায়নভঙ্গী প্রধানত ব্যবহৃত হয়। অন্যপক্ষে পশ্চিমবঙ্গীয় সামান্য যে কয়েকটি গীতিকা পাওয়া গেছে—সেখানে ঝুমুরের গায়ন ভঙ্গিটিই মুখ্য। তবে উত্তরবঙ্গের নাথ গীতিকার সুরালোপের কোনো নির্দেশ সেভাবে প্রাপ্য নয়। সম্ভাব্য একটি সূত্র হল, হয়ত উত্তরবঙ্গীয় লৌকিক সুর ভাওয়াইয়ার আদিরূপে সেগুলি গাওয়া হত।[২]
এছাড়াও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গাথা কবিতা অনুকরণে ‘স্পর্শমণি’, ‘পণরক্ষা’; জসীম উদ্দীনের ‘নকশীকাঁথার মাঠ’ ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ গাথা কবিতার অতুলনীয় নিদর্শন। ইংরেজি সাহিত্যে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, টমাস হার্ডি, কোলরিজ, জন কিটস প্রমুখ কবি এ জাতীয় কবিতা প্রচুর লিখেছেন।
আরো পড়ুন
- রবীন্দ্র সাহিত্যে প্রকৃতি প্রেম ও প্রকৃতিবাদ এবং বাঙলাদেশের পরিবেশ
- লু স্যুনের ছোটগল্প-এর চরিত্রগুলো সামন্তবাদের বিরুদ্ধে লড়ায় করেছে
- ছিন্নপত্র তুলে ধরে উনিশ শতকের বাঙলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবন
- ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথের বহুমুখী পরিচয় ও জীবনবোধকে তুলে ধরে পত্রসাহিত্য ছিন্নপত্র
- পূর্ববঙ্গের পদ্মা তীরবর্তী প্রকৃতির চিত্র ফুটে উঠেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিন্নপত্রে
- ছিন্নপত্রে কবিত্ব হচ্ছে কবি রবীন্দ্রনাথের কাব্যিক গদ্যের চিঠির সংকলন
- অভিবাসন-এর মাধ্যমে মানিক সমাজের অর্থনীতিকে তুলে ধরেছেন
- প্রহসন বা ফার্স হচ্ছে সমাজের খারাপ রীতি শোধনার্থে হাস্যরস প্রধান একাঙ্কিকা
- গীতিকা বা গাথা হচ্ছে লোকসাহিত্যের সর্বশেষ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপবর্গ
- প্রবাদ জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে উপলব্ধি করা সত্যকে মূর্তভাবে প্রকাশ করে
- ভাদু মূলত কৃষি বা ফসল তোলার উৎসবকে কেন্দ্র করে আচার অনুষ্ঠানের গান
- ধাঁধা বা ধাঁধাঁ হচ্ছে একমাত্র ভাব বা বিষয়কে রূপকের দ্বারা প্রশ্নের আকারে প্রকাশ
- পুরাণ বা মিথ হচ্ছে লোক সাহিত্যের অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকরণ
- লোকসাহিত্য বা মৌখিক সাহিত্য হচ্ছে এমন ধরনের সাহিত্য যা কথ্য বা গীত হয়
- কমেডি হচ্ছে প্রধানত নাটকের একটি ধরন যেখানে বিষয়বস্তু হাস্যরসাত্মক
- ছড়া হচ্ছে বিশেষ ধরনের ছন্দের ক্ষুদ্রাকার কবিতা বা পদ্য
- ছোটগল্প ও উপন্যাসের পার্থক্য ও তুলনামূলক আলোচনা কথাসাহিত্যের বিশ্লেষণ
- ছোটগল্পের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস শুরু ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে
- সংলাপ হচ্ছে সাহিত্যিক রচনায় দুটি চরিত্রের মধ্যকার কথোপকথন
- পাশ্চাত্যে ও ভারতে নাটকের ইতিহাস শুরু হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব সময়ে
- ট্রাজেডি হচ্ছে প্রধান চরিত্রের চরম বিপর্যয়ে পতিত হবার নাটক
- সাহিত্য হচ্ছে মানুষের চিন্তাভাবনা ও অনুভূতির লিখিত অথবা মুদ্রিত বিষয়
- মহাকাব্য জাতীয় বা বীরত্বব্যঞ্জক বিষয়ে বিশাল পটভূমিতে বিধৃত বর্ণনামূলক কাব্য
- ইংরেজি সাহিত্য ইংরেজি ভাষায় সপ্তম শতাব্দী থেকে অদ্যাবধি লিখিত সাহিত্য
- প্রবন্ধ সাধারণত এক টুকরা লেখা যা লেখকের নিজস্ব যুক্তি দেয়
- নাটক হচ্ছে কথাসাহিত্যের বিশেষ ধরন যা অভিনয়ের মাধ্যমে পরিবেশিত হয়
- উপন্যাস সাধারণত গদ্য কথাসাহিত্যরূপে রচিত তুলনামূলক দীর্ঘ লেখা
- বাংলা ছোটগল্প হচ্ছে বিশ শতকে বাংলা ভাষায় রচিত ও চর্চিত গল্পের ধারা
- ছোটগল্প হচ্ছে কথাসাহিত্য বা গদ্য-সাহিত্যের বিশেষ শাখা
- বাংলা কবিতা হচ্ছে বাংলা ভাষায় রচিত কবিতার সমৃদ্ধশালী ঐতিহ্যবাহী ধারা
- কবিতা শব্দের এবং ছন্দের আন্তঃব্যবহারের উপর ভিত্তি করে একধরণের সাহিত্য
- সাহিত্যে রস হচ্ছে সাহিত্য পাঠের ফলে বিষয়ের অনুধাবনসূত্রে বহুবিধ ভাবের সৃষ্ট
- সাহিত্যের শৈলি হচ্ছে কোনো লেখকের দ্বারা কোনো গল্প লেখা অথবা বলার উপায়
- সাহিত্যের শ্রেণিবিভাগ বা সাহিত্য রীতি হচ্ছে সাহিত্য লেখার বিষয়শ্রেণি
- সাহিত্যের স্বরূপ হচ্ছে নির্দিষ্ট সংস্কৃতি, ধর্ম, দর্শন বা এ ধরনের লিখিত রচনার রূপ
তথ্যসূত্র
১. আবুল ফজল ও রেজাউল ইসলাম, সাহিত্য তত্ত্ব-কথা, দুরন্ত পাবলিকেশন্স, ঢাকা, পুনর্মুদ্রণ ২০০৯, পৃষ্ঠা ২১।
২. চন্দ্রমল্লী সেনগুপ্ত, সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত, বুদ্ধিজীবীর নোটবই, নবযুগ প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা, প্রথম সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০১০, পৃষ্ঠা, ৫৮১।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।