প্রান্তরের গান আমার: সলিল চৌধুরী ও উৎপলা সেনের কালজয়ী গানের লিরিক্স ও ইতিহাস

‘প্রান্তরের গান আমার, মেঠো সুরের গান আমার’—বাংলা আধুনিক গানের সোনালী যুগের এক অনবদ্য ও কালজয়ী সৃষ্টি। ১৯৫৩ সালে মুক্তি পাওয়া এই গানটি আজও শ্রোতাদের মুগ্ধ করে。 সুরের জাদুকর সলিল চৌধুরীর অসামান্য কথা ও সুর, আর কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী উৎপলা সেন-এর জাদুকরি গায়কীর এক অপূর্ব মেলবন্ধন এটি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়েও এই মেঠো সুর আজও প্রতিটি বাঙালি শ্রোতার হৃদয়ে দোলা দিয়ে যায়।

গান সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য ও ক্রেডিট

বিষয়ের বিবরণগানটির মূল তথ্য
গানের শিরোনামপ্রান্তরের গান আমার (মেঠো সুরের গান আমার)
কণ্ঠশিল্পীউৎপলা সেন
গীতিকার ও সুরকারসলিল চৌধুরী
প্রকাশকাল১ মে, ১৯৫৩ (১৯৫৩ সালের পূজার অ্যালবাম)
রেকর্ড লেবেলসারেগামা ইন্ডিয়া লিমিটেড / HMV
গানের ঘরানাবাংলা আধুনিক গান (সোনালী যুগ)

গানের মূল ভাবার্থ ও সাঙ্গীতিক বৈশিষ্ট্য

সলিল চৌধুরীর অন্যান্য কালজয়ী সৃষ্টির মতোই এই গানটিতেও রয়েছে গভীর রূপক, দর্শন ও বিষাদের এক মায়াবী ছোঁয়া। গানের কথায় গ্রামীণ বা মেঠো সুরের হারিয়ে যাওয়ার বেদনাকে প্রকৃতির পটভূমিতে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

১. রূপক ধর্মিতা ও গভীর হাহাকার

গানের প্রতিটি লাইনে সলিল চৌধুরী শব্দের যে জাদুকরি ব্যবহার করেছেন, তা শ্রোতার মনকে নাড়া দেয়। যেমন:

  • ‘আকাশে আগুন জ্বালায়’: এই লাইনের মাধ্যমে জীবনের তীব্র সংকট ও ঝড়ের মতো কোনো দুর্যোগের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
  • ‘ফসলবিহীন মন কাঁদায়’: এটি মানুষের ভেতরের চরম শূন্যতা, অপ্রাপ্তি এবং আপন ‘নীড়’ বা ঘর ভেঙে যাওয়ার এক আকুল হাহাকার প্রকাশ করে।

২. সুর ও ইউনিক কম্পোজিশন

সুরকার হিসেবে সলিল চৌধুরীর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো পাশ্চাত্য ক্লাসিক্যাল (Western Classical) এবং দেশীয় লোকজ (Folk) সুরের মেলবন্ধন। এই গানটিও তার ব্যতিক্রম নয়:

  • ওয়েস্টার্ন হার্মোনি: গানটিতে তিনি সরল মেঠো সুরের আবহের সাথে ওয়েস্টার্ন হার্মোনির এক চমৎকার আলো-আঁধারির খেলা তৈরি করেছেন।
  • সাঙ্গীতিক আবহ: কর্ড প্রোগ্রেসনের সূক্ষ্ম ব্যবহার গানটির বিষাদময় আবেগকে আরও জীবন্ত করে তুলেছে।

৩. উৎপলা সেনের জাদুকরি কণ্ঠ

এই গানের আরেকটি প্রাণভোমরা হলেন কিংবদন্তি গায়িকা উৎপলা সেন। সলিল চৌধুরীর জটিল কম্পোজিশনকে তিনি তার মায়াবী ও দরদী কণ্ঠে এত সহজভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, গানটি শুনলেই শ্রোতার চোখে গ্রামীণ প্রকৃতির এক বিষাদময় ছবি ভেসে ওঠে।

গানের গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১৯৫৩ সালের শারদীয় পূজায় প্রকাশিত এই গানটি কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী উৎপলা সেনের দীর্ঘ সংগীত ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মাইলফলক হিসেবে গণ্য করা হয়।

১. বাংলা গানে নতুন জোয়ারের সূচনা

পঞ্চাশের দশকে সুরকার সলিল চৌধুরী বাংলা গণসংগীত এবং আধুনিক গানে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছিলেন। ঠিক সেই সন্ধিক্ষণে নিখুঁত রাগপ্রধান ও মেলোডি ঘরানার ‘প্রান্তরের গান আমার’ গানটি মুক্তি পায়। এটি আপামর বাঙালি শ্রোতাদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং পরবর্তীতে সলিল চৌধুরীর একটি ‘সিগনেচার ট্র্যাকে’ পরিণত হয়।

২. বর্তমান যুগে গানটির প্রাসঙ্গিকতা ও উত্তরাধিকার

কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও এই গানটির আবেদন একটুও কমেনি:

  • সলিল চৌধুরী ফাউন্ডেশন: বর্তমানে সলিল চৌধুরী ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগীতপ্রেমী প্ল্যাটফর্মে এই গানটিকে নিয়মিত শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।
  • নতুন প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয়: বর্তমান যুগের তরুণ শিল্পীরাও এই কালজয়ী মেঠো সুরকে নতুন করে রিমেক ও কাভার করার মাধ্যমে টিকিয়ে রাখছেন।

গানটি ইউটিউব থেকে শুনুন

গানের কথা

প্রান্তরের গান আমার, মেঠো সুরের গান আমার
হারিয়ে গেল কোন্ বেলায়,  আকাশে আগুন জ্বালায়
মেঘলা দিনের স্বপন আমার
ফসল বিহীন মন কাঁদায়।

মাঝে মাঝে উদাস হাওয়ায় এলোমেলো কি যে শুনি,
বুঝি তাহার ব্যাথার ছোঁয়ায় হারায় আমার সুরের ধ্বনি
ঝড়ের হাওয়ায়, পাতার মতন ঝরিয়া যায়—
যায় যায় যায়!

ক্লান্ত ডানায় নীড় খুঁজি, অথৈ নদীর তীর খুঁজি,
শুধুই আমার যায় বেলা, ভাসায় আশার ভেলা,
অন্তবিহীন পথের পুঁজি
অন্তরেরই সান্ত্বনায়।

আমি তো চাইনি কিছুই শুধু আপন নীড়ের ছায়ায়
আপন বীণার সুরে ভুবন ভ’রে দিতে প্রেমের মায়ায়,
ভাঙিল যে ঘর ঝড়ের বায়,
হায় হায় হায়!

উপসংহার (Conclusion)

পরিশেষে বলা যায়, ‘প্রান্তরের গান আমার’ কেবল একটি গান নয়, এটি বাংলা আধুনিক সংগীতের ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল। সলিল চৌধুরীর জাদুকরি কম্পোজিশন আর উৎপলা সেনের মায়াবী কণ্ঠের এই মেলবন্ধন সাত দশক পেরিয়ে আজও শ্রোতাদের মনে দোলা দিয়ে যায় এবং গ্রামীণ মেঠো সুরের এই ক্লাসিক সৃষ্টি চিরকাল বাঙালির হৃদয়ে বেঁচে থাকবে।

আরো পড়ুন

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ২ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ২৯ মে ২০২৬ তারিখে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো।

Leave a Comment