গণসংগীতের মাইলফলক: বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা গানের প্রেক্ষাপট ও বিশ্লেষণ

সলিল চৌধুরীর কালজয়ী সৃষ্টি ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা’ বাংলা গণসংগীতের ইতিহাসে এক অবিনাশী মাইলফলক। ১৯৪৫ সালের উত্তাল রাজনৈতিক আবহে রচিত এই গানটি হয়ে উঠেছিল শোষিত মানুষের হৃদয়ের গর্জন। ব্রিটিশ শাসন পরবর্তী সময়ে যখন স্বাধীন দেশেও রাষ্ট্রীয় জুলুম ও সাধারণ মানুষের ওপর নিপীড়ন থামেনি, তখনই এটি প্রতিবাদের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তৎকালীন কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত সলিল চৌধুরী তার এই সুরের মধ্য দিয়ে মেহনতি মানুষের বঞ্চনা এবং কারাবন্দি রাজবন্দিদের ওপর হওয়া অবিচারের বিরুদ্ধে এক আপসহীন ও জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

কাব্যিক উপাদানের বিশ্লেষণ

গানটির কথা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সরাসরি শাসকগোষ্ঠীর দিকে আঙুল তোলে। গানটি মূলত শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের চূড়ান্ত হুঙ্কার। এখানে ‘বিচারপতি’ বলতে কেবল আদালতের বিচারক নয়, বরং তৎকালীন শোষক সমাজ ব্যবস্থাকে বোঝানো হয়েছে। কবি বিশ্বাস করেন, জনতার আদালতই শেষ পর্যন্ত সব অন্যায়ের হিসাব নেবে।

  • বিপরীতধর্মী চিত্রকল্প: গানের শুরুতেই শাসক ও শাসিতের ক্ষমতার লড়াই স্পষ্ট। একদিকে আছে ‘গুলি’, ‘ফাঁসি’ ও ‘কারাগার’, অন্যদিকে আছে জাগ্রত ‘জনতা’। শোষকের পেশিশক্তির বিপরীতে জনতার নৈতিক শক্তির জয়গান এখানে ফুটে উঠেছে।
  • ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কবি এখানে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন:
    • ক্ষুদিরামের রক্তবীজ: ক্ষুদিরাম বসুর আত্মত্যাগ কীভাবে হাজারো বিপ্লবীর জন্ম দিয়েছে, তা ‘রক্তবীজ’ রূপকের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে।
    • জালিয়ানওয়ালার রক্তস্নান: জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের নিষ্ঠুরতা যে জনগণের জেদকে বাড়িয়ে দিয়েছে, তা এখানে স্পষ্ট।
  • নিয়তির পরিহাস ও পরিবর্তন: ‘আমীর’ এবং ‘রাজা-মহারাজা’—যারা বর্তমানে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, ভবিষ্যতে তারাই যে কাঠগড়ায় দাঁড়াবে, কবি সেই অমোঘ পরিণতির কথা বলেছেন। এটি সামাজিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের (Revolution) সংকেত।
  • মানবিক ও আধ্যাত্মিক আত্মসমর্পণ: গানের শেষে কবি ‘বিধাতা’ সম্বোধন করে শাসকের দম্ভ চূর্ণ হওয়ার কথা বলেছেন। এখানে বিধাতা বলতে সেই সর্বশক্তিমান শাসককে বোঝানো হয়েছে, যাকে একদিন সাধারণ মানুষের পায়ের কাছে মাথা নত করে ক্ষমা চাইতে হবে।

🎥 গানটি শুনুন এখানে

সুরের বৈশিষ্ট্য

সুরের জাদুকর সলিল চৌধুরী এই গানে এমন এক বলিষ্ঠ তাল ও লয়ের সমন্বয় ঘটিয়েছেন, যা মুহূর্তেই শ্রোতার মনে এক বিপ্লবী উদ্দীপনা জাগিয়ে তোলে। গানটি মূলত সমবেত কণ্ঠ বা ‘কোরাস’ হিসেবে গাওয়ার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ জনতাকে একটি অভিন্ন সুরে ঐক্যবদ্ধ করা এবং সম্মিলিত প্রতিবাদের মাধ্যমে তাদের অধিকার আদায়ের পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব

বাংলার যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন কিংবা অধিকার আদায়ের মিছিলে এই গানটি আজও এক অপরিহার্য অনুপ্রেরণা। এটি কেবল সুর ও বাণীর সমষ্টি নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণের এক কালজয়ী প্রতীক। সলিল চৌধুরীর এই সৃষ্টি কালকে জয় করে প্রমাণ করেছে যে, শিল্প ও সংগীত কীভাবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। আজও যখনই সামাজিক অবিচার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তখনই ‘আজ জেগেছে এই জনতা’ পঙ্ক্তিটি প্রতিবাদী মানুষের হৃদয়ে বিদ্রোহের মূলমন্ত্র হয়ে প্রতিধ্বনিত হয়।

গানের কথা

বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা —
আজ জেগেছে এই জনতা,
তোমার গুলির, তোমার ফাঁসির,
তোমার কারাগারের পেষণ শুধবে তারা ওজনে তা
এই জনতা।।

তোমার সভায় আমীর যারা,
ফাঁসির কাঠে ঝুলবে তারা
তোমার রাজা- মহারাজা, করজোড়ে মাগবে বিচার
ঠিক জেনো তা এই জনতা।।

তারা,  নতুন প্রাতে প্রাণ পেয়েছে, প্রাণ পেয়েছে প্রাণ পেয়েছে
তারা,  ক্ষুদিরামের রক্তবীজে প্রাণ পেয়েছে প্রাণ পেয়েছে
তারা,  জালিয়ানের রক্তস্নানে প্রাণ পেয়েছে প্রাণ পেয়েছে
তারা,  ফাঁসির কাঠে জীবন দিয়ে প্রাণ পেয়েছে, প্রাণ পেয়েছে।

নিঃস্ব যারা সর্বহারা তোমার বিচারে
সেই নিপীড়িত জনগণের পায়ের ধারে

ক্ষমা তোমায় চাইতে হবে নামিয়ে মাথা হে বিধাতা
রক্ত দিয়ে শুধতে হবে নামিয়ে মাথা হে বিধাতা
ঠিক জেনো তা এই জনতা এই জনতা।।

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী

১. ‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা’ গানটি কার লেখা ও সুর করা?
উত্তর: এই কালজয়ী গানটি প্রখ্যাত সংগীতজ্ঞ ও সুরকার সলিল চৌধুরীর লেখা এবং সুর করা।

২. গানটি কোন প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছিল?
উত্তর: গানটি ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশ ভারতের উত্তাল রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাষ্ট্রীয় শোষণ এবং কারাবন্দি রাজবন্দিদের ওপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদে রচিত হয়েছিল।

৩. বাংলা গণসংগীতে এই গানটির গুরুত্ব কী?
উত্তর: এটি বাংলা গণসংগীতের একটি মাইলফলক। গানটি সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে এবং শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আজও এক শক্তিশালী অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।

৪. গানটি কেন কোরাস বা সমবেত কণ্ঠে গাওয়ার জন্য জনপ্রিয়?
উত্তর: গানটির তাল ও লয় অত্যন্ত বলিষ্ঠ এবং এর সুর এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যা অনেক মানুষ একসাথে গেয়ে গণজাগরণ সৃষ্টি করতে পারে। একারণেই মিছিল বা আন্দোলনে এটি কোরাস হিসেবে গাওয়া হয়।

৫. বর্তমান সময়েও এই গানটি কেন প্রাসঙ্গিক?
উত্তর: যখনই সমাজে অবিচার বা সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করা হয়, তখনই এই গানের প্রতিবাদী বাণীগুলো মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর হয়ে ফিরে আসে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. লেখাটি ৪ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে সুধীর চক্রবর্তী সংকলিত ও সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা ১৫৫ থেকে।

Leave a Comment