অধ্যাপক কাজী ফারুক আহাম্মদ: একজন বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারকের জীবনী

অধ্যাপক কাজী ফারুক আহাম্মদ (জন্ম: ২৬ মার্চ, ১৯৬৬) বাংলাদেশের একজন বরেণ্য শিক্ষাবিদ এবং আধুনিক ও উদার জীবনদর্শনের অধিকারী এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং উদারতাবাদের আদর্শে গভীরভাবে বিশ্বাসী। একজন পরমতসহিষ্ণু ও প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি যেমন একজন আদর্শবান শিক্ষক, তেমনি একজন দায়িত্বশীল অভিভাবক। শৈশবেই পিতৃহারা হলেও, শতবর্ষী জননীকে নিয়ে চল্লিশোর্ধ্ব সদস্যের এক বিশাল যৌথ পরিবারকে তিনি অত্যন্ত সুনিপুণ ও মমতা দিয়ে আগলে রাখছেন।

কাজী ফারুক আহাম্মদ ১৯৬৬ সালের ২৬ মার্চ গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার পৈলানপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মো. সুরুজ মিয়া এবং মাতা মজিরুন বেগম। ছয় ভাইয়ের মধ্যে তিনি পঞ্চম। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় খৈপড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এবং সেখান থেকেই তিনি ১৯৭৫ সালে পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি খৈপড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং ১৯৭৮ সালে অষ্টম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। তিনি ১৯৮১ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কালীগঞ্জ রাজেন্দ্র নারায়ণ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান শাখায় প্রথম বিভাগে এস এস সি পাস করেন।

উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে তিনি মানবিক বিভাগে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৮৪ সালে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে কালীগঞ্জ শ্রমিক কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে এইচ এস সি পাস করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সমাজকল্যাণ বিষয়ে ১৯৮৭ সালে সম্মানসহ দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি একই বিষয়ে ১৯৮৮ সালে দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

বর্ণাঢ্য কর্মজীবন ও প্রশাসনিক সাফল্য

কাজী ফারুক আহাম্মদ তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সক্রিয় ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন; তিনি ১৯৮৫-৮৬ সালে বাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি সরকারি চাকরিতে পদার্পণ করেন এবং ১৯৯৩ সালের ২০ অক্টোবর ১৪তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের মাধ্যমে ফেনীর পরশুরাম কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি ফেনী, কুমিল্লা, গৌরীপুর, গফরগাঁও এবং ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী আনন্দমোহন কলেজে প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তাঁর দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতায় নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজ একটি বিশেষ অধ্যায়; যেখানে তিনি ২০১৭ সালের ২৩ মে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে এবং একই বছরের ১৯ ডিসেম্বর উপাধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হন। ২০২০ সালের ৪ আগস্ট তিনি অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করেন। এরপর ২০২১ সালের ৯ আগস্ট তিনি গফরগাঁও সরকারি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন এবং বর্তমানে সেখানে সফলভাবে প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

শিক্ষা বিস্তার ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন

শিক্ষাক্ষেত্রে কাজী ফারুক আহাম্মদের অবদান কেবল শ্রেণিকক্ষেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক প্রসারেও তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত উজ্জ্বল। তিনি ২০১৫ সালে নিজ গ্রামে তাঁর মায়ের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘পৈলানপুর মজিরুন বেগম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও নিজ এলাকার শিক্ষা প্রসারে তিনি একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন। প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনকালে তিনি গফরগাঁও সরকারি কলেজের সামগ্রিক অবকাঠামোগত উন্নয়নে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন, যা প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গত তিন দশক ধরে বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে তাঁর নিরলস অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব স্থানীয় মহলে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়ে আসছে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. অনুপ সাদি, দোলন প্রভা, নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ, টাঙ্গন, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, জুন ২০২৪, পৃষ্ঠা ৩৩৬-৩৩৭। প্রবন্ধটির রচনাকাল ২৯ অক্টোবর, ২০২১ তারিখে।

Leave a Comment