কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী সলিল চৌধুরীর কথা ও সুরে দেশাত্মবোধক গান ‘ধন্য আমি জন্মেছি মা তোমার ধূলিতে’ বাঙালির দেশপ্রেমের এক অনন্য দলিল। কালজয়ী এই গানটি বাংলা সংগীতের ইতিহাসে একটি বিখ্যাত গণসংগীত হিসেবে সমাদৃত। মূলত ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (IPTA) সাংস্কৃতিক আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সলিল চৌধুরী যে বলিষ্ঠ দেশাত্মবোধক গানগুলো রচনা করেছিলেন, এটি তার মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। দেশের মাটির প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং শিকড়ের টান এই গানের প্রতিটি ছত্রে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।
প্রকাশকাল ও মূল শিল্পী
কালজয়ী এই গানটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫১ সালে। এর প্রথম রেকর্ডে কণ্ঠ দিয়েছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী সুচিত্রা মিত্র এবং স্বয়ং সলিল চৌধুরী। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে মহানায়ক মান্না দে এবং একদল সহশিল্পীর বলিষ্ঠ কণ্ঠে গানটি পুনরায় রেকর্ড করা হয়, যা শ্রোতাদের মধ্যে নতুনভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
বিভিন্ন শিল্পীর কণ্ঠে গানটি
মূল শিল্পীদের পাশাপাশি বাংলা সংগীতের অনেক নক্ষত্র এই দেশাত্মবোধক গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন। তাদের মধ্যে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও মান্না দে-র গায়কী গানটিকে এক ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এছাড়া আধুনিক প্রজন্মের জনপ্রিয় শিল্পী মনময় ভট্টাচার্য এবং শ্রীকান্ত আচার্য-র কণ্ঠেও গানটি সমানভাবে সমাদৃত হয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই গানটি বাঙালির দেশপ্রেমের প্রেরণা হয়ে আজও অমলিন।
গানটি শুনুন সোমনাথ মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে
গানের মূল ভাববস্তু ও অন্তর্নিহিত চেতনা
“ধন্য আমি জন্মেছি মা তোমার ধূলিতে” গানটির পরতে পরতে জন্মভূমির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগের অঙ্গীকার মিশে আছে। গানের পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে হিমালয়ের মহিমা থেকে শুরু করে কোটি প্রাণের জাগরণের এক অভূতপূর্ব ছবি আঁকা হয়েছে। সলিল চৌধুরী এখানে কেবল মাটির বন্দনা করেননি, বরং দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য লড়াই এবং পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক বলিষ্ঠ আহ্বান জানিয়েছেন। এই সুর ও বাণী আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে দেশপ্রেমের অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে দেয়।
গানের কথা
ধন্য আমি জন্মেছি মা তোমার ধূলিতে,
আমার জীবন-মরণে তোমায় চাই না ভুলিতে।
আমি তোমার তরে স্বপ্ন রচি আমার যত গান,
তোমার কারণেই দেব জীবন বলিদান
ওগো জন্মভূমি মা গো মা –
মাটি তোমার সোনা খাঁটি মাঠে সোনার ধান,
ক্ষেত খামারে, কলে খাটে কোটি সোনার প্রাণ।
তবু নিজভূমে পরবাসী হায় রে দিনমান।
মাগো তোমার পানে চেয়ে যায় –
হিমালয় আর নিদ্রা নয়,
কোটি প্রাণ চেতনায় বরাভয়,
জাগো ক্রান্তির হয়েছে সময়,
আনো মুক্তির খরবন্যা।।
তোমারই সন্তান মোরা তোমারই সন্তান,
তুচ্ছ বিভেদ-বিষে কত হয়েছি হয়রান।
তখন দেখিনি মা ঘরে ঘরে কেঁদে কাটাও কাল,
আর গোপনে মরণ কাটে সর্বনাশের খাল।।
ওগো জন্মভূমি মা গো মা-
আজ তোমার ঘরে শিশুর হাসি মায়ের যত প্রাণ,
বন্ধ্যা-মাটি না-ফোটা প্রেম অগীত সব গান
দিয়েছে ডাক এবার মোরা পেলাম সমাধান
মাগো সবার মিলন-মোহানায় –
আমাদের দেশ আমার মাটি
ক্ষেত খামারে কলে আমরা খাটি
আমাদের দেশে যা কিছু খাঁটি
হবে সবার পরশে ধন্যা॥
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, “ধন্য আমি জন্মেছি মা তোমার ধূলিতে” কেবল একটি গান নয়, বরং এটি প্রতিটি বাঙালির দেশপ্রেমের এক চিরন্তন বহিঃপ্রকাশ। সলিল চৌধুরীর জাদুকরী সৃষ্টি আর গুণী শিল্পীদের কণ্ঠের মূর্ছনায় গানটি আজও আমাদের হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে। সময়ের বিবর্তনে অনেক গান হারিয়ে গেলেও, দেশমাতৃকার প্রতি গভীর মমত্ববোধের এই সুর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বাঙালির আত্মপরিচয় বহন করে চলবে।
আরো পড়ুন
- ধন্য আমি জন্মেছি মা তোমার ধূলিতে: সলিল চৌধুরীর কালজয়ী দেশাত্মবোধক গানের ইতিহাস ও লিরিক্স
- মুক্তির মন্দির সোপান তলে: মোহিনী চৌধুরীর কালজয়ী গানের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট
- শোন ওরে ও শহরবাসী শিল্পী বিনয় রায়ের কথা ও সুরে রচিত একটি কালজয়ী গণসংগীত
- ‘সপ্তকোটি জনরঙ্গভূমি’: বিনয় রায়ের হারানো গণসংগীতের ইতিহাস ও প্রথম রেকর্ডিং
- ‘নবজীবন তরঙ্গাঘাতে’: বিনয় রায়ের হারিয়ে যাওয়া সেই বিপ্লবী গণসংগীতের ইতিহাস
- ‘আর কতকাল, বলো কতকাল’: অহল্যা মায়ের গান ও নকশালবাড়ি আন্দোলনের অবিনাশী সুর
- ‘নেতাজী সুভাষচন্দ্র সে তুমি দুলাল বাংলা মার’: সজনীকান্ত দাসের শ্রদ্ধার্ঘ্য ও একটি হারানো সুরের কথা
- ‘বন্ধন-ভয় তুচ্ছ করেছি’: সজনীকান্ত দাসের কলমে স্বাধীনতার অমর সংকল্প ও ইতিহাস
- ‘তেলের শিশি ভাঙল বলে’: অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছড়ায় লুকানো গভীর সামাজিক শ্লেষ ও বিশ্লেষণ
- ‘এসো মুক্ত করো’: জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের কালজয়ী গণসংগীতের ইতিহাস ও বিশ্লেষণ
তথ্যসূত্র ও টিকা
১. লেখাটি ১ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা সুধীর চক্রবর্তী সংকলিত ও সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা ১৫৪-১৫৫ থেকে নেয়া হয়েছে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।