‘তেলের শিশি ভাঙল বলে খুকুর পরে রাগ করো’—অন্নদাশঙ্কর রায়ের লেখা বিখ্যাত ‘খুকু ও খোকা’ বা ‘খুকুর বিদ্রূপ’ বাংলা কবিতার এই পঙক্তিগুলো বাঙালির শৈশব ও সমাজভাবনার এক অনবদ্য অংশ। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে রচিত এই ছড়াটি কেবল শিশুদের আনন্দের খোরাক নয়, বরং এর আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক শ্লেষ। কবি অত্যন্ত সহজ ও সরল ছন্দে সমকালীন সমাজের দ্বিচারিতা এবং তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনের প্রতি এক চতুর কটাক্ষ ছুড়ে দিয়েছেন।
কবিতাটির প্রেক্ষাপট বিচার করলে দেখা যায়, এখানে ছোট একটি ঘটনার সঙ্গে বৃহৎ এক ক্ষতির তুলনা করা হয়েছে। একটি শিশু তেলের শিশি ভেঙে ফেললে বড়রা যেভাবে চিৎকার করে তাকে শাসন করে, সেই একই সমাজ বা শাসকরা যখন দেশ বা দশের বড় বড় ক্ষতি সাধন করে বা দেশ ভাগের মতো বড় ধ্বংসযজ্ঞ ঘটায়, তখন সবাই নিশ্চুপ থাকে। কবি এখানে দেখিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষের তুচ্ছ ভুল নিয়ে আমরা যতটা সরব, ক্ষমতাশালীদের বড় বড় অপরাধ বা অবিচারের বেলায় আমরা ততটাই উদাসীন। এই বৈপরীত্যই কবিতাটির মূল উপজীব্য।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৪৭-এর ভারত ভাগের সময়কার বিশৃঙ্খলা এবং স্বার্থপর রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের ঘৃণা এই কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।ভাষাশৈলীর দিক থেকে কবিতাটি অত্যন্ত চটপটে এবং ছন্দোময়। অন্নদাশঙ্কর রায় শিশুতোষ আঙ্গিকে গম্ভীর জীবনবোধ ফুটিয়ে তুলতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। খুকুর সেই সরল প্রশ্নগুলো—যেখানে সে বড়দের কাজের জবাবদিহি চায়—তা আজও প্রাসঙ্গিক।
পরিশেষে বলা যায়, ‘তেলের শিশি ভাঙলো বলে’ গানটি কেবল একটি ছড়া নয়, এটি বিবেককে জাগ্রত করার একটি ডাক। এটি আমাদের শেখায় ক্ষুদ্র স্বার্থের চেয়ে বৃহত্তর ক্ষতিকে চিহ্নিত করা বেশি জরুরি। সমসাময়িক যেকোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে আজও এই পঙক্তিগুলো সমানভাবে প্রভাবশালী এবং কালজয়ী।
সুরারোপকৃত গান হিসেবে
গান হিসেবেও এটি বিভিন্ন সময়ে সুরারোপিত হয়ে জনপ্রিয় হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও বিদ্রূপ প্রকাশের একটি শৈল্পিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এই কবিতাটি প্রথম সুরারোপ করেন সলিল চৌধুরী এবং সলিলের সুরে গেয়েছিলেন বাণী ঘোষাল।
গান হিসেবে ব্যবহৃত কবিতাটির কথা
তেলের শিশি ভাঙল বলে
খুকুর পরে রাগ করো
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা
ভারত ভেঙে ভাগ করো!
তার বেলা, তার বেলা, তার বেলা? ঐ
ভাঙছ প্রদেশ ভাঙছ জেলা
জমিজমা ঘরবাড়ী।
পাটের আড়ৎ ধানের গোলা
করখানা আর রেলগাড়ী!
তার বেলা, তার বেলা, তার বেলা?
চায়ের বাগান কয়লাখনি
কলেজ থানা আপিস-ঘর।
চেয়ার টেবিল দেয়ালঘড়ি
পিয়ন পুলিশ প্রোফেসর!
তার বেলা, তার বেলা, তার বেলা? ঐ
যুদ্ধ জাহাজ জঙ্গি মোটর
কামান বিমান অশ্ব উট
ভাগাভাগির ভাঙাভাঙির
চলছে যেন হরির-লুট !
তেলের শিশি ভাঙল বলে
খুকুর পরে রাগ করো
তোমরা যে সব ধেড়ে খোকা
বাঙলা ভেঙে ভাগ করো!
তার বেলা, তার বেলা, তার বেলা?[১]
আরো পড়ুন
- ধন্য আমি জন্মেছি মা তোমার ধূলিতে: সলিল চৌধুরীর কালজয়ী দেশাত্মবোধক গানের ইতিহাস ও লিরিক্স
- মুক্তির মন্দির সোপান তলে: মোহিনী চৌধুরীর কালজয়ী গানের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট
- শোন ওরে ও শহরবাসী শিল্পী বিনয় রায়ের কথা ও সুরে রচিত একটি কালজয়ী গণসংগীত
- ‘সপ্তকোটি জনরঙ্গভূমি’: বিনয় রায়ের হারানো গণসংগীতের ইতিহাস ও প্রথম রেকর্ডিং
- ‘নবজীবন তরঙ্গাঘাতে’: বিনয় রায়ের হারিয়ে যাওয়া সেই বিপ্লবী গণসংগীতের ইতিহাস
- ‘আর কতকাল, বলো কতকাল’: অহল্যা মায়ের গান ও নকশালবাড়ি আন্দোলনের অবিনাশী সুর
- ‘নেতাজী সুভাষচন্দ্র সে তুমি দুলাল বাংলা মার’: সজনীকান্ত দাসের শ্রদ্ধার্ঘ্য ও একটি হারানো সুরের কথা
- ‘বন্ধন-ভয় তুচ্ছ করেছি’: সজনীকান্ত দাসের কলমে স্বাধীনতার অমর সংকল্প ও ইতিহাস
- ‘তেলের শিশি ভাঙল বলে’: অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছড়ায় লুকানো গভীর সামাজিক শ্লেষ ও বিশ্লেষণ
- ‘এসো মুক্ত করো’: জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের কালজয়ী গণসংগীতের ইতিহাস ও বিশ্লেষণ
বাণী ঘোষালের কণ্ঠে গানটি শুনুন ইউটিউব থেকে
টিকা
১. শিশির চক্রবর্তী সংকলিত, পাঁচদশকের আধুনিক বাংলা গানের গীতবিতান এ শুধু গানের দিন, পত্রভারতী কলকাতা, দ্বিতীয় মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৮, পৃষ্ঠা-১৯৬।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚