সপ্তকোটি জনরঙ্গভূমি বঙ্গদেশ বীর-প্রসবিনী গানটি আধুনিক বাংলা গণসংগীতের ইতিহাসের অন্যতম একটি প্রতিবাদী জাগরণী সৃষ্টি। প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী ও ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (IPTA) অন্যতম সংগঠক বিনয় রায় এই গানটি উনিশশত চল্লিশের দশকে রচনা ও সুর করেছিলেন।
পরবর্তীকালে ২০০৩ সালে রত্না ভট্টাচার্যের মূল উদ্যোগে সেই যুগের জীবিত তিন নক্ষত্র প্রীতি বন্দ্যোপাধ্যায়, রেবা রায় চৌধুরী ও মন্টু ঘোষ গানটি গেয়েছিলেন। আমরা বর্তমান লেখার সাথে ছিল বিনয় রায় রচিত ও সুরারোপিত এই ঐতিহাসিক গান ‘সপ্তকোটি জনরঙ্গভূমি’ আপনাদের কাছে অর্পণ করছি। উল্লেখ্য, গানটি ইতিপূর্বে কখনো রেকর্ড হয়নি।
গানটির ঐতিহাসিক পটভূমি ও গুরুত্ব
১৯৪০-এর দশকে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (IPTA) আন্দোলনের সময় এই গানটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। গানে চাঁদ রায়, কেদার রায়, ঈশা খাঁ এবং প্রতাপাদিত্যের মতো বাংলার বীর সন্তানদের বীরত্বের কথা উল্লেখ করে সমকালীন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে।
গানটির বিষয়বস্তু
গানটি মূলত পরাধীন ভারতের প্রেক্ষাপটে দেশপ্রেম, ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও জাগরণের আহ্বান জানিয়ে রচিত। এতে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ বাংলার বীরত্বগাথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আপামর জনতাকে ভীরুতা ও জড়তা ত্যাগ করে জেগে ওঠার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গানটির কথাসমূহ
সপ্তকোটি জনরঙ্গভূমি
বঙ্গদেশ বীর-প্রসবিনী
হতনাম শৃঙ্খলিত দলিতা, শতাব্দীর সঞ্চিত ভীরু জড়তা,
দীনতা ত্যজি নবযৌবন ভরে জাগো জাগো রে।
চাঁদ কেদার রায় সন্তান
ইসলাম তিলক ঈশা খান
প্রতাপাদিত্য সেন বল্লাল
রাণী ভবানী কন্যা দুলাল
বারভূঁইয়া বীর গাথা স্মরিয়া জাগো জাগো রে।
কোথা সুখ সমৃদ্ধি আজ
স্বাধীন রাজ নবাব সিরাজ
পলাশীর আম্রকুঞ্জ হ’ল কাল
সফল হ’ল দেশবৈরীকৃত জাল
রাখিল বীর মীর মদন-মোহনলাল সম্মান।
শুরু হ’ল দেশ জোড়া
রাজ্য ভাঙাগড় – ঘোর অন্ধকার
পশে সস্তা পণ্য সাথে ।
গোরা সৈন্য সাথে – বণিকের কারবার (পশিল )
গেল মসলিনের ব্যাওগার, সেথা আসে ‘ল্যাঙ্কাশায়ার’
নীলকর সাহেবের কুঠি কৃষকের হ’ল কারাগার।
গোলামির সর্বগ্রাসী জঠরে।
বণিকী অত্যাচারে লাজে ভয়ে ভরে
দেশের দশে মরে ঘোর হতাশায়
তথাপি আশার আলো ঝালকায়
বঙ্গবাসী মোহনিদ্রা ত্যজি জাগে পুনরায় ।
জরাজীর্ণ সমাজে ব্রাহ্মরূপ দিল রাজা রামমোহন,
দীনবন্ধু রচিল নীলকুঠি স্মরি নাটক নীল-দর্পণ।
হাজী মহম্মদ মহসীন, এলো বিদ্যাসাগর নবীন
বঙ্কিম বঙ্গজনে বন্দে মাতরম করিল অর্পণ।
আরো পড়ুন
- ধন্য আমি জন্মেছি মা তোমার ধূলিতে: সলিল চৌধুরীর কালজয়ী দেশাত্মবোধক গানের ইতিহাস ও লিরিক্স
- মুক্তির মন্দির সোপান তলে: মোহিনী চৌধুরীর কালজয়ী গানের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট
- শোন ওরে ও শহরবাসী শিল্পী বিনয় রায়ের কথা ও সুরে রচিত একটি কালজয়ী গণসংগীত
- ‘সপ্তকোটি জনরঙ্গভূমি’: বিনয় রায়ের হারানো গণসংগীতের ইতিহাস ও প্রথম রেকর্ডিং
- ‘নবজীবন তরঙ্গাঘাতে’: বিনয় রায়ের হারিয়ে যাওয়া সেই বিপ্লবী গণসংগীতের ইতিহাস
- ‘আর কতকাল, বলো কতকাল’: অহল্যা মায়ের গান ও নকশালবাড়ি আন্দোলনের অবিনাশী সুর
- ‘নেতাজী সুভাষচন্দ্র সে তুমি দুলাল বাংলা মার’: সজনীকান্ত দাসের শ্রদ্ধার্ঘ্য ও একটি হারানো সুরের কথা
- ‘বন্ধন-ভয় তুচ্ছ করেছি’: সজনীকান্ত দাসের কলমে স্বাধীনতার অমর সংকল্প ও ইতিহাস
- ‘তেলের শিশি ভাঙল বলে’: অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছড়ায় লুকানো গভীর সামাজিক শ্লেষ ও বিশ্লেষণ
- ‘এসো মুক্ত করো’: জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের কালজয়ী গণসংগীতের ইতিহাস ও বিশ্লেষণ
প্রীতি বন্দ্যোপাধ্যায়, রেবা রায় চৌধুরী ও মন্টু ঘোষর কণ্ঠে গানটি শুনুন ইউটিউব থেকে
বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚