নবজীবন তরঙ্গাঘাতে হ’ল বঙ্গভূমি সিঞ্চিতা গানটি আধুনিক বাংলা গণসংগীতের ইতিহাসের অন্যতম একটি প্রতিবাদী জাগরণী সৃষ্টি। প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী ও ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (IPTA) অন্যতম সংগঠক বিনয় রায় এই গানটি উনিশশত চল্লিশের দশকে রচনা ও সুর করেছিলেন।
গানটির ঐতিহাসিক পটভূমি ও গুরুত্ব
গানটি স্বাধীনতার আগের এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন বাংলা ও ভারতের সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলন ও জনগণের জাগরণের ইতিহাসকে তুলে ধরে। সেই সময় লক্ষ জনতা স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সেই মহান জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে বিনয় রায় এই গানটি রচনা করেন। গানটির সুর সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। গানটি ইদানিং গাওয়া হয়নি।
নবজীবন তরঙ্গাঘাতে হ’ল বঙ্গভূমি সিঞ্চিতা গানের মূলভাব
নতুন জীবনের জোয়ারে বাংলা আজ সিক্ত, আর সাধারণ মানুষের মন যেন ভোরের কুঁড়ির মতো জেগে উঠছে। বিশ্বকবির তেজোদীপ্ত অনুপ্রেরণায় গোটা বাংলা আজ দেশপ্রেমের বন্যায় ভাসছে। ভারতের স্বাধীনতার লড়াইয়ে বাংলা সবার সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। কিন্তু এই উজ্জ্বল পথ চলা সহজ ছিল না; ঘোর অন্ধকারে স্বার্থপরতার বিষাক্ত ছোবল বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিষ্ঠুর ও লোভী বণিকেরা নিজেদের স্বার্থে বিদেশিদের কাছে মাথা নত করেছে, যাদের হাত ছিল সাধারণ মানুষের রক্তে রাঙানো।
ঘোর অন্ধকারের মাঝেও সাধারণ মানুষের ঐক্য আর সাহস মনে আশা জাগাচ্ছে। কোটি কোটি মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বাধীনতার নেশায় সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। এক সময় যে সাধারণ মানুষ অবহেলিত ছিল, তারা আজ নরকতুল্য পরাধীনতা থেকে মুক্তি পেয়ে বিজয়ের রথে চড়ে সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলার মানুষের সব ভয় আর মায়া আজ কেটে গেছে। চারিদিকে নতুন প্রাণের ছোঁয়া লেগেছে আর আমাদের বাংলা নতুন রূপে, সজীবতায় জেগে উঠেছে।
গানটির কথাসমূহ
নবজীবন তরঙ্গাঘাতে হ’ল বঙ্গভূমি সিঞ্চিতা,
চাহিল জনমন-কলি আঁখি মেলিয়া প্রাতে।
হের বিশ্বকবি রবি জাগি নবদৃপ্ত তেজে ছাইল
ভাসিল বঙ্গভূমি দেশপ্রেমের বন্যাতে।
শুরু হ’ল জাতীয় জাগরণ মুক্তির রণ দারুণ
সেথা পুরোভাগে বঙ্গ জাগে ভারতে।
যেথা উজলা চাঁদের হাটে লক্ষ তারার ছিল মেলা,
সেথা ঘোর অন্ধকারে দুর্গম হ’ল পথ চলা।
সেথা স্বার্থে স্বার্থে চলে বিষাক্ত সর্পের খেলা।
ধনী বণিকের ক্রূরমতি পদে পদে জানায় তারা নতি
( ক্রুর মনে বক্র ভীরু গতি )
বিদেশীর খুনে রাঙা চরণে।
বজ্রসম এ আঁধারে চমক লাগায় প্রাণে
ভরসা জাগায় জনতা,
কোটি কোটি কাঁধে কাঁধে কদম বাড়ায়
ঐ স্বাধীনপরান জনতা।
নরকের সর্বগ্রাসী দ্বার হতে বিজয় মনোরথে
স্বরগের পথে যাত্রা শুরু দীন হীন জনতার,
মোহ জাল ছিন্ন আজি বাংলার।
বঙ্গ আজি নবরূপ রস ফুল ফলে জাগে রে।
আরো পড়ুন
- আধুনিক বাংলা গান সমকালের রুচি ও মনন থেকে জন্ম নেওয়া এক অনন্য সুরশৈলী
- এইটুকু এই জীবনটাতে হাসতে মানা, নিষেধের বেড়াজালে বিষণ্ণ হাসির গান
- রাখালিয়া সুর আনে মৃদু সমীরণ আনন্দ মুখোপাধ্যায়ের লেখা একটি আধুনিক বাংলা গান
- এই ঝির ঝির ঝির বাতাসে এই গান ভেসে ভেসে আসে, সেই সুরে সুরে মন নাচে উল্লাসে
- বনে বনে বসন্ত আসে বকুলের গান যায় ছড়িয়ে শিরশিরে ফাল্গুনী হাওয়া
- জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেলছ জুয়া
- প্রেমেন্দ্র মিত্রের গান আধুনিক বাংলা গানের ধারায় রচিত
- থামো বন্ধু, দাঁড়াও ক্ষণেক থামি হচ্ছে প্রেমেন্দ্র মিত্রের রচিত গান
- হারা-মরু নদী, শ্রান্ত দিনের পাখি, নিভু-নিভু দীপ, আর্ত-আতুর নহ একাকী
- নাবিক আমার নোঙর ফেলো, ওই তো তোমার তীর
- আরও একটু সরে বসতে পারো, আরও একটু কাছে
- এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি, ডালে ডালে ফোটায় কে আজ বুলিয়ে রঙিন অঙ্গুলি
- যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন, শুধু দূরে যেতে কেন বলো এমন
- বিদায় সন্ধ্যা আসিল ওই ঘনায় নয়নে অন্ধকার
- যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই কেন মনে রাখ তারে
- মন-ময়ূরী ছড়ালো পেখম তারি হচ্ছে সলিল চৌধুরীর আধুনিক বাংলা প্রেমের গান
- গণসংগীত বা বাংলার প্রতিবাদী গান হচ্ছে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের জনগণের বিপ্লবী গান
- হোই হোই হোই, জাপান ঐ গানটি বিনয় রায় রচিত একটি বিখ্যাত গণসংগীত
- শোন ওরে ও শহরবাসী শিল্পী বিনয় রায়ের কথা ও সুরে রচিত একটি কালজয়ী গণসংগীত
- সপ্তকোটি জনরঙ্গভূমি বঙ্গদেশ বীর-প্রসবিনী
- নবজীবন তরঙ্গাঘাতে হ’ল বঙ্গভূমি সিঞ্চিতা
- ফিরাইয়া দে, মোদের কায়ুর বন্ধুদেরে
- আর কতকাল, বলো কতকাল, সইব এ মৃত্যু অপমান
- নেতাজী সুভাষচন্দ্র সে তুমি দুলাল বাংলা মার
- ওগো সুন্দর, মনের গহনে তোমার মূরতিখানি
- বন্ধন-ভয় তুচ্ছ করেছি উচ্চে তুলেছি মাথা
- তেলের শিশি ভাঙল বলে, খুকুর পরে রাগ করো
- নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল
- বাংলা সংগীত হচ্ছে হাজার বছর ধরে চলমান এক সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের অধিকারী
- ভয় নেই, ভয় নেই, মরণের পাল তুলে জীবন তো আসবেই
- মুক্তিরণের সাথী ওরে মুক্তিরণের সাথী
- এসো মুক্ত করো, মুক্ত করো অন্ধকারের এই দ্বার
- শেফালী তোমার আঁচলখানি বিছাও শারদ প্রাতে, চরণে চরণে তোলো রিনিঝিনি
- আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাইবা জ্বলে, কণ্ঠ-মালার বকুল যদি যায় গো দ’লে
- নজরুল গীতি হচ্ছে দেশপ্রেম, প্রেম, ধর্মসংগীতসহ রাগ ধারার গান
বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।