‘এসো মুক্ত করো’: জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের কালজয়ী গণসংগীতের ইতিহাস ও বিশ্লেষণ

‘এসো মুক্ত করো, মুক্ত করো অন্ধকারের এই দ্বার’—বাংলা গণসংগীতের ইতিহাসে এক অবিনাশী ও কালজয়ী আবেদন। গানটির দ্রোহী শব্দমালা ও উদ্দীপনাময় সুরের স্রষ্টা প্রখ্যাত কবি ও সংগীতজ্ঞ জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের (IPTA) অন্যতম পুরোধা এই ব্যক্তিত্ব তাঁর এই সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের মুক্তি আর চেতনার এক অনন্য বার্তাকে তুলে ধরেছেন।

রচনার প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব:

গানটির সৃষ্টি ১৯৪৩ সালে—যখন একদিকে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল ভারত, অন্যদিকে বাংলার বুকে নেমে এসেছে পঞ্চাশের মন্বন্তরের ভয়াবহ ছায়া। সেই দুঃসময়ে শোষিত ও বুভুক্ষু জনতাকে জাগিয়ে তোলার ব্রত নিয়েই এই রণসংগীতটি রচিত হয়। বাংলা গণসংগীতের ধারায় এটিকে ‘পিতৃপ্রতিম’ ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। গানের প্রতিটি ছত্রে রয়েছে বিপ্লবের তীব্র আহ্বান। এখানে শিল্পী ও শ্রমজীবী স্রষ্টাদের ‘বিশ্বকর্মা’ রূপে সম্বোধন করে সমাজ থেকে অশুভ আর অন্ধকারের অবসান ঘটিয়ে আলোর নবদ্বার উন্মোচনের ডাক দেওয়া হয়েছে।

সুরশৈলী ও শিল্পরূপ:

জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের এই অমর সৃষ্টিতে রবীন্দ্রসংগীতের ধ্রুপদী আভিজাত্যের সঙ্গে গণসংগীতের তেজোদীপ্ত ও বৈপ্লবিক সুরের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে। সময়ের বিবর্তনে বিভিন্ন প্রখ্যাত শিল্পী ও দলের কণ্ঠে গানটি ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে, রুমা গুহঠাকুরতার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ‘ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়্যার’-এর সমবেত পরিবেশনা এবং নাট্যব্যক্তিত্ব শম্ভু মিত্রের আবৃত্তিধর্মী গায়কী গানটিকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।

এসো মুক্ত করো গানের কথাসমূহ

এসো মুক্ত করো, মুক্ত করো অন্ধকারের এই দ্বার
এসো শিল্পী, এসো বিশ্বকর্মা, এসো স্রষ্টা
রস রূপ মন্ত্র দ্রষ্টা,
ছিন্ন করো, ছিন্ন করো বন্ধনের এ অন্ধকার।।

দিকে দিকে ভেঙ্গেছে যে শৃংখল,
দুগর্ত দলিতেরা পায় বল।
এ শুভ-লগ্নে আজ   তাই তোমার স্মরণ করি
রূপকার
এসো মুক্ত কর হে এই দ্বার।।

উঠেছে যে জীবনের লক্ষ্মী মৃত্যু-সাগর মন্থনে,
নূতন পৃথিবী চায় শিল্পীর বরাভয় নব সৃষ্টির
শুভক্ষণে।

এসো সমিতির সাম্য ও ঐক্যে,
এসো জনতার মুখরিত সখ্যে,
এসো দু:খ তিমির ভেদি দুর্গম ধ্বংসে,
মৃত্যু আঘাত করি চূর্ণ,
এসো প্রাণের আধার করি পূর্ণ।

গানটি ইউটিউব থেকে শুনুন

উপসংহার

পরিশেষে বলা যায়, ‘এসো মুক্ত করো’ কেবল একটি গান নয়, বরং এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার একটি চিরন্তন শক্তি। ১৯৪৩ সালের সেই অন্ধকার সময়ে জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র যে আশার প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন, আজও যেকোনো সামাজিক সংকটে বা শোষণের বিরুদ্ধে এই গান আমাদের প্রেরণা জোগায়। সৃষ্টির এই আলোকবর্তিকা প্রতিটি মানুষের অন্তরে অন্ধকারের দ্বার ভেঙে নতুনের আবাহন ঘটুক—এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

আরো পড়ুন

বিশেষ দ্রষ্টব্য ও টিকা

১. লেখাটি ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা সুধীর চক্রবর্তী সংকলিত ও সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা ১৩৩ থেকে নেয়া হয়েছে।

Leave a Comment