জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র ছিলেন বিংশ শতকের কবি, লেখক, গীতিকার

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মৈত্র (নভেম্বর ১১, ১৯১১ – অক্টোবর ২৬, ১৯৭৭) ছিলেন বিংশ শতাব্দীর আধুনিক বাঙালি কবি, লেখক, গায়ক। গান লেখা, সুর সংযোগ, চলচ্চিত্রসহ রাজনৈতিক কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন। ছাত্রজীবন থেকে কবিতা লিখতেন। পরবর্তীতে সঙ্গীত সাধনা শুরু করেন এবং খ্যাতি অর্জন করেন।  ১৯৩৯-৪০ খ্রি. কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হয়ে নানাভাবে সাংগঠনিক কাজ করেন।[১]

বাল্যকাল:

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মৈত্রের জন্ম ১৯১১ সালে পাবনা জেলার শীতলাই গ্রামে। । জমিদার পিতা যোগেন্দ্রনাথ পাবনার তৎকালীন জাতীয় আন্দোলনের নেতা ছিলেন। মাতা সরলা দেবী। প্রখ্যাত গায়ক, কবি।

শিক্ষাজীবন ও সাহিত্যচর্চা:

কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বি.এসসি. ও পরে বি.এ. পাশ করেন। ইংরেজিতে এম.এ. পড়ার সময় কবি বিষ্ণু দে তাঁর সতীর্থ ছিলেন। কবিতা লেখা শুরু ১৯২৮-২৯ খ্রি. থেকে। ছাত্রাবস্থায় তাঁর রচিত কবিতা পরিচয় ও বিভিন্ন বিশিষ্ট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ত্রিশঙ্কু ছদ্মনামে অগ্রণী পত্রিকায় তাঁর কবিতা ১৯৩৮ খ্রি. প্রকাশিত হয়।

তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতার বই ‘রাজধানী ও মধুবংশীর গলি’ (অগ্র ১৩৭৮ ব.)। ১৯৪৩ এর শেষের দিকে তাঁর ‘মধুবংশীর গলি’ জনসভায় একক বা যুগ্মভাবে আবৃত্তি করা হত। শম্ভু মিত্রের কণ্ঠে ‘মধুবংশীর গলি’ শ্রোতাদের তন্ময় করে দিত। পঞ্চাশের মন্বন্তরের মর্মান্তিক পরিস্থিতির অভিজ্ঞতায় লেখেন ‘নবজীবনের গান’।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মৈত্র-এর সঙ্গীত সাধনা:

ক্লাসিকাল সংগীতে শিক্ষা হরিচরণ চক্রবর্তী, ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়, কালীনাথ চট্টোপাধ্যায় ও আশফাক হোসেনের কাছে। সরলা দেবীচৌধুরানী, ইন্দিরা দেবী ও অনাদি দস্তিদারের কাছে রবীন্দ্রসংগীতের তালিম নেন। অল্পবয়স থেকেই সেতার, এস্রাজ, তবলা ও ঢাক বাজাতে শিখেছিলেন। এছাড়া কৈশোর থেকে তিনি বাজাতে পারতেন সেতার, এসরাজ, তবলা আর ঢাক। পাশ্চাত্য সংগীত এবং বাংলা লোকসংগীতেও তার উৎসাহ ছিল।

১৯৩৯ সাল থেকে জ্যোতিরিন্দ্র যোগ দেন প্রগতি আন্দোলনে এবং রচনা করেন ‘নবজীবনের গান’। পরে অনেক চলচ্চিত্রে তিনি সুর দেন। পঞ্চাশের দশকে তিনি দিল্লীপ্রবাসী হন এবং সেখানকার সংগীত নাটক একাডেমি ও ভারতীয় কলাকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হন। গানের সূত্রে ভারতের নানা জায়গা এবং মস্কো ও পূর্ব জার্মানী ভ্রমণ করেন। পাশ্চাত্য সংগীতেও অনুসন্ধিৎসা ছিলো। তাঁর রচিত ‘নবজীবনের গান’-এ ভারতীয় মার্গসংগীতের সঙ্গে পাশ্চাত্য সংগীতের সমন্বয় লক্ষণীয়। তা ছাড়া লোকসংগীতকেও তিনি বিভিন্নভাবে ব্যবহার করেছেন।[২][৩]

আরো পড়ুন:  এম এ মতিন ছিলেন বিপ্লবী নেতা, বুদ্ধিজীবি, কবি, গীতিকার ও প্রাবন্ধিক

সাংগঠনিক কাজ:

১৯৩৯-৪০ খ্রি. কমিউনিস্ট আন্দোলনে যোগ দিয়ে আজীবন ওই পার্টির সঙ্গে জড়িত থাকেন। ফ্যাসিবিরোধী লেখক ও শিল্পী অ্যাসোসিয়েশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। বহু চলচ্চিত্রের তিনি সুরকার। তবে। জগতে ‘আনন্দ যজ্ঞে’ এই একটি গানই তিনি রেকর্ড করেছেন।

১৯৫৭ থেকে ১৯৭৩ খ্রি. তিনি দিল্লিতে থাকেন। সেখানে সংগীত-নাটক-অ্যাকাডেমি ও ভারতীয় কলাকেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দিল্লিতে তাঁরই প্রয়োজনায় ‘রামচরিত মানস’ নূতনভাবে অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭২ খ্রি. বিষ্ণু দে-র ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষত’ গ্রন্থের কবিতায় তিনি সুর দেন। শ্রীবেদব্যাসের সঙ্গে হিন্দি ভাষায় তাঁর গীতিনাট্যানুষ্ঠান করিয়েছিলেন।

জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মৈত্র-এর সংকলন:

১৯৬২ খ্রি. আন্তর্জাতিক সুরস্রষ্টা সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন যান। দিল্লি থেকে আসার পর বাংলাদেশের শিল্পীদের আহ্বানে ঢাকাতে গিয়ে ‘নবজীবনের গান’ ও অন্যান্য সংগীত শেখান। ভারতের নানা স্থানে, মস্কোতে ও ১৯৭৩ খ্রি. পূর্ব-জার্মানিতে ভ্রমণকালে অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি তাঁর রচিত বিভিন্ন কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে। অসাধারণ গদ্যছন্দে লেখা তাঁর শেষ বয়সের রচনা ‘বার্লিনের কবিতাগুচ্ছ’। তাঁর অপর বই ‘যে পথেই যাও’।

মৃত্যু:

শেষজীবনে মেদিনীপুরের ঝাড়গ্রামে জমি কিনে ‘কষণী’ নামে আদর্শগ্রাম গড়ার কাজ শুরু করেছিলেন। কংগ্রেস রাজনীতিতে ‘Big Five-এর তুলসী গোস্বামী তাঁর মাতুল। ১৯৭৭ সালের ২৬ অক্টোবর তার প্রয়াণ ঘটে।[৩]

তথ্যসূত্র:

১. দোলন প্রভা, ০৪ ডিসেম্বর ২০১৮ “জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র আধুনিক বাংলা গানের গীতিকার”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএলঃ https://www.roddure.com/biography/jyotirindra-moitra/

১ সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা, ১৬৯।

২. প্রধান সম্পাদক সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত, সম্পাদক অঞ্জলি বসু (দ্বিতীয় মুদ্রণ: ২০১৩)। সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান (প্রথম খন্ড)। কলকাতা: সাহিত্য সংসদ পৃষ্ঠা ২৫৫ আইএসবিএন 978-81-7955-135-6।

Leave a Comment

You cannot copy content of this page