‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’: মোহিনী চৌধুরীর কালজয়ী গানের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট

মুক্তির মন্দির সোপান তলে কত প্রাণ হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রুজলে’—অমর এই পঙক্তিমালা বাংলা গণসংগীতের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি। প্রখ্যাত গীতিকার মোহিনী চৌধুরীর কালজয়ী এই রচনায় ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর শহীদদের আত্মত্যাগ ও বীরত্বগাথা অনন্য মহিমায় ফুটে উঠেছে। অন্যান্য গণসংগীতের মতো এর সুরের মূর্ছনায় যেমন এক গভীর বিষণ্নতা আছে, তেমনি রয়েছে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য আপামর জনতাকে জাগ্রত করার এক তীব্র আহ্বান।

মোহিনী চৌধুরীর কালজয়ী এই সৃষ্টি তাঁকে বাংলা সংগীত জগতে প্রভূত খ্যাতি ও সুউচ্চ মর্যাদা এনে দেয়। সুরস্রষ্টা কৃষ্ণচন্দ্র দে-র দরদি সুরারোপ গানটিকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। সময়ের বিবর্তনে গানটি বহু গুণী শিল্পীর কণ্ঠে বারবার পুনর্নির্মিত ও সমাদৃত হয়েছে, যা বাংলা আধুনিক গানের ভাণ্ডারকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। গবেষক সুধীর চক্রবর্তী তাঁর সম্পাদিত আকর গ্রন্থ ‘আধুনিক বাংলা গান’-এ এই কালজয়ী সৃষ্টিকে গুরুত্বের সাথে সংকলিত করেছেন।

গানটি মধুবন্তী মুখার্জির কণ্ঠে শুনুন ইউটিউব থেকে

গানের কাব্যিক বিশ্লেষণ

মোহিনী চৌধুরীর এই কালজয়ী সৃষ্টিতে ‘স্বাধীনতা’কে এক পবিত্র ‘মন্দির’ হিসেবে রূপকায়িত করা হয়েছে, যার প্রতিটি সোপান নির্মিত হয়েছে অগণিত বিপ্লবীর রক্তস্নাত আত্মত্যাগের বিনিময়ে। গানে ‘তরুণ অরুণ’ বা উদীয়মান সূর্যের মতো তেজস্বী প্রাণগুলোর অকালে ঝরে পড়ার যে হাহাকার ফুটে উঠেছে, তা মূলত আমাদের স্বাধীনতার চরম মূল্যকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। এখানে দেশপ্রেমকে দেওয়া হয়েছে স্বর্গের চেয়েও উচ্চতর মর্যাদা; যেখানে মৃত্যুঞ্জয়ী বীরদের রক্তে রাঙা পথই হয়ে উঠেছে জাতির মুক্তির একমাত্র সোপান। কবির দৃষ্টিতে এই আত্মদান নিছক মৃত্যু নয়, বরং ‘অশ্রুজলে লেখা’ এক অবিনশ্বর ইতিহাস—যা চিরকাল উত্তরসূরিদের হৃদয়ে দেশপ্রেমের মশাল হয়ে জ্বলবে।

গানের দ্বিতীয় অংশে বিপ্লবীদের চিত্রিত করা হয়েছে সামাজিক ও রাজনৈতিক নবজাগরণের অগ্রদূত হিসেবে। কবির মতে, এক স্থবির ও ‘জীর্ণ জাতি’র হৃদয়ে সাহসের সঞ্চার এবং নিপিড়ীত মানুষের ‘মৌন মুখে’ প্রতিবাদের ভাষা ফুটিয়ে তোলার মূল কারিগর এই বীর মহানায়কেরা। তাঁদের এই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামকে কবি ‘রক্তকমলে গাঁথা মাল্য’ হিসেবে কল্পনা করেছেন, যা স্বাধীনতার দেবী বা ‘বিজয়লক্ষ্মী’ পরম শ্রদ্ধায় তাঁদের কণ্ঠে অর্পণ করেন। অর্থাৎ, বিপ্লবীদের আত্মদান বৃথা যায়নি; তাঁদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা এবং জাতির পুনর্জাগরণই তাঁদের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। শোক আর শৌর্যের এই অনন্য কাব্যিক মেলবন্ধন গানটিকে এক কালজয়ী উচ্চতা দান করেছে।

গানের কথা

মুক্তির মন্দির সোপান তলে
কত প্রাণ হলো বলিদান,
লেখা আছে অশ্রুজলে।

কত বিপ্লবি বন্ধুর রক্তে রাঙা,
বন্দীশালার ওই শিকল ভাঙা
তাঁরা কি ফিরিবে আর সুপ্রভাতে,
যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে।

যারা স্বর্গগত তারা এখনো জানে,
স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভূমি
আজ স্বদেশ ব্রতে মহা দীক্ষা লভি’
সেই মৃত্যুঞ্জয়ীদের চরণ চুমি।

যারা জীর্ণ জাতির বুকে জাগালো আশা
মৌন মলিন মুখে জাগালো ভাষা
আজ রক্তকমলে গাঁথা মাল্যখানি,
বিজয়লক্ষী দেবে তাঁদেরি গলে।।

উপসংহার

পরিশেষে, ‘মুক্তির মন্দির সোপান তলে’ কেবল একটি দেশাত্মবোধক গান নয়, এটি আমাদের স্বাধীনতার রক্তক্ষয়ী ইতিহাসের এক অমর দলিল। মোহিনী চৌধুরীর শাণিত কলম আর কৃষ্ণচন্দ্র দে-র হৃদয়স্পর্শী সুর আজও প্রতিটি বাঙালির রক্তে দেশপ্রেমের শিহরণ জাগায়। যারা নিজের জীবন তুচ্ছ করে আমাদের জন্য এক স্বাধীন ভোরের স্বপ্ন দেখেছিলেন, এই গান তাঁদের সেই অসামান্য আত্মত্যাগের প্রতি এক বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। যতকাল বাংলা ভাষা ও সংগীত থাকবে, ততকাল এই গান আমাদের মুক্তির পথপ্রদর্শক হয়ে চির ভাস্বর থাকবে।

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. লেখাটি ১১ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা সুধীর চক্রবর্তী সংকলিত ও সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা ১০৩ থেকে নেয়া হয়েছে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!