বন্ধন-ভয় তুচ্ছ করেছি উচ্চে তুলেছি মাথা গানটি বাংলা গণসংগীতের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কালজয়ী সৃষ্টি। গানটির কথা লিখেছেন কবি সজনীকান্ত দাস। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগের বাংলা সাহিত্য আন্দোলনের একজন প্রথম সারির ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন বাঙালি সাহিত্যিক, সম্পাদক, গীতিকার, গবেষক।
রচনার প্রেক্ষাপট ও সময়কাল
১৯৪৬ সালে রচিত এই কবিতাটি পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এবং আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের সংকল্প ব্যক্ত করে, যেখানে কবি ভারতমাতাকে স্বাধীন করার ডাক দিয়েছেন।
কবি বলছেন যে, আমরা বন্দি থাকার ভয়কে তুচ্ছ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি। চারদিকে পরাধীনতার শিকল ভেঙে পড়ার শব্দ শোনা যাচ্ছে এবং আকাশে স্বাধীনতার পতাকা উড়ছে। ভারতের মানুষ এখন ‘হয় স্বাধীনতা অর্জন করব, না হয় মরব’—এই শপথ নিয়েছে। দেশের স্বাধীনতার জন্য অসংখ্য মানুষ প্রাণ দিতে প্রস্তুত, আর সেই আত্মত্যাগের ওপর ভিত্তি করেই আগামীর নতুন ও স্বাধীন ভারতের পথ তৈরি হচ্ছে। পরিশেষে, ভারতমাতার জয়গান গেয়ে কবি দেশের বিজয় কামনা করছেন।
সুরশৈলী
সজনীকান্ত দাসের এই গানে ঐতিহ্যের পাশাপাশি গণসংগীতের উপযোগী তেজোদীপ্ত সুরের সংমিশ্রণ পাওয়া যায়। গানটিতে সুর করেছিলেন সুকৃতি সেন এবং গানটি সত্য চৌধুরী, সুকৃতি সেন এবং তাদের দল ১৯৪৬ সালে গেয়েছিলেন এবং সেসময় কিছুটা জনপ্রিয় হয়েছিল।
গানের কথাসমূহ
বন্ধন-ভয় তুচ্ছ করেছি উচ্চে তুলেছি মাথা
আর কেহ নয়, জেনেছি মোরাই মোদের পরিত্রাতা ৷৷
করিব অথবা মরিব এ পণ, ভরিয়া তুলেছে ভারত ভুবন,
স্বপ্নের মাঝে শুনিতেছি যেন স্বাধীন ভারত-গাথা ।
জয় জয় জয় ভারতের জয়, জয়তু ভারত-মাতা।।
শুনিতেছি নাকি শৃঙ্খল ওই ভাঙিতেছে খান খান,
মুক্তি-কেতন উড়িছে আকাশে তারি বন্দনা গান,
করিব অথবা মরিব এ পণ, ভরিয়া তুলেছে ভারত ভুবন,
লক্ষ প্রাণের বলি-বেদীমূলে নূতন আসন পাতা ।
জয় জয় জয় ভারতের জয়, জয়তু ভারত-মাতা ।।
আরো পড়ুন
- ধন্য আমি জন্মেছি মা তোমার ধূলিতে: সলিল চৌধুরীর কালজয়ী দেশাত্মবোধক গানের ইতিহাস ও লিরিক্স
- মুক্তির মন্দির সোপান তলে: মোহিনী চৌধুরীর কালজয়ী গানের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট
- শোন ওরে ও শহরবাসী শিল্পী বিনয় রায়ের কথা ও সুরে রচিত একটি কালজয়ী গণসংগীত
- ‘সপ্তকোটি জনরঙ্গভূমি’: বিনয় রায়ের হারানো গণসংগীতের ইতিহাস ও প্রথম রেকর্ডিং
- ‘নবজীবন তরঙ্গাঘাতে’: বিনয় রায়ের হারিয়ে যাওয়া সেই বিপ্লবী গণসংগীতের ইতিহাস
- ‘আর কতকাল, বলো কতকাল’: অহল্যা মায়ের গান ও নকশালবাড়ি আন্দোলনের অবিনাশী সুর
- ‘নেতাজী সুভাষচন্দ্র সে তুমি দুলাল বাংলা মার’: সজনীকান্ত দাসের শ্রদ্ধার্ঘ্য ও একটি হারানো সুরের কথা
- ‘বন্ধন-ভয় তুচ্ছ করেছি’: সজনীকান্ত দাসের কলমে স্বাধীনতার অমর সংকল্প ও ইতিহাস
- ‘তেলের শিশি ভাঙল বলে’: অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছড়ায় লুকানো গভীর সামাজিক শ্লেষ ও বিশ্লেষণ
- ‘এসো মুক্ত করো’: জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের কালজয়ী গণসংগীতের ইতিহাস ও বিশ্লেষণ
বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚