আর কতকাল, বলো কতকাল, সইব এ মৃত্যু অপমান বা অহল্যা মায়ের গান — অগ্নিঝরা নকশালবাড়ি অভ্যুত্থানের পটভূমিতে রচিত এই পঙক্তিটি বাংলা গণসংগীতের ইতিহাসে এক অবিনাশী প্রতিবাদের নাম। শোষিত মানুষের হাহাকার, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন আর অগণিত শহীদের রক্তস্নাত আত্মত্যাগের আর্তনাদ এই গানের ছত্রে ছত্রে মিশে আছে।
প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী বিনয় রায়ের কথা ও সুরে এই গানে উঠে এসেছে চন্দনপিঁড়ির সরোজিনী কিংবা অহল্যা মায়ের মতো লড়াকু মানুষদের খুনের বদলা নেওয়ার অঙ্গীকার। ভাতের প্রতিটি গ্রাসে লেগে থাকা রক্তের দাগ আর অপমানের গ্লানি মুছে ফেলার এক তীব্র আহ্বান ফুটে উঠেছে এই সুরে। গানটি নির্দিষ্ট কোনো একক কণ্ঠের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে বরং সমবেত গণকণ্ঠে আন্দোলনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে বাংলার জনপদে সমাদৃত হয়েছে।
গানটির প্রেক্ষাপট এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
গানটি একটি দ্রোহের গান। গানে শহর, বন্দর এবং কৃষকের কুটিরে “নরখাদক দলের অভিযান” অর্থাৎ শোষক শ্রেণির অত্যাচারের কথা তুলে ধরা হয়েছে। গানে এই অপমান ও লাঞ্ছনা আর না সয়ে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। গানটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং সংলগ্ন অঞ্চলে বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক আন্দোলন, বিশেষ করে খনি শ্রমিকদের লড়াই এবং নিম্নবর্গের মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের সময় বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। নকশালবাড়ি আন্দোলনের সময়ের লিটল ম্যাগাজিন বা সংকলনেও এই গানটির উল্লেখ পাওয়া যায়।
সাহিত্যে উল্লেখ
প্রখ্যাত সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী তাঁর বিভিন্ন রচনায় প্রান্তিক মানুষের যন্ত্রণার কথা তুলে ধরতে এই গানটির চরণ ব্যবহার করেছেন। এছাড়া বিভিন্ন গণসংগীতের সংকলনেও এটি স্থান পেয়েছে। হারানের নাতজামাই চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহৃত হয়েছে।
আর কতকাল, বলো কতকাল গানটির কথা
আর কতকাল, বলো কতকাল
সইব এ মৃত্যু অপমান — এ আর সহে না।
শহর বন্দরে, চাষীর কুটিরে
নরখাদক দলের অভিযান — এ আর সহে না।
কমলাপুর শহীদ ডাকে — আয় রে, আয় আয় রে
ডোঙ্গাজোড়ার শহীদ সুরেন — মোদের পানে চায় রে, চায় রে
চন্দনপিঁড়ির সরোজিনী, অহল্যা মা
তাদের খুনের তর্পণ হ’ল না — এ আর সহে না।
সুন্দরবনের জঙ্গল কেটে ফলালো যে সোনা
তার মা-বোনের রক্তে হ’ল সোনার মাটি লোনা
রক্তের ধার বেঁধে মোদের, প্রতি গ্রাসে গ্রাসে
কবে, বলো কবে শুধব তা — প্রাণ আর মানে না।
শুনি নাকি স্বরাজ এখন, এই কি তার নমুনা।
মা-বোনেরি ইজ্জত ললাটে কোন্ স্বরাজের সেনা
চরকা নয় খদ্দর নয় আর — নয় অহিংসার বুলি
বুকে বেঁধে গরম সীসার গুলি — এ আর সহে না।
অহল্যা মা, তোমার সন্তান জন্ম নিল না
ঘরে ঘরে সেই সন্তানের প্রসব যন্ত্রণা।
শত কংস ধ্বংস করে যে শিশু জন্মিবে
মাঠে মাঠে তারই জল্পনা।।
🔗 নকশালবাড়ি সংগ্রহশালা:
- 📖 আরও পড়ুন: গানের বাণীর মতোই আপসহীন ও অকুতোভয় জীবন ছিল যাঁর: কমরেড ভারতজ্যোতি রায়চৌধুরী ✊
- 🚩 আরও পড়ুন: নকশালবাড়ি আন্দোলনের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সব পোস্ট দেখুন: নকশালবাড়ি অভ্যুত্থান।
আরো পড়ুন
- ধন্য আমি জন্মেছি মা তোমার ধূলিতে: সলিল চৌধুরীর কালজয়ী দেশাত্মবোধক গানের ইতিহাস ও লিরিক্স
- মুক্তির মন্দির সোপান তলে: মোহিনী চৌধুরীর কালজয়ী গানের ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট
- শোন ওরে ও শহরবাসী শিল্পী বিনয় রায়ের কথা ও সুরে রচিত একটি কালজয়ী গণসংগীত
- ‘সপ্তকোটি জনরঙ্গভূমি’: বিনয় রায়ের হারানো গণসংগীতের ইতিহাস ও প্রথম রেকর্ডিং
- ‘নবজীবন তরঙ্গাঘাতে’: বিনয় রায়ের হারিয়ে যাওয়া সেই বিপ্লবী গণসংগীতের ইতিহাস
- ‘আর কতকাল, বলো কতকাল’: অহল্যা মায়ের গান ও নকশালবাড়ি আন্দোলনের অবিনাশী সুর
- ‘নেতাজী সুভাষচন্দ্র সে তুমি দুলাল বাংলা মার’: সজনীকান্ত দাসের শ্রদ্ধার্ঘ্য ও একটি হারানো সুরের কথা
- ‘বন্ধন-ভয় তুচ্ছ করেছি’: সজনীকান্ত দাসের কলমে স্বাধীনতার অমর সংকল্প ও ইতিহাস
- ‘তেলের শিশি ভাঙল বলে’: অন্নদাশঙ্কর রায়ের ছড়ায় লুকানো গভীর সামাজিক শ্লেষ ও বিশ্লেষণ
- ‘এসো মুক্ত করো’: জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্রের কালজয়ী গণসংগীতের ইতিহাস ও বিশ্লেষণ
অনুরাধা পাড়োয়ালের কণ্ঠে গানটি শুনুন ইউটিউব থেকে
বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ৩ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚