বাঙালি হৃদয়ে বিরহ আর গোধূলি যেন একসূত্রে গাঁথা। আর সেই বিরহ যদি সুর পায় অখিলবন্ধু ঘোষের দরদী কণ্ঠে, তবে তা হয়ে ওঠে অমর। কিংবদন্তি গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কালজয়ী সৃষ্টি— ‘শিপ্রা নদীর তীরে সন্ধ্যা নামে গো অন্তর হলো দিশাহারা!’ আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাসে এমন এক মণিমানিক্য, যা আজও শ্রোতাদের নিয়ে যায় এক মায়াবী ও বিষণ্ণ রোমান্টিকতায়। অখিলবন্ধু ঘোষের নিপুণ সুরারোপিত এই গানটিতে নিশিথিনী সন্ধ্যার নিস্তব্ধতা আর অন্তরের না-বলা হাহাকার যেভাবে ফুটে উঠেছে, তা সত্যিই অতুলনীয়।
প্রকৃতির পটে বিরহের প্রতিচ্ছবি: শিপ্রা নদীর বিষণ্ণ সন্ধ্যা
গানটি মূলত হারানো প্রেম এবং স্মৃতিবেদনার এক অনন্য কাব্যিক বহিঃপ্রকাশ। এর পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা ভাবার্থগুলো নিচে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. প্রকৃতি ও বিরহের মেলবন্ধন: শিপ্রা নদীর তীরের সন্ধ্যা এখানে কেবল দিনের অবসান নয়, বরং কবির মনের গাঢ় বিষণ্নতারই এক রূপক। একসময় যে নদীর কলতান প্রিয়তমার চোখের উজ্জ্বলতার সাথে তাল মেলাত, আজ সেখানে কেবল দীর্ঘশ্বাস। প্রকৃতির এই নিস্তব্ধতা কবির ‘দিশাহারা’ অন্তরের হাহাকারকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
২. স্মৃতির নস্টালজিয়া ও শূন্যতা: কবি এখানে বাঁশির সুর আর কাঁকনের শব্দের মাধ্যমে ফেলে আসা মধুর মুহূর্তগুলোকে পুনর্জীবিত করেছেন। যে বালুচর একসময় প্রেমে মুখরিত ছিল, আজ সেখানে কেবলই শূন্যতা। হারানো শব্দের এই অনুরণন জীবনের ক্ষণস্থায়ী রূপকেই আমাদের সামনে তুলে ধরে।
৩. শাশ্বত বাঙালি নারীর রূপ: গানের সেই ‘গাঁয়ের লাজুক মেয়েটি’ স্নিগ্ধ ও পবিত্র প্রেমের এক জীবন্ত প্রতীক। আঁচলে বকুল, কপালে সোনালী টিপ আর কবরীতে অতসী ফুল—সব মিলিয়ে এক চিরায়ত বাঙালি নারীর অবয়ব ফুটে উঠেছে। তবে ট্র্যাজেডি হলো, সেই চেনা রূপটি আজ ধরাছোঁয়ার বাইরে, যা কবির আকুল আহ্বানে আর সাড়া দেয় না।
৪. বিচ্ছেদ ও বৈরাগ্যের দীর্ঘশ্বাস: ‘আলতা জমানো ঠোঁট’ কিংবা ‘মান-অভিমানের’ স্মৃতিগুলো প্রিয়তমার সাথে কাটানো নিবিড় মুহূর্তের কথা মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু বর্তমানের ‘গেরুয়া মাটির দেশ’ এখানে শুষ্কতা ও বৈরাগ্যের প্রতীক হিসেবে এসেছে, যা কবির জীবনে কেবল অশ্রুধারাই অবশিষ্ট রেখেছে।
গানের কথা
শিপ্রা নদীর তীরে সন্ধ্যা নামে গো
অন্তর হলো দিশাহারা!
আজ কোথা সেদিনের ছলছল কলগান
জ্বলজ্বল দুটি আঁখিতারা।।
একটি বাঁশির মীড়ে বেজে ওঠা কাঁকনের ধ্বনি
বালুচরে আর নাহি শুনি! —
মাটির প্রদীপ হাতে গাঁয়ের লাজুক মেয়ে
দেয় না তো, হায় দেয় না তো সাড়া।।
আঁচলে বকুল আর কপালে সোনালী টিপ আঁকা
কবরী অতসী ফুলে ঢাকা।
আলতা জমানো ঠোঁটে কোথা সেই মান অভিমান —
হারানো দিনের কথা গান।
গেরুয়া মাটির দেশে তারই নামে মালা গেথে
আঁখি কোলে, হায় আঁখি কোলে জমে জলধারা।।
আরো পড়ুন
- শিপ্রা নদীর তীরে সন্ধ্যা নামে: গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ও অখিলবন্ধু ঘোষের এক অমর সৃষ্টি
- গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের অমূল্য সৃষ্টি: অখিলবন্ধু ঘোষের ‘শ্রাবণ রাতি বাদল নামে’ গানের সার্থকতা
- একটি দুটি তারা করে উঠি উঠি: গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের এক অমর সৃষ্টি
- কতদিন দেখিনি তোমায়: প্রণব রায় রচিত বিচ্ছেদ ও নিঃসঙ্গতার এক কাব্যিক আখ্যান
- মায়ের মমতা ও প্রকৃতির মেলবন্ধন: ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’ গানের কাব্যিক বিশ্লেষণ
- নাইবা ঘুমালে প্রিয় রজনী এখনো বাকি: কালজয়ী এই গানের পেছনের গল্প ও লিরিক্স
- তব মুখখানি খুঁজিয়া ফিরি গো সকল ফুলের মুখে: গানটির ইতিহাস ও অজানা তথ্য
- জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা: বিরহ ও না পাওয়ার এক কালজয়ী গান
- বলেছিলে তুমি তীর্থে আসিবে আমার তনুর তীরে: গানটির সঠিক গীতিকার ও ভাবার্থ
- কেন এ হৃদয় নিজেরে লুকাতে চায়: এক অন্তর্মুখী প্রেমের কাব্যিক ব্যবচ্ছেদ
- বাস্তববাদী গান হচ্ছে বিশিষ্ট সঙ্গীত ধারা, যা উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে উদ্ভূত হয়েছে
- প্রেমের গান ভালোবাসা, প্রেমে পড়ার আনন্দ ও বিচ্ছেদের হাহাকার নিয়ে রচিত হয়
- রাখালিয়া সুর আনে মৃদু সমীরণ আনন্দ মুখোপাধ্যায়ের লেখা একটি আধুনিক বাংলা গান
- বনে বনে বসন্ত আসে বকুলের গান যায় ছড়িয়ে শিরশিরে ফাল্গুনী হাওয়া
- যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন, শুধু দূরে যেতে কেন বলো এমন
- যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পার নাই কেন মনে রাখ তারে
- মন-ময়ূরী ছড়ালো পেখম তারি হচ্ছে সলিল চৌধুরীর আধুনিক বাংলা প্রেমের গান
- নয়ন ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল
- শেফালী তোমার আঁচলখানি বিছাও শারদ প্রাতে, চরণে চরণে তোলো রিনিঝিনি
- আমার আঁধার ঘরের প্রদীপ যদি নাইবা জ্বলে, কণ্ঠ-মালার বকুল যদি যায় গো দ’লে
গানটি অখিলবন্ধু ঘোষের কণ্ঠে শুনুন ইউটিউব থেকে
১. লেখাটি ২৮ জুলাই ২০১৯ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে শিশির চক্রবর্তী সংকলিত পত্রভারতী কলকাতা প্রকাশিত দ্বিতীয় মুদ্রণ ডিসেম্বর ২০১৮পাঁচদশকের আধুনিক বাংলা গানের গীতবিতান এ শুধু গানের দিন গ্রন্থের ২৪ পৃষ্ঠা থেকে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।