যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন, শুধু দূরে যেতে কেন বলো এমন গানটি বাংলা সংগীতের স্বর্ণযুগের একটি কালজয়ী সৃষ্টি। এই গানটির কথা লিখেছেন বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র। গানটির প্রথম কণ্ঠশিল্পী বা মূল গায়িকা ছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী কানন দেবী। গানটির সুর করেছেন প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক কমল দাশগুপ্ত। গানটি ১৯৪২ সালে মুক্তি পায়। এটি পরবর্তীতে ‘যোগাযোগ’ নামক চলচ্চিত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে।
যদি ভালো না লাগে গানের বিশ্লেষণ
যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন গানটির এই পঙক্তিগুলো গভীর বিরহ, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এবং অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষার এক অনন্য প্রকাশ।গানটিতে এক গভীর আকুতি ও অভিমান ফুটে উঠেছে। প্রিয়জনের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে যে, যদি সে ভালোবাসতে না-ও পারে, তবে যেন অন্তত চোখের সামনে থেকে দূরে সরে যাওয়ার কথা না বলে। হৃদয়ে জায়গা না পেলেও কেবল দৃষ্টির সীমানায় থাকার অনুমতিটুকুই এখানে কাঙ্ক্ষিত। এখানে প্রেমিক তার প্রিয়জনের প্রতি এক চরম ত্যাগের মনোভাব প্রকাশ করেছেন। যদি হৃদয়ে জায়গা না-ও মেলে, তবে অন্তত চোখের সামনে থাকার অনুমতিটুকু চাওয়া হয়েছে। হৃদয়রূপী ‘দুয়ার’ যদি বন্ধও থাকে, তবে ‘বাতায়ন’ বা জানলাটুকু যেন খোলা থাকে—অর্থাৎ ভালোবাসার পূর্ণ স্বীকৃতি না দিলেও যেন যোগাযোগটুকু বিচ্ছিন্ন না হয়।
নির্মল প্রেমের উদাহরণ
‘আকাশ’ ও ‘মেঘ’-এর উপমার মাধ্যমে কবি বুঝিয়েছেন যে, মেঘ যেমন আকাশে সাময়িক আনাগোনা করে কিন্তু আকাশের নীলিমাকে কলুষিত করতে পারে না, তেমনি প্রেমিকের জীবনে দুঃখের কালো মেঘ আসলেও তার মনের স্বচ্ছতা বা ভালোবাসা ম্লান হয় না। প্রেম এখানে জাগতিক প্রাপ্তির ঊর্ধ্বে।
অল্পে সন্তুষ্টি ও স্বপ্নের গুরুত্ব
বাস্তব জীবনে প্রিয়জনকে না পাওয়ার বেদনাকে এখানে মেনে নেওয়া হয়েছে। বাগানে ‘কুসুম’ বা ফুল না পেলেও ঝরা ‘পাতা’ কুড়িয়েই প্রেমিক তার শূন্যতা পূরণ করতে রাজি। সবশেষে বলা হয়েছে, যদি বাস্তবে বা ‘জাগরণে’ প্রিয়জনকে পাওয়া সম্ভব না হয়, তবে ঘুমের ঘোরে দেখা সেই ‘ভীরু স্বপন’ বা স্বপ্নটুকু যেন ভেঙে দেওয়া না হয়। কারণ সেই স্বপ্নটুকুই এখন বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। সামগ্রিকভাবে, এটি এমন এক প্রেমের প্রকাশ যেখানে কোনো দাবি নেই, কেবল প্রিয়জনের সান্নিধ্য আর স্মৃতির আবহে বেঁচে থাকার প্রার্থনা রয়েছে।
যদি ভালো না লাগে গানের কথা
যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন,
শুধু দূরে যেতে কেন বলো অমন!
যদি হৃদয়ে না মেলে ঠাঁই
নয়নে মানা তো নাই,
যদি না দুয়ার খুলিতে চাও, খুলে রেখো বাতায়ন।
মেঘেতে যা কিছু আঁকিয়া যাক,
(জানি) আকাশে কখনো লাগে না দাগ।
কুসুম না যদি পাই,
কাননে পাতা কুড়াই,
(তুমি) জাগরণে যদি ধরা না দাও, ভেঙোনা ভীরু স্বপন।।
আরো পড়ুন
- প্রেমেন্দ্র মিত্রের গান আধুনিক বাংলা গানের ধারায় রচিত
- থামো বন্ধু, দাঁড়াও ক্ষণেক থামি হচ্ছে প্রেমেন্দ্র মিত্রের রচিত গান
- হারা-মরু নদী, শ্রান্ত দিনের পাখি, নিভু-নিভু দীপ, আর্ত-আতুর নহ একাকী
- নাবিক আমার নোঙর ফেলো, ওই তো তোমার তীর
- আরও একটু সরে বসতে পারো, আরও একটু কাছে
- এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি, ডালে ডালে ফোটায় কে আজ বুলিয়ে রঙিন অঙ্গুলি
- যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন, শুধু দূরে যেতে কেন বলো এমন
- পুন্নাম
- প্রেমেন্দ্র মিত্র আধুনিক বাঙালি কবি ছোটগল্পকার, উপন্যাসিক ও সিনেমা পরিচালক
- মহানগর
- তেলেনাপোতা আবিষ্কার
গানটি কানন দেবীর কণ্ঠে গানটি শুনুন ইউটিউব থেকে
বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪ পৃষ্ঠা ১০০ থেকে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।