প্রেমেন্দ্র মিত্র আধুনিক বাঙালি কবি ছোটগল্পকার, উপন্যাসিক ও সিনেমা পরিচালক

প্রেমেন্দ্র মিত্র (৪ সেপ্টেম্বর, ১৯০৪ – ৩ মে, ১৯৮৮) ছিলেন একাধারে কবি, ছোটগল্পকার, উপন্যাসিক এবং চিত্রপরিচালক হিসেবে স্বমহিমায় ভাস্বর। মূলত কবি ও কথাশিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেও তাঁর কর্মজীবন ছিল বহুমুখী প্রতিভায় দীপ্ত। শিক্ষকতা ও পত্রিকা সম্পাদনা থেকে শুরু করে চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য রচনা, পরিচালনা এবং বেতার কেন্দ্র পরিচালনার মতো নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। অশীতিপর দীর্ঘ জীবনেও তিনি ছিলেন একজন একনিষ্ঠ ও পূর্ণসময়ের সাহিত্যসেবক, যাঁর কলম বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে প্রতিনিয়ত সমৃদ্ধ করেছে।[১]

প্রেমেন্দ্র মিত্রের শৈশব থেকেই ছিল সাহিত্যের প্রতি প্রবল অনুরাগ। তাঁর সম্পাদনায় প্রথম প্রকাশিত হয় সেকালের অত্যন্ত জনপ্রিয় পত্রিকা কালিকলম। পরবর্তীকালে তিনি বুদ্ধদেব বসু ও সমর সেনের সঙ্গে ত্রয়ী সম্পাদনায় প্রকাশ করেন বিখ্যাত কবিতা পত্রিকা। মূলত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রথমা’ প্রকাশের মাধ্যমেই কবি হিসেবে তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। অসাধারণ সৃজনশীল ও স্বভাবজাত চঞ্চলতার অধিকারী এই মানুষটি বৈচিত্র্যের সন্ধানে বারবার পেশা ও নেশা বদলেছেন, ফলে কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে নিজেকে একনিষ্ঠভাবে আটকে রাখা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

১৯০৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তাঁর পিতার কর্মক্ষেত্র বারাণসীতে জন্মগ্রহণ করেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলার রাজপুরে।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের শিক্ষা জীবন

প্রেমেন্দ্র যে যথেষ্ট মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং পরীক্ষায় যথার্থ সাফল্য লাভ করেছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ম্যাট্রিকুলেশন উত্তীর্ণ হয়ে প্রেমেন্দ্র প্রথমে ভর্তি হয়েছিলেন স্কটিশচার্চ কলেজের কলা বিভাগে, কিন্তু, অস্থির স্বভাবের প্রেমেন্দ্র প্রায়ই কলেজ ত্যাগ করে যেতেন নির্জনতায়। কখনও চিড়িয়াখানায়, কখনও নদীর ঘাটে। এই সময় থেকেই প্রেমেন্দ্রের মনে কাব্যভাবনার আকর বিস্তৃত হতে থাকে। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে অহিংস অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। প্রেমেন্দ্র তখন স্কটিশচার্চ ছেড়ে ভর্তি হয়েছেন সাউথ সাবার্বান কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে। দেশব্যাপী তখন তুমুল অস্থিরতা। স্বাধীনতা সংগ্রামের জোয়ার। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত ‘কল্লোল যুগ’ বইটিতে বিশেষভাবে স্মরণ করেছেন এ সময়টির কথা।

‘নন কো অপারেশনের বান ডাকা দিল। আমাদের কলেজের দোতলার বারান্দা থেকে দেশবন্ধুর বাড়ির অভিনা দেখা যায়… তরঙ্গ তাড়নে কলেজ প্রায় টলোমলো। কি করে যে আঁকড়ে থাকলাম কে জানে শুনলাম প্রেমেন ভেসে পড়েছে’ (পৃঃ ২৭)।

সেই সময়ে সে বয়সে প্রেমেন্দ্রের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্যে অস্থিরতা ও আবেগ যতটা ছিল, দেশচেতনা, কিংবা রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিচার মূল্যায়ন ক্ষমতা সম্ভব ছিল না। তাই, ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে প্রেমেন্দ্র সিদ্ধান্ত নিলেন,

‘আসল চিরন্তন ভারতবর্ষ যেখানে অবহেলায় পড়ে আছে, গ্রামাঞ্চলে সেই চাষীদের মধ্যে গিয়ে কাজ করতে হবে। তার জন্য আধুনিক বৈজ্ঞানিক কৃষিবিদ্যা শেখা দরকার।’ (পৃঃ ৩২২, নানারঙে বোনা, ঐ)।

কৃষিবিদ্যা ও হস্তশিল্প হাতে কলমে শেখার আদর্শ পরিস্থিতি সে সময়ে ছিল শ্রীনিকেতনে। হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রায় নিঃসম্বল অবস্থায় প্রেমেন্দ্র সেখানে চলে গিয়েছিলেন। তবু, শ্রীনিকেতনের তত্ত্বাবধায়ক এলমহার্স্ট প্রেমেন্দ্রের আগ্রহ দেখে তাঁকে ভর্তি করেছিলেন শ্রীনিকেতনে। শ্রীনিকেতনের পরিবেশ, শিক্ষাব্যবস্থা সবই ভালো লেগেছিল প্রেমেন্দ্রের। রবীন্দ্রসান্নিধ্য পেয়েছিলেন তিনি; প্রেমেন্দ্র লিখেছেন তাঁর মাস্টারমশায় দেবকিশোর বাবু চেয়েছিলেন প্রেমেন্দ্র আমেরিকায় যাক। কিন্তু নিজে প্রেমেন্দ্র তা চাননি। তাই তাঁর স্নেহের মর্যাদা তিনি রাখতে পারেননি। কিন্তু শ্রীনিকেতনেও থাকেননি বেশিদিন প্রেমেন্দ্র। এর মূল কারণ কোলকাতার অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ।

কোলকাতায় ফিরে এসে সাউথ সাবার্বান-এ পড়াশোনা শুরু করলেন প্রেমেন্দ্র। অচিন্ত্যকুমারের সঙ্গে পুরোনো বন্ধুত্ব জোড়া লাগল। কিন্তু, পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে পারলেন না তিনি। পুরী, মধুপুর নানা অঞ্চলে ভ্রমণ করতে লাগলেন তিনি। বন্ধুদের লিখতে লাগলেন তাঁর অভিজ্ঞতা ও দর্শন এবং ক্রমশ গঠিত হয়ে উঠতে লাগল সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্রের মানস পরিমণ্ডল। প্রসঙ্গত উদ্ধৃত করা যেতে পারে ‘কল্লোল যুগ’ গ্রন্থে অচিন্ত্যকুমার কে লেখা প্রেমেন্দ্রের দীর্ঘ একটি চিঠি-

‘কি কথা বলতে চাই বলতে পারছি না। বুকের ভেতর কি কথায় ভিড়, বন্ধ ঘরে মৃগনাভির তীব্র ঘ্রাণের মত নিবিড় হয়ে উঠছে। তবু বলতে পারছি না। কতরকমের কত কথা- তার না পাই খেই, না পাই ফাঁক। হাস্নাহানার বন্ধ কুড়ির মত টনটন করছে সমস্ত প্রাণ কিন্তু পারছি না বলতে… গলস্তয়ার্দির ‘Apple Tree’ পড়েছিলুম- না পড়ে ফেলেছি দুপুরে, সেই না জানা আপেল মঞ্জরীর সুবাস বুঝি এমন উদাস করেছে।… Pan ছাড়া এরকম Love Story পড়েছি বলে তো মনে পড়ছে না।’ (পৃঃ ১৪, কল্লোল যুগ)।

কিন্তু পরীক্ষার প্রস্তুতি না নিতে পারায় মাতামহী কুসুমকুমারীর সঙ্গে বিরোধ তীব্র হয় প্রেমেন্দ্রের। ব্যক্তিত্বময়ী কুসুমকুমারী ভবানীপুরের বাড়ির বেশ কিছুটা ভাড়া দিয়ে চলে যান কাশীতে। প্রেমেন্দ্র ফিরে এসে উঠলেন ২৮, গোবিন্দ ঘোষাল লেনের একটি মেসে। এই মেস এর দায়িত্বভার ছিল বিমল চন্দ্র ঘোষ ওরফে টেনিদার হাতে। বিমল ঘোষের স্বভাবগত মাধুর্যে প্রেমেন্দ্রের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল। অনেকেই মনে করেন প্রেমেন্দ্রের প্রথম গল্পসংকলন ‘পঞ্চশর’ (১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ) -এর এক গল্প ‘নীপুদা’-র চরিত্রটি টেনিদার আদর্শেই গঠিত।

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে প্রেমেন্দ্র ও অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘আভ্যুদায়িক সংঘ’। এছাড়াও তাদের সঙ্গী ছিলেন শিশিরচন্দ্র বসু, বিনয় চক্রবর্তী, চিত্ত চট্টোপাধ্যায়, মনোমোহন সান্যাল, প্রফুল্ল রায় চৌধুরী প্রমুখ। সব মিলিয়ে জনা দশেক। এই সংঘের বর্ণনা দিয়েছেন অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত তাঁর ‘কল্লোল যুগ’ গ্রন্থে –

‘আভ্যুদায়িকের বৈঠক বসত রোজ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়। ভালো ঘর পাইনি কিন্তু ভালো সঙ্গ পেয়েছি এতেই সকল অভাব পুষিয়ে যেত।’ (পৃঃ ১০, কল্লোল যুগ)।

এই আসরটিতে গড়ে উঠল আধুনিক যুগের সাহিত্য ও সাহিত্য সম্পর্কিত ধারণা। ‘মৌচাক’, ‘ভারতী’ প্রভৃতি পত্রিকায় লেখা ছাপা হতো এই সংঘের সভ্যদের। শিশু সাহিত্যিক সুনির্মল বসু মাঝে মাঝে আসতেন এ সভায়, এখানেই প্রেমেন্দ্র তাঁর তিন বন্ধু অচিন্ত্যকুমার, শিশিরচন্দ্র বসু ও বিনয় চক্রবর্তীর সঙ্গে একত্রে লেখা শুরু করেছিলেন ‘চতুষ্কোণ’ নামে একটি উপন্যাস। লেখাটি সম্পূর্ণ হয়নি।

ঢাকা গমন ও জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হওয়া

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দেই ‘আভ্যুদায়িক সঙ্ঘ’ প্রতিষ্ঠার আগে বিমল চন্দ্র ঘোষের সঙ্গে প্রেমেন্দ্র গিয়েছিলেন ঢাকায়। চাঁদপাল ঘাট থেকে নারায়ণগঞ্জ হয়ে ঢাকা পর্যন্ত এই জলপথ যাত্রা তাঁর জীবনের এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা, তাঁর স্মৃতিকথায় প্রেমেন্দ্র লিখেছেন সমুদ্র তীরবর্তী অরণ্য অঞ্চল, নদীর মোহনায় ওঠা প্রবল ঝড়ের অভিজ্ঞতা প্রভৃতির মুগ্ধ বিবরণ।

এই যাত্রাকালীন অভিজ্ঞতার ছবি ধরা পড়েছে প্রেমেন্দ্রের বিভিন্ন সাহিত্যেও যেমন ‘অরণ্যপথ’ গল্পটি। ‘মহানগর’ গল্পসংকলনের অন্তর্ভুক্ত (১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দ) এটি। আর ঐ জাহাজেই খালাসিদের জীবন অভিজ্ঞতা তিনি দেখেছিলেন দরদী মন নিয়ে। এই জাহাজে এক খালাসির মৃত্যু সংবাদ প্রেমেন্দ্রকে ব্যথিত করেছিল। আমাদের মনে হয় সম্ভবত প্রেমেন্দ্রের বিখ্যাত ‘কল্পনায়’ গল্পের মালেক চরিত্রটির মূলে এই অভিজ্ঞতাও কাজ করেছিল। ঢাকায় সূত্রপুরের কাগজীটোলার ঘিঞ্জি মধ্যবিত্ত পাড়ায় পুরনো বাড়িতে ঢুকে প্রেমেন্দ্রের ‘মুগ্ধ বিস্ময়ে চোখ দুটো যেন বিস্ফারিত হয়ে গিয়েছিল’ (পৃঃ ৩৩৮, ঐ)। কারণ অন্তত গোটা দশেক সস্তা কাঠের আলমারিতে প্রচুর বই প্রেমেন্দ্রকে আকৃষ্ট ও শ্রদ্ধাশীল করে তুলেছিল।

এসময়েই প্রেমেন্দ্র জেনেছিলেন টেনিদার বাবা শ্রী রাধারমণ ঘোষের কথা, লেখাপড়াই ছিল তার প্রথম নেশা। ‘সারা জীবনেই সেই বই পত্রের সঞ্চয়ই শুধু তিনি তাঁর পরিবারের জন্য রেখে গিয়েছিলেন’ (পৃঃ ৩৩৮, ঐ)। স্বর্গীয় মাতামহর সঙ্গে নামসাদৃশ্য ছাড়াও বইয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহ প্রেমেন্দ্রকে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাবান করেছিল। ঐ বাড়িটির আকর্ষণ বুকে নিয়ে ফিরে গেলেন মেডিক্যাল স্কুলে পড়ার ইচ্ছা নিয়ে। কিন্তু ঢাকার ছাত্ররা সেখানে অগ্রাধিকার পেত।

তাই, অপেক্ষা না করে প্রেমেন্দ্র ভর্তি হলেন ঢাকার জগন্নাথ কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে। থাকতেন অক্সফোর্ড মিশন ছাত্রাবাসে। ঢাকার প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রেমেন্দ্র অনেকটাই মানসিক স্থিরতা ফিরে পেয়েছিলেন। এ সময়ের প্রেমেন্দ্রের চিঠিগুলিতে ধরা পড়েছে রবীন্দ্রপ্রভাব। অন্যদিকে ‘আভ্যুদায়িক সঙ্ঘ’ প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছিল তাঁকে। ‘আভ্যুদায়িক’ -এর একটি শাখা ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগও নিয়েছিলেন। কিন্তু কোলকাতার বন্ধুদের আকর্ষণ এড়িয়ে যেতে পারেননি। তাই, মাঝে মধ্যেই কোলকাতায় চলে আসতেন প্রেমেন্দ্র, এসে উঠতেন গোবিন্দ ঘোষাল লেনের পুরনো সেই মেসেই।

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে প্রেমেন্দ্র এই আসা খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মেসের ফাঁকা ঘরে হঠাৎ প্রেমেন্দ্রের হাতে এসে পড়ল ঘরের পুরনো বাসিন্দার নামে লেখা জীর্ণ একটি পোষ্টকার্ড। প্রেমেন্দ্র নিজেই একথা জানিয়েছেন নানা জায়গায়। ওরিয়েন্ট লংম্যান প্রকাশিত প্রেমেন্দ্র মিত্রের সমস্ত গল্প-এর তিনটি খন্ডের প্রথম খন্ডে প্রেমেন্দ্র মুখবন্ধ হিসাবে জানিয়েছেন-

‘আমাদের কামরার দরজা ও জানালার মাথায় যে কাগজে বেশ জমাট করে ঠাসা। আমার মাথার কাছে তেমনি একটি কুলুঙ্গি থেকেই একটা পোষ্টকার্ড কেমন করে আলগা হয়ে খসে পড়েছে নিচে। পোষ্টকার্ডটি কুড়িয়ে নিয়ে বেশ একটু কৌতুকই বোধ করলাম।… সংসারে অভাব অভিযোগ মেশানো নানা সমস্যার সঙ্গে নিজের আগোচরে মধুর একটি প্রণয়-ব্যাকুলতার আভাস মনকে নাড়া দিয়ে গেল।’ (ঐ)

এরপরেই ‘শূন্য একরঙা ফ্যাকাশে’ জীবনের গল্প লিখতে প্রবৃত্ত হন প্রেমেন্দ্র। সেদিনই তৈরী হয়ে ওঠে দুটি গল্প – ‘শুধু কেরাণী’ ও ‘গোপনচারিনী’। গল্পদুটি ‘প্রবাসী’ পত্রিকার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিয়ে প্রেমেন্দ্র চলে যান ঢাকায়। ঢাকায় বসে অবিশ্বাস্য সংবাদ পান প্রেমেন্দ্র যে গল্পদুটিই ‘প্রবাসী’-র পৌষ-মাঘ সংখ্যায় ছাপা হয়েছে। এর আগেও অবশ্য প্রবাসীতে প্রেমেন্দ্রর একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। লেখাটি ছিল স্পেনীয় লেখক জাসিন্তো বেনাভান্তের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষীয় একটি পরিচিতি জ্ঞাপক রচনা। লেখাটি ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় মুদ্রিত হয় ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে।

১৯২৪ খ্রিস্টাব্দেই মার্চ ও এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত হয় ‘শুধু কেরাণী’ ও ‘গোপনচারিণী’। ‘শুধু কেরাণী’ গল্পের সপ্রশংস সমালোচনা প্রকাশিত হয়েছিল এই সময়ের অন্যতম পত্রিকা ‘কল্লোল’ -এ। নতুন কালের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এ সময় প্রকাশিত হয়েছিল ‘কল্লোল’ (১৯২৩ খ্রিস্টাব্দ)। ‘শুধু কেরাণী’র সপ্রশংস সমালোচনা করে ‘কল্লোল’ এর তৎকালীন সম্পাদক দীনেশ রঞ্জন দাশ সমর্থন জানিয়েছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্রের সাহিত্য সম্ভাবনাকে। ‘ভারতী’ পত্রিকায় এ বছরই প্রকাশিত হয় ‘শিকলির দাম’ নামে আর একটি ছোটগল্প। আলোচ্য গল্পটিরও প্রশংসাসূচক আলোচনা করা হয় ‘কল্লোল’ -এ। এই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা এবং বন্ধু অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের উদ্যোগ ও আগ্রহে প্রেমেন্দ্রের সঙ্গে ‘কল্লোল’ পত্রিকাগোষ্ঠীর সংযোগ ঘটে যায়। এবং এরপরেই প্রেমেন্দ্রের জীবনে এই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।

১৯২৪ খ্রিস্টাব্দেই জুন মাসে ‘কল্লোল’ পত্রিকার কাৰ্য্যালয়ে এসে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন প্রেমেন্দ্র। ঐ বছরই ‘সংক্রান্তি’ নামে একটি ছোটগল্প প্রকাশিত হয় ‘কল্লোল’ পত্রিকায়। এ গল্পটিতেও আমরা দেখেছি একটি অসহায় আত্মসমর্পণ রয়েছে সমাজ ও দারিদ্র্যের কাছে। গল্পটিতে কল্লোলীয় আদর্শই বর্ণিত হয়েছিল ‘সংহতি পত্রিকা’ (১৯২৩ খ্রীষ্টাব্দে)। ‘সংহতি পত্রিকা’-র মূল ভাববাদ অপেক্ষাও ছিল সমাজতান্ত্রিক আদর্শ। বিপ্লবী বিপিনচন্দ্র পালের পুত্র জ্ঞানাঞ্জন পালের নেতৃত্বে, অমৃতবাজার পত্রিকার মুদ্রণকর্মী জিতেন্দ্রনাথ গুপ্তের উদ্যোগে, ভবানিপুর মিত্র ইনষ্টিটিউশন -এর শিক্ষক মুরলীধর বসুর সহায়তায় সাম্যবাদী ভাবধারাপুষ্ট এই পত্রিকার জন্ম। পত্রিকার সম্পাদনায় যুক্ত ছিলেন মুরলীধর বসু ও জ্ঞানাঞ্জন পাল। মুরলীধর বসু ছিলেন সাহিত্যে নিবেদিত প্রাণ একজন মানুষ। নবীন লেখকের সন্ধানে মুরলীধর সদা তৎপর ছিলেন। তিনি শৈলজানন্দ ও প্রেমেন্দ্রের লেখা আমন্ত্রণ করেছিলেন। প্রেমেন্দ্রের তখন তৈরী কোন লেখা ছিলনা। তাঁর লেখা ‘পাঁক’ উপন্যাসটিই কিছুটা সংশোধিত করে পাঠিয়ে দেন তিনি। ‘সংহতি’ পত্রিকায় ‘পাঁক’ উপন্যাসটি প্রকাশিত হতে থাকে ১৯২৪ খ্রীষ্টাব্দের জুলাই থেকে। কিন্তু ১৯২৪ এর সেপ্টেম্বর মাসের পর ‘সংহতি’ আর প্রকাশিত হয় নি। তবে ১৯২৪ খ্রীষ্টাব্দেই ‘বিজলী’ পত্রিকায় সম্পূর্ণ হল ‘পাঁক’। সাবিত্রী প্রসন্ন চট্টোপাধ্যায় ও সুবোধ রায়ের সম্পাদনায় ‘বিজলী’ পত্রিকাটিও সেই সময়ের একই গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ছিল। ‘পাঁক’ উপন্যাসের প্রথম পর্ব এখানেই সমাপ্ত হয়। আর ১৯২৫ খ্রীষ্টাব্দে কালিকলম পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘পাঁক’ উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব।

১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসেই প্রেমেন্দ্র আবার ঢাকায় ফিরে গিয়েছিলেন। কিন্তু অক্সফোর্ড ছাত্রাবাসে খ্রিস্টান ছাত্রদের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী বিতর্কে জড়িয়ে ছাত্রাবাস থেকে বিতাড়িত হন তিনি। এরপর ‘বয়েজ হোম’ নামে একটি স্বদেশি ছাত্রাবাসে থাকতে শুরু করলেন। বন্ধুত্ব হলো অনিল ভট্টাচার্যের সঙ্গে। অনিল ভট্টাচার্যের পিতা গুরুবন্ধু ভট্টাচার্য ছিলেন ঢাকায় শিক্ষণ-প্রশিক্ষণ মহাবিদ্যালয়ের সহ অধ্যক্ষ; পরে তিনি বরোদা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন। এই পরিবারের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পর প্রেমেন্দ্র এঁদের গৃহে চলে আসেন টিকাটুলিতে। এই পরিবারটির রুচিশীলতা, শিক্ষা প্রেমেন্দ্রের মনকে শান্তি দিয়েছিল।

ঢাকার প্রভাব

প্রেমেন্দ্র লিখেছেন যে ঢাকার পরিবেশ, নদীবহুল অঞ্চল তাঁকে খুবই আকৃষ্ট করেছিল। শীতলক্ষ্যা নদীর পারে নারায়ণগঞ্জে বেড়াতে যাওয়া, প্রভৃতি স্মরণ করেছেন প্রেমেন্দ্র তাঁর স্মৃতিকথায়। এসময় প্রেমেন্দ্র নিবিষ্টভাবে পাঠ করেছিলেন বৈষ্ণব কবিতা ও পাশ্চাত্য সাহিত্য। গলস্তয়ার্দি, ইয়েটস্ এর সম্পর্কে গভীর অনুভূতির কথা, রবীন্দ্রনাথের কথা প্রেমেন্দ্র এসময়ের লেখা বহু চিঠিতে জানিয়েছেন।

কালিকলমের সঙ্গে

১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে প্রেমেন্দ্র ফিরে এলেন কোলকাতায়। ঢাকায় আর না ফিরে এক বাল্যবন্ধুর প্রস্তাবে চক্রবেড়িয়া মাইনর স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন। ‘কল্লোল’ পত্রিকা গোষ্ঠির উষ্ণ সান্নিধ্য, সাহিত্যিক পরিবেশ প্রেমেন্দ্রকে কোলকাতায় তীব্র আকর্ষণে আবদ্ধ করে রেখেছিল। কিন্তু, ক্রমেই কল্লোল গোষ্ঠীতে ভাঙন দেখা দিল। এই গোষ্ঠী সদস্যরা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে গেলেন বিভিন্ন কারণে। নানাকারণে মুরলীধর বসুর সঙ্গে দীনেশ রঞ্জন দাশের মতবিরোধ তুঙ্গে ওঠায় ‘কল্লোল’ গোষ্ঠীর অনেকেই ঐ পত্রিকা গোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে এসে অন্য একটি মাসিক পত্রিকার প্রবর্তন করেন।

নতুন পত্রিকাটি হল ‘কালিকলম’। এর প্রথম প্রকাশ ১৯২৬ খিস্টাব্দ এপ্রিল মাসে। প্রথম বছরে এর সম্পাদক ছিলেন তিনজন মুরলীধর বসু, শৈলেজানন্দ মুখোপাধ্যায় ও প্রেমেন্দ্র মিত্র। সাহিত্যগত আদর্শ নয়, ‘কল্লোল’ গোষ্ঠী ভাঙনের মূল কারণ ছিল ব্যাক্তিত্বের সংঘাত। দীনেশরঞ্জন ও মুরলীধরের ব্যক্তিত্বের সংঘাত তো ছিলই, নতুন লেখকদের অর্থকরী কারণে ক্ষোভও ছিল ‘কল্লোল’ পত্রিকা সম্পাদক দীনেশ রঞ্জনের উপর সমালোচক জীবেন্দ্র সিংহরায়েরর এ অনুমান আমরা সমর্থন করি। পত্রিকা সম্পাদনায় প্রেমেন্দ্রের প্রথম আত্মপ্রকাশ ‘কালিকলম’ পত্রিকায়। এই পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যা বেরিয়েছিল প্রেমেন্দ্রের ‘পোনাঘাট পেরিয়ে’ নামক ছোটগল্পটি। গল্পটি পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন আরেক লেখক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। ‘আমার সাহিত্য জীবন’ স্মৃতিকথায় সে কথা স্বীকার করেছেন তারাশঙ্কর। প্রেমেন্দ্র এরপরেই বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। কোন এক জায়গায় দীর্ঘদিন মনোনিবেশ করতে পারেন নি। নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থাও ছিল না তাঁর। কলকাতার কাছে রাজগঞ্জে টালিখোলার ব্যবসা, সাঁওতাল পরগণায় বসবাস এবং কাশীর আউধঘরবি ঘাট এই ছিল তাঁর ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দের পরিক্রমণ।

কাশীতেই তৎকালীন বিদ্বৎসমাজের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন প্রেমেন্দ্র। এবং কাশীতে থাকবেন মনস্থির করে চলে আসেন। গঙ্গার ঘাট, বন্ধুবান্ধব, কারমাইকেল লাইব্রেরি ও বইপত্র নিয়ে ভালোই কাটছিল প্রেমেন্দ্রের দিন। কাশীতেই পরিচয় হয় ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ র গবেষক দীনেশচন্দ্র সেনের পুত্র বিনয় সেনের সঙ্গে। ইতিহাস বিশেষজ্ঞ বিনয় সেন প্রেমেন্দ্রকে কোলকাতায় কর্মসংস্থানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে প্রেমেন্দ্র আনন্দসুন্দর ঠাকুর ওরফে বয়োজ্যেষ্ঠ লেখক প্রবোধ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে পরিচিত হয়েছিলেন ঘনিষ্ঠ হয়েছিলন ‘উত্তরা’ পত্রিকার সম্পাদক সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তী এবং সশস্ত্র বিপ্লবীদলের সদস্য সুধাংশু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

সুধাংশু মুখোপাধ্যায় ছিলেন শিশির ভাদুড়ীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এই গোষ্ঠীতে প্রেমেন্দ্র যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু, কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় ১৯২৭ খ্রীষ্টাব্দের জুন মাস নাগাদ কোলকাতায় ফিরে এলেন প্রেমেন্দ্র। এবং এসে উঠলেন ‘কল্লোল’ পত্রিকার কার্যালয়ে। ইতিমধ্যে ‘কালিকলম’ পত্রিকার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। প্রেমেন্দ্র এসেই ‘কালিকলম’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করতে না পারায় দুঃখ প্রকাশ করে সম্পাদকের দায়িত্ব ত্যাগ করেছেন। ‘কল্লোল’ -এর সঙ্গে বিচ্ছেদও প্রেমেন্দ্রকে সম্ভবত পীড়া দিয়েছিল। তাই ‘কল্লোল’ এর সঙ্গে আবার সম্পর্ক পুনঃ স্থাপন করেছিলেন প্রেমেন্দ্র। এরপরে ১৯৩৬ বঙ্গাব্দে ‘কালিকলম’ পত্রিকা অবলুপ্ত হয়। এবং এর আগে প্রেমেন্দ্র এখানে আর লেখেননি, আর ‘কল্লোল’ পত্রিকার ১৯২৭ খ্রীষ্টাব্দ ও ১৯২৮ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে প্রেমেন্দ্র লিখেছিলেন ‘কৃত্তিবাস ভদ্র’ ছদ্মনামে লঘু প্রবন্ধ, ‘মিছিল’ উপন্যাস প্রভৃতি।

‘কালিকলম’ পত্রিকা মূলত কবি হিসেবে প্রেমেন্দ্রকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। অবশ্য ‘পোনাঘাট পেরিয়ে’ বা ‘ভবিষ্যতের ভার’ এর মত ছোটগল্প এবং ‘পাঁক’ উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্বও ‘কালিকলম’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ‘কল্লোল’, ‘কালিকলম’ দুটি পত্রিকার ভূমিকাই প্রেমেন্দ্র মিত্রের সাহিত্যজীবনের সূচনায় অনস্বীকার্য।

১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি কোলকাতায় ফিরে এসে প্রেমেন্দ্র যোগাযোগ করেন বিনয় সেনের সঙ্গে। বিনয় সেন পিতা দীনেশচন্দ্র সেনের সাথে প্রেমেন্দ্রের যোগাযোগ ঘটিয়েছিলেন। প্রেমেন্দ্রকে গবেষণা সহায়কের পদ গ্রহণের প্রস্তাব দেন দীনেশচন্দ্র। সম্মত হয়ে প্রেমেন্দ্র তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর উপাচার্য শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কাছে দরখাস্ত দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট’ -এর কাজে নিযুক্ত হন। কাজ শুরু করার পর দীনেশচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর গুরু ও পিতৃতুল্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়, কিন্তু প্রেমেন্দ্র তাঁর আগোছালো স্বভাবের জন্য নিয়মিত হাজিরা দিতে পারতেন না। কাজও যথাসময়ে করা সম্ভব হচ্ছিল না তাঁর পক্ষে। ফলে, একবছর কাজের পর তাঁকে গবেষণা সহায়কের পদটি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। কিন্তু দীনেশচন্দ্র ও বিনয় সেনের প্রীতির সম্পর্ক থেকে তিনি কখনোই বঞ্চিত হন নি। কাশী থেকে ফিরে প্রেমেন্দ্র কল্লোল পত্রিকা কার্যালয়ে কাটিয়ে কিছুদিন পর মহিম হালদার স্ট্রিটে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতেন। কাছাকাছিই থাকতেন শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়। প্রেমেন্দ্র, অচিন্ত্যকুমার, শৈলজানন্দের বন্ধুত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের বিবাহ হয় মূলত দিদিমা কুসুমকুমারী দেবীর উদ্যোগে। পাত্রী যশোর জেলার ঝিনাইদহ গ্রামের সতীশচন্দ্র ঘোষের কন্যা বিভাদেবী। সতীশচন্দ্র কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত চাকুরিজীবী ছিলেন। বংশকৌলীন্যেও তারা মিত্র পরিবারের সমতুল্য ছিলেন। বিবাহকালে প্রেমেন্দ্রের বয়য় ছিল পঁচিশ এবং বিভাদেবীর চোদ্দ।

বিবাহের পর প্রেমেন্দ্র কাজ নিলেন জাতীয়তাবাদী দৈনিক পত্রিকা ‘বাংলার কথা’য়। বাংলায় রাজনৈতিক আন্দোলন তখন তীব্রতর হয়ে উঠেছে। তবে তখন প্রত্যক্ষ রাজনীতির থেকেও মননশীলতায় রাজনীতি পরোক্ষ অথচ স্পষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শগত পত্রিকা প্রকাশের ধূম পড়ে গিয়েছিল। কারাবরণের মেয়াদ শেষ করে বিপ্লবীরা অনেকেই তখন বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতে শুরু করেছেন। সেই সংগঠনের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছে বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্র। বাংলার রাজনৈতিক মুখপত্র হিসেবে অন্যতম ছিল ইংরাজী ‘ফরওয়ার্ড’ এবং বাংলায় ‘বাংলার কথা’ দৈনিক পত্রিকা। এঁদেরই সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল ‘আত্মশক্তি’।

আলোচিত পত্রিকাগুলি প্রকাশিত হত ‘ফরওয়ার্ড পাবলিশিং কোম্পানী’ নামক প্রকাশনা সংস্থা থেকে। ‘বাংলার কথা’ পত্রিকাটি প্রকাশিত হয় ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে। এই পত্রিকাটির প্রথম সম্পাদক ছিলেন সত্যরঞ্জন বক্সী। অল্পদিন পরে সম্পাদক হন গোপাললাল সান্যাল। এরপরে পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হন বিপ্লবী উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেই প্রেমেন্দ্র মিত্রকে নিয়ে যান বিনয় সেন। পত্রিকা কার্যালয়, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান স্ট্রিটে। ‘বাংলার কথা’ য় প্রেমেন্দ্র সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত হন। আরও দুজন সহ-সম্পাদক ছিলেন এ পত্রিকার – বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় ও সরোজকুমার রায় চৌধুরী। এইভাবে প্রেমেন্দ্র প্রথম সাংবাদিকতার জগতে পা রাখেন।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের বহু ছোটগল্পে আমরা লক্ষ্য করেছি সাংবাদিকতা ও সম্পাদনার ধরণটি। যেমন ‘গল্পে নেই’, ‘দৌবারিকের দু’কলম’ প্রভৃতি গল্প। গল্পগুলিতে এসময়ের অভিজ্ঞতার প্রত্যক্ষ ছাপ রয়ে গেছে। কিছুদিন পর থেকেই ‘বাংলার কথা’, ‘বঙ্গবাণী’ এবং ‘ফরওয়ার্ড’ পত্রিকা ‘লিবার্টি’ নামে প্রকাশিত হতে থাকে। এই নামপরিবর্তনের কারণ স্বরূপ দুটি মত প্রচলিত আছে। প্রথমটি হল, রাজরোষ এবং দ্বিতীয়টি হল রেল দুর্ঘটনা সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশে রেলওয়ে কোম্পানির সঙ্গে মামলা। দুটি কারণ এক হওয়ার সম্ভাব্যতাও থাকতে পারে। প্রবোধকুমার সান্যালের ‘বনস্পতির বৈঠক’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার সময় প্রেমেন্দ্র নামপরিবর্তনের কারণ স্বরূপ রেল দুর্ঘটনার প্রতিবেদন সম্পর্কিত মামলার কথা মেনে নেন। সমালোচক ডঃ সুমিতা চক্রবর্তী অনুমান করেছেন, রেল দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলাটি সরকারের বিরুদ্ধে মামলা। সে কারণেই রাজ্যরোষ আর তাই পত্রিকা নাম পরিবর্তন। (পৃঃ ৪১ প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুমিতা চক্রবর্ত্তী, পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি)। যাই হোক ‘বাংলার কথা’ এবং ‘বঙ্গবাণী’ দুটিতেই শেষ পর্যন্ত প্রেমেন্দ্র সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছিলেন। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসের পর ঐ পত্রিকাটিগুলি আর প্রকাশিত হতে পারে নি।

কিন্তু, তখন প্রেমেন্দ্রর আর্থিক উপার্জনের দায় ছিল প্রচুর। ১৯৩৪ খ্রীষ্টাব্দেই প্রেমেন্দ্র ও বিভার প্রথম সন্তান মাধবীর জন্ম হয়। ‘বঙ্গবাণী’ সম্পাদনা কালেই প্রেমেন্দ্র যুক্ত হয়েছিলেন সেই সময়ের প্রখ্যাত ঔষধ প্রস্তুতকারক সংস্থা ‘বেঙ্গল ইমিউনিটর’ বিজ্ঞাপন বিভাগের প্রচার সচিব হিসেবে। বিশ শতকে ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় ও তাঁর সহযোগী কয়েকজন ডাক্তার মিলে স্থাপন করেছিলেন ‘বেঙ্গল ইমিউনিটি’। কিন্তু কর্মব্যস্ত ডাক্তারেরা যথাযথ মন দিতে পারছিলেন না বলে প্রতিষ্ঠানটি কখনোই লাভের মুখ দেখেনি। সংস্থাটি উঠে যাওয়ার মুখে এর হাল ধরেন ক্যাপ্টেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত।নরেন্দ্রনাথ ডাক্তারি পাস করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ক্যাপ্টেন পদাধিকারী চিকিৎসক হয়েছিলেন। রাজনীতি সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রভৃতি সমস্ত বিষয়ে তাঁর উৎসাহ ছিল উল্লেখ করার মত। বিপ্লবী যুগান্তর দলের সমর্থক ছিলেন নরেন্দ্রনাথ। এই সময়েই নরেন্দ্রনাথের সাথে বিধানচন্দ্রের পরিচয়লাভ ও বেঙ্গল ইমিউনিটির দায়িত্বভার গ্রহণ পর্বটি সম্পূর্ণ হয়। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে ওই সংস্থার বিজ্ঞাপন বিভাগে প্রচারসচিবের কাজ পেলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। প্রেমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে শিবরাম চক্রবর্তীর সখ্যও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল। ‘সাহিত্যসেবক সমিতি’র সঙ্গে সংযোগসূত্রে প্রেমেন্দ্রের রচনার একনিষ্ঠ পাঠক হিসেবে শিবরাম প্রেমেন্দ্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হন। শিবরাম পরবর্তীকালে তাঁর একটি সাক্ষাৎকারে তাঁদের সমকালে প্রেমেন্দ্রই যে শ্রেষ্ঠ তা দ্বিধাহীনভাবে প্রকাশ করেছিলেন। উভয়ের লেখালেখি উভয়কে প্রভাবিতও করেছিল যথেষ্ট। বিশেষত প্রেমেন্দ্রের অসংখ্য ছোটগল্পে আমরা ক্রমেই লক্ষ করেছি স্পষ্টত হিউমার ও স্যাটায়ারের আবহ হিসেবে তৈরি হয়েছে। বিষয় হিসেবে তাকে গ্রহণ এ ব্যাপারে শিবরামের সখ্য ও প্রভাব অবশ্যই কাজ করে থাকবে। প্রসঙ্গত, ‘আদ্যাক্ষর’, ‘যষ্টিরূপে তমোনাশ’, ‘বিপদ মানেই বিপবারণ’, ‘পরোপকার’ প্রভৃতি গল্পের সঙ্গে অন্য গল্পগুলিকে মিলিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে গল্পগুলি হিউমার ও স্যাটায়ার ভাবনায় কিভাবে এখানে অনবদ্য হয়ে উঠেছে। যাইহোক, শিবরাম চক্রবর্তীও ‘আত্মশক্তি’ পত্রিকায় কিছুকাল সম্পাদকের কাজ করেছিলেন। কিন্তু স্থায়ী ভাবে কাজ করতে পারেন নি নিজ অস্থির স্বভাবের জন্য।

এইখানেও প্রেমেন্দ্র মিত্রের সঙ্গে তাঁর মিল ছিল। শিবরামের জন্য বেঙ্গল ইমিউনিটির প্রচার সচিবের কাজে সুপারিশ করেছলেন স্বয়ং ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়। কিন্তু, দশটা পাঁচটার ডিউটি দিতে অনীহা ছিল শিবরামের। আর তাই শিবরাম তাঁর পরিবর্তে কাজটি দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন প্রেমেন্দ্রকে। এতে নরেন্দ্রনাথ রাজী হয়েছিলেন এবং প্রেমেন্দ্র প্রচার সচিব হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণও করেছিলেন। কিন্তু, শিবরামের মতই ‘দশটা পাঁচটার’ নিয়মিত উপস্থিতির প্রতি অনীহাবশত প্রেমেন্দ্র কাজটা চালিয়ে যেতে পারেননি। কিন্তু, ক্যাপ্টেন নরেন্দ্রনাথ দত্তের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিলই। পরে ‘বেঙ্গল ইমিউনিটির বিজ্ঞাপন লেখনের কাজে যোগ দেন প্রেমেন্দ্র।

অন্যদিকে, ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে মধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে প্রেমেন্দ্রের চারটি উপন্যাস ‘পাঁক’, ‘মিছিল’, ‘আগামীকাল’ এবং ‘কুয়াশা’। প্রকাশিত হয়েছে গল্পসংকলন গ্রন্থ ‘পঞ্চশর’ এবং ‘বেনামী বন্দর’। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে প্রেমেন্দ্রের প্রথম কবিতা সংকলন ‘প্রথমা’ প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ এ সময়ের মধ্যেই কবিতা-উপন্যাস-ছোটগল্প তিনটি ক্ষেত্রেই প্রেমেন্দ্র সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

প্রেমেন্দ্র রচিত শিশু সাহিত্য

প্রেমেন্দ্র-সাহিত্যে আর একটি দিক উজ্জ্বল হয়ে আছে, সেটি হলো প্রেমেন্দ্র রচিত শিশু সাহিত্য। শিশু-কিশোরদের জন্য রচিত গল্পে প্রেমেন্দ্রের সার্থকতা ও সাফল্যের শুরু ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে। ‘দেব সাহিত্য কুটির’ প্রকাশনা সংস্থা থেকে ছোটদের জন্য সুদৃশ্য, সুমুদ্রিত, সমৃদ্ধ পূজাবার্ষিকী প্রকাশিত হতে থাকে ১৯৩৭ সাল থেকেই। সমকালের প্রতিষ্ঠিত লেখকরা প্রায় প্রত্যেকেই প্রকাশকদের অনুরোধে এখানে লিখতে শুরু করেন। প্রেমেন্দ্র এসময়ে যে সাহিত্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রেই রীতিমতো সুপ্রতিষ্ঠিত তা উল্লেখ করা হয়েছে। পূজাবার্ষিকীর প্রথম ছোটদের জন্য লেখাতেও তিনি সকলের দৃষ্টি আকর্ষন করলেন।

প্রথম প্রকাশিত শিশুতোষ গল্পটির নাম ছিল ‘মশা’। গল্পের নায়ক ঘনশ্যাম। মেসের বাসিন্দা। রীতিমত বাকপটু, বিদেশী ফিশন্ গল্পের নায়কের ছায়ায় তাকে নির্মাণ করেছিলেন বলে নিজেই জানিয়েছিলেন প্রেমেন্দ্র। (আনন্দমেলা, মে সংখ্যা, ১৯৮৬)। ঘনাদার চরিত্রে অন্যতম সমালোচক সুরজিৎ দাশগুপ্ত দেখেছিলেন ডঃ গোবিন্দ ঘোষাল লেনের বিমলচন্দ্র ঘোষ ওরফে টেনিদার ছায়া। বিষয়টি নিয়ে বিতর্কআছে। যত বিতর্কই থাকুক বাংলায় মজলিসী সাহিত্যের একটি নতুন ঘরানা তৈরী হয়েছিল ঘনাদার আবির্ভাবে। কৃশকায়, শ্যামবর্ণ, চওড়া কপালবিশিষ্ট ঘনাদা বাঙালীর তরুণদের একসময়ের প্রতিভূস্বরূপ। মেসে তার বাস এবং সঙ্গী ছেলেরাই তার গল্পের শ্রোতা। এই ছেলেরাই তাকে প্রিয় খাদ্য ও অফুরন্ত নেশার দ্রব্যের যোগান দেয় বিনিময়ে অফুরাণ গল্প শোনায় ঘনাদা। তার কাহিনি বিচিত্র, অভিজ্ঞতা বিপুল। তিনি সর্বত্রই সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তা প্রমাণে সক্ষম। জ্ঞান, বুদ্ধি, মেধা, সাহস সবই তার পায়ের ভৃত্য – সুতরাং তিনি অতুলনীয়। এই হলো ঘনাদার গল্পের সারবত্তা। আর গল্পগুলি মিথ্যা জেনেও তার কথনের আকর্ষণে, রোমাঞ্চকর বর্ণনার টানে মুগ্ধ হয়ে থাকে মেসের ছেলেরা, এবং এভাবেই ছোটবড় নির্বিশেষে গল্প পাঠকের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুও হয়ে ওঠেন ঘনাদা। সর্বোপরি বিজ্ঞান-ফিকশন এত নিপুণভাবে বাংলায় এর আগে পরিবেশিত হয়েছে কিনা যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

প্রসঙ্গত অবশ্যই মনে পড়বে ত্রৈলোক্যনাথের ডমরুধর এবং প্রমথ চৌধুরীর নীললোহিতের কথা। কিন্তু পূর্বসূরীদের সঙ্গে মিল থাকা সত্ত্বেও প্রেমেন্দ্রের বর্ণনায়, ও সময়নিরিখে ঘনশ্যাম দাস প্রাসঙ্গিক এবং সে কারণেই ঘনাদার গল্পগুলিও মৌলিক। বাংলায় কল্পবিজ্ঞান কাহিনির স্রষ্টার কৃতিত্বও প্রেমেন্দ্র মিত্রেরই প্রাপ্য। ঘনাদার গল্প ছাড়াও এসময় ছোটদের জন্য আরও অসংখ্য রকম গল্প, অ্যাডভেঞ্চার গল্প, ভূতের গল্প, পরাশর বর্মার কাহিনি ও অসংখ্য কবিতা লিখেছেন প্রেমেন্দ্র।

অবশ্য, প্রেমেন্দ্র মিত্রের প্রথম ছোটদের বিষয়ক লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে ‘রামধনু’ র পাতায়। রামধনুর সম্পাদক তখন ছিলেন তরুণ মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য ও ক্ষিতীন্দ্র নারায়ণ ভট্টাচার্য। রামধনুর পাতায় প্রথম গল্প ছিল ‘সেকালের কথা’। এটিই পরে ‘পিঁপড়ে পুরাণ’ নাম দিয়ে গ্রন্থাকারে বের হয়েছিল। এরপরে প্রকাশিত হয়েছিল একে একে ‘কালাপানির অতলে’, ‘ডঃ সরকারের ডায়েরী’, ‘শয়তানের দ্বীপ’, ‘হিমালয়ের চূড়ায়’, ‘পৃথিবীর শত্রু হার্মাদ’ প্রভৃতি। অন্যদিকে ‘মৌচাক’ ও ‘রংমশাল’ -এর মত নতুন কাগজে বেরিয়েছিল- ‘কুসুমের দেশে’, ‘ময়দানবের দ্বীপ’, ‘পৃথিবী ছাড়িয়ে’ প্রভৃতি উপন্যাস।

অন্যদিকে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ তখন লিখছেন, ইংরেজীতে প্রথম সার্থক গদ্য কবিতা ‘দ্য চাইল্ড’। আর গদ্যকবিতার সংকলনরূপে ‘পুনশ্চ’ প্রকাশ পেল ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে। প্রেমেন্দ্র মিত্র কিন্তু ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ থেকেই বিচ্ছিন্নভাবে গদ্যকবিতা লিখছিলেন; যেমন ‘পথ’, ‘মানুষের মানে চাই’ প্রভৃতি। এগুলি সমকালীন বিভিন্ন পত্রিকায় যেমন ‘বিজলী’, ‘কালিকলম’ প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এই ‘পথ’ প্রতীকটি নানাভাবেই প্রেমেন্দ্রের লেখায় বারবার এসেছে। অন্যদিকে, প্রেমেন্দ্রের প্রায় সমকালেই প্রকাশিত হয়েছে বুদ্ধদেব বসুর ‘মর্মবাণী’ (১৯২৪), সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘তন্বী’ (১৯৩০) জীবনানন্দ দাশের ‘ঝরা পালক’ (১৯২৭) প্রভৃতি। প্রত্যেকেই এঁরা নিজস্বতা নিয়ে অবির্ভূত হয়েছিলেন। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের আঙ্গিকের অভিনবত্ব, বুদ্ধদেব বসুর রোমান্টিকতা, জীবনানন্দের গভীর অনুধ্যান-এসবের পাশাপাশি ‘প্রথমা’র সারল্য এবং পরিচ্ছন্ন বাচনভঙ্গী কবিতা পাঠকদের কাছে সাদরে গৃহীত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথও প্রশংসা করেছিলেন ‘প্রথমা’ সংকলনটির। তবে নবীন কবিকে প্রবীনের পরামর্শ ছিল ‘জীবনের যে ভূভাগে মরুর অধিকার পাকা হয়নি, যেখানে ফুল ফোটে, ফল ফলে, সেখানেও কবি বাঁশি বাজাবার বায়না পেয়েছে একথা মনে রেখো- কেবল দুন্দুভি বাজাবার পালা তার নয়।’ (পূর্বাশা পত্রিকার রবীন্দ্রসংখ্যা ১৯৪১ এ প্রকাশিত, সুত্রঃ উত্তরসূরীদের প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ, পিনাকী চৌধুরী)। রবীন্দ্রনাথ এই কবিতাগুলির সত্যতা স্বীকার করেও অসুন্দর জটিল বাস্তবতা, যা আধুনিক সাহিত্যের লক্ষণ তা যে তাঁকে আকৃষ্ট করেনি তা জানাতে দ্বিধা করেননি।

১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রেমেন্দ্র মিত্রের জনপ্রিয়তা যে যথেষ্টই ছিল তার একটি প্রমাণ হতে পারে ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে রমেশচন্দ্র সেন স্থাপিত ‘সাহিত্য সেবক সমিতি’র প্রেমেন্দ্র মিত্রকে দেওয়া সম্বর্ধনা। ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘সাহিত্যসেবক সমিতি’ দীর্ঘ সময় ধরে বাংলা সাহিত্যিকদের মিলনক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। রমেশচন্দ্র সেন নিজেও একজন সমাজমনস্ক সাহিত্যিক ছিলেন। তাঁর সাহিত্যসভায় আসতেন নানা মতাদর্শের সাহিত্যিকরা; পেশায় চিকিৎসক রমেশচন্দ্রের মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের চিকিৎসালয় এবং ওষুধের দোকানঘরটিতেই তখন বসত সাহিত্যিকদের আসর। নবীন-প্রবীন অনেকেই এখানে আড্ডায় আসতেন। এঁদের মধ্যে ছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুশীল জানা, শিবরাম চক্রবর্তী, বনফুল, মোহিতলাল, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সজনীকান্ত দাস প্রমুখ। প্রেমেন্দ্র মিত্রের চতুর্থ গল্পসংকলন ‘পুতুল ও প্রতিমা’ (১৯৩২ খ্রিস্টাব্দ) এবং ‘প্রথমা’ কবিতা সংকলন প্রকাশিত হওয়ার পর ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে প্রেমেন্দ্র মিত্রকে সংবর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। এই উপলক্ষে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন সমালোচক সজনীকান্ত দাস। এর তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। কিন্তু এই ঘটনা থেকে একটা কথা প্রমাণিত হয় নিন্দা ও প্রশংসা সত্ত্বেও প্রেমেন্দ্র বাংলা আধুনিক কবিতা ও ছোটগল্পের শিল্পীরূপে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন ক্রমশঃ। ছোটগল্পকার হিসেবে তখন প্রেমেন্দ্র সুপ্রতিষ্ঠিত এবং তাঁর প্রতিটি ছোটগল্পই স্বমহিমায় সুপরিচিত হয়ে উঠেছে।

১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রেমেন্দ্রের চারটি গল্পসংকলন প্রকাশিত হয়েছিল ‘পঞ্চশর’ (১৯২৯), ‘বেনামী বন্দর’ (১৯৩০), ‘পুতুল ও প্রতিমা’ (১৯৩২) এবং ‘মৃত্তিকা’ (১৯৩৫)। প্রতিটি গল্পসংকলন স্বতন্ত্র মর্যাদায় ভূষিত হয়ে উঠেছিল।

১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দেই প্রেমেন্দ্রের প্রথমা স্ত্রী বিভাদেবীর মৃত্যু হয়। মাত্র উনিশ বছর বয়সে মারা যান বিভাদেবী, তিনটি অল্পবয়স্ক সন্তান মাধবী, মৃন্ময় ও হিরন্ময়কে রেখে। তিনটি শিশু সন্তানকে নিয়ে বিব্রত প্রেমেন্দ্র দ্বিতীয় বিবাহের সিদ্ধান্ত নেন। বন্ধুদের সহায়তায় গিরিডির রাজ এস্টেটের দেওয়ান তিনকড়ি বসুর পৌত্রী, আশুতোষ বসুর কন্যা বীণাদেবীর সঙ্গে বিবাহ হয় তাঁর। মাতৃহীন বিভাদেবীর সন্তানদের বীনাদেবী ছিলেন সত্যিকারের মা। এবং নিজের সন্তান না থাকলেও তাঁর সন্তানস্নেহে ঘাটতি ছিল না। সর্বোপরি, প্রেমেন্দ্র মিত্রের অনিয়মিত, অপরিমিত উপার্জনেও সাংসারিক শান্তি বজায় রাখার দায়িত্বভার বীণাদেবীই গ্রহণ করেছিলেন।

১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দেই প্রেমেন্দ্র মিত্র যুক্ত হয়েছিলেন সরকারী অনুবাদকর্মের সঙ্গে। সেই উপলক্ষে তৎকালীন সেক্রেটারিয়েট এ তাঁকে কিছুকাল যাতায়াত করতে হয়েছিল। অনেকেই মনে করেন সেখানকার দীর্ঘ কাঠের সিঁড়ি লক্ষ্য করেই তিনি ‘সম্রাট’ কাব্য গ্রন্থের ‘কাঠের সিঁড়ি’ কবিতাটি লিখেছিলেন। ১৯৩৪ ও ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই প্রেমেন্দ্র ও তাঁর পরিবারের ঘনিষ্ঠতা হয় বুদ্ধদেব বসু ও তাঁর পত্নী প্রতিভা বসুর সঙ্গে। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের ১লা অক্টোবর প্রকাশিত হয় বুদ্ধদেব বসুর সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকা। এখানে যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। কবিতার প্রতি ভালোবাসার টানে পরীক্ষামূলক কবিতার বিষয়-আঙ্গিক ভাবনায় প্রকাশিত হয়েছিল বুদ্ধদেব বসুর এই পত্রিকাটি। বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে ‘কল্লোল’ এর সময়কালে ১৯৩০- ‘৩১ খ্রিস্টাব্দে প্রেমেন্দ্রের যে পরিচয় ঘটেছিল তা ক্রমে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। ‘কবিতা’ পত্রিকার সূত্রে দুজনের বন্ধুত্ব গভীরতর হয়েছিল। কবিরূপে প্রেমেন্দ্র তখন ছিলেন প্রথিতযশা। বুদ্ধদেবের কবি প্রতিপত্তি নিছক কম ছিল না। ‘কবিতা’ পত্রিকার প্রথম রচনাটি ছিল প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতা ‘ইলেকট্রনের তামাশা’। বুদ্ধদেব এভাবেই মর্যাদা দিয়েছিলেন বন্ধুত্বের। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে বুদ্ধদেব-প্রতিভা বসু সহ অনেকের সঙ্গে নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন প্রেমেন্দ্র। কিন্তু, এরপরেই ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে ‘কবিতা’ পত্রিকার সম্পাদকরূপে প্রেমেন্দ্র মিত্রের নাম আর দেখা যায় নি। বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে মতবিরোধই এর কারণ কিনা সঠিক বলা যাচ্ছে না, তবে ‘কবিতা’ পত্রিকার সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ’ সংযুক্তি প্রেমেন্দ্রের ছিল না। ‘কবিতা’ পত্রিকা নিয়ে গবেষণারত গবেষক প্রভাতকুমার দাসকে প্রেমেন্দ্র লিখেছিলেন যে, চলচ্চিত্র মাধ্যমের সঙ্গে সংযুক্তির কারণে তিনি ‘কবিতা’ পত্রিকার জন্য সময় দিয়ে উঠতে পারেন নি। শুধু এইটুকু ছাড়া বুদ্ধদেব বা প্রেমেন্দ্র কেউই প্রকাশ্যে আর কিছু বলেন নি। প্রভাত কুমার দাসের অনুমান গদ্যকবিতা বিষয়েই তাঁদের মতান্তর হয়েছিল। গদ্যকবিতার আঙ্গিক নিয়ে এই মতপার্থক্যের কারণ অবশ্য ছিলই। কারণ, ‘কবিতা’ পত্রিকায় যাঁদের কবিতা প্রকাশিত হত তাদের কবিতায় প্রকরণগত জটিলতা ও দুর্বোধ্যতা প্রায়ই চোখে পড়ত। আবার, কোথাও পাশ্চাত্যের অকারণ অনুকরণও দুর্লভ ছিল না। এজাতীয় জটিলতা ও অন্ধ অনুকরণ প্রেমেন্দ্র মিত্র পছন্দ করতেন না; প্রসঙ্গত, আমাদের মনে পড়বে ‘নিরুক্ত’ পত্রিকাটি প্রকাশের পূর্বে প্রেমেন্দ্র চিঠি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। সেখানে প্রেমেন্দ্র বাংলা কবিতায় ‘নকল করা বাতুলতার হুজুগ’ কে আক্রমণ করে ‘কাব্যাদর্শ’ গঠনের কথা বলেছিলেন কবিকে।

প্রসঙ্গটি অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ এখানেই রয়ে গিয়েছে মতাদর্শগত বিরোধের আভাস। অন্যদিকে, আরেকটি সূত্রও চলে আসে পাশাপাশি ‘কবিতা’ পত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে সঙ্গেই প্রেমেন্দ্র মিত্র সম্পাদনা করছিলেন ‘নবশক্তি’ পত্রিকা। এ কারণেও হয়ত প্রেমেন্দ্র ‘কবিতা’ পত্রিকার জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন নি। অথচ, ‘নবশক্তি’ পত্রিকা থেকে তিনি যে উপার্জন করতেন সেটা তার পক্ষে খুবই জরুরী ছিল। ‘নবশক্তি’ আসলে ছিল ১৯২১ খ্রিস্টাব্দের প্রকাশিত ‘আত্মশক্তি’ পত্রিকারই পরিমার্জিত রূপ। ‘নবশক্তি’ চিত্তরঞ্জন দাশ পরিচালিত স্বরাজ্য দলের মুখপাত্র হিসাবে নির্দিষ্ট হয়েছিল। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে বিপ্লবী তারানাথ রায়ের সম্পাদনায় ‘নবশক্তি’ পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। ক্রমে পত্রিকাটির আর্থিক সামর্থ ক্ষীণ হয়ে এলে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে এই পত্রিকাটি কিনে নিয়েছিলেন বেঙ্গল ইমিউনিটির ক্যাপ্টেন নরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে থেকে এর সম্পাদক নিযুক্ত হন প্রেমেন্দ্র মিত্র এবং সহকারী সম্পাদক হন অদ্বৈত মল্লবর্মন। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত দুই সম্পাদক ও কথাশিল্পীর লেখায় ভরে থাকত কাগজটি। নবীন-প্রবীন দুই ধরনের লেখকই নিয়মিত লিখতেন এখানে। নিয়মিত প্রকাশিত হত একাঙ্ক নাটক। লিখতেন সমকালের প্রতিষ্ঠিত লেখকরা বুদ্ধদেব বসু, মন্মথ রায়, শিবরাম চক্রবর্তী প্রমুখ। প্রেমেন্দ্র মিত্র লিখতেন সম্পাদকীয় ও ‘বেঙ্গল ইমিউনিটি’র বিজ্ঞাপনী প্রচারসমৃদ্ধ গল্প। যে কোন বিষয়কেই আগ্রহের করে তোলায় প্রেমেন্দ্র ছিলেন সিদ্ধহস্ত; তাই এ ধরনের লেখাও বিশেষত প্রভাব ফেলেছে তা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। বস্তুত, প্রেমেন্দ্রের বিচিত্র জীবন ও কর্ম অভিজ্ঞতাই তাঁর লেখায় বৈচিত্র্য এনেছে অনেকাংশে, তা অস্বীকার করা যায় না। ‘মৌচাক’, ‘রঙমশাল’, ‘রামধনু’ পত্রিকায় আগেও লিখেছিলেন প্রেমেন্দ্র। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে থেকে ‘রঙমশাল’ পত্রিকার অন্যতম উপদেষ্টা ও সম্পাদক হয়ে উঠলেন তিনি। পরীক্ষামূলক ভাবনায়, বিচিত্র লেখায় ভরে উঠল ‘রঙমশাল’ পত্রিকা। এবং এখানের লেখক গোষ্ঠী পারস্পরিক বন্ধুতায় সংযুক্ত ছিলেন দীর্ঘকাল।

১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হল ‘নিখিল ভারত প্রগতি লেখক সংঘ’। এই সংঘের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন মুন্সী প্রেমচন্দ। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে প্রগতি লেখক সংঘের সদস্যরা প্রকাশ করলেন ‘টুওয়ার্ডস প্রগ্রেসিভ লিটারেচার’ এবং ‘প্রগতি’ নামে বাংলা ও ইংরাজী দ্বিভাষিক সংকলন। ‘প্রগতি’ পত্রিকাটিতে প্রকাশিত হয়েছিল প্রেমেন্দ্র মিত্রের ‘কল্পনায়’ নামক একটি গল্প। ‘প্রগতি লেখক সংঘ’-এর সক্রিয় সদস্য হিসেবে প্রেমেন্দ্র দ্বিতীয় সম্মেলন (১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে) -এ যোগ এবং আলোচনা সভায় একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। ‘কল্পনায়’ গল্পটিতে তাঁর সমকালের একজন দরিদ্র অসহায় মানুষের চিত্র ফুটে উঠতে দেখা গেছে যে নিপীড়িত, শোষিত, বঞ্চিত কর্ম ও জীবিকার তাড়নায় তাড়িত, ব্যক্তিগত জীবন বলে তার কিছু নেই, ভাগ্যের হাতে সে সঁপে দেয় নিজেকে। কিন্তু, শেষ পর্যন্ত এই বঞ্চনা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করে। ‘মালেক’ নামে এই চরিত্রটি যে কল্পিত নয়, সাংবাদিক ও সত্যান্বেষীর দৃষ্টি দিয়ে প্রেমেন্দ্র তা দেখিয়েছিলেন। এর পাশাপাশি এসেছে আরব্য রজনীর একটি কল্পিত প্রেক্ষিত, মুহূর্তেই অবশ্য তা ছিন্ন হয়েছে বাস্তব অভিঘাতে। লেখক সুনিপুণ ভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করেছেন, শ্রমজীবী মানুষের ট্র্যাজেডি, যা তাদের চরিত্রগত নয়। সমাজের গভীরেই রয়ে গেছে এর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। বোঝা যায় ‘প্রগতি’ পত্রিকায় ‘কল্পনা’ য় ছাপা হওয়ার কারণটি। অবশ্য প্রেমেন্দ্রের সমাজতান্ত্রিক ভাবনার সূত্রপাত আরও আগেই ঘটেছিল ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে ‘সংহতি’ পত্রিকার সূত্রে। তাঁর ‘পাঁক’ উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ‘সংহতি’ পত্রিকাতেই ধারাবাহিকরূপে। ‘সংহতি’ র সাম্যবাদী ভাবনা এবং কল্লোলীয় বাস্তবতা দুইই প্রেমেন্দ্রের ভাবাদর্শকে প্রভাবিত করেছে। কিন্তু, কল্লোলীয়রা প্রায়ই ইউরোপীয় বাস্তবতার অন্ধ অনুকরণ করেছেন যা প্রেমেন্দ্র মিত্রের রচনায় প্রভাব ফেললেও ন্যাচারালিজম্ -এর কদর্য অনুপুঙ্খ অনুকরণ গ্রহণ করেননি প্রেমেন্দ্র। তুলনায় ‘সংহতি’ ও তাঁর সমাজতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিফলন বেশী ঘটেছে প্রেমেন্দ্রের অনেক রচনাতেই। ‘পাঁক’ উপন্যাসে অবশ্য শ্রমজীবী জনগণের কথা এসেছিল সমাজতন্ত্রবাদী ধারণার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংযোগের আগেই ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে প্রেমেন্দ্রের চোদ্দ বছর বয়সে; কিন্তু পাঁক উপন্যাসের দ্বিতীয় পর্ব পড়লে বোঝা যায়, সমাজতন্ত্র প্রেমেন্দ্রের মননে ক্রমেই গভীরতম ছাপ ছেলতে শুরু করেছিল। শ্রেণীগত সম্পর্ক, মজুর শ্রেণীর দাবি, সমাজ গঠন, ঔপনিবেশিক শোষণ প্রভৃতির বিশ্লেষণে ‘পাঁক’ উপন্যাসের দ্বতীয় পর্বে ক্রমশ সাম্যবাদ প্রভৃতির প্রসঙ্গও উপস্থাপিত হয়েছে। ‘কল্লোল’ সূত্রে ইতিমধ্যেই প্রেমেন্দ্র পরিচিত হয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম ও তাঁর সাম্যবাদী ভাবনার সঙ্গে। এ সমস্তই প্রেমেন্দ্রকে অনুপ্রাণিত করেছিল।

‘প্রগতি’ র সঙ্গে সংযোগের পর ফ্যাসিবিরোধী সাংস্কৃতিক প্রয়াসের সঙ্গে প্রেমেন্দ্রের সম্পর্ক স্থাপিত হয় ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে সোভিয়েত রাশিয়া জার্মানির নাৎসিবাহিনি দ্বারা আক্রান্ত হলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ও বুদ্ধিজীবীরা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেন। ‘আনন্দবাজার পত্রিকায় ১৯৪১ এর ১৯ জুলাই বুদ্ধিজীবীদের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। এই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন বহু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের মত প্রেমেন্দ্র মিত্রও।

বাংলার ফ্যাসিবিরোধী আন্দোলন বিপুলভাবে আলোড়িত হয়েছিল ঢাকার তরুণ সাম্যবাদী কর্মী সোমেন চন্দের হত্যাকান্ডের পর। ঢাকায় ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ তারিখে ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’-র ব্যবস্থাপনায় একটি ফ্যাসিবিরোধী সম্মেলন আহুত হয়। সোমেন চন্দ ছিলেন রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়ন -এর সম্পাদক। সেই সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য মিছিল করে আসার সময় সশস্ত্র রাজনৈতিক দলের আক্রমনে নৃশংসভাবে নিহত হন তিনি। তখন সোমেন চন্দের বয়স মাত্র একুশ, ছোটগল্পকার হিসেবে তিনি ইতিমধ্যেই যথেষ্ট সাড়া ফেলেছিলেন। তাঁর জনপ্রিয়তম গল্প ছিল ‘ইঁদুর’।

সোমেন চন্দের মৃত্যুর অভিঘাতে ফ্যাসিবিরোধী আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ওঠে। এই অভিঘাতেই বাংলায় গঠিত হয় ফ্যাসিবিরোধী ‘লেখক ও শিল্পী সংঘ’। দল-মত নির্বিশেষে সাহিত্যসেবীরা যুক্ত হয়েছিলেন এই মঞ্চে। প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রথমাবধি যুক্ত ছিলেন এই সংঘের সঙ্গে। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে এই সংঘের দ্বিতীয় সম্মেলনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। এই সম্মেলনে সংঘের নতুন কমিটি গঠিত হয়। সেই কমিটির সভাপতিও নির্বাচিত হয়েছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র।

ফ্যাসিবিরোধী কার্যক্রমের অর্ন্তভুক্ত সবগুলি না হলেও বেশিরভাগ গ্রন্থেই প্রেমেন্দ্র মিত্রের রচনা সংকলিত হয়েছে। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে ‘একসূত্রে’ নামক এই সংঘের কবিতা সংকলনে পঞ্চান্নজন কবির মধ্যে ছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্রও। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে সংঘের প্রবন্ধ সংকলনেও পনেরোজন উল্লেখযোগ্য লেখকের সঙ্গে ছিলেন স্বনামধন্য প্রেমেন্দ্র মিত্র। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের পরে ইতালী-জার্মানি-জাপান জোটের পরাজয়ের পর ক্রমে এসেছিল ফ্যাসিবিরোধী সংঘের প্রয়োজনীয়তা। ‘প্রগতি লেখক সংঘ’ থেকে ‘ফ্যাসি বিরোধী লেখক শিল্পী সংঘ’ সর্বত্রই কার্যকরী হয়েছিল প্রেমেন্দ্রের সমাজতান্ত্রিক বাস্তববোধ। এবং ‘সংহতি’ পত্রিকার সমাজতান্ত্রিক আদর্শই এর মূল ভিত্তি।

১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দেও যখন পশ্চিমবঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ‘ভারতীয় প্রগতি লেখক সংঘ’, তখনও প্রৌঢ় প্রেমেন্দ্র তার প্রাদেশিক শাখার সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এভাবেই প্রেমেন্দ্রের মানসগঠনে সমাজতন্ত্রবাদ গভীর শিকড় বিস্তার করেছিল। তাই এর বিপুল কর্মকান্ডে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন তিনি বারবার এবং এসবের প্রভাব পড়েছে তার লেখায়।

চলচ্চিত্র জগতে প্রেমেন্দ্র মিত্র

১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে চলচ্চিত্র জগতের সংযোগ ঘটে যায় প্রেমেন্দ্র মিত্রের; এই শিল্পরূপের বৈচিত্র্য, অভিনবত্বের কারণে এটি প্রেমেন্দ্রের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত সতেরো বছর চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে যুক্ত ছিলেন প্রেমেন্দ্র। খুব অল্প বয়সে দাদা মশায়ের সঙ্গে ‘ম্যাজিক লণ্ঠন’ দেখার অভিজ্ঞতা, অ্যাংলো পাড়ায় নির্বাক বায়োস্কোপ দেখা- এ সব প্রয়োগশিল্প তাঁকে চিরকাল আকর্ষণ করেছিল। এই আকর্ষণেই নলহাটিতে ‘যাত্রা দেখা’ এবং বীরুমামার সঙে কথকতা ও যাত্রার দল তৈরীর কথাও ভেবেছিলেন প্রেমেন্দ্র। ১৯২৭খ্রিস্টাব্দে থেকে যখন কলকাতায় পাকাপাকি বাস করছেন প্রেমেন্দ্র তখন বন্ধুরা যে ম্যাডান থিয়েটার, কিংবা মেট্রোতে নিয়মিত সিনেমা-থিয়েটার দেখতেন তা প্রেমেন্দ্র উল্লেখ করেছেন তাঁর স্মৃতিকথা ‘নানা রঙে বোনা’ তে। প্রেমেন্দ্রর পূর্বসূরী নজরুল ইসলাম এবং সমবয়স্ক গোকুল নাগ, শৈলজানন্দও চলচ্চিত্র প্রযোজনায় জড়িয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু প্রেমেন্দ্রের মতো চলচ্চিত্রের নানা ক্ষেত্রে তাঁরা স্থায়ী হননি দীর্ঘদিন। চলচ্চিত্র প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা, গীতিকার, কাহিনিকার সবক্ষে ত্রেই প্রেমেন্দ্র প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে। প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রায় চোদ্দটি ছবি পরিচালনা করেন। চলচ্চিত্রে পরিচালকরূপে তাঁর আত্মপ্রকাশ সমাধান চলচ্চিত্রের পরিচালনার মধ্যে দিয়ে। ‘বঙ্গীয় চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি’ ‘দাবী’ ছায়াছবির জন্য ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে প্রেমেন্দ্রকে শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার হিসেবে পুরস্কৃত করে।

‘বঙ্গীয় চলচ্চিত্র দর্শক সমিতি’ কর্তৃক পুরস্কৃত হয় তাঁর কাহিনি ও পরিচালনা সমৃদ্ধ ‘ভাবীকাল’। চলচ্চিত্র নির্মানশিল্পের প্রয়োগে প্রেমেন্দ্র এনেছিলেন অভিনবত্ব। আলো আঁধারী আবহনির্মাণে প্রেমেন্দ্র সার্থকতা অর্জন করেছেন, রহস্য রোমাঞ্চ প্রধান বাংলা ছায়াছবিতে প্রেমেন্দ্র মিত্র অপ্রতিরোধ্য জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তৎকালীন বোম্বেতে ‘ফিল্মিস্তান’ কোম্পানির সঙ্গে তিনবছরের চুক্তিতে ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে চিত্রনাট্য লেখার কাজ নিয়ে মুম্বই গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু পরের বছরই ফিরে আসেন, সম্ভবত সেখানকার পরিবেশে কাজ করার আগ্রহ হারিয়েছিলেন প্রেমেন্দ্র।

চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে সংযুক্তি প্রেমেন্দ্রর সাহিত্যভাবনাকেও প্রভাবিত করেছিল। চিত্রনাট্যের আদলে অনেক ছোটগল্প এসময় লিখেছেন প্রেমেন্দ্র। এসেছে চলচ্চিত্রের বিভিন্ন আঙ্গিক, নির্মান কৌশল এবং এর সবগুলিই রীতিমতো শিল্প সফল; যেমন – পান্থশালা (১৯৪৭), ইকেবানা (‘অষ্টপ্রহর’ গল্প সংকলনের অন্তর্গত- ১৯৭৩), কলকাতার আরব্য রজনী (‘ক্বচিৎ কখনো’ গল্প সংকলনের অন্তর্গত ১৯৬২)। আবার অনেক গল্প উপন্যাস প্রেমেন্দ্র নিজের তো বটেই, অন্য চলচ্চিত্রকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে প্রেমেন্দ্রের সমসময়ে এবং পরবর্তীকালে। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রেমেন্দ্রের গল্প সংকলন গ্রন্থের সংখ্যা পনেরো এবং উপন্যাসের সংখ্যা ষোল। এই পর্বে প্রেমেন্দ্র বেশ কিছু অনুবাদও করেছেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক- প্রতিটি সাহিত্যসংরূপকেই অনুবাদের আওতায় এনেছিলেন তিনি। লরেন্সের গল্প অনুবাদ-সংকলন সম্পাদনা করেছিলেন বুদ্ধদেব বসু ও ক্ষিতীশ রায়ের সঙ্গে। সমরসেট সম্ এর গল্প অনুবাদ ও সম্পাদনা করেছেন, বাণার্ড শ এর নাটকও অনুবাদ করেছেন। এসবই প্রকাশিত হয়েছে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে।

প্রেমেন্দ্র প্রথম সাহিত্য পুরস্কার পেলেন ১৯৫৪ সালে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে সম্মানিত করা হলো ১৯৫৪ সালে, ‘শরৎ স্মৃতি পুরস্কার’ দিয়ে। আকাশবাণী কলকাতার অনুষ্ঠান-প্রযোজক রূপে তিনি কাজে যোগদান করলেন ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে। এবং ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। আকাশবাণীতে কাজ করার সময়ও একটি বিশেষ সাহিত্যগোষ্ঠী তৈরী হয়েছিল যা শুধু পশ্চিমবঙ্গের নয়, ভারতীয় লেখক, শিল্পী ও সংগীতকারদের সমন্বয়ে গঠিত। এ সময়ে প্রেমেন্দ্রের সহকর্মী ছিলেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র, সৈয়দ আলী আহমেদ, লীলা মজুমদার প্রমুখ। এঁরা প্রত্যেকেই প্রেমেন্দ্রের উচ্ছ্বল, সদাপরিহাস প্রিয়, জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। অনুষ্ঠান প্রযোজক রূপেও প্রেমেন্দ্র ছিলেন অনবদ্য। প্রেমেন্দ্রের আগ্রহেই আকাশবাণীর পক্ষ থেকে নবীন সাহিত্যিকরা আমন্ত্রিত হতেন আকাশবাণী ভবনে। ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে প্রেমেন্দ্র পূর্বাঞ্চলীয় উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন আকাশবাণীতে। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে পর্যন্ত এই পদে যুক্ত ছিলেন প্রেমেন্দ্র।

১৯৫৬ খিস্টাব্দেই ‘সাগর থেকে ফেরা’ নামের কাব্য সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে ‘সাহিত্য অকাদেমী’ এবং ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ পান প্রেমেন্দ্র ঐ সংকলনের জন্যই। প্রখ্যাত সমালোচক জগদীশ ভট্টাচার্য আলোচ্য কাব্যটির প্রসঙ্গে লিখেছেন-

‘কবি বাঙালী জীবনের এই সূত্র ভৌগোলিক সীমানাকে পেরিয়ে আবার মহাপৃথিবীর বিশাল আকাশে মুক্তির স্বাদ পেতে চেয়েছেন। সাগর থেকে ফিরে তিনি সঞ্চারিত করে দিতে পেয়েছেন সুবিশাল সমুদ্রচেতনা’ (পৃঃ ১৩০, আমার কালের কয়েকজন কবি, জগদীশ ভট্টাচার্য)।

বলাবাহুল্য এ চেতনা সভ্যতার বুকে প্রাণচেতনারই নামান্তর। এর পাশাপাশি ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে ‘ঘনাদা সিরিজ’ গল্পমালার জন্য প্রেমেন্দ্র রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পান এবং ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে ‘পদ্মশ্রী’ সম্মানলাভ করেন। ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দেই প্রেমেন্দ্রের গোয়েন্দা উপন্যাস সংকলন ‘পরাশর’ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এর আগে ‘রোমাঞ্চ’ পত্রিকায় ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে পরাশর বর্মার গল্প বেরিয়েছিল। ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে বেঙ্গল পাবলিশার্স থেকে তিনটি পরাশর বর্মার উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছিল।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের প্রবন্ধ সাহিত্য

প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রাবন্ধিক রূপে পরিচিত না হলেও তার প্রবন্ধের সংখ্যাও কম নয়। ‘কৃত্তিবাস ভদ্র’ ছদ্মনামে অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছিলেন প্রেমেন্দ্র ‘পদবী বিলোপ’, ‘মুসায়েরা বা কবিসভা প্রভৃতি এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য, উক্ত প্রবন্ধগুলি অসংলগ্ন নাম দিয়ে গ্রন্থবদ্ধ হয় ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে। ‘বৃষ্টি এল’ প্রবন্ধ উনিশটি প্রবন্ধ সংকলনে হয়েছিল। ‘বর্বর যুগের পর’ (১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে) সংকলন গ্রন্থটিতে স্থান পেয়েছিল দশটি প্রবন্ধ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘কবিতার ছলাকলা’ প্রভৃতি। ‘বঙ্কিমচন্দ্রের জীবন ও সাহিত্য’ নামে প্রেমেন্দ্র লিখিত জীবনী গ্রন্থটিতে (১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে) পাওয়া যাচ্ছে সাহিত্য-তাত্ত্বিক প্রেমেন্দ্র মিত্রকে। ‘শত প্রসঙ্গ’ নামে প্রায় অসম্পূর্ণ একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে। প্রেমেন্দ্র লিখিত তাঁর অনবদ্য জীবনীকাহিনী ‘নানা রঙে বোনা’ গ্রন্থটিও প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দেই।

১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রেমেন্দ্র একমাত্র লেখা ছাড়া অন্য কিছুর সঙ্গেই নিজেকে যুক্ত করেননি। ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকা ও ইংল্যাণ্ড ভ্রমণ করেছেন প্রেমেন্দ্র। শিশুসাহিত্যের জন্য ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে পেয়েছেন ‘মৌচাক’ পুরস্কার। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকান তথ্যবিভাগ আয়োজিত চারদিন ব্যাপী আলোচনাচক্রে পাটনায় আমন্ত্রিত সাহিত্যিক হিসেবে গিয়েছিলেন প্রেমেন্দ্র। আলোচনাচক্রের বিষয় ছিল ‘আমেরিকান সাহিত্য’, প্রেমেন্দ্র ছিলেন আমন্ত্রিত বক্তা। ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে ‘ওয়েষ্ট বেঙ্গল রাইটার্স কো অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ এর অন্যতম ডিরেক্টর নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ‘আনন্দবাজার প্রকাশনা সংস্থা’র পক্ষ থেকে ‘আনন্দ পুরস্কার’ পান প্রেমেন্দ্র। ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে সোভিয়েত দেশ থেকে ‘নেহেরু পুরস্কার’ লাভ করেন এবং ঐ বছরই তিনি সর্বভারতীয় ‘অথরস্ গিল্ড’ এর সভাপতি হন। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ থেকে ‘হরলাল ঘোষ পদক’ এবং ১৯৮১ সালে ‘শরৎ সমিতি’ থেকে ‘শরৎ পুরস্কার’ পেয়েছেন প্রেমেন্দ্র। ১৯৮১ তেই পেয়েছিলেন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ডি. লিট উপাধি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জগত্তারিনী পদক’ তাঁকে প্রদান করা হয় ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গ সরকার শিশু সাহিত্যের জন্য তাঁকে ‘বিদ্যাসাগর পুরস্কার’ দান করেন। প্রেমেন্দ্রের শেষ সম্মানলাভ ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক ‘দেশিকোত্তম’ উপাধিপ্রাপ্তি। ১৯৬২ সালের পর থেকে প্রেমেন্দ্র একমাত্র সাহিত্যচর্চা ছাড়া অন্য কোন জীবিকার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন নি। শেষ দিকে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে এসেছিল প্রেমেন্দ্রের। ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে হারিয়েছিলেন দ্বিতীয় পত্নী বীণাদেবীকে। প্রেমেন্দ্রের জীবনে এ ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। ‘দেশিকোত্তম’ উপাধিলাভের পর ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ ফেব্রুয়ারী ‘শিল্প ও সাহিত্য’ পত্রিকার পক্ষ থেকে প্রতাপচন্দ্র চন্দ্রের বাড়িতে তাঁকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। এর পরেই ৪ঠা মার্চ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তিহন প্রেমেন্দ্র এবং ধরা পরে তাঁর ক্যানসার। এই দুরারোগ্য ব্যাধিতেই শেষ পর্যন্ত ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের ৩রা মে মৃত্যু হয় প্রেমেন্দ্র মিত্রের।

জীবনে সম্মান ও প্রতিষ্ঠা প্রচুর লাভ করেছেন প্রেমেন্দ্র। পুরস্কার বা সম্মান হয়ত শেষ কথা নয়, কিন্তু শিল্প ও শিল্পীকে সম্মানিত করার একটি মাধ্যম তা অস্বীকারও করা যায় না। জীবনের শেষ দিকে প্রেমেন্দ্র বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেছেন। ডিটেকটিভ গল্প, কল্পগাথা, নৃতাত্ত্বিক, ভৌগোলিক তথ্য সমৃদ্ধ অ্যাডভেঞ্চার পরাশর বর্মার কাহিনি, (১৯৬০) বা অন্যতম উপন্যাস ‘মনুদ্বাদশ’ (১৯৬৪) এর স্বাক্ষর। তবে, প্রেমেন্দ্র-সৃষ্ট গোয়েন্দা পরাশর বর্মা খুব বেশী জনপ্রিয়তা পায় নি। এর কারণ সম্ভবত প্রেমেন্দ্রের মজলিশি, ধীরচলন। তবে, সেগুলি ব্যর্থও হয়নি। প্রচলিত, গোয়েন্দাদের থেকে স্বতন্ত্র পরাশর বর্মা। সে অলস, কবিতা লিখতে ভালোবাসে, নির্জনতা চায়- কবি ও ডিটেকটিভএখানে সমন্বিত। আর পরাশরের সহকারী কৃত্তিবাস ওঝা। নামকরণে পুরাণ এবং আদলে বিদেশী ডিটেকটিভ গল্পের প্রভাব এখানে সমন্বয়িত। উপন্যাসের ক্ষেত্রটিও প্রায় বিবর্তিত হয়েছে প্রেমেন্দ্র-জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে বলা যেতে পারে। শেষ দিকের উপন্যাস ‘মনুদাদ্বশ’ ও ‘অমলতাস’ (১৯৬৬) প্রভৃতি প্রেমেন্দ্রের পরীক্ষায় নির্মিতিতে, রূপকল্পনায় অসাধারণ হয়ে উঠেছে। ভূ-বিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, সমাজবিবর্তন মিলিত বৈজ্ঞানিক ফিকশন্ ‘মনুদ্বাদশ’ এর অন্যতম আকর্ষণ। ‘অমলতাস’ উপন্যাসে মানবসম্পর্কের জটিল ঘাত-প্রতিঘাত দ্বন্দ্ব উপন্যাসের বিষয় হয়েও আত্মগত দর্শন গল্পটিকে অসাধারণত্ব দিয়েছে। ‘সাগর থেকে ফেরা’ (১৯৫৬) কাব্যগ্রন্থের পর প্রকাশিত হয় ‘হরিণ চিতা চিল’ (১৯৫৯), ‘কখনো মেঘ’ (১৯৬১) ‘অথবা কিন্নর’ এবং ‘নদীর নিকটে’ (১৯৭২) প্রভৃতি কবিতা সংকলন। এছাড়াও ১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দেই প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ (নাভানা প্রকাশনা)। এছাড়া অন্যান্য সংকলনগুলির মধ্যে আছে ‘প্রেমের কবিতা’ (১৯৭৩), ‘ছয় দশকের কবিতা’ (১৯৭৮) প্রভৃতি। প্রেমেন্দ্র প্রথম দিকের কবিতা যেমন ‘প্রথমা’ কিংবা ‘সম্রাট’ কাব্য সংকলনে আমরা দেখেছি সামাজিক সচেতন মনোভঙ্গি, নিপীড়িত মানুষ, অন্যায়ের প্রতিবাদ মূর্ত হয়েছে উঠেছে। কিন্তু ক্রমে জীবনের অবিরল আনন্দসন্ধানই প্রেমেন্দ্রের কবিতার বিষয় হয়ে উঠেছিল। নির্জনতা, আত্মসমাহিতি, নিবিড় অনুভূতিতে মগ্ন কবি এখানে অন্তরের সঙ্গে যোগের কথাই ভেবেছেন। ‘সাগর থেকে ফেরা’ (১৯৫৬) কে মাঝখানে রাখলে দুটি সময়ের বিভেদ স্পষ্ট বোঝা যায়। প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিমানসের বিশেষ লক্ষণ পথিকসত্ত্বা ও প্রেমিক সত্ত্বা, এ দুয়ের সমন্বয়েই প্রেমেন্দ্রের কাব্য অস্তিত্বের পূর্ণতা। প্রেমেন্দ্রকে কবি এলিয়ট নন মুগ্ধ করেছিলেন এজরা পাউন্ড। কিন্তু বিদেশী কবিদের অন্ধ অনুকরণে তাঁর আপত্তি ছিল। অসংখ্য অনুবাদ করেছেন। প্রেমেন্দ্র এবং সবই স্বচ্ছন্দ ভাবানুবাদ। ১৯৮২ পর্যন্ত প্রেমেন্দ্র মিত্রের ছোটগল্প লেখার কথা বলা হলেও, ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে গল্পসংকলন নির্বাচিতা বের হওয়ার পর নতুন কোন ছোট গল্প লেখেননি প্রেমেন্দ্র। নাট্যকার প্রেমেন্দ্র মিত্রের কথা আগেই বলা হয়েছে। ‘নবশক্তি’ পত্রিকার হয়ে নাট্যসমালোচনা করেছিলেন প্রেমেন্দ্র।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দুই পুরুষ’ নাটকটি ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে মঞ্চস্থ হলে এই নাটকের গান লিখেছিলেন প্রেমেন্দ্র। প্রেমেন্দ্রের ‘সামনে চড়াই’ গল্পসংকলনে ‘কালবৈশাখী’ নামে ছোট একটি নাটকও মুদ্রিত হয়। প্রেমেন্দ্র লিখেছেন একাধিক নাটক- ‘প্রেমই ধন্বন্তরি, (১৯২৯) মলিয়র এর গল্প ‘লা মুর মেদিসিন’ অবলম্বণে ‘হাত বাড়ালেই বন্ধু’ (১৯৬২) প্রভৃতি। ‘আগন্তুক’ রচিত হয় প্রেমেন্দ্র মিত্র ও তরুণ রায়ের উদ্যোগে। ‘পাহারা’ (১৯৪৮) নামক পত্রিকায় সমালোচনামূলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হত, দায়িত্বে ছিলেন প্রেমেন্দ্র। পুস্তক প্রকাশকদের সম্মিলিত প্রয়াসে ‘বইপত্তর’ (১৯৭৩) নামে পত্রিকা দায়িত্ব নেন তিনি। এই সময়েই ‘পক্ষীরাজ’ নামে একটি ছোটদের পত্রিকা সম্পাদনার কাজ নিয়েছিলেন প্রেমেন্দ্র, জীবনের শেষ দিন পর্যন্তও এই সম্পাদনা কাজে ব্যপৃত ছিলেন। সম্পাদক হিসেবে প্রেমেন্দ্রে খ্যাতি উল্লেখ করার মতই। একাধিক প্রতিভাধর প্রেমেন্দ্রের জীবন ও কর্মই তাঁর প্রতিভার যথার্থ পরিচায়ক, একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের সংগীত

প্রেমেন্দ্র মিত্রের বহুমুখী প্রতিভার আরেকটি চমকপ্রদ দিক ছিল তাঁর গান রচনা। তাঁর গানগুলোকে আধুনিক বাংলা গান হিসেবে সহজেই শ্রেণিকরণ করা যায়। তাঁর গানেও প্রেম, বিরহ, অনুভব এবং স্বাভাবিকভাবেই চাঁদ ফুল তারা পাখি ইত্যাদি শব্দের প্রভাব দেখা যায়। তাঁর কাছে গান লেখা ছিল অনেকটা খেয়ালি খেলার মতো; তাই এই ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্য ও জননন্দিত হওয়া সত্ত্বেও পরবর্তীতে তিনি এর প্রতি আর তেমন আগ্রহ বোধ করেননি।

মূল প্রবন্ধ: প্রেমেন্দ্র মিত্রের গান

পরবর্তীকালে গান লেখায় অনীহার কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছিলেন, সুরকার ও শিল্পীদের পেছনে ছুটে বেড়ানোর ঝক্কি সামলানো তাঁর স্বভাবে ছিল না। অথচ তাঁর এই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা গানগুলো যথাযথভাবে সংকলিত হলে বাংলা গানে একটি নতুন ঘরানার সন্ধান পাওয়া সম্ভব ছিল, যা একাধারে স্বাদুগুণসম্পন্ন, চমৎকার পাঠযোগ্য এবং গভীর কাব্যগুণে সমৃদ্ধ।[২]

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র

১. দোলন প্রভা, ৬ ডিসেম্বর ২০১৮, “প্রেমেন্দ্র মিত্র আধুনিক বাঙালি কবি ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং চিত্রপরিচালক”, রোদ্দুরে.কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/premendra-mitra/
২. সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪, পৃষ্ঠা, ১৭৪-১৭৫।

Leave a Comment

error: Content is protected !!