আরও একটু সরে বসতে পারো, আরও একটু কাছে গানটি বাংলা আধুনিক গানের জগতের অন্যতম জনপ্রিয় একটি রোমান্টিক গান। এই গানটির কথা লিখেছেন বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র। গানটির প্রথম কণ্ঠশিল্পী বা মূল গায়িকা ছিলেন কিংবদন্তি রিক্তা (১৯৩৯) ছবির অন্যতম অভিনেত্রী রমলা দেবী (ইহুদি কন্যা মিস র্যাচেল কোহেল) নিজ কণ্ঠে গেয়েছিলেন এবং গানটি সে সময় বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। শাস্ত্রীয় সংগীতের কিংবদন্তি ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায় গানটির সুর করেছিলেন। তাঁর নিপুণ সুরে গানটি অনন্য হয়ে ওঠে। গানটি ১৯৩৯ সালে বা তার আগে লেখা হয়। এটি রিক্তা নামক চলচ্চিত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে।
গানের মর্মার্থ
গানটি মূলত ভালোবাসার মানুষের প্রতি এক ধরনের মিষ্টি আবদার বা মান-অভিমানের গল্প বলে। গানের কথাগুলোতে প্রিয়জনের আরও কাছে আসার আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। সাধারণ কথাবার্তার ঢঙে লেখা এই গানে নাগরিক জীবনের প্রেম এবং তার সহজ বহিঃপ্রকাশ ফুটে উঠেছে।
আরও একটু সরে বসতে পারো, আরও একটু কাছে এসো। দূরে থাকার যে ভান, তা আসলে কোনো কাজের নয়। যখন চোখে চোখ পড়ে আর চোখ ভরে ওঠে অদ্ভুত এক অনুভূতিতে, তখন আর দূরত্বের দেয়াল টেকে না। যদি হঠাৎ করে হাতের সঙ্গে হাত লেগে যায়, আর লজ্জায় চোখ নেমে আসে মুখের উপর, তখন হৃদয়টা আচমকা কেঁপে ওঠে। এই অনুভূতি খুব স্বাভাবিক। লজ্জা পাওয়ার সময় তো সামনে অনেকই আছে; এখন শুধু কাছাকাছি বসে এই সুন্দর মুহূর্তটুকু অনুভব করাই যথেষ্ট।
চুলের সুবাস হাওয়ায় ভেসে আসে, আর সেই গন্ধে মন যেন নেশায় ভরে ওঠে। আজ মনে হয়, এই পৃথিবীতে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ নেই—চারপাশ যেন নিঃশব্দ ও নির্জন। এত কথা বলার কীই বা প্রয়োজন? কথার পর আর কথা জুড়ে দেওয়ার দরকার নেই। শুধু কাঁধের উপর মাথাটা নুয়ে এলেই অনেক কিছু বলা হয়ে যায়। সেই গভীর, কথার অতীত নীরবতার মাঝেই আমাদের মধুর এক স্বর্গ যেন তৈরি হয়, যেখানে শব্দের চেয়ে অনুভূতিই বেশি সত্য।
আরও একটু সরে বসতে পারো গানের কথা
আরও একটু সরে বসতে পার, আরও একটু কাছে।
দূরে থাকার ছলনা হায় বৃথা, ছল ছল নয়ন যবে যাচে।
হাতে যদি পড়েই এসে হাত, মুখের প’রে হ’লে নয়ন-পাত,
হৃদয় কেঁপে ওঠেই অকস্মাৎ, লজ্জা পাবার সময় অনেক আছে।
চুলের সুবাস হাওয়ায় ভাসে, নেশায় বিভোর মন।
আজকে জানি আমরা দুজন বাদে, পৃথিবী নির্জন।
কথার পরে কাজ কি কথা গাঁথা, কাঁধের পরে পড়ুক নুয়ে মাথা।
কথার অতীত গহন-নীরবতায়, মোদের সুধার স্বর্গ মিলিয়াছে৷
আরো পড়ুন
- প্রেমেন্দ্র মিত্রের গান আধুনিক বাংলা গানের ধারায় রচিত
- থামো বন্ধু, দাঁড়াও ক্ষণেক থামি হচ্ছে প্রেমেন্দ্র মিত্রের রচিত গান
- হারা-মরু নদী, শ্রান্ত দিনের পাখি, নিভু-নিভু দীপ, আর্ত-আতুর নহ একাকী
- নাবিক আমার নোঙর ফেলো, ওই তো তোমার তীর
- আরও একটু সরে বসতে পারো, আরও একটু কাছে
- এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি, ডালে ডালে ফোটায় কে আজ বুলিয়ে রঙিন অঙ্গুলি
- যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন, শুধু দূরে যেতে কেন বলো এমন
- পুন্নাম
- প্রেমেন্দ্র মিত্র আধুনিক বাঙালি কবি ছোটগল্পকার, উপন্যাসিক ও সিনেমা পরিচালক
- মহানগর
- তেলেনাপোতা আবিষ্কার
রমলা দেবীর কণ্ঠে গানটি শুনুন ইউটিউব থেকে
বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪ পৃষ্ঠা ৯৮ থেকে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।