নাবিক আমার নোঙর ফেলো, ওই তো তোমার তীর

নাবিক আমার নোঙর ফেল ওই তো তোমার তীর গানটি বাংলা সংগীতের স্বর্ণযুগের একটি কালজয়ী সৃষ্টি। এই গানটির কথা লিখেছেন বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র। গানটির প্রথম কণ্ঠশিল্পী বা মূল গায়িকা ছিলেন কিংবদন্তি শিল্পী রবিন মজুমদার এবং সহশিল্পীরা। গানটির সুর করেছেন প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক কমল দাশগুপ্ত। গানটি সম্ভবত ১৯৪২ সালে মুক্তি পায়। এটি পরবর্তীতে ‘যোগাযোগ’ নামক চলচ্চিত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে।

গানটির মর্মার্থ

গানটির মর্মার্থ হচ্ছে, কবি বলছেন, হে সাগর-পথিক, তোমার নিরন্তর যাত্রার এবার বিরাম ঘটুক; ওই যে তীরের দেখা মিলেছে, সেখানে নামাও তোমার নোঙর। আকাশের অসীম শূন্যতায় যে অবাধ ডানার বিস্তার ছিল, মায়ার অমোঘ বাঁধনে তাকে এবার শান্ত করো। নির্জনতার বুকে গড়ে তোলো তোমার একান্ত আপন নীড়। যদি কখনো অকূল দরিয়া থেকে চঞ্চল হাওয়া তোমাকে ব্যাকুল করে ডাক দেয়, তবে বিচলিত হয়ো না; তোমার আঙিনার পুষ্পতরুরা যেন হাসিমুখে সেই বিদায়বেলায় সঙ্গী হয়। আর যদি সপ্তর্ষির ইশারায় বিনিদ্র রজনী কাটে, তবে কক্ষপ্রান্তে জ্বেলে রেখো এক আকাশ-প্রদীপ—যা তোমার ক্লান্ত মনের ছুটির মিনতি হয়ে নীরবে জ্বলবে।

নাবিক আমার নোঙর ফেলো গানের বিশ্লেষণ

জীবনের শেষ তীরের আহ্বান

এই পংক্তিগুলোতে মানুষের জীবনকে একটি দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার সাথে তুলনা করা হয়েছে। যেখানে ‘নাবিক’ বা ‘সাগর-মুসাফির’ হলো খোদ মানুষের আত্মা। দীর্ঘকাল অজানার পথে ভ্রমণ শেষে এবার তীরে ফেরার অর্থাৎ শান্তির নীড় খোঁজার সময় এসেছে।

বিরাম ও নোঙর: কবি জীবনের শেষবেলায় বা ক্লান্তির মুহূর্তে স্থির হওয়ার কথা বলছেন। ‘নোঙর ফেলা’ মানে হলো সব অস্থিরতা ঝেড়ে ফেলে একটি পরম আশ্রয়ে ফিরে আসা।

অবাধ ডানা বনাম ছোট নীড়: একসময় মানুষের স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া, অবাধ স্বাধীনতায় সে ঘুরে বেড়িয়েছে। কিন্তু জীবনের পরিণতির দিকে এসে নির্জনতায় একটি ‘ছোট নীড়’ বা আত্মিক শান্তির প্রয়োজনীয়তা বড় হয়ে ওঠে।

মায়ার বাঁধন: এখানে মাঝির ‘মায়ার বাঁধন’ বলতে পার্থিব স্নেহ-মমতা বা আধ্যাত্মিক আশ্রয়ের কথা বলা হয়েছে, যা যাযাবর জীবনকে স্থিরতা দান করে।

বিদায়ে প্রশান্তি: যখন জীবন থেকে বিদায় নেওয়ার সময় আসবে (‘অকূল থেকে আকুল হওয়া ডাকবে যখন’), তখন যেন কোনো আক্ষেপ না থাকে। আঙিনার ‘পুষ্পতরু’ বা জীবনের কর্মফল যেন হাসিমুখে সেই বিদায়কে স্বাগত জানায়।

আকাশ প্রদীপ ও ছুটির মিনতি: বিনিদ্র রাতে বা মৃত্যুর আগে যখন ‘সপ্তর্ষির ইশারা’ বা মহাকালের ডাক আসবে, তখন ‘আকাশ প্রদীপ’ বা ধ্যানের আলো জ্বেলে রাখার কথা বলা হয়েছে। এটি মূলত জীবনের সব দায়িত্ব শেষে মহাজাগতিক ছুটির জন্য এক বিনীত প্রার্থনা।

নাবিক আমার নোঙর ফেলো গানের কথা

নাবিক আমার নোঙর ফেলো,
ওই তো তোমার তীর
মাঝির মায়ার বাঁধন পরো
সাগর  মুসাফির।

দিকে দিকে অবাধ ডানার
আকাশ শুধু ছিল তোমার
নিরালাতে রচো এবার
একটি ছোট নীড়।

অকূল থেকে আকুল হাওয়া
ডাকবে যখন এসে,
অঙ্গনে থাক পুষ্পতরু,
বিদায় দেবে হেসে,

সপ্তঋষির ইশারাতে
ঘুম যদি না আসে রাতে,
জ্বেলে রেখো আকাশ প্রদীপ,
ছুটির মিনতির।।

আরো পড়ুন

গানটি রবীন মজুমদার ও সহশিল্পীদের কণ্ঠে শুনুন ইউটিউব থেকে

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪ পৃষ্ঠা ৯৯-১০০ থেকে।

Leave a Comment

error: Content is protected !!