হারা-মরু নদী, শ্রান্ত দিনের পাখি, নিভু-নিভু দীপ, আর্ত-আতুর নহ একাকী গানটি বাংলা সংগীতের স্বর্ণযুগের একটি কালজয়ী সৃষ্টি। এই গানটির কথা লিখেছেন বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র। গানটির প্রথম কণ্ঠশিল্পী কে ছিলে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবে পরবর্তীতে গানটি গেয়েছেন ফিরোজা বেগম। গানটির সুর করেছেন প্রখ্যাত সংগীত পরিচালক কমল দাশগুপ্ত।
গানটির মর্মার্থ
গানটি আবেগঘন পংক্তি দিয়ে লেখা। এই অংশটি মূলত সমাজের অবহেলিত, নিগৃহীত এবং নিঃস্ব মানুষের প্রতি গভীর সমবেদনা ও মানবিকতার এক অনন্য দলিল। কবি বলছেন, হে নিঃস্ব ও ক্লান্ত পথিক, তুমি আজ একা নও। শুষ্ক মরু-নদী, শ্রান্ত দিনের পাখি কিংবা নিভন্ত প্রদীপের মতো যারা আজ জীর্ণ ও অবসন্ন, তাদের সবার জন্য রয়েছে এক পরম করুণার তীর। যেখানে জগতের সকল শ্রান্ত তরী এসে ভিড়ে, সেই মহতী বেদনা-তীর্থে আজ তোমায় আহ্বান জানাই। পৃথিবী যাদের আশ্রয় দিতে দ্বিধা করে, এমনকি দেবতারাও যাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের জন্য কেবল মানুষের হৃদয়েই জমা থাকে অফুরান মমতা। মনে রেখো, এই অন্ধকারের পরেই লুকিয়ে আছে নতুন এক প্রভাত। তাই দ্বিধা ঝেড়ে একে অপরের হাত ধরো; কারণ মানুষের হৃদয়ের ভালোবাসা বিনিময়ের মাধ্যমেই এই ধরণীতে স্বর্গের সুখ নামিয়ে আনা সম্ভব।
হারা-মরু নদী গানের বিশ্লেষণ
নিঃস্বতার রূপক: ‘হারা-মরু নদী’, ‘শ্রান্ত দিনের পাখি’ বা ‘নিভন্ত প্রদীপ’—এই রূপকগুলোর মাধ্যমে কবি সমাজের সেইসব মানুষকে বুঝিয়েছেন যারা জীবনের সব আশা হারিয়ে ক্লান্ত ও একাকী।
বেদনা তীর্থ ও মহামেলা: যে ‘জীর্ণ তরী’ বা বিধ্বস্ত মানুষদের দেবতারাও মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাদের জন্য মানুষের হৃদয়ই শ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল। কবি একে ‘বেদনা তীর্থ’ বলেছেন, যেখানে দুঃখই সবাইকে এক সুতোয় বাঁধে।
মানুষের মমত্ব বনাম দৈব উপেক্ষা: ধরণী বা নিয়তি যাদের অগ্রাহ্য করে, কবি বিশ্বাস করেন একমাত্র মানুষের ভালোবাসাই তাদের পুনর্জীবন দিতে পারে। এটি মূলত মানবতাবাদের এক বলিষ্ঠ বহিঃপ্রকাশ।
তিমির শেষে প্রভাত: বর্তমানের এই দুঃখের অন্ধকার চিরস্থায়ী নয়। যদি একে অপরের হাত ধরা যায় এবং হৃদয়ের সুধা (ভালোবাসা) বিনিময় করা যায়, তবে এই মর্ত্যলোকেই স্বর্গের শান্তি খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
হারা-মরু নদী, শ্রান্ত দিনের পাখি গানের কথা
হারা-মরু নদী, শ্রান্ত দিনের পাখি,
নিভু-নিভু দীপ, আর্ত-আতুর নহ একাকী।
সাগর কিনারে করুণার তীরে,
জীর্ণ তরীরা যেথা গিয়ে ভিড়ে,
সে মহামেলায় বেদনা তীর্থে আজিকে তোমারে ডাকি।
ধরণী যাদের ধরিতে না চায়,
দেবতা ফিরায় মুখ,
তাদের লাগিয়া মমতায় ভরা
শুধু মানুষেরই বুক,
এ তিমির শেষে আছে রে প্রভাত,
সাদরে সবার ধর শুধু হাত,
হৃদয় সুধার বিনিময়ে ফিরে স্বর্গ মিলিবে নাকি।
আরো পড়ুন
- প্রেমেন্দ্র মিত্রের গান আধুনিক বাংলা গানের ধারায় রচিত
- থামো বন্ধু, দাঁড়াও ক্ষণেক থামি হচ্ছে প্রেমেন্দ্র মিত্রের রচিত গান
- হারা-মরু নদী, শ্রান্ত দিনের পাখি, নিভু-নিভু দীপ, আর্ত-আতুর নহ একাকী
- নাবিক আমার নোঙর ফেলো, ওই তো তোমার তীর
- আরও একটু সরে বসতে পারো, আরও একটু কাছে
- এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি, ডালে ডালে ফোটায় কে আজ বুলিয়ে রঙিন অঙ্গুলি
- যদি ভালো না লাগে তো দিও না মন, শুধু দূরে যেতে কেন বলো এমন
- পুন্নাম
- প্রেমেন্দ্র মিত্র আধুনিক বাঙালি কবি ছোটগল্পকার, উপন্যাসিক ও সিনেমা পরিচালক
- মহানগর
- তেলেনাপোতা আবিষ্কার
গানটি ফিরোজা বেগমের কণ্ঠে শুনুন ইউটিউব থেকে
বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেখাটি ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ তারিখে অনলাইন রোদ্দুরে.কমে প্রকাশ করা হয় এবং সেখান থেকে ফুলকিবাজ.কমে বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। গানের কথা নেয়া হয়েছে সুধীর চক্রবর্তী সম্পাদিত আধুনিক বাংলা গান, প্যাপিরাস, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১ বৈশাখ ১৩৯৪ পৃষ্ঠা ৯৯-১০০ থেকে।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।