সিপিবির মোদীতোষণ এবং ক্ষুদে-বুর্জোয়া নির্বোধদের সিপিবিতোষণ

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবি তাঁদের অতীত কর্মের ধারাবাহিকতা থেকেই নরেন্দ্র মোদীকে বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়েছিল। তারা পুরনো চক্র হতে বের হতে পারেনি। এই সংগঠনটি আত্মসমালোচনা করতে পারে না। ফলেই এই আধমরা সংগঠনটি ভারতের কর্পোরেটোক্রেসির প্রতিনিধি, সাম্রাজ্যবাদের সেবক, প্রতিদিন হাজার হাজার কৃষক শ্রমিকের রক্তপানকারী কসাই নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়েছে।[১] উল্লেখ্য কসাই নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশে তাঁর দুদিনের ভ্রমণ শুরু করেছে ৬ জুন, ২০১৫ তারিখে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট নামধারী পার্টি কী পরিমাণ দেউলিয়া এবং জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারলে সাম্প্রদায়িকতা আর ৪০০০ মানুষ হত্যায় ইন্ধনদাতা এক মোদিকে তারা বাংলাদেশে স্বাগত জানাতে পারে!

আপনাদের মনে থাকার কথা গত ২০১৫ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে সিতারাম ইয়েচুরি নামে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)-র সম্পাদক বাংলাদেশ ভ্রমণ করে গেছিল। সেই সময় আমরা সিপিবির এবং ইয়েচুরির মোদীতোষণ দেখি। মূলত মোদির আগমনের আগে মাঠ তৈরি করতে সিতারাম ইয়েচুরি বাংলাদেশে এসেছিলো। সে নরেন্দ্র মোদিকে স্বাগত জানিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, সে সার্টিফিকেট দিয়েছিলো যে নরেন মোদী খেটে খাওয়া মানুষের জন্য কাজ করছে। ইয়েচুরি সেসময় আরো বলেছিল,

“মানুষের মঙ্গলের জন্য যে কোনো প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের সফরকে স্বাগত জানাই। কেননা আমাদের সংগ্রাম তো খেটে-খাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য। তাদের জন্য যারাই কাজ করবেন আমরা তাকে স্বাগত জানাব।”[২]

ইয়েচুরি বাংলাদেশে এসে বাংলাদেশকে মৌলবাদ সাম্রাজ্যবাদ বিষয়ে সবক দিলেও শ্রেণিসংগ্রাম, সমাজতন্ত্র, শ্রমিক ও কৃষক, শ্রেণি রাজনীতি ইত্যাদি সম্পর্কে কোনো কথাই বলেনি। সুধাকর রেড্ডি, সিতারাম ইয়েচুরিরা মূলত কংগ্রেসপন্থি নেতা যাদের সারাটা জীবন গেছে কেন্দ্রের ক্ষমতায় কংগ্রেসকে টিকিয়ে রাখতে। ২০১৯ সালে ভারতের নির্বাচনের পূর্বে ইয়েচুরি নামের এই গাড়লটা নিজের ধ্বংস দেখতে পায়নি, সে তখনো কল্পনামৈথুন করছে, যে ২০১৯ সালে “কেন্দ্রে কংগ্রেস বিকল্প ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক সরকার গঠন করার মতো অবস্থায় পৌঁছালে বামরা সমর্থন জানাতে দ্বিধা করবে না।”[৩] নির্বাচনের ফল বেরোলে দেখা গেল, চোরার পার্টি মাত্র ৩টা আসনে জিতেছে।

জ্যোতি বসু, প্রকাশ কারাত, সুধাকর রেড্ডি বা সীতারাম ইয়েচুরি মতো পাঁড়-সংশোধনবাদি ও কংগ্রেসের পদলেহনকারি পার্টিতে থাকলে ওই পার্টি দ্বারা বিপ্লব করা যায় না, যতোই বিপ্লবের অনুরাগিগণ পার্টিতে যাক না কেন। সিপিএম শুধু কংগ্রেসের পদলেহনই করেনি, এরা বিজেপিকে ফ্যাসিবাদী বলতে নারাজ। যেমন, সিপিএমের ২০২৫ সালের ২ থেকে ৬ এপ্রিল মাদুরাইতে অনুষ্ঠিত ২৪তম পার্টি কংগ্রেসের প্রাক্কালে দলের পক্ষে রাজ্যে রাজ্যে রাজনৈতিক প্রস্তাবের যে খসড়া পাঠানো হয়েছে, … [সেই] প্রস্তাবে বলা হয়েছে, মোদি সরকারের ১১ বছরের কাজকর্মে নব্য ফ্যাসিস্ট বৈশিষ্ট্যের বিচ্ছুরণ ঘটলেও সরকারকে ফ্যাসিস্ট আখ্যা দেওয়া হচ্ছে না।[৪]

সিপিবি সম্পর্কে আরো বলা যায় দেশের ভেতরে তাদের সমস্ত কাজই আওয়ামি লিগের পিছে গিয়া ফুরাইল; আর দেশের বাইরে ‘তাদের কাজ থেকে ভারতীয় বিস্তারবাদ, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, এদের মিত্র শাসক গোষ্ঠী, সামন্ত-বুর্জোয়া শ্রেণি, এবং এমন কি হাল আমলে এনজিওরা পর্যন্ত উপকৃত হয়ে আসছে।’ এই ইতিহাস কিন্তু বাংলাদেশের শুরু থেকেই, যেমন মওলানা ভাসানী ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি দেশে ফেরার পর দৈনিক বাংলায় এক সাক্ষাতকারে ভারতীয় বন্ধুত্বের স্বরূপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। ফলশ্রুতিতে ছাত্র ইউনিয়ন পরদিন পত্রিকাটির সামনে বিক্ষোভ দেখায় এবং সেই চাপে পত্রিকাটি ২৬ জানুয়ারি দুঃখ প্রকাশ করে সাক্ষাতকারটি প্রকাশের জন্য। ১৯৭২ সালে ২২ এপ্রিল লেনিনের ১০২তম জন্মদিন পালন অনুষ্ঠানে সিপিবির কুচক্রী নেতা মনি সিংহ বলেছিলেন,

“মহান লেনিনের আদর্শ অনুসরণ করেই মুজিব সরকার বাংলাদেশের উন্নয়নে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।”[৫]

সিপিবিকে যারা সমর্থন করেন, হয়তো এসব সমর্থক মনেও করেন সিপিবি একদিন এদেশে বিপ্লব ফাটাবে, কিন্তু তারা বিবেচনা করেন না যে তারা এমন এক অন্ধের কাছে হস্তরেখা বিচার করতে দিয়েছেন যারা কোনোদিনই শ্রমিক কৃষককে শক্তি হিসেবে বিবেচনা করেনি। সিপিবি হচ্ছে সেই জন্মপাপে পাপী এক রোবটের ঘোড়া যাকে বাইরে থেকে শক্তি না দিলে সেটি নড়াচড়া করে না। জহরলাল নেহেরু ও ইন্দিরা গান্ধী যেমন লাল ঘোড়া দাবড়াইয়াও সিপিআই-সিপিএমের সমর্থন পায়, সিপিবি তেমনি প্রায় অর্ধলক্ষ কমিউনিস্ট এবং অর্ধ লক্ষ আদিবাসী হত্যাকারী বুর্জোয়া লীগেনপির  পেছনেই থাকে, খাল কেটে কুমির আনায় জিয়াকে সাহায্য করে, ১৯৯১ সালে নৌকা মার্কা লইয়া আওয়ামি লিগের পক্ষেই ভোটে অংশ নেয়। সেই পুরনো কর্মের ধারাবাহিকতায় তারা মোদিকে বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়েছে।

সিপিবি যতই ইনিয়ে বিনিয়ে শ্রেণিসংগ্রাম বাদ দিয়ে মধ্যবিত্ত সুবিধাবাদি লাইন নিয়ে, নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জনগনকে সজ্জিত করার প্রতারণার লাইন নিয়ে আর যাই হউক, বিপ্লব হয় না। বনেদি বা খানদানী পরিবার থেকে আগত কমিউনিস্ট নেতারা ছিলেন মার্কসবাদ ও প্রলেতারিয়েতবিরোধী এবং এটাই ছিল এদেশে প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র ও নয়া-ফ্যাসিবাদের উত্থানের অনেক কারণের একটি। এই কারণেই কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপ অভিজাত প্রতিক্রিয়াশীলদের দখলে ছিল। আর এখনকার সুবিধাবাদী সিপিবির দশম কংগ্রেসের দলিলসমূহ থেকে কয়েকটি লাইন তুলে দিচ্ছি; এটিই প্রমাণ করে সিপিবি এখনো ভুয়া সাম্যবাদীদের আখড়াঃ

“পার্টিতে সার্বক্ষণিক হিসেবে যারা কাজ করছেন, তাদের সমস্যা বেশ গভীর। সার্বক্ষণিকদের জন্য ফান্ড গঠনে জেলাগুলোর প্রচেষ্টার ঘাটতি আছে। পার্টি ও গণসংগঠনের জন্য পার্টির সকল স্তরে আরো সার্বক্ষণিক প্রয়োজন। সার্বক্ষণিকদের জন্য পার্টির বিশেষ তহবিল গড়ে তুলতে হবে। পরিবারের উপর নির্ভর করে চলতে পারে, এধরনের সার্বক্ষণিক খুঁজে বের করতে হবে।”[৬]  

উপরের উদ্ধৃতিটুকুর সহজ বাংলা হচ্ছে, সিপিবির সার্বক্ষণিকদের অনেক টাকার দরকার; আপনার বাপ যদি কোটিপতি হয় তবে সিপিবি আপনাকে ডাকছে। ফলে সিপিবির জন্যে বিপ্লবী জনগণ শুধু ঘৃণাই জমা রাখতে পারে। কোনো রাজনৈতিক দল যখন শ্রেণিসংগ্রাম ছেড়ে ধনিক শ্রেণির তোষণ নীতি গ্রহণ করে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা হারায়। আদর্শিক বিচ্যুতির কারণে বিপ্লবের ডাক দেয়া দলগুলো যখন বিত্তবানদের প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ জনগণের মনে চরম ঘৃণা ও ক্ষোভের জন্ম হয়।

বিপ্লবী দলগুলোর ভিত্তি হওয়ার কথা ছিল কৃষক, শ্রমিক এবং মেহনতি মানুষ। কিন্তু এখন তাদের সেই আদি আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে অর্থের পেছনে ছুটছে। সিপিবির মতো একটি দলে এখন সাধারণ কর্মীদের চেয়ে ধনী পরিবারের সন্তানদের বেশি কদর দেওয়া হচ্ছে। একটি বিপ্লবী দলের জন্য এর চেয়ে বড় অবক্ষয় আর হতে পারে না। যখন কোনো দলের সার্বক্ষণিক কর্মী হওয়ার যোগ্যতা হিসেবে মেধা বা ত্যাগের বদলে ‘পারিবারিক প্রাচুর্য’ প্রাধান্য পায়, তখন সেই দল আর সাধারণ মানুষের থাকে না।

সাধারণ জনগণ যারা একদিন এই দলকে মুক্তির প্রতীক হিসেবে দেখেছিল, তারা এখন এই সুবিধাবাদী অবস্থান দেখে হতাশ ও ক্রুদ্ধ। যারা এখনো অন্ধভাবে এই দলটিকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের দ্রুত সত্যটা অনুধাবন করা উচিত। সময়ের সাথে সাথে কোনো আদর্শ যখন পুঁজিবাদের কাছে বিক্রি হয়ে যায়, তখন সেই পথ থেকে সরে আসাই বুদ্ধিমানের কাজ। যদিও অন্ধ অনুগত্যের কারণে সবার বিবেক জাগ্রত হবে না, তবুও শুভাকাঙ্ক্ষীদের জন্য এটি একটি চরম সতর্কবার্তা।[৭]

আরো পড়ুন

তথ্যসূত্র ও টিকা

১. চন্দন সিদ্ধান্ত, বার্তা প্রেরক, কেন্দ্রীয় দপ্তর বিভাগ, “মোদীর আসন্ন ঢাকা সফর সম্পর্কে সিপিবি”, ৪ জুন ২০১৫, ওয়েবসাইট: সিপিবিবিডি.ওরগ, লিংক: http://cpbbd.org/?page=details&serial=73
২. বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম, ২৯ মে ২০১৫, বাংলানিউজটুয়েন্টিফোর.কম, “মোদির সফরকে স্বাগত জানালেন ইয়েচুরি”, লিংক: https://www.banglanews24.com/banglanewsprint/397238
৩. কলকাতা প্রতিনিধি, দৈনিক মানবজমিন, “কংগ্রেস সরকার গঠন করলে বামরা সমর্থন দেবে: সীতারাম ইয়েচুরি”, ১৬ এপ্রিল ২০১৯; লিংক: http://www.m.mzamin.com/article.php?mzamin=168350
৪. নয়াদিল্লি প্রতিনিধি, ভারত, “সিপিএমের রাজনৈতিক প্রস্তাবে মোদি সরকার ‌‘ফ্যাসিস্ট’ নয়, শুরু বিতর্ক”, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, দৈনিক প্রথম আলো, ইউআরএল: https://www.prothomalo.com/world/india/oyyrmh440o
৫. আলতাফ পারভেজ উদ্ধৃত, মুজিব বাহিনী থেকে গণবাহিনী ইতিহাসের পুনর্পাঠ; দৈনিক সংবাদ, ২৩ এপ্রিল ১৯৭২।
৬. সিসি, সিপিবি; দশম কংগ্রেসে গৃহীত দলিলসমূহ; জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী; নভেম্বর, ২০১২; পৃষ্ঠা- ৭১।
৭. লেখাটি গত ৩১ মে ২০১৯ তারিখে [অনুপ সাদি] কর্তৃক “সুবিধাবাদী সিপিবির কসাইতোষণ এবং ক্ষুদে-বুর্জোয়া নির্বোধদের সিপিবিতোষণ” শিরোনামে রোদ্দুরে.কম সাইটে প্রকাশিত হয়। ফুলকিবাজ.কমে আজ ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে কিছুটা বর্ধিত আকারে প্রকাশ করা হলো। রোদ্দুরের ইউআরএলটি ছিল: https://www.roddure.com/politics/cpb-on-buthcher/

Leave a Comment

error: Content is protected !!