নেত্রকোনার মোহনগঞ্জের মাটি যেমন শস্য-শ্যামল, তেমনি এ মাটি জন্ম দিয়েছে অনেক অকুতোভয় সন্তানকে। তাঁদেরই একজন কমরেড আবদুল বারী (৬ জুন ১৯৪৭ – ২৪ ডিসেম্বর ২০২৩)। তিনি ছিলেন একাধারে একজন আদর্শবাদী সাম্যবাদী রাজনীতিবিদ, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রজ্ঞাবান শিক্ষক। আদর্শের প্রশ্নে আপসহীন এই মানুষটি জীবনভর শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন বুনে গেছেন।
জন্ম ও শৈশব: সংগ্রামী জীবনের শুরু
১৯৪৭ সালের ৬ জুন মোহনগঞ্জ উপজেলার টেংগাপাড়া গ্রামে এক সাধারণ মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল বারী। তাঁর পিতার নাম আবদুল কাদির এবং মাতার নাম মুক্তা কাদির। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি হয় মোহনগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরপর ১৯৬৩ সালে তিনি মোহনগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি পাস করেন।
ছাত্র রাজনীতি ও নেতৃত্বের উন্মেষ
এসএসসি পাসের পর তিনি কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক গুরুদয়াল কলেজে ভর্তি হন। সেখানেই তাঁর নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হতে শুরু করে।
- ১৯৬৫-৬৬ শিক্ষাবর্ষ: গুরুদয়াল কলেজ ছাত্র সংসদে ‘নাট্য সম্পাদক’ হিসেবে নির্বাচিত হন।
- পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ: শিক্ষার্থীদের বিপুল সমর্থনে তিনি কলেজের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে নির্বাচিত হন।
এইচএসসি পাসের পর তিনি নেত্রকোনা ডিগ্রি কলেজে ভর্তি হন এবং খুব দ্রুতই নেত্রকোনা মহকুমা ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে তিনি ছিলেন সামনের সারির সৈনিক। পুরো জেলা ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষকে অধিকার সচেতন করতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০ সালে তিনি বিএ পাস করেন এবং একই বছর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ গ্রহণ করে সক্রিয় রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন।
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মেঘালয়ের স্মৃতি
১৯৭১ সালে যখন মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, আবদুল বারী তখন টগবগে যুবক। মাতৃভূমিকে মুক্ত করার টানে তিনি এপ্রিল মাসেই মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তিনি ভারতের মেঘালয় সীমান্তবর্তী চিচিংপাড়া ক্যাম্পের ইনচার্জ হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। শুধু তাই নয়, তাঁর নেতৃত্বেই সেই ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের জন্য আসামের তেজপুর জেলার সেলুনিবাড়িতে পাঠানো হয়। যুদ্ধের সেই উত্তাল দিনগুলোতে তাঁর সাহসিকতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা সহযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
সমাজসেবা ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি নেত্রকোনা জেলা কৃষক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব নেন এবং প্রান্তিক কৃষকদের অধিকার আদায়ে কাজ শুরু করেন। ১৯৭৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সিদ্ধান্তে তিনি সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন ভ্রমণ করেন। দীর্ঘ এক বছর সেখানে থেকে সমাজতন্ত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯৭৫ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
শিক্ষকতা ও পেশাজীবী নেতৃত্ব
রাজনীতির পাশাপাশি সমাজ সংস্কারের জন্য তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন।
- ১৯৮০: মোহনগঞ্জের খুরশিমুল উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন।
- ১৯৮১: ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড সম্পন্ন করেন এবং সেখানেও ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হয়ে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন।
পরবর্তীতে তিনি মোহনগঞ্জ পাবলিক হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সুদীর্ঘ সময় শিক্ষার আলো ছড়ান। ১৯৮৬ সালে গঠিত বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি শিক্ষক সমাজের অধিকার আদায়ে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ২০০৭ সালে তিনি শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও প্রয়াণ
১৯৮১ সালের ২৮ ডিসেম্বর তিনি তাহমিনা ছাত্তারের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পারিবারিক ও রাজনৈতিক জীবনের মাঝে সমন্বয় করে তিনি আমৃত্যু মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন। দীর্ঘ কর্মময় ও সংগ্রামী জীবন শেষে ২৪ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে মোহনগঞ্জের নিজ বাড়িতে এই কালজয়ী বিপ্লবী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ময়মনসিংহ জেলা কমিটি গভীর শোক প্রকাশ করে তাঁকে ‘আজীবন বিপ্লবী’ হিসেবে অভিহিত করেছে। কমরেড আবদুল বারী আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর আদর্শ ও সংগ্রামের ইতিহাস নেত্রকোনার মানুষের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।
আরো পড়ুন
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, দোলন প্রভা, নেত্রকোণা জেলা চরিতকোষ, টাঙ্গন, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ, জুন ২০২৪, পৃষ্ঠা ৩৪-৩৫।
রচনাকাল ২৫ ডিসেম্বর ২০২৩, কুরপাড়, নেত্রকোনা।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚