প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র (ইংরেজি: Oriental despotism) বলতে এশীয় সমাজগুলির রাজনৈতিক বা নৈতিকভাবে স্বৈরশাসনের প্রতি অধিক সংবেদনশীল শাসন ব্যবস্থাকে বোঝায়। বিভিন্ন মনীষীদের লেখায় দেখানো হয়েছে, প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র হচ্ছে “প্রাচ্য” সমাজের স্বৈরতন্ত্রী সরকারসমূহ যেখানে সেচ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা অপরিহার্য ছিল, এবং সেচ ও পানি প্রবাহের এই প্রকল্পগুলি পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ছিল বৃহৎ আকারের আমলাতন্ত্রের। ফলশ্রুতিতে প্রাচ্যের এই সরকারসমূহ অর্থনীতি, সমাজ এবং ধর্মীয় জীবনে আধিপত্য বিস্তার করত। এই স্বৈরতন্ত্রী শাসন পশ্চিমা অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন ছিল, যেখানে ক্ষমতা প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলির মধ্যে বিতরণ করা হতো।
প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্রের ধারণা বহু শতাব্দী ধরে এশিয়ার সরকার ও সমাজের ইউরোপীয় ব্যাখ্যা এবং প্রতিনিধিত্বকে রূপ দিয়েছে। এর উৎপত্তি অ্যারিস্টটলীয় রাজনৈতিক দর্শনে পাওয়া যায়। তবে, এর অর্থ তখন থেকে বিকশিত হয়েছে, কেবল বিভিন্ন চিন্তাবিদদের তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে নয়, বরং এশিয়ার সাথে ইউরোপীয়দের মুখোমুখি অভিজ্ঞতার কারণেও। আলোকায়নের যুগে, প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র ছিল একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ধারণা, বিশেষ করে মন্টেস্কুর লেখার জন্য। পরবর্তীতে, এটি হেগেলের চিন্তাভাবনা এবং কার্ল মার্কসের লেখায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যখন এটি “এশীয় উৎপাদন পদ্ধতি” তত্ত্বের দিকে ঝুঁকে পড়ে। অবশেষে, ধারণাটি ম্যাক্স ওয়েবারের চিন্তাভাবনা এবং বিংশ শতাব্দীতে, উইটফোগেলের চিন্তাভাবনায় পুনরায় আবির্ভূত হয়।[১]
সরকারের একচ্ছত্র শাসন, যথেচ্ছাচারী ক্ষমতা; বিশেষ করে যে সরকার কার্যত কোনো আইন, বিরোধী-পক্ষ অথবা প্রথা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় না; এবং ক্ষমতাসীনেরা যখন ও যেখানে ইচ্ছা অপরের অধিকার খর্ব করতে পারে এমন শাসনকে যদি স্বৈরতন্ত্র বলি তবে ভারতীয়, অটোমান এবং চীনা সাম্রাজ্যে প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্রের গণবিরোধী ভূমিকা বিশাল। স্বৈরতন্ত্র বঙ্গে বা ভারতে এক অনিবার্য নিয়তি। প্রাচ্যের কৃষিজীবীরা যেই স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি ছিলো এবং যে স্বৈরতন্ত্র তৈরি করেছিলো, সেই স্বৈরতন্ত্রের ধারাবাহিকতা এখনো চলছে।[২]
ব্রিটিশ উপনিবেশ বাঙলায় যে নতুন জমিদারী ব্যবস্থা তৈরি করে তা মূলত এখানকার কৃষিকে ব্রিটেনের কারখানার কাঁচামাল যোগানোর উপায়ে পরিণত করে। বঙ্গের জমিদাররা কৃষিতে পুঁজিবাদ আনেনি, কারণ এখানে কৃষিনির্ভর শিল্প গড়ে উঠেনি। ফলে বঙ্গের জমিদাররা ব্রিটিশ উপনিবেশের দালাল হয়েছে এবং কৃষকের উপর স্বৈরশাসন কায়েম করেছে। কলকাতায় উনিশ শতকের যে বাবু কালচার তা মূলত পরজীবী ফড়িয়া আর শিক্ষিত চাকুরি করা মেরুদণ্ডহীন উপনিবেশের ঘানি টানা কিন্তু কৃষকের ঘাড়ে চেপে বসা জগদ্দল পাথর অন্য ভাষায় যারা পরজীবী ও মুৎসুদ্দি। যদিও উঠতি এই শিক্ষিতদের একটা অংশ জাতীয়তাবাদী ও বিপ্লবী নৈরাজ্যবাদী আন্দোলনে অংশ নিয়েছে।
প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র এখনো টিকে আছে, কারণ এখনো এই কৃষকরা মুক্ত হতে পারেনি। গত দুই হাজার বা তারও অধিককাল ধরে স্বৈরতন্ত্র এখানে উর্বর ভূমি পেয়েছে যে ভূমিকে মার্কস বলেছেন ‘এশীয় উৎপাদন-পদ্ধতি’ (ইংরেজি: Asiatic mode of production)। ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়েরের লেখা, মন্টেস্কু এবং হেগেলের যুক্তি, এবং এঙ্গেলসের বিশ্লেষণসমূহ মার্কস খেয়াল করে এই ‘এশীয় উৎপাদন-পদ্ধতি’র সিদ্ধান্ত টেনেছিলেন। প্রাচ্যের বিশেষ ধরনের অর্থনৈতিক প্রকৃতি, বিশেষভাবে সম্পত্তির মালিকানা সংক্রান্ত স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকের দৃষ্টিকে মার্কস তুলে ধরেন। মার্কসের মতে, সমগ্র এশিয়ার অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি হচ্ছে ব্যক্তি মালিকানার অধিকারের অনুপস্থিতি, যেহেতু এখানে গ্রামীণ কৌম গোষ্ঠীগুলি ছিল স্বায়ত্তশাসিত, ফলে আঞ্চলিক থেকে সাম্রাজ্যিক সমস্ত রাজাই ছিলো একচ্ছত্র মালিক। মার্কস দেখিয়েছেন যে এশিয়ার দেশগুলোর ভৌগলিক অবস্থার ফলে এই রাজনৈতিক ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়েছে, এবং উদাহরণ হিসেবে স্বাভাবিকভাবেই এসেছে শুধুমাত্র একটি শক্তিশালী এবং কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পরিচালিত কৃষিতে প্রয়োজনীয় কৃষি পানিসেচ ব্যবস্থা।[৩] কার্ল মার্কস গ্রামের কাঠামোর বিস্তারিত বিবরণ ও ব্যাখা দেবার পর লিখেছেন
“শ্রমপরায়ণ পিতৃতান্ত্রিক ও নিরীহ সামাজিক সংগঠনগুলি … … শান্ত-সরল গ্রাম-গোষ্ঠীগুলি যতই নিরীহ মনে হোক, প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্রের তারাই ভিত্তি হয়ে এসেছে চিরকাল, মনুষ্য-মানসকে তারাই যথাসম্ভব ক্ষুদ্রতম পরিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে, তাকে বানিয়েছে কুসংস্কারের অবাধ ক্রীড়নক, তাকে করেছে চিরাচরিত নিয়মের ক্রীতদাস, হরণ করেছে তার সমস্ত কিছু মহিমা ও ঐতিহাসিক কর্মদ্যোতনা।” … … এই হীন, অনড় ও উদ্ভিদ-সুলভ জীবন, এই নিস্ক্রিয় ধরনের অস্তিত্ব থেকে অন্যদিকে, তার পাল্টা হিসাবে সৃষ্টি হয়েছে বন্য লক্ষ্যহীন এক অপরিসীম ধ্বংসশক্তি এবং হত্যা ব্যাপারটিকেই হিন্দুস্তানে পরিণত করেছে এক ধর্মীয় প্রথায়। যেন না ভুলি যে ছোটো ছোটো এই সব গোষ্ঠী ছিল জাতিভেদপ্রথা ও ক্রীতদাসত্ব দ্বারা কলুষিত, অবস্থার প্রভুরূপে মানুষকে উন্নত না করে তাকে করেছে বাহিরের অবস্থার অধীন, স্বয়ং-বিকশিত একটি সমাজব্যবস্থাকে তারা পরিণত করেছে অপরিবর্তমান প্রাকৃতিক নিয়তিরূপে এবং এই ভাবে আমদানি করেছে প্রকৃতির পুশবৎ পূজা, প্রকৃতির প্রভু যে মানুষ তাকে হনুমানদেব রূপী বানর এবং শবলদেবী রূপী গরুর অর্চনায় ভুলুষ্ঠিত করে অধঃপতনের প্রমাণ দিয়েছে।”[৪]
বিংশ শতাব্দীতে প্রবেশের সাথে সাথে, “প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র” সম্পর্কে একাডেমিক আগ্রহ কিছুটা হ্রাস পায় কারণ সামাজিক বিজ্ঞান আরও সূক্ষ্ম কাঠামো তৈরি করে। তবুও মূল চিন্তাবিদরা এই ধারণাটি পুনর্বিবেচনা করতে থাকেন, বিশেষ করে কেন পশ্চিমারা শিল্পায়িত এবং আধুনিকীকরণ করেছে যখন প্রাচ্য (ধারণা করা হয়) তা করেনি তা ব্যাখ্যা করার প্রেক্ষাপটে।
জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার সভ্যতার তুলনামূলক অধ্যয়নে এই ধারণাটি একীভূত করেছিলেন। ওয়েবার প্রাচীন অর্থনীতি বিশ্লেষণ করে যুক্তি দিয়েছিলেন যে পরিবেশগত এবং কাঠামোগত কারণগুলি নিকট প্রাচ্য এবং এশীয় সমাজগুলিকে শক্তিশালী আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল যা ব্যক্তিবাদকে দমন করেছিল, অন্যদিকে ইউরোপের নগর-রাষ্ট্র এবং সামন্তবাদী রাজনীতিতে তা ঘটতে পারেনি। পুরোনো তত্ত্বের প্রতিধ্বনি করে, ওয়েবার সেচকে একটি প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরেন: ফেরাউনকালীন মিশর বা মেসোপটেমিয়ার মতো অঞ্চলে, বৃহৎ পরিসরে জল নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা থেকে কেন্দ্রীভূত প্রশাসন এবং খাল এবং বন্যা ব্যবস্থাপনার তত্ত্বাবধানে একটি “জলবাহী আমলাতন্ত্র” তৈরি করে।
তবে, শীতল যুদ্ধের যুগের মধ্যেই “প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র” শব্দটি নাটকীয়ভাবে ফিরে আসে এবং এর পেছনে মূলত কার্ল অগাস্ট উইটফোগেলের অবদান ছিল। উইটফোগেল ছিলেন একজন জার্মান-আমেরিকান ইতিহাসবিদ যিনি ১৯৫৭ সালে “ওরিয়েন্টাল ডেসপোটিজম: আ কম্পারেটিভ স্টাডি অফ টোটাল পাওয়ার” নামক একটি বিখ্যাত আধুনিক রচনা প্রকাশ করেন, যা এই ধারণার উপর নিবেদিত। নিজে একজন প্রাক্তন মার্কসবাদী, উইটফোগেল গোঁড়া সোভিয়েত-বান্ধব মার্কসবাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন এবং সমসাময়িক সমাজতন্ত্র অভিমুখী রাষ্ট্রগুলির সমালোচনা করার জন্য প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্রের ধারণাকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন।
আরো পড়ুন
- কর্তৃত্ববাদ হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যবস্থা যার বৈশিষ্ট্য হলো রাজনৈতিক বহুত্ববাদ প্রত্যাখ্যান
- কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে
- এশীয় উৎপাদন পদ্ধতি হচ্ছে কার্ল মার্কস কর্তৃক তৈরিকৃত একটি তত্ত্ব
- বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি প্রসঙ্গে
- প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র বলতে এশীয় সমাজগুলির রাজনৈতিক বা নৈতিকভাবে স্বৈরশাসনকে বোঝায়
- স্বৈরতন্ত্র এমন সরকার যেখানে একটি একক সত্তা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার সাথে শাসন করে
- আরব অঞ্চলের ধারাবাহিক স্থবিরতা প্রসঙ্গে একটি মূল্যায়ন
- ভোট হচ্ছে মৌখিক বা ব্যালটের মাধ্যমে কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া
- স্বৈরতন্ত্র জনগণের মধ্যে অনৈক্য করেই টিকে থাকে
- মৌলিক গণতন্ত্র হচ্ছে স্বৈরতন্ত্রী শাসনব্যবস্থা পাকা করবার পদ্ধতি
- জর্জ অরওয়েল হচ্ছেন পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী ফার্মের একগুঁয়ে এক এনিমেল
- চার্লস লুই দ্য মন্টেস্কু স্বৈরতন্ত্র ও রাজতন্ত্রবিরোধী একজন পুঁজিবাদী দার্শনিক
তথ্যসূত্র ও টিকা:
১. Rolando Minuti, Oriental Despotism, European History Online, Deutsche Nationalbibliothek, Url: https://d-nb.info/1043574832/34
২. অনুপ সাদি, “স্বৈরতন্ত্র কাকে বলে”, ২৪ মার্চ ২০১৮; রোদ্দুরে.কম,, ইউআরএল: http://www.roddure.com/encyclopedia/marxist-glossary/bases-of-bangladeshi-despotism/
৩. Rolando Minuti, “Oriental Despotism”, 5 March, 2012, European History Online in English, http://ieg-ego.eu/, ইউআরএল: http://ieg-ego.eu/en/threads/backgrounds/european-encounters/rolando-minuti-oriental-despotism
৪. কার্ল মার্কস, ভারতে ব্রিটিশ শাসন, ১০ জুন ১৮৫৩, কার্ল মার্কস ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস নির্বাচিত রচনাবলী, তৃতীয় খণ্ড, বারো খণ্ডে, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, ১৯৭৯, পৃষ্ঠা ১৪২।
রচনাকাল: ২৩-২৪ মার্চ, ২০১৮।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।