চার্লস লুই দ্য মন্টেস্কু স্বৈরতন্ত্র ও রাজতন্ত্রবিরোধী একজন পুঁজিবাদী দার্শনিক

চার্লস লুই দ্য মন্টেস্কু বা মঁতেসকিয়্যু বা মন্টেসক্যূ (ইংরেজি: Charles de Montesquieu, ১৮ জানুয়ারি ১৬৮৯ – ১০ ফেব্রুয়ারি ১৭৫৫) ছিলেন অষ্টাদশ শতকের একজন ফরাসি বিচারক, প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি, রাজনৈতিক দার্শনিক এবং সমাজতত্ত্ববিদ। তিনি ছিলেন ক্ষমতার স্বতন্ত্রীকরণ তত্ত্বের প্রধান উৎস, যা বিশ্বজুড়ে অনেকগুলি সংবিধানে প্রয়োগ করা হয়। রাজনৈতিক শব্দকোষে “স্বৈরতন্ত্র” শব্দের স্থান সুরক্ষিত করতে তিনি অন্য লেখকের চেয়ে বেশি কাজ করার জন্যও পরিচিত। তাঁর বেনামে ১৭৪৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত দ্য স্পিরিট অফ ল গ্রন্থটি গ্রেট ব্রিটেন এবং আমেরিকান উপনিবেশ উভয় জায়গাতেই সমাদৃত হয়েছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের খসড়া তৈরির ক্ষেত্রে প্রভাবিত করেছিল।[১]

সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে মন্টেস্কুর রচনাবলী ১৭৮৯ সালের ফরাসি পুঁজিবাদী বিপ্লবের পথ সুগম করার কাজে সাহায্য করে। কারণ মন্টেস্কু স্বেচ্ছাচারী রাজতন্ত্রের তীব্র সমালোচক ছিলেন। তিনি অনুসন্ধান করেছেন রাজার একাধিপত্যের বদলে প্রজার অধিকার কি ভাবে বজায় রাখা যায়। ফরাসি জ্ঞানালোক আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ মানবতাবাদী এই চিন্তাবিদের চিন্তায় ও রাজনৈতিক দর্শনে সমকালীন ফরাসি সমাজের অস্থিরতা, রাজতান্ত্রিক অপশাসন, শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সংকটের পরিস্থিতি থেকে দেশের মানুষকে উদ্ধার করার এবং দেশাত্মবোধে তাদের উদ্বুদ্ধ করার এক বলিষ্ঠ ও একনিষ্ঠ প্রয়াস লক্ষ্য করা গেছে।[২]

১৭২১ সালে The sersian letters রচনার মধ্য দিয়ে মন্টেস্কুর বিশাল সাহিত্য কীর্তির সূচনা। বইটিতে সমকালীন ফরাসি রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তীব্র শ্লেষ ও বিদ্রুপ করে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন চতুর্দশ লুই-এর শাসনের প্রতি তাঁর বিরাগ ও অনাস্থা। প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থা বা শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতেই যে তিনি শুধুমাত্র তৎপর নন, ফরাসি সমাজ ও জীবন থেকে লুপ্ত, বাস্তব রাজনীতিবোধটিকে ফেরাতেও যে তিনি উদগ্রীব, সমাজ সংস্কারও যে তাঁর লক্ষ্য বইটি সেকথাও প্রমাণ করে। বল্যূয়েটের পর মন্টেস্কুই সম্ভবত ফরাসি চিন্তার সেই উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধি যিনি রাজনীতির প্রচলিত গতিটিকে গভীর সন্দেহ ও বিচার বুদ্ধির সাহায্য নিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছেন, ফরাসি জাতি ও মানুষের বাস্তব প্রয়োজন ও সম্ভাবনাকে সামনে রেখে তাঁর রাজনীতি ও দর্শনকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সমকালের বৌদ্ধিক আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করার ক্ষেত্রে জ্যাঁ জ্যাক রুশো ও ভলতেয়ারের সঙ্গে মন্টেস্কুর নাম একই সঙ্গে উচ্চারিত হয়। বাগাড়ম্বরপূর্ণ দর্শন নয়, অসার তত্ত্ব নয়, আদর্শ নয়, মন্টেস্কু ছিলেন যুক্তিসিদ্ধ, ব্যবহারিক পুঁজিবাদী রাজনীতির প্রবক্তা।[২]

আরো পড়ুন:  টমাস হবসের রাষ্ট্রচিন্তা হচ্ছে রাষ্ট্র, মানব প্রকৃতি, প্রকৃতির রাজ্যের ধারণা

তিনি রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রীয় বিধানের উৎপত্তি সম্পর্কে ভুল বিশ্লেষণ হাজির করেন। রাষ্ট্র যে শ্রেণি-বিরোধের অমিমাংসেয়তার ফল এবং রাষ্ট্র যে শ্রেণিশোষণের যন্ত্র তা তিনি বুঝতে পারেননি। বরং তিনি বলেন, রাষ্ট্র হচ্ছে প্রকৃতিজাত সংগঠন এবং রাষ্ট্রের বিধানের মূলও প্রকৃতি, রাজা কিংবা ঈশ্বর নয়। মন্টেস্কু্র এই তত্ত্ব মধ্যযুগে রাজাকে ঈশ্বরের প্রতিভূ বলে গণ্য করার যে তত্ত্ব চলে আসছিল সেই কায়েমী তত্ত্বের বিরোধী ছিল। অবশ্য মন্টেস্কু রাজতন্ত্রকে পরিপূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করতে পারেন নি। তাঁর মতে শাসনতান্ত্রিক রাজতন্ত্রই হচ্ছে সর্বোত্তম শাসনতন্ত্র।[৩]

অভিজ্ঞতাবাদ ও ইতিহাসবাদের প্রতি অনুরক্ত থেকে, সমাজতাত্ত্বিকের দৃষ্টি নিয়ে, আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের ধারণা নিয়েই রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থাকে জানতে ও বুঝতে চেয়েছেন মন্টেস্কু। এই জানা ও বোঝার তাগিদেই মন্টেস্কু বেরিয়ে পড়েন দেশ ভ্রমণে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, বিশেষত ইংল্যান্ডে পরিভ্রমণের সুযোগে যে অভিজ্ঞতা তিনি লাভ করেন দেশে ফিরে  সেটাকেই  কাজে লাগাতে তিনি সচেষ্ট হন। ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলের ইতিহাস ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে জানতে আগ্রহী হলেও মন্টেস্কুর দৃষ্টি ছিল প্রধানত রোম ও ইংল্যান্ডের প্রতি। রোমের ইতিহাস সম্পর্কে তাঁর গবেষণা পুস্তক Greatness and decline of the romans (১৭৩৪) রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য দলিল।

ইংল্যান্ডে এসে সে দেশের রাজনীতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করাই নয়, মন্টেস্কু পরিচিত হয়েছেন সে দেশের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বলিংব্রোক (Boling Broke) এর সঙ্গে, অনুভব করেছেন সে দেশের বৈপ্লবিক আন্দোলন, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত ভাবনা চিন্তাগুলোর উৎকর্ষতাকে।

স্বাধীনতা প্রসঙ্গে মন্টেস্কুর ধারণা

মন্টেস্কুর বিখ্যাত গ্রন্থ The spirit of law-তে স্বাধীনতা বিষয়ক আলোচনাটি অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়েছে। জন্মভূমি ফ্রান্সের স্বৈরতান্ত্রিক শাসকদের অত্যাচার ও নিপীড়নমূলক আচরণ মন্টেস্কুর হৃদয়কে বড়ই আঘাত দিত। স্বৈরচারী শাসকরা সেখানেও জনগণের চিন্তা ও কর্মের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিল না। কিন্তু মন্টেস্কু ছিলেন একনিষ্ঠ স্বাধীনতার ভক্ত। তিনি স্বাধীনতা বলতে যা খুশি তা করাকে বুঝায়নি। যা খুশি তা করা হলে সমাজে অনাচার ও নৈরাজ্য নেমে আসে। মন্টেস্কু আইনের বিধান অনুযায়ী কাজ করাকে স্বাধীনতা বলেছেন। ব্যাপক অর্থে মানুষ যখন নিজের ইচ্ছেমত কাজ করার অধিকার পায়, তখন তার স্বাধীনতা আছে বলে মনে করা হয়। মন্টেস্কু আইনের বিধান অনুযায়ী কাজ করাকে স্বাধীনতা বলেছেন। মন্টেস্কু আরো বলেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা যা খুশি তা করার সাথে সংশ্লিষ্ট নয় তবে আইন যা অনুমোদন দেয় তা শুধু করতে পারে।

আরো পড়ুন:  রেনে দেকার্ত ছিলেন সপ্তদশ শতকের ফরাসি দার্শনিক, গণিতশাস্ত্রবিদ ও বিজ্ঞানী

মন্টেস্কুর অন্য আরেকটি তত্ত্ব ভৌগলিকবাদ নামে পরিচিত। এই তত্ত্বে তিনি বলেন, যে কোনো একটি জনগোষ্ঠী বা জাতির দৈহিক, চারিত্রিক এবং রাষ্ট্রীয় চরিত্র নিয়ন্ত্রিত হয় তার প্রাকৃতিক অবস্থান অর্থাৎ তার ভূখন্ডের আকার, জলবায়ু, মাটি প্রভৃতি বৈশিষ্ট্য দ্বারা। মন্টেস্কু নিজে নাস্তিক না হলেও তিনি গীর্জা এবং যাজকতন্ত্রের তীব্র সমালোচক ছিলেন।[৩] ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠান, প্রথা, মানুষের আচার ব্যবহার, স্বাধীনতাবোধ প্রভৃতির অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি সৃষ্টি করলেন তাঁর অমূল্য গ্রন্থ The Spirit of the Laws (১৭৪৮)। মন্টেস্কুর চিন্তার মূল সূত্রটি যে রোমের ইতিহাস এবং ইংল্যান্ডের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেই সংগৃহীত এবং তাঁর রাষ্ট্রদর্শনের মূল ধারণা ‘স্বাধীনতা’ কথাটি যে এই দুটি সূত্রের দ্বারাই অনুপ্রাণিত সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

তথ্যসূত্র:

১. অনুপ সাদি, ২৫ মে ২০১৮, “মন্টেস্কু স্বৈরশাসন ও রাজতন্ত্রবিরোধী একজন পুঁজিবাদী দার্শনিক”, রোদ্দুরে ডট কম, ঢাকা, ইউআরএল: https://www.roddure.com/biography/charles-de-montesquieu/
২. মো. আবদুল ওদুদ, “চার্লস দ্য মন্টেস্কু”, রাষ্ট্রদর্শন, মনন পাবলিকেশন, ঢাকা, দ্বিতীয় প্রকাশ; ১৪ এপ্রিল ২০১৪; পৃষ্ঠা ৩১৭-৩১৯।
৩. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; জুলাই, ২০০৬; পৃষ্ঠা ২৮৭

রচনাকাল: ২৫ মে ২০১৮, মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

Leave a Comment

error: Content is protected !!