বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি (ইংরেজি:The base of oriental despotism in Bangladesh) হচ্ছে সামন্তবাদী পশ্চাৎপদ অর্থনীতি, উপরিকাঠামোতে মুৎসুদ্দি পুঁজিবাদ, সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে মুৎসুদ্দি অর্থনীতির নির্ভরতা এবং সাম্রাজ্যবাদের নির্দেশনা মোতাবেক সকল রকমের শিল্পায়ন বিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণ। ১৯৭১ পরবর্তী সময়ের সবগুলো সরকার বাংলাদেশের জনগণকে শত শত বছর ধরে দাস করে রাখবার জন্য বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বন্দি করে রেখেছে কৃষির বেড়াজালে।
স্নায়ু যুদ্ধকালীন নয়া উপনিবেশবাদী সময়ে প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্রের সাথে সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহ ঐক্য গড়ে তোলে। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় গত দুশো বছর পুঁজিবাদ উপনিবেশবাদ এবং সাম্রাজ্যবাদ সেই প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্রকে শক্তিশালী করেছে। ভারতে নেহরু-ইন্দিরা ভয়ংকর স্বৈরতন্ত্র চাপিয়ে দেয়, পাকিস্তান-বাংলাদেশে চলে সামরিক-বেসামরিক স্বৈরতন্ত্র, নেপালে রাজতান্ত্রিক স্বৈরতন্ত্র।
বাংলাদেশে গত চল্লিশ বছরে কৃষিতে যে অগ্রগতি তাও অগভীর নলকূপের মাধ্যমে ডিজেলচালিত মেশিনের মাধ্যমে যা সাম্রাজ্যবাদ নির্ভর। অধিক ফলনশীল সাম্রাজ্যবাদের সরবরাহ করা বীজগুলো স্থানীয় বীজ ধ্বংস করেছে। ফলে কৃষি এখন সাম্রাজ্যবাদের পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণে। যেহেতু উৎপাদন বৃদ্ধি হয়েছে, ফলে অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে, কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে নদীগুলোকে শাসন ও খনন প্রাচীন এককেন্দ্রিক শাসনটাকেই ফিরিয়ে এনেছে এবং শক্তিশালী করেছে। এই কৃষককে শোষণ করার জন্য ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি, এবং এবং নির্যাতনের জন্য দৈনিক ২০টি খুন, ফিরে এসেছে সেই ভয়ংকর স্বৈরতন্ত্র। এই যে নিজের টাকায় পদ্মা সেতুর উদাহরণ, দোতলা সড়ক জাইকা, এডিবি আর বিশ্বব্যাংকের টাকায় অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদের সাথে স্বৈরতন্ত্রের ঐক্যও স্বৈরতন্ত্রকেই শক্তিশালী করেছে। সাথে গত ২০০৯-২০১৮ পর্যন্ত দশ বছরে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র আমদানির কথা খেয়াল করলেই এই স্বৈরতন্ত্রের শক্তি কোথায় তা খুব সহজেই বোঝা যাবে।[১]
বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের একটি শক্তিশালী ভিত্তি ছিলো হোমো এরশাদ। বর্বর এবং নরপিশাচ বলতে যা বোঝায় তা এরশাদের মাঝে দেখা যায়। মিছিলে ট্রাক তুলে দেয়া, খুন, রক্তলোলুপতা, দুর্নীতি থেকে হেন কোনো অপরাধ নাই, যা এই ইতরটা করেনি। বাংলার বুকে কবিতা, যৌনতা থেকে ধর্মের দূষণে সে ছিলো এক মহা ধড়িবাজ। রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম করায় সে সাংবাদিক লেখক বুদ্ধিজীবীদের সমর্থন হারিয়ে ফেলে। আহমদ শরীফ, হুমায়ূন আজাদ, আনিসুজ্জামান, আহমদ ছফা, আবদুল গাফফার চৌধুরীরা তার বিপক্ষে সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়েন। সে রাষ্ট্রধর্ম না করলে আরো ৫-৭ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারত। বদমায়েশি, মোনাফেকি আর মিথ্যাচারের সমন্বয় হচ্ছে এরশাদ। এই নর্দমার কীটের মৃত্যু হতে পারে কেবল বাংলার বুকে চেপে বসা স্বৈরতন্ত্রের পাথরটিকে উৎখাতের মাধ্যমে।
বাংলাদেশে অধিকাংশ বামপন্থি দলগুলো আমলাতান্ত্রিক সামরিক শাসনবিরোধি আন্দোলনে বুর্জোয়া জাতিয়তাবাদীদের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করায় এবং ১৯৯০ সালের পরে সংসদীয় রাজনীতির বিকাশে নির্বাচনমুখি প্রবণতা অনুসরণ করায় জনগণের মূল সমস্যাগুলোকে জনগণের সামনে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে পুঁজিবাদ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে শক্তিশালি শ্রমিক আন্দোলন করতে এবং শ্রেণিসংগ্রামকে আঁকড়ে ধরে ইস্যুভিত্তিক সাময়িক আন্দোলনের বিপরীতে দীর্ঘস্থায়ি রাজনৈতিক শ্রেণিসংগ্রাম চালাতে পারেনি। আর এই আত্মগত ও নৈর্বক্তিক কারণগুলিই বাংলাদেশে গত চার দশকে স্বৈরতন্ত্রের জমিকে পুষ্টি দিয়েছে।
স্বৈরতন্ত্র টিকে থাকে বিশাল পরজীবী বাহিনীর উপরে ভিত্তি করে, আর এই স্বৈরতন্ত্রী কাঠামোর সবার উপরে থাকে সেই স্বৈরতন্ত্রীর অবস্থান। কেন্দ্রীভূত কর্তৃত্ববাদী সেই স্বৈরতন্ত্রীরা সামান্য খুদ-কুড়ার বিনিময়ে একটি বিশাল বাহিনী পুষতে পারে। সেই বাহিনীর এক প্রান্তে প্রান্তিকরূপে নির্যাতনে নেমে পড়ে যে তুচ্ছ মানুষটি তার নাম হতে পারে ফরিদ বা ফরিদা, শ্রাবণ বা শ্রাবণী[২]।
জাতীয়তাবাদ, স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদে একটি সাধারণ শত্রু উপস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশে যেমন উপস্থাপন করা হয় হিন্দুদের; ভারত ও বার্মায় তেমনি উপস্থাপন করা হয় মুসলমানদের। ফলে বাংলাদেশে আজ নতুন করে স্বৈরতন্ত্র আসেনি[৩], এটি হাজার বছর ধরেই টিকে আছে। সমস্যাগুলোর দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য প্রধান সমস্যা খুঁজে বের করে সেটিকে আঘাতের মাধ্যমেই কেবল সকল সমস্যার সমাধান হতে পারে।
বাংলাদেশে প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদনির্ভরতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রবিরোধীতার রাজনীতি, সাম্প্রদায়িকতাবাদ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, গত এক শতক ধরে দাঁড়িয়ে আছে সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ, সামাজিক বিভাজন ও শোষণের উপর ভিত্তি করে। শোষণ-মুনাফা-ব্যবসা-লুটেরানির্ভর বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়াশীল কংগ্রেস-মুসলিম লীগ এবং আওয়ামি লীগ-বিএনপি ও এই দুইদল-পন্থী রাজনৈতিক দলগুলো পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বশংবদ এবং এই দলগুলো সাধারণ মানুষের মূল সমস্যাগুলো সমাধান না করে অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশত্রু শোষকদেরকে সহায়তা করেছে, যা নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচিকে হাজির করছে।
আরো পড়ুন
- কর্তৃত্ববাদ হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যবস্থা যার বৈশিষ্ট্য হলো রাজনৈতিক বহুত্ববাদ প্রত্যাখ্যান
- কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে
- এশীয় উৎপাদন পদ্ধতি হচ্ছে কার্ল মার্কস কর্তৃক তৈরিকৃত একটি তত্ত্ব
- বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি প্রসঙ্গে
- প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র বলতে এশীয় সমাজগুলির রাজনৈতিক বা নৈতিকভাবে স্বৈরশাসনকে বোঝায়
- স্বৈরতন্ত্র এমন সরকার যেখানে একটি একক সত্তা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার সাথে শাসন করে
- আরব অঞ্চলের ধারাবাহিক স্থবিরতা প্রসঙ্গে একটি মূল্যায়ন
- ভোট হচ্ছে মৌখিক বা ব্যালটের মাধ্যমে কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া
- স্বৈরতন্ত্র জনগণের মধ্যে অনৈক্য করেই টিকে থাকে
- মৌলিক গণতন্ত্র হচ্ছে স্বৈরতন্ত্রী শাসনব্যবস্থা পাকা করবার পদ্ধতি
- জর্জ অরওয়েল হচ্ছেন পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী ফার্মের একগুঁয়ে এক এনিমেল
- চার্লস লুই দ্য মন্টেস্কু স্বৈরতন্ত্র ও রাজতন্ত্রবিরোধী একজন পুঁজিবাদী দার্শনিক
- বাংলা সংগীত হচ্ছে হাজার বছর ধরে চলমান এক সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের অধিকারী
- বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি প্রসঙ্গে
- প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র বলতে এশীয় সমাজগুলির রাজনৈতিক বা নৈতিকভাবে স্বৈরশাসনকে বোঝায়
- বাংলাদেশের ইতিহাস হচ্ছে পূর্ববঙ্গের জনগণের লড়াই ও মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস
- যুগান্তর দল বা যুগান্তর সমিতি ছিল বাংলার গোপন বিপ্লববাদী সংস্থা
- অনুশীলন সমিতি ছিল বাংলার বিপ্লববাদী রাজনৈতিক সংগঠন
- বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন প্রসঙ্গে
- বাংলাদেশের গণযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে স্বাধীনতার জন্য চালিত সশস্ত্র সংগ্রাম
- জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস ২০২০ প্রশ্নপত্র
- বাংলার সংস্কৃতি বাংলা ও ভারতের পূর্ব অংশে বাংলাভাষী প্রধান অঞ্চলের সংস্কৃতি
- বাংলা নামের উৎপত্তি হয়েছে বঙ্গ শব্দের সাথে আল বা আইল শব্দ যুক্ত হয়ে
- বাংলার ইতিহাসে ভৌগোলিক উপাদান বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যাবলীর প্রভাব
- বাংলা বা বঙ্গের ভৌগোলিক পরিচয় বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যাবলী প্রসঙ্গে
- ভারতীয় উপমহাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বা প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ
- সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলাফল হচ্ছে জাতির স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা পুনরুদ্ধার
- সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ হচ্ছে খাজনা বৃদ্ধি, মহাজনদের শোষণ ও কারচুপি
- রাজমহলের যুদ্ধ হচ্ছে বাংলাকে পরাধীন করার অন্যতম নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধ
- পাবনা কৃষক বিদ্রোহ ছিল জমিদারদের বিরুদ্ধে একটি উল্লেখযোগ্য বিদ্রোহ
- নীল বিদ্রোহ বা নীল প্রতিরোধ আন্দোলন ছিল কৃষক আন্দোলন
- রংপুর কৃষক বিদ্রোহ হচ্ছে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে উত্তরবঙ্গের অন্যতম বিদ্রোহ
- কৃষক বিদ্রোহের কারণ হচ্ছে সতের ও আঠার শতকের ব্রিটিশ খাজনা ও শোষণ
- সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী এবং স্থানীয় জমিদারদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান
- চাকমা বিদ্রোহ হচ্ছে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদিদের বিরুদ্ধে চাকমা জাতির অভ্যুত্থান
- খাসি বিদ্রোহ হচ্ছে বর্বর ব্রিটিশ উপনিবেশবাদিদের বিরুদ্ধে খাসিয়া অভ্যুত্থান
- বাংলায় ধর্মীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর ব্রিটিশবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলন ও বিদ্রোহ
তথ্যসূত্র
১. . অনুপ সাদি, “স্বৈরতন্ত্র কাকে বলে”, ২৪ মার্চ ২০১৮; রোদ্দুরে.কম,, ইউআরএল: http://www.roddure.com/encyclopedia/marxist-glossary/bases-of-bangladeshi-despotism/
২. এই নামগুলি প্রতীকী, যেমন একটি মেয়ে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রী নিপিড়ন করতে গিয়ে আরেক ছাত্রীকে পেটায় এবং অর্ধ-উলঙ্গ করে। এতে পুরুষেরা স্বৈরতন্ত্রের তুচ্ছ ছাপোষা খুঁটি সেই মেয়টির তীব্র সমালোচনা করে। এই বিষয়ে ২৪ জানুয়ারি ২০১৮ তারিখের বাংলাদেশী পত্রিকাগুলো দেখা যেতে পারে।
৩. বিবিসি বাংলা, “বিশ্বের নতুন পাঁচ ‘স্বৈরতান্ত্রিক দেশের তালিকায়’ বাংলাদেশ”, ২৩ মার্চ, ২০১৮, ইউআরএল: http://www.bbc.com/bengali/news-43515895.
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।