জায়নবাদ বা ইহুদি স্বাতন্ত্র্যবাদ (ইংরেজি: Zionism) হচ্ছে একটি জাতি-সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন যা ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ইউরোপে আবির্ভূত হয়েছিল; এটি মূলত ফিলিস্তিনে উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে একটি ইহুদি আবাসভূমি প্রতিষ্ঠা এবং সমর্থন করার চেষ্টা করে, যা ইহুদি ধর্মে ইস্রায়েলের ভূমির সাথে প্রায় মিলে যায় — যা নিজেই ইহুদি ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু। জায়নবাদীরা ফিলিস্তিনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র তৈরি করতে চেয়েছিল যেখানে যত বেশি জমি থাকবে তত বেশি ইহুদি এবং যত কম সম্ভব ফিলিস্তিনি আরব থাকবে।[১]
উনিশ শতকের শেষের দিকে মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে ইহুদি-বিদ্বেষের নতুন তরঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় এবং হাসকালাহ বা ইহুদি আলোকায়নের প্রতিক্রিয়ায় ইহুদিবাদ প্রাথমিকভাবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই সময়কালে ফিলিস্তিনে জায়নবাদী বসতি স্থাপনকারীদের আগমনকে ব্যাপকভাবে ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংঘাতের সূচনা হিসেবে দেখা হয়। ফিলিস্তিনের উপর ইহুদিদের দাবি এই ধারণার উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল যে ইহুদিদের ঐতিহাসিক অধিকার আরবদের চেয়ে বেশি।
এই ইহুদি স্বাতন্ত্র্যবাদী আন্দোলন জেরুজালেমের কাছে জায়ন (ইংরেজি: Zion) পাহাড়ের নাম দিয়ে ইহুদি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কিছু ব্যক্তি উনিশ শতকে একটি আন্দোলন গড়ে তােলেন। জায়নবাদ বা ইহুদি স্বাতন্ত্র্যবাদী আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল সারা বিশ্বের ইহুদিদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং ইহুদিদের আদি পবিত্র বাসস্থান প্যালেস্তাইনে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র গড়ে তােলা। এই অভীপ্সার রূপায়ণের জন্য থিওডাের হের্জল (১৮৬০-১৯০৪) নামে হাঙ্গেরির জনৈক সাংবাদিক ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে সুইজারল্যান্ডের ব্যাল শহরে ইহুদিদের নিয়ে সারা বিশ্বের প্রথম জিওনিস্ট সম্মেলন আহ্বান করে ওয়ার্ল্ড জিওনিস্ট কংগ্রেস নামে একটি সংগঠন তৈরি করেন। প্রতিষ্ঠিত হয় ইহুদিদের জাতীয় তহবিল এবং জমি-ব্যাঙ্ক।
হের্জল ছাড়াও মাক্স নর্ভো, কেম উইজম্যান প্রমুখ ব্যক্তির নেতৃত্বে আন্দোলন ক্রমে শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাঁরা অনুভব করেন যে নিজস্ব একটি রাষ্ট্র ব্যতীত ইহুদিদের নিরাপত্তা বিপন্ন। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দের ২ নভেম্বর ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব আর্থার জেমস ব্যালফোরের বেলফোর ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে এক ঘোষণায় ইহুদিদের দাবি স্বীকৃতি পায় এবং এই আন্দোলনের প্রতি ব্রিটেনের সমর্থন প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২২ সালে, ব্রিটেন কর্তৃক শাসিত ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ অনুশাসনের মাধ্যমে স্থানীয় ফিলিস্তিনি জনসংখ্যার উপর ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের স্পষ্টভাবে বিশেষাধিকার প্রদান করে। প্রথম বিশ্ব-মহাযুদ্ধের পরিসমাপ্তির সঙ্গে চারশ বছরের তুর্কি অটোম্যান সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে।
ভার্সাই চুক্তি অনুযায়ী সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে মধ্যপ্রাচ্যে ট্রান্সজর্ডানসহ সমগ্র প্যালেস্তাইনের শাসনভার (ম্যানডেট) গ্রেট ব্রিটেনের উপর ন্যস্ত করে। সেখানে ইহুদিদের উপনিবেশ সেই সময় থেকে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেন ইহুদি উদ্বাস্তু উপনিবেশ স্থাপনের নিয়মকানুন কড়াকড়ি করে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্ব-মহাযুদ্ধের পর অত্যাচারিত ইহুদিদের দাবি প্রবল হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রসংঘ প্যালেস্তাইনকে দ্বিখণ্ড করে দেয়। ইজরায়েল নামে ইহুদি রাষ্ট্র জন্ম নেয় ১৪ মে, ১৯৪৮। ওয়ার্ল্ড জিওনিস্ট কংগ্রেস সেইসময় থেকে পৃথকভাবে সক্রিয়।[২]
আরো পড়ুন
- জায়নবাদ বা ইহুদি স্বাতন্ত্র্যবাদ হচ্ছে একটি জাতি-সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন
- আরব অঞ্চলের ধারাবাহিক স্থবিরতা প্রসঙ্গে একটি মূল্যায়ন
- ইহুদি বিদ্বেষ বা ইহুদি-ঘৃণা হচ্ছে ইহুদিদের প্রতি শত্রুতা, পক্ষপাত বা বৈষম্য
- ধর্ম প্রসঙ্গে গ্রন্থের রুশ সংস্করণের ভূমিকা
- লেনিনবাদী বিশ্বদৃষ্টিতে ধর্ম
- সংগ্রামী বস্তুবাদের তাৎপর্য
- যুব লীগের কর্তব্য
- রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক)-এর খসড়া কর্মসূচি থেকে ধর্ম প্রসঙ্গে
- নারী-শ্রমিকদের প্রথম সারা রুশ কংগ্রেসে বক্তৃতা
- মাক্সিম গোর্কির কাছে
- মাক্সিম গোর্কির কাছে
- ধর্ম এবং যাজনতন্ত্রের প্রতি মনোভাব অনুসারে বিভিন্ন শ্রেণি আর পার্টি
- ধর্ম প্রসঙ্গে শ্রমিক পার্টির মনোভাব
- সমাজতন্ত্র ও ধর্ম
- লেনিন রচিত ধর্ম প্রসঙ্গে বইয়ের পূর্বকথা ও সূচিপত্র
- মার্কসবাদী বিশ্বদৃষ্টিতে ধর্মের স্বরূপ বিশ্লেষণ
- বৌদ্ধবাদ বা বৌদ্ধ ধর্ম হচ্ছে প্রাচীন ধর্মসমূহের অন্যতম একটি ধর্ম
- তাওবাদ হচ্ছে প্রাচীন চীনের দর্শনের একটি মৌলিক সূত্র
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ২০ ডিসেম্বর ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “জায়নবাদ বা ইহুদি স্বাতন্ত্র্যবাদী আন্দোলন প্রসঙ্গে”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/philosophy/zionism/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৪৮।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।