ইহুদি বিদ্বেষ বা ইহুদি ঘৃণা বা ইহুদিবাদ বিরোধিতা (ইংরেজি: Antisemitism বা anti-Semitism বা Jew-hatred) হচ্ছে ইহুদিদের প্রতি শত্রুতা, পক্ষপাত বা বৈষম্য। যে ব্যক্তি এটি পোষণ করে তাকে ইহুদি-বিদ্বেষী বলা হয়। ইহুদি-বিদ্বেষকে বর্ণবাদের একটি রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হবে কিনা তা চিন্তাধারার উপর নির্ভর করে। ইহুদি বিদ্বেষী প্রবণতা মূলত ইহুদিদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব বা ইহুদি ধর্মের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব দ্বারা অনুপ্রাণিত হতে পারে। পূর্ববর্তী ক্ষেত্রে, যা সাধারণত জাতিগত ইহুদি বিদ্বেষ হিসাবে পরিচিত, একজন ব্যক্তির শত্রুতা এই বিশ্বাস দ্বারা পরিচালিত হয় যে ইহুদিরা এমন একটি স্বতন্ত্র বর্ণ গঠন করে যার অন্তর্নিহিত লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্যগুলো সেই ব্যক্তির সমাজের পছন্দের লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্যগুলির চেয়ে ঘৃণ্য বা নিকৃষ্ট।[১]
পরবর্তী ক্ষেত্রে, ধর্মীয় ইহুদি বিদ্বেষবাদ নামে পরিচিত তত্ত্বটি বলে, একজন ব্যক্তির শত্রুতা তার স্বধর্মের মধ্যে বিরাজিত বিধর্মী ইহুদি এবং বিধর্মী ইহুদি ধর্মের প্রতি ধারণা দ্বারা পরিচালিত হয়। সাধারণত অধিগ্রহণের মতবাদগুলি অন্তর্ভুক্ত করে যে ইহুদিদের ইহুদি ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দরকার এবং ইহুদি ধর্মের উত্তরসূরি বিশ্বাস হিসাবে পরবর্তীকালের উপস্থাপনকারী ধর্মগুলোর কাছে ইহুদিদের আত্মসমর্পণ করার প্রত্যাশা করে বা দাবি করে — এটি অন্যান্য আব্রাহামিক ধর্মের মধ্যে একটি সাধারণ বিষয়। বর্ণবাদী এবং ধর্মীয় ইহুদি-বিদ্বেষবাদের বিকাশ ঐতিহাসিকভাবে ইহুদিধর্ম-বিরোধী (ইংরেজি: Anti-Judaism) চিন্তা দ্বারা উৎসাহিত হয়েছে, যা নিজেই ইহুদি-বিদ্বেষবাদ থেকে আলাদা।
আধুনিককালে ইহুদি বিদ্বেষ বা ইহুদি-ঘৃণার সূত্রপাত ঘটে ঊনিশ শতক থেকে ইউরােপে ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে। সমগ্র মধ্য যুগে ইহুদিরা ধর্মীয় কারণে প্রচণ্ড প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হত, বিশেষ করে তারা সুদি কারবার করত বলে। বর্তমানকালে রাজনৈতিক, অর্থনীতিক ও মতাদর্শগত কারণে ইহুদি বিদ্বেষের ধরন পালটে গেছে; কতকগুলি মিথ্যা বৈজ্ঞানিক যুক্তি খাড়া করেছে কিছু ইহুদি বিদ্বেষী লেখক ও নাৎসি দর্শনবেত্তারা। উনিশ শতকের সত্তরের দশকে জার্মানির একটি লেখক গােষ্ঠী ভাষাতত্ত্বের ‘সেমিটিক’ ও ‘আর্য’ শব্দ দুটির পার্থক্যকে জাতিগত প্রত্যয়ে অপব্যাখ্যা করে বলতে শুরু করে যে ইহুদিরা হলো একটি স্বতন্ত্র ও নিচু জাত বা নরগােষ্ঠী। আশির দশকে জার্মানি ও অষ্ট্রিয়া-হাঙ্গেরিতে ইহুদি বিরােধী নানা রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠে। সে সময়ে রাশিয়ায় ইহুদিদের বিরুদ্ধে হিংসাত্মক ক্রিয়াকলাপ (pogrom) দেখা দেয়।[২]
উনিশ শতকের শেষদিকে ও বিশ শতকের গােড়ায় ইহুদিরা দলে দলে দেশ ছেড়ে ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেয়, ক্রমে ফ্রান্স, লিথুয়ানিয়া ও পােল্যান্ডে সেই ইহুদি বিদ্বেষী আন্দোলনও ছড়িয়ে পড়ে। ১৯২০ থেকে ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত হিটলার আর্যদের উচ্চ জাতি বলে এক নতুন তত্ত্ব খাড়া করেন এবং জামনির দুর্গতির জন্য ইহুদিদের দায়ী করেন। সেই কারণে নাৎসি জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বিধিবদ্ধ নুরেমবার্গ আইন (১৯৩৫) অনুযায়ী ইহুদিদের জার্মান নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয় ও আর্যদের সঙ্গে তাদের বিবাহ নিষিদ্ধ হয়; ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে ইহুদিদের যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা শুরু হয়।
১৯৩৯ সালে হিটলার বিভিন্ন দেশ আক্রমণ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটালে জার্মানির অভ্যন্তরে ইহুদি নির্যাতন চরম আকার গ্রহণ করে। সমস্ত ইহুদি সম্প্রদায়কে বলশেভিক বা সাম্যবাদের অনুচর আখ্যা দেওয়া হয় এবং নাজিরা ব্যাপকভাবে ইহুদিদের গ্রেপ্তার করে বন্দি নিবাসে প্রেরণ করতে থাকে এবং লক্ষ লক্ষ ইহুদিকে নির্বিচারে হত্যা করে। এরূপ পরিবেশে আইনস্টাইনের ন্যায় যে সমস্ত ইহুদি বুদ্ধিজীবি, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক জার্মানি থেকে পালায়ন করে অন্যান্য দেশে আশ্রয় নিতে সক্ষম হন কেবল তাঁরা এই নিধনযজ্ঞ থেকে রেহাই পান।[৩] দ্বিতীয় বিশ্ব-মহাযুদ্ধের সময়ে ৫০ লক্ষ ইহুদিকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে হত্যা করা হয়। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে বিভিন্ন দেশে ইহুদি স্বাতন্ত্র্যবাদী আন্দোলন ও ইজরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ইহুদি বিদ্বেষ নতুন আকার নেয়।
ইহুদি বিদ্বেষের ইতিহাস দীর্ঘ এবং তার রকমফের আছে। নাৎসিরা ইহুদিদের সঙ্গে আর্যদের জাতিগত, রক্তগত ও চরিত্রগত পার্থক্যের তত্ত্ব প্রচার করে। তাদের উপর নাৎসিরা ধূর্তামি, লােভ, শক্তিমত্ততা, ষড়যন্ত্র ইত্যাদি দোষ আরােপ করে; নাৎসিদের প্রচারে ইহুদিরা হলো সুদখাের ও অত্যাচারী। তবে ইহুদি বিদ্বেষের সঙ্গে ইহুদিদের সঙ্গে খ্রিস্টানদের ধর্মের বিরােধ স্বতন্ত্র। ইহুদিরা যিশু খ্রিস্টকে অস্বীকার করে, তবে যারা খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করে তাদের সঙ্গে বিরােধ মিটে যায়। ইহুদি বিদ্বেষ সম্পর্কে নানারকম ব্যাখ্যাও আছে। যেমন, ঋণদাতার বিরুদ্ধে ঋণগ্রহীতার বিদ্বেষ আবহমানকালের। ইজরায়েল রাষ্ট্র সৃষ্টির পর বিশ্বের মুসলমানদের মনে ইহুদি বিদ্বেষ বদ্ধমূল হয়ে গেছে।[২]
আরো পড়ুন
- জায়নবাদ বা ইহুদি স্বাতন্ত্র্যবাদ হচ্ছে একটি জাতি-সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন
- আরব অঞ্চলের ধারাবাহিক স্থবিরতা প্রসঙ্গে একটি মূল্যায়ন
- ইহুদি বিদ্বেষ বা ইহুদি-ঘৃণা হচ্ছে ইহুদিদের প্রতি শত্রুতা, পক্ষপাত বা বৈষম্য
- ধর্ম প্রসঙ্গে গ্রন্থের রুশ সংস্করণের ভূমিকা
- লেনিনবাদী বিশ্বদৃষ্টিতে ধর্ম
- সংগ্রামী বস্তুবাদের তাৎপর্য
- যুব লীগের কর্তব্য
- রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টি (বলশেভিক)-এর খসড়া কর্মসূচি থেকে ধর্ম প্রসঙ্গে
- নারী-শ্রমিকদের প্রথম সারা রুশ কংগ্রেসে বক্তৃতা
- মাক্সিম গোর্কির কাছে
- মাক্সিম গোর্কির কাছে
- ধর্ম এবং যাজনতন্ত্রের প্রতি মনোভাব অনুসারে বিভিন্ন শ্রেণি আর পার্টি
- ধর্ম প্রসঙ্গে শ্রমিক পার্টির মনোভাব
- সমাজতন্ত্র ও ধর্ম
- লেনিন রচিত ধর্ম প্রসঙ্গে বইয়ের পূর্বকথা ও সূচিপত্র
- মার্কসবাদী বিশ্বদৃষ্টিতে ধর্মের স্বরূপ বিশ্লেষণ
- বৌদ্ধবাদ বা বৌদ্ধ ধর্ম হচ্ছে প্রাচীন ধর্মসমূহের অন্যতম একটি ধর্ম
- তাওবাদ হচ্ছে প্রাচীন চীনের দর্শনের একটি মৌলিক সূত্র
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “ইহুদি বিদ্বেষ হচ্ছে জাতিবিদ্বেষমূলক আন্দোলন”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/on-antisemitism/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৪৭।
৩. সরদার ফজলুল করিম; দর্শনকোষ; প্যাপিরাস, ঢাকা; ৫ম মুদ্রণ জানুয়ারি, ২০১২; পৃষ্ঠা ৬৩।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।