আশ্রিত রাজ্য (ইংরেজি: Protectorate) হচ্ছে এমন একটি রাষ্ট্র বা অঞ্চল যা আগ্রাসন এবং আইনের অন্যান্য লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার জন্য অন্য রাষ্ট্র দ্বারা সুরক্ষিত থাকে। এটি একটি নির্ভরশীল অঞ্চল যা তার বেশিরভাগ অভ্যন্তরীণ বিষয়ে স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করে, যদিও কোনও দখল ছাড়াই একটি শক্তিশালী সার্বভৌম রাষ্ট্রের আধিপত্যকে স্বীকৃতি দেয়। এই বিষয়টি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে আলোচিত হয়।[১]
অর্থাৎ আশ্রিত রাজ্য কোনও রাষ্ট্রের আশ্রয়াধীন একটি রাজ্য বা প্রদেশ, যার উপর ওই রাষ্ট্রের আইনগত অধিকার ও ক্ষমতা থাকে, কিন্তু আশ্রিত রাজ্যটির পূর্ণ সার্বভৌমত্ব থাকে না। বিভিন্ন ধরনের চুক্তি, প্রচলিত ধারা ইত্যাদির মাধ্যমে একটি দেশ আশ্রিত রাজ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। অতএব, আশ্রিত রাজ্য একটি উচ্চ সার্বভৌমত্বের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল।
আধুনিক যুগে, গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কসমূহকে পরিচালনা করতে কতিপয় শর্ত দিয়ে সন্ধির মাধ্যমে অধিকাংশ আশ্রিত রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই চুক্তিটি কূটনৈতিক প্রয়োজনে চুক্তি-তৈরির ক্ষমতা এবং দূত-সংক্রান্ত প্রতিনিধিত্বের অধিকারের বিশেষ উল্লেখের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্রিত রাজ্যের অবস্থান সংজ্ঞায়িত করে। বাহ্যিক বিষয়গুলির সকল বিষয়ে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সুরক্ষাকারী ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র দুর্বল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের পক্ষে সুনির্দিষ্ট ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে।[২]
উপনিবেশের সাথে পার্থক্য
একটি আশ্রিত রাজ্য একটি উপনিবেশ থেকে আলাদা কারণ এর স্থানীয় শাসক থাকে, সরাসরি দখলে থাকে না এবং খুব কমই সার্বভৌম রাষ্ট্র দ্বারা উপনিবেশ স্থাপনের অভিজ্ঞতা লাভ করে। যে রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সুরক্ষার অধীনে থাকে এবং তার আন্তর্জাতিক আইনি ব্যক্তিত্ব বজায় রাখে তাকে “সুরক্ষিত রাষ্ট্র” বলা হয়, আশ্রিত রাজ্য নয়। একই কারণে খুব কমই কর্তৃত্বকারী সার্বভৌম রাষ্ট্র থেকে অভিবাসী কর্তৃক অভিবাসনের অভিজ্ঞতা হয়।
ব্রিটেনের রীতি অনুযায়ী আশ্রিত দেশের অধিবাসীরা ব্রিটেনের নাগরিক হিসেবে গণ্য হয় না এবং সে-সব আশ্রিত রাজ্য বিদেশি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়; কিন্তু ওইসব নাগরিকদের ব্রিটেনের রাজশক্তির প্রতি কোনও আনুগত্য না থাকলেও আশ্রয়ের চুক্তি অনুযায়ী কিছু বাধ্যবাধকতা থাকে এবং আশ্রিত রাজ্যের অধিবাসীরা অন্য কোনও রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনও সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না। আশ্রয়দানকারী রাষ্ট্র আশ্রিত রাজ্যের অনেকটা অভিভাবকের মতো সে রাজ্যের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি উন্নয়নের কাজে সহায়তা করে।[৩]
আশ্রিত রাজ্যের ইতিহাস
রোমান সাম্রাজ্যের সময় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রাচীনতম বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে একটি হল আশ্রিত রাজ্য। সিভিটেটস ফোয়েডেরাটে ছিল এমন শহর যা তাদের বৈদেশিক সম্পর্কের জন্য রোমের অধীনস্থ ছিল। মধ্যযুগে, অ্যান্ডোরা ফ্রান্স ও স্পেনের একটি আশ্রিত রাজ্য ছিল। আধুনিক আশ্রিত রাজ্যের ধারণাগুলি ঊনবিংশ শতাব্দীতে তৈরি করা হয়েছিল।
রোডেসিয়া এক সময়ে ব্রিটেনের আশ্রিত রাজ্য ছিল। তবে জার্মানি কর্তৃক ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে চেকোস্লোভাকিয়াকে আশ্রিত রাজ্য হিসেবে দাবি করলেও কার্যত সেটি ছিল অন্তর্ভুক্তিকরণ।
আরো পড়ুন
- আশ্রিত রাজ্য হচ্ছে প্রতিরক্ষার জন্য অন্য রাষ্ট্র দ্বারা সুরক্ষিত এলাকা
- একাধিপত্য হচ্ছে আঞ্চলিক বা বৈশ্বিক, অন্য রাষ্ট্রের উপর একটি রাষ্ট্রের প্রাধান্য
- আত্ম-নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক সত্তা গঠনের অধিকার
- অন্তর্ভুক্তি হচ্ছে এক রাষ্ট্র কর্তৃক অন্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ড দখল
- চীন থেকে অস্ত্র আমদানি বাংলাদেশকে সাম্রাজ্যবাদের অধীনস্থ করেছে
- মাও সেতুং-এর গণচীনের হারিয়ে যাওয়া লাল রং এবং বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী চীন
- আফিম যুদ্ধ ১৯ শতকে কিং রাজবংশ এবং পাশ্চাত্যের মধ্যে সংঘটিত দুটি যুদ্ধ
- সাম্রাজ্যবাদের কুফল সম্পর্কে পুলিশ হিসেবে কর্মরত জর্জ অরওয়েলের বর্ণনা
- সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় লেনিন রচিত পুঁজিবাদের বিশ্লেষণমূলক গ্রন্থ
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮; রোদ্দুরে.কম, “আশ্রিত রাজ্য কোনও রাষ্ট্রের আশ্রয়াধীন রাজ্য যার পূর্ণ সার্বভৌমত্ব থাকে না”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/protectorate/
২. The Editors of Encyclopaedia Britannica, তারিখহীন, ব্রিটানিকা ডট কম, https://www.britannica.com/topic/protectorate-international-relations
৩. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৪০-৪১।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।