রংপুর কৃষক বিদ্রোহ বা রংপুরের ঐতিহাসিক প্রজা বিদ্রোহ (ইংরেজি: Rangpur rebellion) হচ্ছে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রজা বিদ্রোহ। জমিরাজস্ব প্রক্রিয়ার ত্রুটি, মহাজন ও সুদখোরদের নির্লজ্জ শোষণ, উপনিবেশবাদী ব্রিটিশ শোষণ এবং কৃষক ও আদিবাসীদের ওপর নিপীড়ন ও গণহত্যা ইত্যাদির কারণে গড়ে ওঠা বিদ্রোহী প্রতিবাদে নানা সময়ে কৃষক, তাঁতি, কারিগর, জেলে, মেথর, মুচি, ব্যবসায়ী, শিল্পী, শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অজস্র মানুষ বিচ্ছিন্ন ভাবে হলেও দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামে সামিল হয়েছিল। সেইসব বিদ্রোহসমূহের মধ্যে রংপুর বিদ্রোহ ছিল অন্যতম।
১৭৭২-১৭৭৭ সালের পঞ্চবর্ষব্যাপী ভূমিরাজস্ব বন্দোবস্ত এবং সে সময় থেকে বাৎসরিক বন্দোবস্তের অধীনে ভূমি সর্বোচ্চ নিলামে ইজারা দেয়ার পদ্ধতি কৃষকদের স্বার্থে এক বিধ্বংসী আঘাত ছিল। প্রথাগতভাবে রায়তগণ পরগনা নিরিখ অনুসারে ভূমিকর প্রদান করতো এবং তা বংশগত জমিদারদের দ্বারা সংগ্রহ করা হতো, যাদের সরকারি অনুমোদন ব্যতিরেকে পরগনা নিরিখ পরিবর্তনের অধিকার ছিল না। স্পষ্টত রাজস্ব প্রদানকারী কৃষকদের (revenue farmers) প্রধান লক্ষ্য ছিল মুনাফা অর্জন করা। চুক্তি অনুসারে সরকারি রাজস্ব সংগ্রহের জন্য ও নির্ধারিত রাজস্বের অতিরিক্ত মুনাফার জন্য এসব কৃষক বাধ্য হয়ে পরগনা নিরিখ অগ্রাহ্য করে, রাজস্বহার বৃদ্ধি করে এবং অবৈধভাবে আবওয়াব (abwab) বা কর সংগ্রহ করে। এতে অতিরিক্ত করভারে ভারাক্রান্ত রায়তেরা অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হয়। অনেক স্থানে তারা নিষ্ক্রিয় এবং কোনো কোনো সময় সক্রিয় প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং নির্ধারিত হারের অতিরিক্ত কর প্রদানে অস্বীকৃতি জানায়।
রংপুর বিদ্রোহ
যা হোক, ১৭৮৩ সালে রংপুরে রায়ত-অসন্তোষের সবচেয়ে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে কম্পিত করে তোলে। এটা ছিল কলকাতার এক রাজস্ব ইজারাদার দেবী সিংহের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। দেবী সিংহ রাজস্বহার বৃদ্ধি করেন এবং পরিবর্তিত হারে প্রজাদের খাজনা দিতে বাধ্য করেন। অধিকন্তু, তিনি কৃষকদেরকে দেরিনউইলা (Derinwilla) নামে নতুন কর (abwab) দিতে নির্দেশ দেন। এ ব্যবস্থা বিলম্বে কর প্রদানকারীদের উপর আরোপ করা হয়। আরেকটি নতুন আবওয়াব, যা প্রজাদের দিতে হতো, তা হলো হুন্দিয়ান (Hundian) বা অর্থ বিনিময় ও প্রেরণ সংক্রান্ত কর। দেবী সিংহের গোমস্তারা নিজেদের ভোগের জন্য প্রজাদেরকে আবওয়াব পরিশোধে বাধ্য করে।
দেবী সিংহ ক্ষুদে স্থানীয় জমিদারদের কাছ থেকে রাজস্ব সংগ্রহকারী এক ইজারাদার ছিলেন। উক্ত ভূমালিকগণ দেবী সিংহ ও কোম্পানি বাহাদুরের বিরুদ্ধে নির্যাতিত প্রজাদের পক্ষে নেতৃত্ব দেন। সাধারণ প্রজাদেরকে বর্ধিত হারে রাজস্ব দিতে নিষেধ করা হয় এবং ফলে উৎসাহী প্রজারা দেবী সিংহকে কোনো রাজস্ব প্রদান করে নি এবং সেই সাথে তাকে রংপুর ও দিনাজপুরে অবাঞ্ছিত (undesirable) ব্যক্তি ঘোষণা করে।[১]
১৭৮৩ সালের জানুয়ারি মাসে বামনডাঙ্গা ও তেপাহ পরগনায় বিদ্রোহ শুরু হয় এবং তা শীঘ্রই অন্যান্য পরগনায় ছড়িয়ে পড়ে। সব স্থানেই প্রজারা ‘ইজারাদার দেবী সিংহের মুণ্ডু চাই’ স্লোগান দেয়। এ যাবৎ দেবী সিংহের গোমস্তাদের দ্বারা আটককৃত সকল খেলাপী প্রজাকে মুক্ত করা হয় এবং এ প্রক্রিয়ায় ইজারাদারের অনেক প্রতিনিধি নিহত হয়। এ বিদ্রোহে নেতৃত্ব দেন প্রথমে ধীরাজ নারায়ণ নামে এক ক্ষুদে ভূস্বামী এবং পরবর্তীতে নূরুল-আল-দীন বা নূরলদীন যিনি নিজেকে দেশের ‘নবাব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। দয়াশীল নামে আরেকজন ক্ষুদে ভূস্বামী (ইংরেজি: petty landholder) তাঁর দীউয়ান বা ডেপুটি ছিলেন। তাঁরা দু’জনেই লেফটেন্যান্ট ম্যাকডোনাল্ডের নেতৃত্বে সরকারি বাহিনীর সাথে সামরিক সংঘর্ষে নিহত হন। সৈন্যরা অনেক গ্রাম ভস্মীভূত করে দেয়। আতঙ্কিত ও ভীত প্রজারা পরে আত্মসমর্পণ করে এবং সরকারি শর্তাবলী মেনে নেয়। শর্তের একটি বিষয় ছিল, সকল খাজনা বর্ধিতকরণ বাতিলযোগ্য হবে ও সংগৃহীত খাজনা ফেরত দেয়া হবে এবং আগামীতে কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনা না করে খাজনার হার বৃদ্ধি করা হবে না। বিদ্রোহে সক্রিয়ভাবে জড়িত প্রজাদেরকে সাধারণ ক্ষমা প্রদর্শন করা হয়।[২]
আরো পড়ুন
- বাংলা সংগীত হচ্ছে হাজার বছর ধরে চলমান এক সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের অধিকারী
- বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি প্রসঙ্গে
- প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র বলতে এশীয় সমাজগুলির রাজনৈতিক বা নৈতিকভাবে স্বৈরশাসনকে বোঝায়
- বাংলাদেশের ইতিহাস হচ্ছে পূর্ববঙ্গের জনগণের লড়াই ও মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস
- যুগান্তর দল বা যুগান্তর সমিতি ছিল বাংলার গোপন বিপ্লববাদী সংস্থা
- অনুশীলন সমিতি ছিল বাংলার বিপ্লববাদী রাজনৈতিক সংগঠন
- বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন প্রসঙ্গে
- বাংলাদেশের গণযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে স্বাধীনতার জন্য চালিত সশস্ত্র সংগ্রাম
- জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস ২০২০ প্রশ্নপত্র
- বাংলার সংস্কৃতি বাংলা ও ভারতের পূর্ব অংশে বাংলাভাষী প্রধান অঞ্চলের সংস্কৃতি
- বাংলা নামের উৎপত্তি হয়েছে বঙ্গ শব্দের সাথে আল বা আইল শব্দ যুক্ত হয়ে
- বাংলার ইতিহাসে ভৌগোলিক উপাদান বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যাবলীর প্রভাব
- বাংলা বা বঙ্গের ভৌগোলিক পরিচয় বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যাবলী প্রসঙ্গে
- ভারতীয় উপমহাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বা প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ
- সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলাফল হচ্ছে জাতির স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা পুনরুদ্ধার
- সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ হচ্ছে খাজনা বৃদ্ধি, মহাজনদের শোষণ ও কারচুপি
- রাজমহলের যুদ্ধ হচ্ছে বাংলাকে পরাধীন করার অন্যতম নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধ
- পাবনা কৃষক বিদ্রোহ ছিল জমিদারদের বিরুদ্ধে একটি উল্লেখযোগ্য বিদ্রোহ
- নীল বিদ্রোহ বা নীল প্রতিরোধ আন্দোলন ছিল কৃষক আন্দোলন
- রংপুর কৃষক বিদ্রোহ হচ্ছে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে উত্তরবঙ্গের অন্যতম বিদ্রোহ
- কৃষক বিদ্রোহের কারণ হচ্ছে সতের ও আঠার শতকের ব্রিটিশ খাজনা ও শোষণ
- সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী এবং স্থানীয় জমিদারদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান
- চাকমা বিদ্রোহ হচ্ছে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদিদের বিরুদ্ধে চাকমা জাতির অভ্যুত্থান
- খাসি বিদ্রোহ হচ্ছে বর্বর ব্রিটিশ উপনিবেশবাদিদের বিরুদ্ধে খাসিয়া অভ্যুত্থান
- বাংলায় ধর্মীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর ব্রিটিশবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলন ও বিদ্রোহ
তথ্যসূত্র
১. রংপুর প্রজা বিদ্রোহের উপর বিস্তারিত দেখুন, Narahari Kaviraj, A Peasant Uprising in Bengal, 1783 (New Delhi 1972).
২. সিরাজুল ইসলাম, “অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে প্রতিরোধ আন্দোলন ও বিদ্রোহ”, বাংলাদেশের ইতিহাস ১৭০৪-১৯৭১, প্রথম খণ্ড, রাজনৈতিক ইতিহাস, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, ডিসেম্বর ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ১৫০-১৫১।
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।