বাংলা বা বঙ্গ বা বাংলা অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিচয় বা বৈশিষ্ট্যাবলী (ইংরেজি: Geographical identity of Bengal) হচ্ছে ৮০ হাজার বর্গমাইল বিস্তৃত নদীবাহিত পলি দ্বারা গঠিত এক বিশাল সমভূমি। এদেশের ভৌগোলিক পরিচয় এদেশের ইতিহাসকে যুগ যুগ ধরে প্রভাবিত করেছে।
প্রথমেই বাংলা বলতে কোনো ভূ-খন্ডকে বোঝাতো তা স্পষ্ট করে নেয়া প্রয়োজন। মোটামুটিভাবে ১৯৪৭-এর পূর্বে ব্রিটিশ ভারতের ‘বেঙ্গল’ প্রদেশের ভূ-খন্ডকেই ‘বাংলা’ অঞ্চল হিসেবে ধরা হয়েছে। বর্তমানে এই ভূখন্ডেই আমাদের বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। ইতিহাসের দৃষ্টিতে এই ভূ-খন্ডের একটি আঞ্চলিক সত্তা ছিল এবং ভূগোলবিদগণ উপমহাদেশের মধ্যে ‘বাংলা’কে একটি ভৌগোলিক অঞ্চল বলে স্বীকার করেছেন।
বাংলার পাঁচটি প্রধান অঞ্চল
প্রায় ৮০ হাজার বর্গমাইল বিস্তৃত নদীবাহিত পলি দ্বারা গঠিত এক বিশাল সমভূমি এই বাংলা। এর পূর্বে ত্রিপুরা, গারো ও লুসাই পাহাড়, উত্তরে শিলং মালভূমি ও নেপালের তরাই অঞ্চল, পশ্চিমে রাজমহল ও ছোট নাগপুর পর্বতরাজির উচ্চ ভূমি এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। এই বিস্তৃত সমভূমির দক্ষিণ দিক সাগরাভিমুখে ঢালু এবং গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার জলরাশি দ্বারা বয়ে আনা বিপুল পরিমাণ পলি সাগরে উৎসারিত হচ্ছে।
সমুদ্রোপকূলবর্তী নিম্নভূমি জঙ্গলাকীর্ণ এর পেছনেই (অর্থাৎ উত্তরে) প্রায় ৫০ হাজার বর্গমাইল সমতল ভূমি, যার গঠনে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা প্রবাহের অবদান রয়েছে। এই বিস্তৃত সমতলভূমির মধ্যে ত্রিপুরা অঞ্চল নিকটবর্তী প্লাবন ভূমির তুলনায় গড়ে ৬ ফুট উঁচু এবং এর মাঝামাঝি রয়েছে লালমাই পাহাড়। সিলেট এলাকাও গড়ে প্রায় ১০ ফুট উঁচু এবং এরই দক্ষিণ সীমায় অবস্থিত প্লাইস্টোসিন যুগের সুগঠিত মধুপুর উচ্চভূমি। এই সুগঠিত উচ্চভূমির উত্তর-পশ্চিমে বিস্তৃতিই হচ্ছে ‘বরেন্দ্র’ বা ‘বারিন্দ্র’ এলাকা। পশ্চিমে রাজমহল ও ছোট নাগপুর পাহাড় সংলগ্ন উত্তর থেকে দক্ষিণাভিমুখে বিস্তৃত প্লাইস্টোসিন ভূ-ভাগ রয়েছে। নীহাররঞ্জন রায়ের ভাষায় “একদিকে সুউচ্চ পর্বত, দুই দিকে কঠিন শৈলভূমি, আর একদিকে বিস্তীর্ণ সমুদ্র; মাঝখানে সমভূমির সাম্য- ইহাই বাঙালীর ভৌগোলিক ভাগ্য।”
সামগ্রিকভাবে ভূ-প্রাকৃতিক গঠন বৈশিষ্ট্যের আলোকে বাংলাকে পাঁচটি ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে। সেগুলো হচ্ছে (১) উত্তর বাংলার পাললিক সমভূমি; (২) ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অন্তর্বর্তী ভূ-ভাগ; (৩) ভাগীরথী-মেঘনা অন্তর্বর্তী ব-দ্বীপ; (৪) চট্টগ্রামাঞ্চলের অনুচ্চ পার্বত্য এলাকা এবং (৫) বর্ধমানাঞ্চলের অনুচ্চ পার্বত্য এলাকা।
অবস্থানগত বিবেচনায় বাংলা ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বপূর্ব প্রান্তের অঞ্চল। বাংলার উত্তরে প্রকান্ড হিমালয় পর্বত ও নেপাল। পূর্বে মনিপুর, আসাম, ত্রিপুরা ও মায়ানমার। পশ্চিমে ভারতের বিহার এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর।
নদনদীর প্রভাব
বাংলার ভূ-প্রকৃতিতে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নদীমালার। প্রধান নদীগুলোর স্রোতধারাই বাংলাকে মূলত চারটি ভাগে বিভক্ত করেছে? উত্তর, পশ্চিম, মধ্য ও পূর্ব। প্রত্যেকটি বিভাগেরই যেমন রয়েছে ভৌগোলিক সত্তা তেমনি ঐতিহাসিক সত্তা। যা হোক, বাংলার নদ-নদীর মধ্যে গঙ্গাই প্রধান। রাজমহলকে স্পর্শ করে গঙ্গা বাংলার সমতলভূমিতে প্রবেশ করেছে। সমতলভূমিতে প্রবেশ করেই গঙ্গার দুটি প্রধান প্রবাহ লক্ষ করা যায়। গঙ্গার একটি প্রবাহ পূর্ব দক্ষিণগামী যার নাম পদ্মা, অন্যটি সোজা দক্ষিণমুখী নাম ভাগীরথী। গঙ্গার আরো অনেক শাখা প্রশাখা বাংলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
বাংলার নদীসমূহের মধ্যে দ্বিতীয় প্রধান প্রবাহ ব্রহ্মপুত্র, বাংলার উত্তর-পূর্ব ও পূর্বাঞ্চলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আসামের ভিতর দিয়ে গতিপথ কিছুটা দক্ষিণ-পশ্চিমগামী এবং রংপুর ও কুচবিহারের সীমান্ত দিয়ে বাংলায় প্রবেশ করেছে। বেশ কয়েকবার গতিপথ পরিবর্তন করে ব্রহ্মপুত্র বর্তমান যমুনা-পদ্মার পথে মেঘনার সাথে মিলিত হয়ে সমুদ্রে পড়েছে।
বাংলার পূর্বাঞ্চলের প্রধান নদীপ্রবাহ মেঘনা, এই নদী শিলং মালভূমি ও সিলেটের জলসম্ভার নিয়ে সমুদ্রে পড়েছে। মেঘনার উত্তর প্রবাহের নাম সুরমা। আঞ্চলিক নদীসমূহের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে অজয় দামোদর, কাঁসাই, দ্বারকেশ্বর, রূপনারায়ণ, সরস্বতী; আর উত্তরাঞ্চলে করতোয়া, আত্রাই, পূনর্ভবা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বাংলার প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলো কোনো না কোনো নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল। বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোও ছিল নদীরই তীরে।
আরো পড়ুন
- বাংলা সংগীত হচ্ছে হাজার বছর ধরে চলমান এক সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময় ঐতিহ্যের অধিকারী
- বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি প্রসঙ্গে
- প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র বলতে এশীয় সমাজগুলির রাজনৈতিক বা নৈতিকভাবে স্বৈরশাসনকে বোঝায়
- বাংলাদেশের ইতিহাস হচ্ছে পূর্ববঙ্গের জনগণের লড়াই ও মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস
- যুগান্তর দল বা যুগান্তর সমিতি ছিল বাংলার গোপন বিপ্লববাদী সংস্থা
- অনুশীলন সমিতি ছিল বাংলার বিপ্লববাদী রাজনৈতিক সংগঠন
- বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন প্রসঙ্গে
- বাংলাদেশের গণযুদ্ধ বা মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে স্বাধীনতার জন্য চালিত সশস্ত্র সংগ্রাম
- জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস ২০২০ প্রশ্নপত্র
- বাংলার সংস্কৃতি বাংলা ও ভারতের পূর্ব অংশে বাংলাভাষী প্রধান অঞ্চলের সংস্কৃতি
- বাংলা নামের উৎপত্তি হয়েছে বঙ্গ শব্দের সাথে আল বা আইল শব্দ যুক্ত হয়ে
- বাংলার ইতিহাসে ভৌগোলিক উপাদান বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যাবলীর প্রভাব
- বাংলা বা বঙ্গের ভৌগোলিক পরিচয় বা ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যাবলী প্রসঙ্গে
- ভারতীয় উপমহাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান বা প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ
- সাঁওতাল বিদ্রোহের ফলাফল হচ্ছে জাতির স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা পুনরুদ্ধার
- সাঁওতাল বিদ্রোহের কারণ হচ্ছে খাজনা বৃদ্ধি, মহাজনদের শোষণ ও কারচুপি
- রাজমহলের যুদ্ধ হচ্ছে বাংলাকে পরাধীন করার অন্যতম নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধ
- পাবনা কৃষক বিদ্রোহ ছিল জমিদারদের বিরুদ্ধে একটি উল্লেখযোগ্য বিদ্রোহ
- নীল বিদ্রোহ বা নীল প্রতিরোধ আন্দোলন ছিল কৃষক আন্দোলন
- রংপুর কৃষক বিদ্রোহ হচ্ছে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে উত্তরবঙ্গের অন্যতম বিদ্রোহ
- কৃষক বিদ্রোহের কারণ হচ্ছে সতের ও আঠার শতকের ব্রিটিশ খাজনা ও শোষণ
- সাঁওতাল বিদ্রোহ ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী এবং স্থানীয় জমিদারদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান
- চাকমা বিদ্রোহ হচ্ছে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদিদের বিরুদ্ধে চাকমা জাতির অভ্যুত্থান
- খাসি বিদ্রোহ হচ্ছে বর্বর ব্রিটিশ উপনিবেশবাদিদের বিরুদ্ধে খাসিয়া অভ্যুত্থান
- বাংলায় ধর্মীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর ব্রিটিশবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলন ও বিদ্রোহ
অনুপ সাদি বাংলাদেশের একজন লেখক ও গবেষক। তাঁর লেখা ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা উনিশটি। ২০০৪ সালে কবিতা গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে তিনি পাঠকের সামনে আবির্ভূত হন। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘মার্কসবাদ’ তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় প্রবন্ধ গ্রন্থ। সাহিত্য ও রাজনীতি বিষয়ে চিন্তাশীল গবেষণামূলক লেখা তাঁর আগ্রহের বিষয়।