কর্তৃত্ববাদ (ইংরেজি: Authoritarianism) হচ্ছে একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যার বৈশিষ্ট্য হলো রাজনৈতিক বহুত্ববাদ প্রত্যাখ্যান, রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা বজায় রাখার জন্য শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার, এবং গণতন্ত্র, ক্ষমতা পৃথকীকরণ, নাগরিক স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের হ্রাসকরণ। কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা হয় স্বৈরাচারী নতুবা অভিজাততান্ত্রিক হতে পারে এবং একদলীয় শাসন, সামরিক বাহিনী, অথবা একক ব্যক্তির ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের উপর ভিত্তি করে তৈরি হতে পারে।[১] যেসব রাষ্ট্রে গণতন্ত্র এবং কর্তৃত্ববাদের মধ্যে অস্পষ্ট সীমানা রয়েছে, তাদেরকে কখনও কখনও “বর্ণসঙ্কর (ইংরেজি: Hybrid) গণতন্ত্র”, “বর্ণসঙ্কর শাসনব্যবস্থা” বা “প্রতিযোগিতামূলক কর্তৃত্ববাদী” রাষ্ট্র হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কর্তৃত্ববাদ হচ্ছে এমন মতবাদ যেখানে জনগণের সম্মতি অপেক্ষা কোনও ব্যক্তি অথবা গােষ্ঠীর কর্তৃত্বে সরকার পরিচালিত হয়। কর্তৃত্ববাদীরা মনে করেন যে তাঁদের মনােমত সুশৃঙ্খল পথে সরকার পরিচালিত হওয়া মঙ্গলজনক অথবা নিদেনপক্ষে প্রয়ােজনীয়। দুটি বিশ্বাস থেকে ধারণাটি গড়ে ওঠে: ১. লােকের কর্তৃত্বাধীন থাকাই কল্যাণকর, এবং ২. কর্তৃত্ব জনগণের সম্মতিসাপেক্ষ নয়, বরং বলা ভালো যে কর্তৃত্ব সম্মতির পূর্বশর্ত।
কর্তৃত্ববাদ বিরোধীতা মূলত উদারতাবাদ ও অতি-গণতান্ত্রিকতার নামান্তর। যারা কর্তৃত্ববাদের বা কর্তৃত্বের বিরোধীতা করেন তারা আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজের জটিলতম বৈশিষ্ট্যগুলোকে খেয়াল করেন না। এই বিষয়ে ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে প্রবন্ধে বেশ কিছু যুক্তি ও উদাহরণ দিয়েছেন, যেখানে কর্তৃত্ব ছাড়া সংগঠন অচল। যেমন আধুনিক বড় শিল্পকারখানার উৎপাদন বা আধুনিক রেলওয়ে পরিবহন। এসব স্থানে কর্তৃত্ব ছাড়া প্রযুক্তি অচল।
বৈশিষ্ট্য
কর্তৃত্ববাদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অত্যন্ত ঘনীভূত এবং কেন্দ্রীভূত সরকারি ক্ষমতা যা রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মাধ্যমে বজায় থাকে এবং সশস্ত্র শক্তির মাধ্যমে সম্ভাব্য বা অনুমিত প্রতিদ্বন্দ্বীদের বহিষ্কার করা হয়। এই শাসনব্যবস্থা তার নিজ রাজনৈতিক দল এবং গণসংগঠনগুলিকে শাসনের চারপাশে জনগণকে একত্রিত করার জন্য ব্যবহার করে। অ্যাডাম প্রজেওর্স্কি তত্ত্ব দিয়েছেন যে “কর্তৃত্ববাদী ভারসাম্য মূলত মিথ্যা, ভয় এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির উপর নির্ভর করে।”
কর্তৃত্ববাদ রাজনৈতিক ক্ষমতার অনানুষ্ঠানিক এবং অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগকেও অন্তর্ভুক্ত করে, এটি এমন একটি নেতৃত্ব যা “স্ব-নিযুক্ত এবং যদি নির্বাচিত হয়, তবুও প্রতিযোগীদের মধ্যে নাগরিকদের স্বাধীন পছন্দ দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত করা যায় না”; এছাড়াও এই ধরনের নেতৃত্ব নাগরিকদেরকে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করে এবং অর্থপূর্ণ বিরোধিতার প্রতি সামান্য সহনশীলতাও প্রদর্শন করে না।
সশস্ত্র বাহিনীর উপর নিয়ন্ত্রণ এবং সমর্থন, শাসনব্যবস্থা দ্বারা নিযুক্ত আমলাতন্ত্র এবং সামাজিকীকরণ এবং মতদীক্ষাদানের বিভিন্ন উপায়ের মাধ্যমে আনুগত্য তৈরির মাধ্যমে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার সময় বিভিন্ন ধরণের সামাজিক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নাগরিক সমাজকে দমন করার চেষ্টা করে। পিপ্পা নরিস এবং রোনাল্ড ইঙ্গেলহার্ট রাজনীতিবিদ এবং রাজনৈতিক দলগুলিতে নিরাপত্তা, সঙ্গতি এবং আনুগত্যের মূল্যবোধ অনুসন্ধান করে কর্তৃত্ববাদকে চিহ্নিত করেন।
কর্তৃত্ববাদকে শাসক বা শাসক দলের (প্রায়শই এক-দলীয় রাষ্ট্রে) বা অন্য কর্তৃপক্ষের “অনির্দিষ্ট রাজনৈতিক মেয়াদ” দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। একটি কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা থেকে আরও গণতান্ত্রিক সরকারে রূপান্তরকে গণতন্ত্রীকরণ বলা হয়।
উগ্র কর্তৃত্ববাদীদের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রিক বাধ্যতার যুক্তিসিদ্ধ কোনও উৎস নেই। সেজন্য অসন্তোষের প্রতিকার তথা রাষ্ট্রের সুস্থিতির জন্য কর্তৃত্ববাদের প্রয়ােজন থাকে; প্রচলিত অনুষ্ঠান-প্রতিষ্ঠানের প্রতি আনুগত্যের তাগিদেও কর্তৃত্ববাদ অপরিহার্য বলে তাঁদের অভিমত। উল্লিখিত তাত্ত্বিক প্রত্যয় ছাড়াও অনেক সময়ে ক্ষমতাসীন কায়েমি শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি অথবা গােষ্ঠীর আচরণেও কর্তৃত্ববাদ ফুটে ওঠে।[২]
আরো পড়ুন
- কর্তৃত্ববাদ হচ্ছে রাজনৈতিক ব্যবস্থা যার বৈশিষ্ট্য হলো রাজনৈতিক বহুত্ববাদ প্রত্যাখ্যান
- কর্তৃত্ব প্রসঙ্গে
- এশীয় উৎপাদন পদ্ধতি হচ্ছে কার্ল মার্কস কর্তৃক তৈরিকৃত একটি তত্ত্ব
- বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের ভিত্তি প্রসঙ্গে
- প্রাচ্য স্বৈরতন্ত্র বলতে এশীয় সমাজগুলির রাজনৈতিক বা নৈতিকভাবে স্বৈরশাসনকে বোঝায়
- স্বৈরতন্ত্র এমন সরকার যেখানে একটি একক সত্তা নিরঙ্কুশ ক্ষমতার সাথে শাসন করে
- আরব অঞ্চলের ধারাবাহিক স্থবিরতা প্রসঙ্গে একটি মূল্যায়ন
- ভোট হচ্ছে মৌখিক বা ব্যালটের মাধ্যমে কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া
- স্বৈরতন্ত্র জনগণের মধ্যে অনৈক্য করেই টিকে থাকে
- মৌলিক গণতন্ত্র হচ্ছে স্বৈরতন্ত্রী শাসনব্যবস্থা পাকা করবার পদ্ধতি
- জর্জ অরওয়েল হচ্ছেন পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী ফার্মের একগুঁয়ে এক এনিমেল
- চার্লস লুই দ্য মন্টেস্কু স্বৈরতন্ত্র ও রাজতন্ত্রবিরোধী একজন পুঁজিবাদী দার্শনিক
তথ্যসূত্র
১. অনুপ সাদি, ২ জানুয়ারি ২০১৯; রোদ্দুরে.কম, “কর্তৃত্ববাদ কাকে বলে”; ইউআরএল: https://www.roddure.com/encyclopedia/marxist-glossary/what-is-authoritarianism/
২. সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, রাজনীতির অভিধান, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ, জুলাই ২০১৩, পৃষ্ঠা ৭৬-৭৭।
অনুপ সাদি একজন বিশিষ্ট কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি রাজনীতি, সমাজ এবং শ্রমিক-কৃষকের মুক্তিকামী চেতনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে চলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৯টি। ২০১২ সাল থেকে বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে তাঁর সরব উপস্থিতি রয়েছে। সমাজতন্ত্র ও মার্কসবাদ নামে তাঁর দুটি পাঠকপ্রিয় বই রয়েছে। বর্তমানে তিনি ‘রোদ্দুরে‘ ও ‘ফুলকিবাজ‘ পোর্টালে নিয়মিত কলাম লিখছেন। 📚 আরও পড়ুন: অনুপ সাদির বইসমূহ: কবিতা, প্রবন্ধ ও সম্পাদিত গ্রন্থের পূর্ণাঙ্গ তালিকা। 📚